জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ছয় রোজা শেষেও নিত্যপণ্যে ফেরেনি স্বস্তি

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা। স্ট্রিম কোলাজ

এবারও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যেই শুরু হয় রমজান। রমজান শুরুর পর সেই ঊর্ধ্বগতিতে কিছুটা লাগাম পড়ে। যদিও এবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটের রমজান শুরু হয়েছে। কারণ নতুন সরকার শপথের মাত্র দুদিন পরই শুরু হয় রমজান।

অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকারের কর্মীদের শঙ্কাকে সত্যে পরিণত করে নতুন সরকারের শপথের সুযোগে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করেছেন ব্যবসায়ীরা। যদিও সরকার দ্রব্যমূল্যের লাগাম টানায় কঠোর হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে সেই প্রতিশ্রুতির বাতাস খুব একটা লাগেনি বাজারে-এমনটাই মত ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ, খুচরা ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।

এবার রোজার শুরুতেই এক ধাক্কায় বিভিন্ন পণ্যের দাম বেশ বেড়ে যায়। এমনকি লেবু, শসা ও কাঁচামরিচসহ কিছু পণ্যের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ে। যদিও গত কয়েকদিন সেসব পণ্যের দাম ধীরে ধীরে কমছে। তবে সার্বিকভাবে রমজানের বাজার এখনও চড়াই।

রোজার শুরুতে লেবুর হালি ২০-৪০ টাকা থেকে একলাফে ৬০ থেকে ১২০; এমনকি ১৫০ টাকা পর্যন্ত হয়, কালো বেগুন ৬০-৮০ থেকে ৮০-১২০, শসা ৫০-৭০ থেকে ৮০-১০০, পেঁয়াজ ৪৫-৫০ থেকে ৫৫-৬৫, পেঁপে ৩০-৪০ থেকে ৬০-৭০, ব্রয়লার মুরগি ১৬০-১৭০ থেকে ২০০-২২০ হয়। এই সময়ে সোনালি মুরগির দামও কেজিতে ৩০-৪০ টাকা বেড়ে ৩২০-৩৫০ টাকা হয়।

এ ছাড়া টমেটো ও গাজরের দামও কেজিতে ১০, কাঁচা মরিচ কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ১৪০-১৬০-তে হয়। এর পাশাপাশি মাছ ও গরু মাংস এবং খেজুরসহ বিভিন্ন ফলের দামও বৃদ্ধি পায়।

স্বস্তির বিষয় হলো শুরুতে বাড়লেও রোজার দ্বিতীয় দিন থেকেই বিভিন্ন পণ্যের দাম কমতেও থাকে। আজ মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ রোজা) রাজধানীর কাওরান বাজারে গিয়ে দেখা যায়, লেবুর হালি ৪০ থেকে ৬০, বেগুন ৮০ থেকে ১০০, শসা ৬০ থেকে ৮০, পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৫০, কাঁচামরিচ ১২০ থেকে ১৪০, পেঁপে ২৫-৩০, ব্রয়লার মুরগি ১৬০ থেকে ১৮০ এবং সোনালি মুরগি ২৩০ থেকে ২৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতা মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘কাঁচামালের দাম প্রতিদিনই উঠানামা করছে। গতকাল বেগুন ৯০/৯৫ টাকায় বিক্রি করেছি। আজ করছি ৮০/৮৫ টাকায়। লেবুর দাম গতকাল আরও কম ছিল। আজ একটু বেশি।’

কারওয়ান বাজার থেকে পাইকারি কাঁচামাল কিনে নিয়ে ভ্যানে বিক্রি করেন মো. শামীম। তিনি বলেন, ‘দাম খুব একটা কমেনি। শসার দাম এখনো বেশি। লেবুর দাম কালকের চেয়ে আজ আবার বেড়েছে। পেঁয়াজও কালকের চেয়ে ২/৩ টাকা বেশি। মরিচের দামও বেশি। তাই আমার ব্যবসায় লাভ কম হচ্ছে। আমরা ভ্যানে বিক্রি করে খুব বেশি লাভ করতে পারি না।’

স্থানীয় মহল্লার বাজারে দাম বেশি দেখে কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে এসেছেন সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সালাউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘রোজার শুরুর দিন থেকে বাজারে জিনিসপত্রের দাম এখনো খুব একটা কমেনি। সবজির দাম এখনো বেশি। ফলের দাম অনেক বেশি।’

খুচরা বিক্রেতা আব্দুল হালিম বলেন, ‘রোজার শুরুর দিকের চেয়ে দাম কমছে, ১০ রোজার পর আরও কমবে।’

হাতিরপুল এলাকা থেকে কারওয়ান বাজারে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. সুজন বলেন, ‘হাতিরপুল বাজারের চেয়ে কারওয়ান বাজারে দাম কিছুটা কম। যেমন এখান থেকে আমি পেঁপে কিনেছি মাত্র ২৫ টাকা কেজি দরে, হাতিরপুলে যা ৪০ টাকা। বেগুনের দাম এখানে ৭০/৮০ টাকা, যা হাতিরপুলের মতো বাজারে ১১০/১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা বেসরকারি ব্যাংকের কর্মচারী মো. জাকির হোসেন জানান, জিনিসপত্রের দাম খুব একটা কমেনি। রোজার শুরুর দিকের চেয়ে আজ দাম একটু কম থাকলেও রোজার আগের চেয়ে বেশিই আছে।

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আমি মাসে মাত্র ৩০ হাজার টাকা বেতন পাই। এই টাকা দিয়েই আমাকে মা ও তিন সন্তানসহ ৬ সদস্যের সংসার চালাতে হয়। কিন্তু দাম বেশি হওয়ায় হিমশিম খাচ্ছি। এবার রোজায় আমরা দাম বেশি দেখে লেবু আর শসা খাওয়া বাদ দিয়ে দিয়েছি।’

সরকারি চাকরিজীবী কাজী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এবার বাজারে জিনিসপত্রের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার পরও দাম বেশি। দাম বৃদ্ধির জন্য সরকারেরও দায় আছে। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ঠিক মতো নজরদারি করেন না, ঠিক মতো রিপোর্ট করেন না।’

কাঁচাবাজারের পাশাপাশি চাল-ডাল-চিনি-তেল-ছোলার মতো মুদি পণ্যের দামও ১০-১৫ শতাংশ দাম বেড়েছে। খুচরা মুদি বিক্রেতা মো. সবুজ বলেন, ‘রোজার প্রথমদিকে যে দাম বেড়েছিল তা থেকে খুব একটা কমেনি।’

এদিকে, সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীরা রোজা উপলক্ষে সয়াবিন তেল, চিনি, ছোলা, ট্যাং, গরুর মাংস ও চালের দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন। সেদিন সকালে কিচেন মার্কেটে ইসলামিয়া শান্তি সমিতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আগের বিক্রয় মূল্য থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল পাঁচ লিটারে ৫, চিনি কেজিতে ১, ট্যাং (বিদেশি) দুই কেজিতে ২০, ছোলা কেজিতে ২, গরুর মাংস কেজিতে ৩০ ও মিনিকেট চাল কেজিতে ১ টাকা কমে বিক্রি করবেন তাঁরা।

চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানিয়ে ব্যবসায়ীরা বলেন, কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজি বন্ধ হলে পণ্যের দাম আরও কমবে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দাম কমানোর আগে বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৫ লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হতো ৯৪০-৪৫, চিনি ১০৪ টাকা, ট্যাং ১ হাজার ৫৮০, গরুর মাংস ৭৮০ ও মিনিকেট চাল কেজিপ্রতি ৮২ টাকা বিক্রি হতো।

এদিকে, ফলের বাজার এখনো অনেক চড়া। আনারের দাম ৪৫০ থেকে বেড়ে ৬৫০-৭০০, আপেল ৩০০-৩২০ থেকে বেড়ে ৩৮০-৪০০, আঙ্গুর ৪০০-৪৫০ থেকে বেড়ে ৬০০-৬৫০, নাশপাতি ৩০০ থেকে বেড়ে ৪০০-৪২০, পাকা পেঁপে ৯০-১২০ থেকে বেড়ে ১৫০-১৮০ এবং পেয়ারা ১০০-১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এ ছাড়া খেজুর বিক্রেতারা জানান, রমজানের শুরুর সময় থেকে দাম কমলেও সব ধরনের খেজুর এখনো ৫০-৬০ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। শুরুর দিকে খেজুরের দাম কেজিতে ৮০-১০০ টাকা বেড়েছিল। মাছের দাম কিছুটা কমলেও আগের চেয়ে বেশিই আছে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন স্ট্রিমকে বলেন, ‘প্রতিবারের মতো এবারও রোজার প্রথমদিকে একলাফে দাম অনেক বেড়েছে। তারপর এখন আবার একটু কমে আসলেও রোজার আগের চেয়ে বেশিই আছে। যেসব পণ্যের দাম বেড়েছে এগুলোর দাম আর বাড়বে না। আর মসলার দাম এখন না বাড়লেও ঈদের আগে বাড়তে পারে। ফলের দাম আরও বাড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাজারে নতুন সরকারের প্রভাব সামান্যই। দাম নিয়ন্ত্রণে নতুন সরকারের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বাণিজ্যমন্ত্রী নিজে বিভিন্ন কাঁচাবাজারে গিয়ে ব্যবসায়ীদের দাম না বাড়ানোর আহ্বান জানালেও মাঠে অভিযান চালানো হচ্ছে না। সরকার দাম কমানোর জন্য ব্যবসায়ীদের নিয়েও বৈঠকে বসেনি। দাম যেটা কমেছে এটা স্বাভাবিক নিয়মেই কমেছে।’

ক্যাবের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরুতে কঠোর বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এর কোনো প্রভাব পড়েনি বললেই চলে। এমনকি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানের সময় বাধা সৃষ্টি করার মতো ঘটনাও ঘটে। অথচ সরকার দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলাও করেনি। এর প্রতিবাদে ক্যাব সারাদেশে মানববন্ধন করেছে। আমরা চাই প্রধানমন্ত্রীর কঠোর বার্তা অনুযায়ী সরকার কঠোর অবস্থানে যাবে এবং বাজারে অভিযান ও নজরদারি বাড়াবে। আর নয়তো দ্রব্যমূল্য আরও বাড়তেই থাকবে।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সরকারের প্রচেষ্টার ঘাটতির অভিযোগ ঠিক নয়। রমজানের শুরুতে হঠাৎ চাহিদা বাড়ায় যে দাম বেড়েছিল তা গত কয়েকদিনে কমে এসেছে। আমাদের অভিযান চলমান আছে, শিগগিরই দাম আরও কমে আসবে।’

তিনি বলেন, ‘এবার বেশিরভাগ পণ্যের দাম গত বছরের রমজানের তুলনায় কম আছে। লেবুটা শুধু এবার মৌসুম না থাকায় বেশি বেড়েছিল। লেবুর মৌসুম সাধারণত বর্ষাকালে। খেজুরের দামও গতবারের চেয়ে কম আছে। আর ইতিমধ্যেই বেশিরভাগ পণ্যের দামই প্রায় রোজার আগের পর্যায়ে নেমে এসেছে।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত