ad

অরুন্ধতী রায়ের স্মৃতির অন্তরালে মা ও মানুষের ইতিহাস

আরফান হাবিব
আরফান হাবিব

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮: ৫০
অরুন্ধতী রায়ের ‘মাদার মেরি কামস টু মি’। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক

কিছু বই পড়া হয় না, কিছু বইয়ে বসবাস করা হয়। অরুন্ধতী রায়ের ‘মাদার মেরি কামস টু মি’ তেমনই এক গ্রন্থ—যার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে পাঠক একসময় বুঝতে পারেন, তিনি আর নিছক পাঠক নন; বরং লেখিকার স্মৃতির ভেতর প্রবেশ করা নীরব সহযাত্রী। বইটির কেন্দ্রে একজন মা। কিন্তু সেই মায়ের চারপাশে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে একটি পরিবার, একটি সময়, একটি সমাজ এবং একজন নারীর দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ফলে এটি কেবল মাতৃস্মৃতির বই নয়। বরং স্মৃতি কীভাবে ব্যক্তিমানুষের পরিচয় নির্মাণ করে, সেই নির্মাণের নেপথ্যে কীভাবে ইতিহাস ও রাজনীতি কাজ করে—তারও গভীর সাহিত্যিক অনুসন্ধান।

অরুন্ধতী রায়ের সাহিত্যিক যাত্রার সূচনা ‘দ্যা গড অব স্মল থিংস’ দিয়ে। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত সেই উপন্যাস তাঁকে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম আলোচিত লেখক করে তুলেছিল। কিন্তু ‘মাদার মেরি কামস টু মি’ তাঁর জন্য অন্য ধরনের প্রত্যাবর্তন। এটি তাঁর প্রথম স্মৃতি এবং এর কেন্দ্রে রয়েছেন তাঁর মা মেরি রায়ের সঙ্গে জটিল, ভালোবাসা ও সংঘাতময় সম্পর্ক। পুরো বইজুড়ে মাকে তিনি মিসেস রায় সম্বোধন করেছেন। ২০২২ সালে মায়ের মৃত্যুতে অরুন্ধতীর মধ্যে যে গভীর শোক ও আত্ম-অনুসন্ধানের জন্ম দেয়, এই বই তারই দীর্ঘ সাহিত্যিক পরিণতি ও পরিভ্রমণ। প্রকাশকের আলোচনাতেও বইটিকে তাঁর মা ও তাঁর লেখক-পরিচয় গঠনের পারস্পরিক সম্পর্কের অনুসন্ধান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অরুন্ধতী তাঁর ভাবনাবাচক রূপতত্ত্বানুগত স্মৃতি স্মরণ করতে গিয়ে ভূগোল ও জীবন সম্পর্কে সহজ কোনো সংজ্ঞা দেন না। বরং কয়েকটি শব্দেই তিনি সেই সম্পর্কের বিপরীতমুখী সত্যকে ধরে ফেলেন—‘‘১৯৭৮ সালের গ্রীষ্মের ছুটিটাই ছিল কেরালায় আমার শেষ ছুটি। তখন আমি দ্বিতীয় বর্ষের পড়াশোনা শেষ করেছি। ট্রেন যখন কোট্টায়াম স্টেশনে এসে থামল, দেখলাম স্কুলের রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীদের দলে সদ্য যোগ দেওয়া আম্মালকে আমাকে নিতে পাঠানো হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই আমার মনে নানা প্রশ্নের উদয় হলো। এর অর্থ কী? ‘তিনি’ কি আমার ওপর রাগ করেছেন? নাকি কোনো কাজে ব্যস্ত? নাকি শহরের বাইরে কোথাও গেছেন?’’

রাজনৈতিক লেখায় যে দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব, ব্যক্তিগত স্মৃতিতে তা সম্ভব নয়। এখানে লেখক নিজেই বিষয়; তাঁর ক্ষত, দ্বিধা, অপরাধবোধ, ভালোবাসা-সবকিছুই লেখার উপাদান। ফলে এই জীবন স্মৃতি সবচেয়ে বড় ঝুঁকি একই সঙ্গে তাঁর সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক শক্তি।

কিছু বাক্যের মধ্যেই যেন পুরো বইটির আবেগগত স্থাপত্য লুকিয়ে আছে। জীবন একই সঙ্গে আশ্রয় এবং ঝড়; নিরাপত্তা এবং বিপন্নতা; ভালোবাসার উৎস এবং সেই ভালোবাসারই কঠিনতম পরীক্ষা। এই দ্বৈততাকে অস্বীকার না করাই অরুন্ধতীর সাহিত্যিক সততা। তিনি বইয়ের অন্যসব পৃষ্ঠাজুড়ে মাকে দেবীমূর্তিতে বসান না, আবার একমাত্রিক নিষ্ঠুর চরিত্র হিসেবেও নির্মাণ করেন না। তিনি তাঁকে দেখেন একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে—যাঁর মধ্যে শক্তি ও দুর্বলতা, স্নেহ ও কঠোরতা, উদারতা ও কর্তৃত্ব পাশাপাশি অবস্থান করে।

মেরি রায় ছিলেন ভারতের নারী অধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর আইনি সংগ্রাম নারীর উত্তরাধিকার অধিকারের প্রশ্নে ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করে। কিন্তু অরুন্ধতীর কাছে মেরি রায় অন্তর্ভুক্ত ইতিহাসের একজন সংগ্রামী নারী নন; তিনি তাঁর মা। আর এই ব্যক্তিগত সম্পর্কই ইতিহাসকে অন্য আলোয় দেখার সুযোগ দেয়। যে নারী বাইরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়েছেন, সেই নারী ঘরের ভেতরেও ছিলেন কঠোর, অনমনীয় এবং কখনও কখনও ভীতিকর। এই বৈপরীত্যই মেরিকে জীবন্ত করে তোলে। অরুন্ধতীর স্মৃতিকথা তাই কোনো স্মৃতিস্তম্ভের গিরিগাত্র নির্মাণ করে না; বরং স্মৃতিস্তম্ভের পাথর সরিয়ে তার নিচে থাকা রক্তমাংসের মানুষটিকে দেখায়।

মা-মেয়ের এই সম্পর্কের জটিলতা বোঝাতে অরুন্ধতীর আরেকটি বাক্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—‘‘আমি আমার মাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম তাঁকে ভালোবাসতাম না বলে নয়, বরং তাঁকে ভালোবেসে যেতে পারার জন্যই।’’

অরুন্ধতীর এই উপলব্ধি প্রচলিত মাতৃত্বের আবেগময় আদর্শকে প্রশ্ন করে। মা ও সন্তানের সম্পর্ক যে সবসময় আশ্রয় ও নির্ভরতার সরল সমীকরণ না-হয়ে তার মধ্যে ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানসিক সীমারেখা এবং আত্মরক্ষার প্রয়োজনও থাকে, এই স্বীকারোক্তি বইটিকে গভীর ক্রমবর্ধমান মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা দেয়।

অরুন্ধতী রায়ের সাহিত্যিক যাত্রার সূচনা ‘দ্যা গড অব স্মল থিংস’ দিয়ে। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত সেই উপন্যাস তাঁকে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম আলোচিত লেখক করে তুলেছিল। কিন্তু ‘মাদার মেরি কামস টু মি’ তাঁর জন্য অন্য ধরনের প্রত্যাবর্তন। এটি তাঁর প্রথম স্মৃতি এবং এর কেন্দ্রে রয়েছেন তাঁর মা মেরি রায়ের সঙ্গে জটিল, ভালোবাসা ও সংঘাতময় সম্পর্ক।

