পাম্পে অপেক্ষার প্রহর কমলেও ‘ফুয়েল পাসে’ ভোগান্তি চরমে

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৩: ১২
স্ট্রিম গ্রাফিক

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পরও গ্রাহক ভোগান্তি পুরোপুরি কাটেনি। ফিলিং স্টেশনগুলোতে অপেক্ষার সময় আগের চেয়ে কমলেও নতুন সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ। জ্বালানি সরবরাহে শৃঙ্খলা আনতে চালু করা এই অ্যাপে প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও জটিলতায় অনেক গ্রাহকই তেল নিতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন।

গ্রাহকরা বলছেন, কারিগরি ত্রুটি, পর্যাপ্ত নির্দেশনার অভাব ও ডিজিটাল জটিলতায় অ্যাপটি ঠিকমতো কাজ করছে না। এতে দীর্ঘ সময় নষ্ট হচ্ছে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে ভুল তথ্যও দেখাচ্ছে।

শনিবার রাজধানীর বেশ কিছু পাম্প ঘুরে দেখা যায়, তেল নিতে আসা চালকদের দীর্ঘ সারি। তবে এই সারি তেলের জন্য নয়, বরং অ্যাপে লগইন করার জন্য।

মোটরসাইকেল চালক জিহান আক্ষেপ করে বলেন, ‘অ্যাপে তথ্য দিতে গিয়ে ওটিপি আসছে না। বারবার চেষ্টা করেও রেজিস্ট্রেশন ফেইল দেখাচ্ছে। অনেক সময় পর কোড এলেও তা কাজ করছে না।’

অপেক্ষা কমলেও ভোগান্তি শেষ হয়নি

জ্বালানির দাম বাড়ানোর পরদিন থেকেই ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন কিছুটা কমেছে।

ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল চালক জাকিরুল জানান, এক সপ্তাহ আগে ১৪ ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করে তেল পেলেও এখন ২-৩ ঘণ্টার মধ্যে পাচ্ছেন। মোহাম্মদ ফজল নামে আরেকজন বলেন, ৫-৬ ঘণ্টার নিচে আগে তেল পাওয়া যেত না। এখন এর অর্ধেক সময়েই তেল মিলছে।

গাবতলীর একটি পাম্পে মাত্র আধা ঘণ্টায় তেল পেয়েছেন বলেও জানান আনোয়ার নামে এক চালক।

অবশ্য সব পাম্পে এই স্বস্তি মিলছে না। কিছু ফিলিং স্টেশনে আগের মতোই ৪-৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

তবে তেলের পরিমাণ নিয়ে আক্ষেপ আছে অনেকেরে। মোটরসাইকেলচালক ফজল বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও ৫০০ টাকার বা তিন লিটারের বেশি তেল পাওয়া যাচ্ছে না। আবার দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও তেল শেষ হলে খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে।

নতুন যন্ত্রণা ফুয়েল পাস অ্যাপ

জ্বালানি বাজারে স্বচ্ছতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে সম্প্রতি ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ চালু করা হয়েছে। এতে গ্রাহকের তেল নেওয়ার পুরো হিসাব এক স্থানে পাওয়া যাচ্ছে। এতে অতিরিক্ত তেল নেওয়া অনেকটাই বন্ধ হয়েছে।

তবে ক্রেতারা বলছেন, এই অ্যাপ নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। যেনতেনভাবে চালু করায় অ্যাপে লগইন করতে ঝামেলায় পড়ছেন অনেকে। আবার পর্যাপ্ত নির্দেশনা না থাকায় অনেকে রেজিস্ট্রেশনও করতে পারছেন না। এত বড় একটি ডিজিটাল সিস্টেম চালুর আগে গণমাধ্যমে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের প্রয়োজন ছিল।

তাদের অভিযোগ, অ্যাপটিতে রেজিস্ট্রেশনে চেসিস নম্বর বা ইঞ্জিন নম্বরের মতো তথ্য চাওয়া হচ্ছে, যে বিষয়ে অনেক সাধারণ চালকের কোনো ধারণা নেই। এ ছাড়া লাইসেন্সের ক্ষেত্রে ‘ঢাকা’ নাকি ‘ঢাকা মেট্রো ল’— লিখে সার্চ করতে হবে তার কোনো স্পষ্ট গাইডলাইন না থাকায় তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি।

হাসান আলী নামে এক মোটরসাইকেল চালক জানান, ৩ বার চেষ্টা করেও রেজিস্ট্রেশন করতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘পাম্পে এই সিস্টেম বুঝিয়ে দেওয়ার মতো কোনো দক্ষ জনবল নেই। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে তেল না নিয়েই অন্য পাম্পে যাচ্ছেন।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে ‘Fuel Pass BD’ নামের একটি গ্রুপকে হেল্পলাইন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই গ্রুপে শত শত অভিযোগ দেখা গেছে। কেউ বলছেন, লগইন করতে গেলে ‘ইনভ্যালিড ক্রেডেনশিয়ালস’ দেখাচ্ছে, আবার কেউ বলছেন, টাকার হিসেবে গরমিল। এক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ১ হাজার টাকার তেল নেওয়ার পর অ্যাপে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১৭৫০ টাকা বা ১২.৫ লিটার কাটা হয়েছে।

ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালকদের জন্য দৈনিক ১২.৫ লিটার এবং মাসে ৬০ লিটারের সীমাও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। চালকরা বলছেন, সারাদিন রাইড শেয়ারিং করতে এই জ্বালানি যথেষ্ট নয়। তবে অ্যাপে এর বাইরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েছেন যারা নতুন মোটরসাইকেল কিনেছেন। এখনও লাইসেন্স নম্বর না পাওয়ায় অ্যাপে নিবন্ধনের কোনো সুযোগই পাচ্ছেন না এসব মোটরসাইকেলের মালিকরা। ফলে বাইক ঘরেই ফেলে রাখা লাগছে।

বিষয়টি নিয়ে রহমান ওয়াসিফ নামে এক গ্রাহক বলেন, এই বিড়ম্বনা কমাতে অ্যাপে সব পাম্পের তালিকা যুক্ত করা, ডিজিটাল বুকিং সুবিধা এবং লাইভ ট্র্যাকিং ফিচার চালু করা উচিত।

সরবরাহ নিয়ে পাম্প মালিকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

গ্রাহকরা ভোগান্তির কথা বললেও অ্যাপের সুবিধার কথাই বললেন একাধিক পাম্প মালিক। শাহবাগের মেঘনা ফুয়েল পাম্প, মহাখালীর ক্রিসেন্ট অটোমোবাইল ও চাষাড়ার আসগর ফিলিং সেন্টার কর্তৃপক্ষের ভাষ্য– ফুয়েল পাস চালুর পর সরবরাহে অনেকটা শৃঙ্খলা এসেছে। গাড়ির দীর্ঘ সারিও কমেছে। একাধিকবার জ্বালানি নেওয়ার সুযোগ না থাকায় বণ্টন ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে ভারসাম্য আসছে।

জ্বালানি সরবরাহ আগের তুলনায় বেড়েছে বলেও জানায় এই পাম্পগুলো। তারা জানিয়েছে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি জ্বালানি পাচ্ছেন তারা। ঘাটতি নেই বললেই চলে।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক পাম্পের কর্মী জানান, গত সপ্তাহের তুলনায় তারা প্রায় ৯ হাজার লিটার তেল কম পেয়েছেন। সরবরাহ কম থাকায় অনেক পাম্প বাধ্য হয়ে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যেই বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

অবশ্য রমনা ও শাহবাগ এলাকায় নিযুক্ত ট্যাগ অফিসার পরিস্থিতি ‘খুবই ভালো’ বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হচ্ছে। তবে অনেক গ্রাহক ২০০-৩০০ টাকার তেল নিয়ে বারবার লাইনে দাঁড়ানোয় লাইন বড় হচ্ছে।

আয় কমেছে ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালকদের

জ্বালানির দাম বাড়ায় এবং পাম্পে দীর্ঘ সময় নষ্ট হওয়ায় রাইডশেয়ারিং চালকদের দৈনন্দিন আয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। জাকিরুল নামে এক চালক জানান, আগে দৈনিক ২ হাজার টাকা আয় হলেও এখন তা ১২০০-১৫০০ টাকায় নেমেছে।

কিছু চালকের অভিযোগ, তেলের লিটারে ২০ টাকা বাড়লেও অ্যাপভিত্তিক কোম্পানিগুলো ভাড়া আগের মতোই রেখেছে, এতে চালকদের আয় কমে গেছে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন নেয়।

অবশ্য রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ‘পাঠাও’ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর ভাড়া সমন্বয় এবং কমিশন কাঠামো নিয়ে তারা কাজ করছে।

সম্পর্কিত