জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

মুক্তিযুদ্ধের ভাঙা ভাস্কর্য ও স্থাপনা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেই

ভাঙচুরের শিকার মুজিবনগর সরকারকে গার্ড অব অনার দেওয়া স্মৃতিতে বানানো ভাস্কর্য। স্ট্রিম ছবি

জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের দিন থেকে পরবর্তী কয়েকদিনে দেশে দেড় হাজারের বেশি ভাস্কর্য ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্ত এসব স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করেনি অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারেরও মুক্তিযুদ্ধের ভাঙা ভাস্কর্য ও স্থাপনা পুনর্নির্মাণের আপাত কোনো উদ্যোগ নেই।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার ভারতে পালানোর দিনে ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্থাপনা। এরপরের কয়েকদিনও সারা দেশে ভাস্কর্য ও স্থাপনা ভাঙা হয়। তবে ঠিক কতগুলো শিল্পকর্ম ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেই তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এসব সংস্কারে কত টাকা লাগতে পারে তাও জানা যায়নি।

তবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান স্ট্রিমকে জানিয়েছেন, দায়িত্ব গ্রহণের অল্পদিন হওয়ায় পর্যাপ্ত তথ্য এখনো তাঁর কাছে নেই।

অন্যদিকে, শিল্প স্থাপনাগুলোর সংস্কার বা পুনর্নির্মাণকে সাধারণ প্রশ্ন মনে করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি, লেখক ও গবেষক মফিদুল হক। তাঁর মতে, এরচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরপেক্ষ তদন্ত করে স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার পেছনে কারা ছিলেন তা উদঘাটন করা।

মফিদুল হক বলেন, ‘আন্দোলনটা (বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন) তো ছিল মুক্তির জন্যে, সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যে, মুক্তিযুদ্ধটাকে শিরোধার্য করেই আন্দোলনের অংশগ্রহণ করা, সেটাকে তো অপব্যবহার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ভাস্কর্যগুলো যেভাবে ভাঙা হয়েছে সেখানে মব কথাটা সঠিক না। একটা গোষ্ঠী সচেতনভাবে সংগঠিতভাবে এটা করেছে। এটার সবচেয়ে বড় নিদর্শন হচ্ছে স্বাধীনতা জাদুঘর। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাটির নিচে একটা জাদুঘর যেখানে খুব বেশি যে মানুষ যায় বা এর সম্পর্কে জানে সেরকমও না। সেটাকে সম্পূর্ণ তছনছ করে দিয়েছে। এটা মব ভায়োলেন্স না। আমার মনে হয়, একটা নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি করে এই বিষয়টা উদঘাটন করা উচিৎ। একটা মানুষকে আঘাত করা হলে সেটা ক্রিমিনাল ওফেন্স। কিন্তু জাতির স্মৃতিস্মারককে এভাবে চুরমার করে দেওয়া এটা তো আরও বড় একটা দুরাচার। এটা কারা করেছে তদন্ত করলে নিশ্চিয়ই বের করা যাবে।’

দেড় হাজারের বেশি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত

২০২৪ সালের ২০ আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিক সারা দেশে ভাঙা ভাস্কর্য ও ম্যুরাল নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে ৫৯টি জেলায় ১ হাজার ৪৯৪টি ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য (সিরামিক বা টেরাকোটা দিয়ে দেয়ালে খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা অবয়ব), ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও উপড়ে ফেলা হয়েছে। এসব ভাস্কর্য ও ম্যুরালের বেশির ভাগই ছিল শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক। এর বেশির ভাগই ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে ৫, ৬ ও ৭ আগস্ট।

ওই প্রতিবেদন মতে, ১৪ আগস্টের মধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকার ১৫টি স্থানে ১২২টির বেশি, ঢাকা বিভাগে ২৭৩টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ২০৪, রাজশাহীতে ১৬৬, খুলনায় ৪৭৯, বরিশালে ১০০, রংপুরে ১২৯, সিলেটে ৪৯ ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৯২টিসহ মোট ১ হাজার ৪৯২টি ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে, উপড়ে ফেলে এবং আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আর শেখ মুজিবুর রহমানের পরিপূর্ণ অবয়ব কাঠামোর ভাস্কর্য ধ্বংস করা হয়েছে ৭টি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে ত্রিভুজ আকৃতির সড়কদ্বীপে ছোট-বড় শতাধিক ভাস্কর্য ছিল। প্রয়াত ভাস্কর শামীম সিকদারের ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ নামের এই শিল্প স্থাপনায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ইয়াসির আরাফাত, জগদীশচন্দ্র বসু, লালন সাঁইসহ দেশ-বিদেশের কবি, সাহিত্যিক, বিপ্লবী, রাজনীতিক, বিজ্ঞানীদের আবক্ষ ভাস্কর্য ছিল। এর কয়েকটি ছাড়া সবগুলো ভাস্কর্যই ভেঙে ফেলা হয়। গত বছরের ৩ জুলাই ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্যটি দ্রুত সংস্কারের দাবিতে উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খানকে স্মারকলিপি দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী। তবে কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

এদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন দুই দফা ভাঙচুরের শিকার হয় মেহেরপুরের মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্র। হামলায় এই স্থাপনার ছোট-বড় প্রায় ৬০০ ভাস্কর্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভাস্কর্যগুলো এখনো সেভাবেই পড়ে আছে।

সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ব্যক্তি স্ট্রিমকে জানান, ৫ আগস্ট বিকেলে শতাধিক মানুষের একটি দল রড, বাঁশ ও হাতুড়ি নিয়ে স্মৃতিকেন্দ্রে প্রবেশ করে। প্রথমেই তারা শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যের মাথার অংশ ভাঙে। এরপর একে একে ‘গার্ড অব অনার’ ভাস্কর্য, পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের দৃশ্য এবং মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টরের মানচিত্রভিত্তিক ছোট ভাস্কর্যগুলোতেও হামলা চালায়। পুরো কমপ্লেক্সজুড়েই চালানো হয় এই তাণ্ডব। আনসার বাহিনীর প্রহরাতে ঘরবন্দি একমাত্র ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের আবক্ষ পিতলের ভাস্কর্যগুলো অক্ষত ছিল।

ভাস্কর্য ভাঙার ঘটনায় ক্ষুব্ধ একাত্তরে স্বাধীন সরকারকে গার্ড অব অনার দেওয়া এক বীর মুক্তিযোদ্ধা নাম না প্রকাশের শর্তে স্ট্রিমকে বলেন, ‘এই জায়গাটা শুধু একটা স্মৃতিসৌধ না, এটা আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ। সেটাকে এভাবে ধ্বংস করা হলো, আর এতদিনেও কোনো উদ্যোগ নেই এটা খুবই কষ্টের।’

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের আহ্বায়ক শামসুল আলম সোনা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যে জায়গা থেকে আমাদের স্বাধীনতার সূচনা, সেটাকে এভাবে ধ্বংস হতে দেখা আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।’

গেল নির্বাচনে মেহেরপুর-১ (সদর ও মুজিবনগর) আসনে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামী দলীয় প্রার্থী মোহাম্মদ তাজউদ্দীন খান। ভাস্কর্য ভাঙার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মুজিবনগর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে এমন ভাঙচুর নিঃসন্দেহে জাতির জন্য লজ্জাজনক। একদল ক্ষুব্ধ মানুষ এমন কাজ করেছেন। আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখছি। খুব শিগগিরই মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই স্থানকে আমরা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে চাই।’

উদ্যোগ নেই সরকারের

গত ১৩ মার্চ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন আহমেদ আযম খান। বিএনপি সরকার গঠনের পর এতদিন মন্ত্রণালয়টির দায়িত্বে ছিলেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় তাঁর জায়গায় নতুন মন্ত্রী হন আযম খান।

ঠিক কতগুলো ভাস্কর্য, স্থাপনা ও শিল্পকর্ম ভাঙা, উপড়ে ফেলা বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেগুলো নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা জানতে যোগাযোগ করা হলে বুধবার (২৫ মার্চ) সন্ধ্যায় স্ট্রিমকে আহমেদ আযম খান জানান, দায়িত্ব পাওয়ার পরে পূর্ণ তিন দিন ও আরেকদিন এক ঘণ্টা অফিস করেছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমি মন্ত্রণালয়ে কাজ শুরু করেছি। মন্ত্রণালয়ের প্রত্যেকটা উইংয়ের সঙ্গে কথা বলছি, তথ্য জানছি, করণীয় ঠিক করছি কিন্তু এই বিষয়গুলো নিয়ে এখনও পুরোপুরি, বুঝেনই তো…চারদিনে সবকিছু বুঝে নেওয়া সম্ভব না।’

মন্ত্রী বলেন, ‘যে স্থাপনাগুলো ভাঙা হয়েছে সেগুলোর কী অবস্থা, সেগুলোর তালিকা করা হয়েছে কিনা, সংস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে কিনা, সবই জানতে একটু সময় লাগবে। মন্ত্রণালয়ের সবকিছু না বুঝে এখনই আমি মন্তব্য করতে চাই না।’

সময় নিয়ে এসব প্রসঙ্গে পরবর্তীতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলবেনও জানান মন্ত্রী।

ভাস্কর্য ও স্থাপনাগুলোর ঐতিহাসিক ও নান্দনিক গুরুত্ব রয়েছে জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি, লেখক ও গবেষক মফিদুল হক স্ট্রিমকে বলেন, ‘মানুষ তাঁর স্মৃতিকে নানাভাবে প্রকাশ করে। এই স্থাপনাগুলো কালেক্টিভ মেমোরির রিফ্লেকশন (সম্মিলিত স্মৃতির প্রতিফলন)। সমাজের যে যৌথ স্মৃতি ইতিহাসের অংশ সেটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তা বলারও বিষয় না। এই গুরুত্ব সব সমাজেই থাকে, থাকবে।’

সম্পর্কিত