আর এখানেই অনুশাসনের স্মৃতি হয়ে ওঠে আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রধান উপাদান। অরুন্ধতী অতীতকে শুধু মনে করেন না; তিনি অতীতকে পুনরায় ব্যাখ্যা করেন। শিশুকালের যে ঘটনাগুলো একসময় কেবল ভয়, রাগ কিংবা অপমান হিসেবে অনুভূত হয়েছিল, প্রাপ্তবয়স্ক লেখক সেই ঘটনাগুলোর দিকে ফিরে তাকিয়ে অন্য অর্থ খুঁজে পান। তিনি মাকে বোঝার চেষ্টা করেন, কিন্তু বোঝার অর্থ ক্ষমা করে দেওয়ার নিদর্শনে একজন মানুষকে তাঁর নিজের জটিলতার মধ্যে দেখতে শেখা। এই দৃষ্টিভঙ্গির অসাধারণ প্রকাশ তাঁর কথায়—‘‘আমার ক্ষেত্রে, মিসেস রায় আমাকে শিখিয়েছিলেন কীভাবে ভাবতে হয়, অথচ পরে আমার সেই ভাবনাগুলোর বিরুদ্ধেই তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন।’’

পরের অংশে তিনি আরও বলেন, মা তাঁকে স্বাধীন হতে শিখিয়েছিলেন, আবার তাঁর স্বাধীনতার বিরুদ্ধেও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন; লিখতে শিখিয়েছিলেন, আবার লেখক হয়ে ওঠার পর সেই পরিচয়কেও সহজে মেনে নেননি। ফলে মেরি রায় একই সঙ্গে তাঁর মেয়ের শিক্ষাগুরু এবং তাঁর প্রতিপক্ষ—এই দ্বৈত সম্পর্ক থেকেই অরুন্ধতীর ব্যক্তিত্বের একটি বড় অংশ গড়ে ওঠে।

এই কারণেই বইটির স্মৃতি-নির্মাণ সরলরৈখিক নয়। এখানে সময় বারবার এগিয়ে যায়, পিছিয়ে আসে, কোনো দৃশ্য অন্য একটি দৃশ্যের দরজা খুলে দেয়। স্মৃতি যেন একটি ভাঙা আয়না—প্রতিটি টুকরোয় অতীতের আলাদা মুখ দেখা যায়। এই খণ্ডিত বিন্যাসকে তাই দুর্বলতা হিসেবে দেখার আগে স্মৃতির স্বাভাবিক প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা দরকার। মানুষের স্মৃতি কখনও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নয়; তা নির্বাচিত, আবেগপ্রবণ, অসম্পূর্ণ এবং পুনর্গঠিত। অরুন্ধতী সেই অসম্পূর্ণতাকেই তাঁর আখ্যানের নান্দনিক শক্তিতে রূপান্তর করেছেন।

নারীবাদী পাঠের ক্ষেত্রেও বইটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মেরি রায়ের আইনি সংগ্রাম নারীর সম্পত্তির অধিকার নিয়ে বৃহত্তর সামাজিক ও আইনি পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু অরুন্ধতী সেই সংগ্রামকে বিভক্তির বীরত্বের আখ্যান করেননি। তিনি দেখিয়েছেন, একজন নারী একই সঙ্গে সামাজিকভাবে বিপ্লবী এবং ব্যক্তিজীবনে জটিল হতে পারেন। এই জায়গায় তাঁর নারীবাদ কোনো স্লোগান নয়; বরং মানুষের পূর্ণাঙ্গ অস্তিত্বকে স্বীকার করার পদ্ধতি। একজন নারীকে কেবল ‘ভালো মা’, ‘সংগ্রামী নারী’ কিংবা ‘নারীবাদী আইকন’—এই একক পরিচয়ে বন্দি না করে তাঁর সমস্ত বৈপরীত্যকে স্বীকার করাই এখানে প্রকৃত মুক্তির ভাষা।

এই ব্যক্তিগত মুহূর্তকে জনসমক্ষে আনার দ্বিধাও লেখিকা নিজেই স্বীকার করেছেন। মায়ের সঙ্গে থাকা সময় নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি বলেছেন—‘‘প্রথমবার বেকারের সঙ্গে দেখা করতে ত্রিবান্দ্রম যাওয়ার যাত্রাটাই শুরু থেকে আমার জন্য ছিল ভীষণ বিব্রতকর। স্কুলের ভ্যানে করে কোট্টায়াম থেকে দক্ষিণ দিকে পাঁচ ঘণ্টা বা তারও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে আমরা রওনা দিয়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে ছিল চারজন: স্কুলের চালক, মিসেস রায়, আমি এবং কুঞ্জাম্মা। কুঞ্জাম্মা ছিলেন হোস্টেল-হোমের রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীদের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তাঁর দায়িত্ব ছিল একটি বড় ব্যাগ সামলে রাখা। সেই ব্যাগে থাকত পানির বোতল, গরম কফির ফ্লাস্ক, ডিমের স্যান্ডউইচ, জরুরি ওষুধ, হাঁপানির ইনহেলার এবং অতিরিক্ত একটি ইনহেলার।’’

এ নিপুণ বিবরণ-স্বীকারোক্তি বইটির নৈতিক ও নান্দনিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। রাজনৈতিক লেখায় যে দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব, ব্যক্তিগত স্মৃতিতে তা সম্ভব নয়। এখানে লেখক নিজেই বিষয়; তাঁর ক্ষত, দ্বিধা, অপরাধবোধ, ভালোবাসা-সবকিছুই লেখার উপাদান। ফলে এই জীবন স্মৃতি সবচেয়ে বড় ঝুঁকি একই সঙ্গে তাঁর সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক শক্তি।

বইটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। খণ্ডিত আখ্যান, সময়ের বারবার অদলবদল এবং কোথাও কোথাও ইচ্ছাকৃত অস্পষ্টতা এমন পাঠকের কাছে কঠিন মনে হতে পারে, যিনি একটি সুসংবদ্ধ, কালানুক্রমিক আত্মজীবনী প্রত্যাশা করেন। কোথাও লেখিকা ব্যাখ্যার চেয়ে নীরবতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন; ফলে কিছু প্রশ্নের উত্তর অনুচ্চারিত থেকে যায়। কিন্তু এই অসম্পূর্ণতাকে কেবল দুর্বলতা বলা যায় না। স্মৃতির প্রকৃতিই তো এমন—তা সম্পূর্ণ নয়, নির্ভুল নয়, নিরপেক্ষও নয়। অরুন্ধতী সেই ফাঁকগুলো পূরণ করার পরিবর্তে অনেক সময় ফাঁক হিসেবেই রেখে দিয়েছেন। আর সেই অসম্পূর্ণতাই তাঁর স্মৃতি-নির্মাণের নন্দনতত্ত্বকে বিশ্বাসযোগ্য করেছে।

এই বইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এখানেই—অরুন্ধতী রায় স্মৃতিকে কেবল অতীতের দিকে ফিরে তাকানোর মাধ্যম করেননি, স্মৃতিকে তিনি আত্মপরিচয় নির্মাণের সক্রিয় প্রক্রিয়ায় পরিণত করেছেন। অতীত তাঁর কাছে মৃত নয়, বর্তমানের ভেতর ক্রমাগত ফিরে আসা এক জীবন্ত ভূগোল। সেখানে মা আছেন। কিন্তু মায়ের আড়ালে আছে একটি সময়, পরিবারের আড়ালে আছে সমাজ, ব্যক্তিগত ক্ষতের আড়ালে আছে ইতিহাস।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

অরুন্ধতী রায়ের স্মৃতির অন্তরালে মা ও মানুষের ইতিহাস