leadT1ad

আন্তর্জাতিক তেল রুট নিয়ন্ত্রণ করে কারা

আন্তর্জাতিক তেলের রুট। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ জটিল আকার ধারণ করেছে। অন্যদিকে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা ধুঁকছে শঙ্কায়। যুক্তরাষ্ট্র যখন আকস্মিক সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিল, তখন বিশ্বনেতাদের ভয়ের কারণ কেবল গণতন্ত্র বা মানবাধিকার ছিল না। সবার অলক্ষে কাজ করছিল আরেকটি ভীতি—‘তেল’।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলের ভাণ্ডার ভেনেজুয়েলায়। মাদুরো সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে এই ভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাবে? সেই অঙ্কেই বিশ্ববাজারে তেলের দামে টালমাটাল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ যত বাড়ছে, পারস্য উপসাগরের ওপর ভূ-রাজনৈতিক মেঘ তত ঘনীভূত হচ্ছে। কারণ ইরানের নিয়ন্ত্রণেই আছে হরমুজ প্রণালী। এই প্রণালী বন্ধ হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়তে পারে বলে ধারনা করেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রশ্ন হলো, খনি থেকে শুরু করে পেট্রোল পাম্প পর্যন্ত এই তেলের যাত্রাপথে ঠিক কার কতটা ক্ষমতা? কেন একটি তরল পদার্থের দাম ও রুট বিশ্বরাজনীতির চাবিকাঠি হয়ে ওঠে?

উৎপাদনের খেলা: কে রাজা, কে প্রজা

প্রতিদিন ১০ কোটি ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরবরাহ হয়। মাটির নিচ থেকে এই তেল ওঠানো দিয়েই গল্পের শুরু। তেল মূলত মেলে মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায়। সাধারণ হিসাবে মনে হতে পারে, যাদের মাটিতে তেল, নিয়ন্ত্রণও তাদের। কিন্তু বাস্তবে হিসাব ভিন্ন। তেল সমৃদ্ধ দেশগুলো আসলে তেল অভিশাপের বা ‘রিসোর্স কার্স’-এর শিকার হয়।

প্রতিদিন ১০ কোটি ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরবরাহ হয়। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
প্রতিদিন ১০ কোটি ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরবরাহ হয়। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

সৌদি আরবের আরামকো বা ভেনেজুয়েলার পিডিভিএসএ-এর মতো রাষ্ট্রীয় কোম্পানি থাকলেও তারা আসলে মুক্ত নয়। দাম ঠিক হয় অনেক দূরে বসে। উৎপাদন তাদের, কিন্তু ভোগ ও চাহিদার হিসাব কষে ধনী দেশ ও বিশাল কর্পোরেশনগুলো। এক্সনমবিল, শেভরন বা শেল-এর মতো তেল কোম্পানিগুলো এই খেলা চালায়। তারা এত ক্ষমতাধর যে প্রয়োজনে অনেক ছোট দেশের সরকারের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে। ইরান বা ভেনেজুয়েলা চাইলেই কি তাদের তেল ইচ্ছেমতো বেচতে পারছে? মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নামের অস্ত্র দিয়ে সেই টুঁটি চেপে রাখা হয়। তেল থাকলেও তারা জিম্মি হয়ে আছে এক শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক শক্তির কাছে।

যে রুটে চলে বিশ্ব অর্থনীতি

খনি থেকে তেল ওঠার পর শুরু হয় এর রোমাঞ্চকর ভ্রমণ। জাহাজের পেটে আর পাইপলাইনের গর্ভে চড়ে এই তরল পাড়ি দেয় হাজার হাজার মাইল। বিশ্বে মোট তেলের প্রায় ৬০ ভাগই জাহাজ বা ট্যাংকারের মাধ্যমে যায়। কিন্তু সমুদ্রপথগুলো অবারিত নয়। এর জন্য নির্ভর করতে হয় কয়েকটি সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ জলপ্রণালীর ওপর। এগুলোকে বলা হয় বিশ্বের ‘চোক পয়েন্ট’। এর যেকোনো একটি বন্ধ হলে বিশ্বজুড়ে তেলের হাহাকার দেখা দিতে পারে।

১. হরমুজ প্রণালী: সবচেয়ে দামি জলপথ

মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরের মুখে অবস্থিত হরমুজ প্রণালী। প্রতিদিন ২১ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেল এখান দিয়ে পার হয়। এই হিসাবটা হলো বিশ্বের মোট সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশ। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল এই পথ ধরেই এশিয়ায় আসে। কিন্তু পথটির প্রস্থ নৌচলাচলের জন্য মাত্র ৩৩ কিলোমিটার। ইরানের পাশ দিয়ে যাওয়া এই সরু জলপথকে পাহারা দেওয়ার নামে পঞ্চম নৌবহর দিয়ে চেপে ধরেছে আমেরিকা। কিন্তু তেহরানের শাসকরা যেকোনো সময় এই পথ বন্ধের হুমকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলে। ইরানের বর্তমান বিক্ষোভে দেশটির পরিস্থিতি টলমল করলে হরমুজ প্রণালীতে সরাসরি তার আঁচ লাগবে। তখন জ্বালানি তেলের দাম আর কারোর নাগালের মধ্যে থাকবে না।

২. মালাক্কা প্রণালী: এশিয়ার ভাগ্য নির্ধারণী সুতো

মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে এশিয়ায় তেল আসার প্রধান করিডর মালাক্কা প্রণালী। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে এর অবস্থান। জাতিসংঘের তথ্যে দেখা যায়, বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক জাহাজের ৯০ ভাগ এখান দিয়ে চলাচল করে। চীন, জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার তেলের জোগান পুরোটাই এই পথের ওপর নির্ভরশীল। এই অঞ্চলের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের উপস্থিতি চীনের জন্য মাথা ব্যথার বড় কারণ। চীন এই নির্ভরতা কমাতে মিয়ানমার ও পাকিস্তানে বিকল্প পাইপলাইনের পথে হাঁটছে। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য মালাক্কা নির্ভরতা কমানো।

৩. বাব-আল-মান্দাব ও সুয়েজ খাল

ইউরোপের সঙ্গে এশিয়ার সংযোগ এই পথ দিয়ে ঘটে। ইয়েমেন ও জিবুতির মাঝখানে বাব-আল-মান্দাব এবং মিসরের সুয়েজ খাল তেলের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ রুট। লোহিত সাগর এলাকায় ইয়েমেনি বিদ্রোহীদের কারণে গত কিছুদিন ধরে এখানকার ট্যাংকারগুলোকে লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে সময় যেমন বেশি লাগছে, পরিবহনের খরচও বাড়ছে বহুগুণে।

৪. তুর্কি প্রণালী

রুশ তেলের লাইফলাইন ইউরোপ ও এশিয়ার ঠিক মোহনায় অবস্থিত বসফরাস এবং দার্দানেলিস—এই দুই সরু জলপথ মিলে গঠিত তুর্কি প্রণালী। কৃষ্ণসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই পথটি রাশিয়া এবং কাস্পিয়ান অঞ্চলের তেল রপ্তানির প্রধান ধমনী। প্রতিদিন প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল ও তেলজাত পণ্য এই পথে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর এই পথের কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে।

তুর্কি প্রণালী। ছবি: লিংকডইন থেকে নেওয়া
তুর্কি প্রণালী। ছবি: লিংকডইন থেকে নেওয়া

আন্তর্জাতিক মনট্রো কনভেনশনের অধীনে তুরস্ক এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রক, ফলে রাশিয়ার তেলবাহী জাহাজের চলাচল অনেকটাই আঙ্কারার মর্জির ওপর নির্ভরশীল, যা অঞ্চলটির ভূ-রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

৫. পানামা খাল

মানুষের তৈরি এই বিস্ময়কর খালটি আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করে জ্বালানি পরিবহনের সময় ও খরচ নাটকীয়ভাবে কমিয়েছে। বিশেষ করে আমেরিকার পূর্ব উপকূল এবং মেক্সিকো উপসাগর থেকে এশিয়ার বাজারে তেল ও এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) পৌঁছানোর এটিই সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ। খালটি না থাকলে জাহাজগুলোকে দক্ষিণ আমেরিকার দুর্গম ‘কেপ হর্ন’ ঘুরে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিতে হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খালে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় প্রায়ই বড় জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হয়, যা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে।

পাইপলাইন পলিটিক্স: শিকলের অদৃশ্য টান

জাহাজের বিকল্প হলো পাইপলাইন। কিন্তু এই লাইনগুলো আসলে শুধু তেল বা গ্যাস পরিবহন করে না। এগুলো একেকটা দেশকে পরাধীন করার মাধ্যমও বটে। রাশিয়ার পাইপলাইন ব্যবস্থা এর সেরা উদাহরণ। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউরোপের দিকে ‘দ্রুজবা’ বা বন্ধুত্ব নামের পাইপলাইন বসিয়েছিল। নাম বন্ধুত্ব হলেও এটি মূলত নির্ভরশীলতার শিকল। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে যখনই রাশিয়ার মতের অমিল হয়েছে, মস্কো তেলের দাম বাড়িয়েছে। অথবা সরবরাহের ভালভ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

অন্যদিকে চীন এখন তার জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সেন্ট্রাল এশিয়া ও রাশিয়ার ওপর পাইপলাইন তৈরি করেছে। সাইবেরিয়া থেকে পাইপলাইন টেনে চীন স্থলপথ দিয়ে তেলের নিশ্চয়তা পেয়েছে। আবার মার্কিন অবরোধ এড়াতে ইরানও নতুন স্থলপথ ও এশিয়ান ব্লকের দিকে ঝুঁকছে।

কে চালায় এই সাম্রাজ্য

১. যুক্তরাষ্ট্র:

সামরিক শক্তিতে আমেরিকা তেল সরবরাহ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পাহারাদার। সব গুরুত্বপূর্ণ জলপথে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারা রয়েছে। আবার ১৯৭০-এর দশকের চুক্তির কারণে বিশ্বে তেল কেনাবেচায় মার্কিন ডলার ব্যবহার করা হয়। ডলার ছাড়া তেল কেনা অসম্ভব করে তুলে বিশ্ব অর্থনীতিকে আমেরিকা নিজের পকেটে ঢুকিয়েছে। এখন আবার শেলে পাওয়া তেলে আমেরিকা নিজেও তেল উৎপাদকদের মধ্যে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে।

২. কর্পোরেট পাওয়ার:

বিশাল সব বহুজাতিক তেল কোম্পানিগুলোর বাজেট বিশ্বের অনেক দেশের জিডিপি-র চেয়েও বেশি। গোপন চুক্তি, লবিং ও রাজনৈতিক অনুদান দিয়ে এই কোম্পানিগুলো সব সরকারের ওপর ছায়া শাসন চালায়। তাদের স্বার্থে আঘাত লাগলে যুদ্ধের কারণ তৈরি করতে তারা মোটেও দ্বিধা করে না।

ভেনেজুয়েলা ও ইরানের ভবিষ্যৎ সমীকরণ

যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় হানা দিয়েছে। তাদের দাবি দেশটিকে স্বৈরাচারের হাত থেকে মুক্ত করা। কিন্তু পর্দার পেছনের অঙ্ক হলো মাদুরোর হাতে থাকা বিপুল তেলের মজুতের মালিকানা পরিবর্তন। মার্কিন কোম্পানি শেভরন এতদিন লাইসেন্সের জন্য ঘুরেছে। এখন তারা হয়তো ভেনেজুয়েলার তেল উত্তোলনের চাবিকাঠি পেয়ে যাবে। এর ফলে বৈশ্বিক তেল বাজারে নতুন প্রবাহ তৈরি হতে পারে। একই সময়ে ইরানে বিক্ষোভে দেশটি যখন বিপর্যস্ত, সেখানে তেলের চোক পয়েন্টগুলোতে সংকট দেখা দিতে পারে। যদি ইরান ও ভেনেজুয়েলায় সরকার বদলে আমেরিকার পক্ষে যায়, তবে বিশ্বে তেলের দাম ও রাজনীতিতে সম্পূর্ণ মার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পাবে। কিন্তু এগুলোর পাল্টা জবাবও হয়তো রাশিয়া বা চীনের দিক থেকে আসবে। তখন এশিয়ায় নতুন শক্তির সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে।

আধুনিক বিশ্বকে আলোকিত করা জ্বালানি তেল নিজের মধ্যে অনেক কালো রাজনীতি লুকিয়ে রাখে। খনি থেকে পরিশোধনাগার, আর জাহাজের পেট থেকে পাইপলাইন পর্যন্ত সর্বত্র ক্ষমতা, শোষণ ও আধিপত্যের খেলা চলছে। একতরফা ব্যবস্থার নিচে পিষে যাচ্ছে উৎপাদনকারী গরিব দেশগুলো। মাদুরোর পতন আর খামেনির বিপদ সেটাই আমাদের নতুন করে বুঝিয়ে দিল।

তথ্যসূত্র: অয়েল অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স: দ্য রিয়েল স্টোরি অব টুডেজ কনফ্লিক্ট জোনস: ইরাক, আফগানিস্তান, ভেনেজুয়েলা, ইউক্রেন অ্যান্ড মোর (জন ফস্টার), মেরিটাইম এক্সিকিউটিভ, ইউ এস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ), ব্লুমবার্গ, নিক্কেই এশিয়া, দ্য গার্ডিয়ান এবং দ্য ডিপ্লোম্যাট

Ad 300x250

সম্পর্কিত