জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

জ্বালানি সংকটে বন্ধ হচ্ছে কারখানা, উৎপাদনেও ধীরগতি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

স্ট্রিম গ্রাফিক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটের শঙ্কায় শুরু হয়েছে রেশনিং। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় শিল্পসহ অন্যান্য খাতে কমেছে গ্যাস সরবরাহ। তবে লোডশেডিং বেড়েছে। এতে আগে থেকেই গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে ভুগতে থাকা শিল্পখাত নিয়ে ‘কপালে চিন্তার ভাঁজ’ পড়েছে ব্যবসায়ীদের।

শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সংকটে দেশে এরই মধ্যে ৬ সার কারখানার পাঁচটিই বন্ধ করা হয়েছে। প্রভাব পড়েছে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও। লোডশেডিং বাড়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল না পাওয়ায় নিজেরাও বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। এতে কমছে উৎপাদন।

জ্বালানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে জ্বালানি চাহিদার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই আমদানি করা হয়। তেলের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা ৯৫ শতাংশের উপরে। গ্যাসের চাহিদারও ২৮ থেকে ৩৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। আমদানিনির্ভর এমন জ্বালানি খাতে তাই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের বড় ধাক্কা লেগেছে। যার প্রভাব দেখা যাচ্ছে শিল্প খাতে।

বড় ধাক্কা সার শিল্পে

জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে দেশের কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সার শিল্পে। দেশের ছয়টি বড় ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিই এখন বন্ধ। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) পরিচালিত ঘোড়াশাল, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানা, যমুনা ও আশুগঞ্জ কারখানা বন্ধ করা হয়েছে। উৎপাদন বন্ধ রেখেছে বেসরকারি কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানিও (কাফকো)।

গত ৫ মার্চ এসব কারখানা ১৫ দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হলেও কবে উৎপাদনে ফিরবে তা বোঝা যাচ্ছে না। বর্তমানে চালু আছে শুধু শাহজালাল সার কারখানা।

পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বেড়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর চালায়। তবে ডিজেলের ঘাটতি ও রেশনিংয়ের কারণে সেটিও কেনা সম্ভব হচ্ছে না। এতে অনেক কারখানা উৎপাদন কমাতে অথবা কিছু শিফট বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

দেশে বছরে ইউরিয়ার চাহিদা প্রায় ২৬ লাখ টন। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদন এবং বাকিটা আমদানি করা হয়। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে উৎপাদন হয়েছে ৫ লাখ ৫০ হাজার টন। চলমান সংকটের কারণে এখন বেশি পরিমাণ সার আমদানি করতে হবে।

বিসিআইসির বাণিজ্যিক, উৎপাদন ও গবেষণা বিভাগের পরিচালক প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান জানান, পাঁচটি কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। এমনিতেই গ্যাস সংকটের কারণে প্রতি বছর সক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশও উৎপাদন করা যায় না। এখন গ্যাস আমদানি ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

পোশাক শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত

দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক ও বস্ত্র শিল্পে এখনও কারখানা বন্ধের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বেড়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর চালায়। তবে ডিজেলের ঘাটতি ও রেশনিংয়ের কারণে সেটিও কেনা সম্ভব হচ্ছে না। এতে অনেক কারখানা উৎপাদন কমাতে অথবা কিছু শিফট বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো বড় শিল্পাঞ্চলে এটি বেশি দেখা যাচ্ছে।

তারা আরও জানান, এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অর্ডার সরবরাহে দেরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এতে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার বাংলাদেশ থেকে সরে অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, সরকার ইতোমধ্যে মার্চ মাসের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করেছে। এপ্রিল ও মে মাসের সরবরাহ নিশ্চিতের কাজ চলছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর বিদ্যুৎ বিভ্রাট দ্বিগুণ হয়ে দিনে প্রায় ৫ ঘণ্টায় পৌঁছেছে। ওই সময় আমাদের ডিজেলচালিত স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর চালাতে হয়। কিন্তু এখন পর্যাপ্ত ডিজেলও কিনতে পারছি না।’

বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘পোশাক শিল্প আগে থেকেই বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছিল। তাই নিজেরাই তেল কিনে জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতাম। কিন্তু এখন একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে, অন্যদিকে সরকার পর্যাপ্ত তেলও দিতে পারছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এতে অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি অর্ডার বাংলাদেশ থেকে সরে ভারত, ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশে চলে যেতে পারে।’

সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এরমধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে অপ্রয়োজনীয় এসি ও বাতি বন্ধ রাখা, গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া এবং গ্যাস লিকেজ পরীক্ষা করার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

এ ছাড়া সার কারখানা বন্ধ রাখার পাশাপাশি ১০ মার্চ থেকে আগাম ঈদের ছুটি ঘোষণা করে সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা হয়েছে। কোচিং সেন্টার এবং বিদেশি কারিকুলামের স্কুলগুলোও বন্ধ রাখা হয়েছে।

পাশাপাশি চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে জরুরিভিত্তিতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া পরিশোধ এবং জ্বালানি আমদানির ওপর শুল্ক ছাড় দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়ানোর চেষ্টাও চলছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যানুযায়ী, গত সোমবারের মধ্যে কাতার থেকে এলএনজি নিয়ে ‘আল জোর’, ‘আল জাসাসিয়া’ ও ‘লুসাইল’ নামের তিনটি জাহাজ এসেছে। আজ বুধবার ‘আল গালায়েল’ নামের আরেকটি জাহাজ বন্দরের জলসীমায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে এই চারটি জাহাজে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন এলএনজি রয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, সরকার ইতোমধ্যে মার্চ মাসের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করেছে। এপ্রিল ও মে মাসের সরবরাহ নিশ্চিতের কাজ চলছে।

তিনি আরও জানান, যুদ্ধ শুরুর পর বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের কাজও চলছে। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, চীনের পাশাপাশি কয়েকটি আফ্রিকান দেশ থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও ভারত থেকেও আমদানি বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

জ্বালানি আমদানির পরিস্থিতি

সাধারণ পরিস্থিতিতে দেশে মাসে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল লাগে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বর্তমানে তিনটি আন্তর্জাতিক ট্রেডারের কাছ থেকে প্রায় ৬০ হাজার টন ডিজেল সংগ্রহ করেছে। জ্বালানি খাতের দুইজন কর্মকর্তা সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে জানান, চলতি মাসের শেষের দিকে আরও ৯০ হাজার টন ডিজেল দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

তাদের মধ্যে এক কর্মকর্তা জানান, পেট্রো-চায়না থেকে আনা ২৭ হাজার টন ডিজেলের একটি কার্গো গত সোমবার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। একই সময় ভিটল কোম্পানির ২৮ হাজার টন ডিজেলবাহী আরেকটি জাহাজ বহির্নোঙরে অপেক্ষা করছে। আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের কাছে এক মাসের জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং আরও এক মাসের সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

এ ছাড়া ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজার টন ডিজেল কেনা হচ্ছে। ইন্ডিয়ান অয়েলের কাছ থেকে আরও প্রায় ৩০ হাজার টন ডিজেল সংগ্রহের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যানুযায়ী, গত সোমবারের মধ্যে কাতার থেকে এলএনজি নিয়ে ‘আল জোর’, ‘আল জাসাসিয়া’ ও ‘লুসাইল’ নামের তিনটি জাহাজ এসেছে। আজ বুধবার ‘আল গালায়েল’ নামের আরেকটি জাহাজ বন্দরের জলসীমায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে এই চারটি জাহাজে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন এলএনজি রয়েছে।

এর আগ দিয়ে ‘সেভান’ ও ‘জি ওয়াইএমএম’ নামের দুটি জাহাজে ৪১ হাজার ৪৮৮ টন এলপিজি দেশে এসেছে। এসব জাহাজ সংঘাত শুরুর দুই থেকে সাত দিন আগে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত