এপ্রিল মাসের চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত আছে: বিপিসি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

জ্বালানি তেল। ছবি: সংগৃহীত

ইরানযুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করলেও বাংলাদেশে আপাতত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার। একইসঙ্গে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় বড় পরিসরে জরুরি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার আওতায় প্রায় ১৭ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে কোনো ধরনের জ্বালানি ঘাটতি নেই এবং এপ্রিল মাসের চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। নিয়মিত জ্বালানি বহনকারী জাহাজ দেশে পৌঁছাচ্ছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রয়েছে।

শনিবার (৪ এপ্রিল) সরকারের অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ১৬ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল এবং ১ লাখ মেট্রিক টন অকটেন আমদানির জন্য নীতিগতভাবে তিনটি পৃথক প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে।

জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘জ্বালানির সরবরাহ নিয়মিত আমদানির মাধ্যমে স্বাভাবিক রাখা হচ্ছে। এপ্রিল মাসের চাহিদা মেটানোর মতো আমদানি ও সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে এবং মে-জুনে বড় চালান আসার পর পরিস্থিতি আরও স্বস্তিদায়ক হবে।’

সর্বশেষ মজুত পরিস্থিতি: ‘পর্যাপ্ত ও নিরাপদ’

জ্বালানি বিভাগের ২ এপ্রিলের (বৃহস্পতিবার) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ১৮ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ডিজেল রয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৬৬০ টন, যা বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী প্রায় ৯ থেকে ১০ দিনের জন্য যথেষ্ট।

এছাড়া অকটেন ৯ হাজার ২১ টন, পেট্রোল ১২ হাজার ১৯৪ টন, ফার্নেস অয়েল ৫৮ হাজার ৭৩৬ টন, জেট ফুয়েল ৪১ হাজার ৮৭৬ টন, কেরোসিন ৯ হাজার ৩৭৮ টন এবং মেরিন ফুয়েল ১ হাজার ১৫৩ টন মজুত রয়েছে।

এরপর গত দুদিনে (৩ ও ৪ এপ্রিল) পৃথক দুটি জাহাজে মোট ৬১ হাজার টন পরিশোধিত ডিজেল দেশে আসে। ৩ এপ্রিল ২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে ‘এমটি ইউয়ান জিং হে’ নামে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছায়। আর ৪ এপ্রিল ভোরে আসে ‘এমটি শান গ্যাং ফা শিয়ান’ নামে আরেকটি জাহাজ। ৩৪ হাজার টন পরিশোধিত তেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্হিনোঙ্গরে ভেড়ে জাহাজটি।

জ্বালানি মন্ত্রণালয় বলছে, দৈনিক ব্যবহারের কারণে মজুতে কিছুটা ওঠানামা স্বাভাবিক হলেও সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি স্থিতিশীল। ইস্টার্ন রিফাইনারিতে অপরিশোধিত তেলের মজুত কম থাকলেও পরিশোধিত জ্বালানি আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হচ্ছে। ফলে এপ্রিল মাসে কোনও সংকট হবে না।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি এপ্রিলে দেশে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন। এ মাসে আরও সোয়া ৩ লাখ টন ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা আছে। ইতোমধ্যে ১ লাখ ৬৫ থেকে ৬৮ হাজার টন ডিজেল আসার নিশ্চয়তা পাওয়ার কথা বলেছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।

২০ এপ্রিল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মাধ্যমে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনা হবে। আরও ১ লাখ টন জ্বালানি বহনকারী ‘এমটি নর্ডিক পোলাক্স’ নামের জাহাজটি বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থান করছে। উভয় চালানই মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে আরও প্রায় ৭ হাজার টন ডিজেল আসছে, পাশাপাশি মালয়েশিয়া থেকেও অতিরিক্ত চালান আসবে।

জরুরি মজুত বাড়ানোর পরিকল্পনা

এপ্রিল থেকে জুন সময়ের জন্য বিপিসি আগেই প্রায় ৩ লাখ টন ডিজেল এবং ৫০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানির পরিকল্পনা করেছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও বড় উদ্যোগ। এই আমদানির মধ্যে রয়েছে ১৬ লাখ টন ডিজেল এবং ১ লাখ টন পেট্রোল।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিবিএস ট্রেডিং হাউস এফজেডসিও থেকে ১০ লাখ টন উন্নতমানের ডিজেল এবং ১ লাখ টন গ্যাসোলিন আনা হবে। ওমানভিত্তিক ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসি থেকে ১ লাখ টন ডিজেল আমদানির প্রস্তাব রয়েছে।

কাজাখস্তানের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ৫ লাখ টন উচ্চগতির ডিজেল সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই চালানগুলো মূলত মে ও জুন মাসে দেশে পৌঁছাবে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও জোরদার করবে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব ও মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, আপাতত সরকার এই মাসের জন্য জ্বালানি নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। তাই তিনি জনগণকে অযথা আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, সরকার নতুন উৎস অনুসন্ধান করছে এবং যেখানে পাওয়া যাচ্ছে, সেখান থেকেই আমদানি করা হচ্ছে।

এদিকে সরকার ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে জ্বালানির মূল্যও অপরিবর্তিত রেখেছে। এপ্রিল মাসে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির পরও সরকার বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে এই মূল্য ধরে রাখছে।

জ্বালানিবিষয়কমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে সরকার বড় অঙ্কের ভর্তুকি বহন করছে। তিনি বলেন, মার্চ মাসেই ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে এবং জুন মাস নাগাদ তা প্রায় ১৬ হাজার ৪৫ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

মন্ত্রী আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের বিকল্প উৎস থেকে তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। বর্তমানে জ্বালানির মজুত কিছুটা চাপের মধ্যে থাকলেও নিয়মিত আমদানির মাধ্যমে তা প্রতি সপ্তাহে আবারও পূরণ করা হচ্ছে।

সম্পর্কিত