‘এক দেশ, এক কিউআর’ যুগে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৬, ২৩: ৩৮
এআই দিয়ে তৈরি ছবি।

স্মার্ট ও ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সব ধরনের ব্যবসায়িক লেনদেনে ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে। দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসকে (এমএফএস) এই অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এর আগে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংক, এমএফএস, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) এবং পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরদের (পিএসও) এই অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে হবে। এর ফলে ডিজিটাল পেমেন্টের জন্য আর আলাদা আলাদা ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের কিউআর কোডের প্রয়োজন হবে না। একটি মাত্র কোড দিয়েই সব ধরনের ডিজিটাল লেনদেন করা যাবে।

বাংলা কিউআর আসলে কী?

বাংলা কিউআর হলো বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত একটি সর্বজনীন, জাতীয় ও আন্তঃলেনদেনযোগ্য (ইন্টারঅপারেবল) ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা। বর্তমানে একজন ব্যবসায়ীর দোকানে বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা বিভিন্ন ব্যাংকের জন্য আলাদা কিউআর কোড দেখা যায়। এতে গ্রাহকদের যেমন বিভ্রান্তি তৈরি হতো, তেমনি ব্যবসায়ীদেরও একাধিক কোড ব্যবহার করতে হতো।

বাংলা কিউআর সেই জটিলতা দূর করছে। এখন থেকে দোকানে একটি মাত্র কিউআর কোড থাকবে। গ্রাহক তাঁর পছন্দের যেকোনো ব্যাংক অ্যাপ অথবা বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা উপায়ের মতো এমএফএস অ্যাপ ব্যবহার করে সেই কিউআর স্ক্যান করলেই সঙ্গে সঙ্গে অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন। এটিই হবে ‘ওয়ান কান্ট্রি, ওয়ান কিউআর’।

কেন এত গুরুত্ব পাচ্ছে বাংলা কিউআর?

বাংলাদেশে এখনো বিপুল পরিমাণ লেনদেন নগদ টাকায় হয়। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায় অনেক লেনদেন। নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার খরচও বেশি। অন্যদিকে ডিজিটাল লেনদেন বাড়লে অর্থের প্রবাহ আরও স্বচ্ছ হয় এবং কর আদায় বাড়তে পারে। এতে জাল নোট ও নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি কমবে। লেনদেনের সময় ও খরচ কমার পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আসবে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, বাংলা কিউআর দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি মৌলিক অবকাঠামো হিসেবে কাজ করবে।

গ্রাহকদের সুবিধা

বাংলা কিউআর সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কেনাকাটাকে আরও সহজ করবে। মুদি দোকান, ওষুধের দোকান, রেস্তোরাঁ কিংবা সুপারশপ—সব জায়গায় একই কিউআর কোড দেখতে পাবেন গ্রাহকেরা। পকেটে নগদ টাকা না থাকলেও স্মার্টফোনে থাকা যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ দিয়ে কয়েক সেকেন্ডে পেমেন্ট সম্পন্ন হবে। এর ফলে নগদ টাকা বহনের প্রয়োজন হবে না এবং খুচরা টাকার ঝামেলা থাকবে না। লেনদেন হবে দ্রুত ও নিরাপদ।

ব্যবসায়ীদের সুবিধা

বাংলা কিউআর ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল হিসাবরক্ষকের ভূমিকা পালন করবে। ক্রেতা পেমেন্ট করার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীর ফোনে নোটিফিকেশন চলে আসবে। প্রতিটি লেনদেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ফলে আলাদা করে খাতায় হিসাব লিখতে হবে না এবং নগদ অর্থ রাখার ঝুঁকি কমবে। এতে লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ব্যাংকিং ইতিহাস তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

ব্যবহারের ক্ষেত্র

বাংলা কিউআর শুধু দোকানপাটে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি ব্যবহার করা যাবে বাস, ট্রেন ও লঞ্চের ভাড়া পরিশোধে; সেতু, এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভারের টোল দিতে; বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও টেলিভিশন বিল পরিশোধে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফি জমা দিতে। শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গায় একই ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

কীভাবে পাওয়া যাবে?

যেকোনো ক্ষুদ্র, মাঝারি বা বড় ব্যবসায়ী সহজেই তাঁর ব্যাংকের মাধ্যমে বাংলা কিউআর নিতে পারবেন। প্রথমে আবেদনকারীর নামে কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকে একটি সেভিংস, কারেন্ট বা এসএনডি হিসাব থাকতে হবে। নির্ধারিত আবেদন ফরম পূরণ করে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে। সাধারণত ৩ থেকে ৪ কার্যদিবসের মধ্যে কিউআর কোড প্রস্তুত হয়ে যায়। এরপর এসএমএস বা ই-মেইলের মাধ্যমে গ্রাহককে জানানো হবে।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

বাংলাদেশ ব্যাংক মার্চেন্টদের দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছে। ১. মাইক্রো মার্চেন্ট, যাদের মাসিক লেনদেন ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত। তাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি লাগবে। ২. রেগুলার মার্চেন্ট, যাদের মাসিক লেনদেন ১০ লাখ টাকার বেশি। তাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, ই-টিন সনদ এবং সর্বশেষ করবর্ষের রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র দিতে হবে।

নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে ডিজিটাল পথে

বাংলা কিউআর কেবল প্রযুক্তি নয়, এটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন। ভারত তাদের ইউপিআই (ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস-একীভূত পেমেন্ট ব্যবস্থা) ও কিউআরভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কয়েক বছরেই নগদনির্ভরতা কমিয়েছে। বাংলাদেশও এখন সেই পথে হাঁটছে। ১ জুলাই থেকে দেশব্যাপী বাংলা কিউআর চালু হলে ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ ও নিরাপদ হবে। এতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে এবং ক্যাশলেস বাংলাদেশের ভিত্তি শক্তিশালী হবে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত