মূল্যস্ফীতি কমলেও লক্ষণ নেই বাজারে, ব্যয়ে পিষ্ট নিম্ন ও মধ্যবিত্ত

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ২০: ০৬
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

টানা তিন মাস পর জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামলেও বাজারে তার প্রভাব মিলছে না। নিত্যপণ্যের পাশাপাশি জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও অন্যান্য সেবার উচ্চমূল্যে সংসার সামলাতে হিমশিম নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় কমছে সার্বিক ক্রয়ক্ষমতা।

ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদরের তথ্যানুযায়ী, গত ছয় মাসে বেশির ভাগ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। চালের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও ভোজ্যতেল, ডাল, আটা, লবণ, আলু, রসুন, ডিম ও গুঁড়া দুধের মতো পণ্যে বাড়তি ব্যয় করতে হয়েছে ভোক্তাদের। বর্ষা মৌসুমের কারণে সবজির বাজারও চড়া।

তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব বলছে, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে, যা জুনের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে দশমিক ৮৪ শতাংশ কম। এর আগে তিন মাস ধরেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি ছিল।

জুলাইয়ে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত– উভয় মূল্যস্ফীতিই কমেছে। তবে বিবিএসের হিসাবে, এই মাসে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। মূলত মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় বাজারে স্বস্তি মিলছে না ভোক্তাদের।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে টাকায় এখন অর্ধেক পণ্যও কিনতে পারি না। চালের দাম খুব বেশি না বাড়লেও তেল, ডাল, সবজি, ডিম— মিলিয়ে মাসের বাজার খরচ অনেক বেড়েছে।’

গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, ‘সংসারের আয় তো একই আছে, কিন্তু প্রতিদিনই খরচ বাড়ছে। আগে মাসের শুরুতে বাজারের জন্য যে বাজেট করতাম, এখন অনেক আগেই শেষ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে মাছ-মাংস কম কিনতে হচ্ছে।’

রিকশাচালক আবদুল হালিম বলেন, বাজারে গেলে আগে যা কিনতাম, এখন তার অনেক কিছু বাদ দিতে হয়। সংসারের খরচ চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন বলেন, শুধু পণ্য নয়, দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, পরিবহন খরচ— সবই বেড়েছে। ব্যবসার খরচ বাড়লেও ক্রেতাদের কাছে বেশি দাম চাইলে তারা পণ্য কম কিনছেন। এতে দুই দিক থেকেই চাপ তৈরি হয়েছে।

সরকারি কর্মচারী নাজমুল হক বলেন, মূল্যস্ফীতি কমেছে বলা হলেও বাজারে তা বোঝা যাচ্ছে না। আগে মাসের শুরুতে ১০ হাজার টাকায় যা কিনতাম একই পণ্য কিনতে এখন অনেক বেশি টাকা লাগছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ জ্বালানি ব্যয়ের চাপ। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত থেকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে সরকারকে তুলনামূলক ব্যয়বহুল উৎসের দিকে যেতে হচ্ছে। উচ্চমূল্যের জ্বালানির কারণে বিদ্যুতের দামও বেড়েছে। এই দুইয়ের প্রভাব পড়েছে কৃষি, শিল্প উৎপাদন থেকে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায়। শেষ পর্যন্ত পুরো চাপে এসেছে পড়ছে ভোক্তাদের ওপর।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বর্তমান মুদ্রানীতি কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। সরকারের বিভিন্ন অর্থনৈতিক উদ্যোগের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে জটিল করছে।

এদিকে, বাজার পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুকতাদিরও। তিনি সম্প্রতি বলেন, শুধু বাজার তদারকি করে পণ্যের দাম কমানো সম্ভব নয়। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য, ঋণের খরচ, পরিবহন, উৎপাদনশীলতা, অবকাঠামো—সবকিছুর সঙ্গে পণ্যমূল্যের সম্পর্ক রয়েছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যয় আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় বেশি। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করা গেলে পণ্যের দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে এসব অবকাঠামোগত পরিবর্তনের সুফল পেতে সময় লাগবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির হার কমানোই যথেষ্ট নয়। মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো না গেলে জীবনযাত্রার সংকট কাটবে না। খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি সামলে কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

মূল্যস্ফীতি কমলেও লক্ষণ নেই বাজারে, ব্যয়ে পিষ্ট নিম্ন ও মধ্যবিত্ত