পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশকে গুলিয়ে ভুল করছে ভারত

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্ক বেশ থমথমে হয়ে আছে। দুই বছর আগেও পরিস্থিতি এত জটিল ছিল না। প্রতিবেশী দেশগুলোর নিজস্ব সংকট কিংবা তাদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এখন ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রধান বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

এই প্রবণতার পেছনে বড় ধরনের ঝুঁকি লুকিয়ে রয়েছে। পররাষ্ট্রনীতিকে ঘরোয়া রাজনীতির হাতিয়ার বানালে শেষ পর্যন্ত ভারতের জাতীয় স্বার্থ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সামগ্রিক অবস্থা খতিয়ে দেখা যাক। নেপালের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক এখন কিছুটা স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল। শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের সাথে সম্পর্কের বেশ ভালো অগ্রগতি হয়েছে। ভুটানের সাথে ভারতের বন্ধুত্ব আগের মতোই অটুট।

পাকিস্তানের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। জেনারেল আসিম মুনিরের সামরিক ক্ষমতায় আসা এবং ধর্ম, ইতিহাস ও রাষ্ট্র নিয়ে তাঁর কট্টর অবস্থানে ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও তলানিতে ঠেকেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে ভারতের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র শেখ হাসিনার পতন এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের উত্থান দিল্লির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর মতো দল মূলধারার রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। ঐতিহাসিকভাবে দলটি পাকিস্তানঘেঁষা হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যথার্থ কারণেই অভিযোগ করতে পারেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তাকে কোনোভাবেই সহায়তা করছে না। ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুকে সামনে রেখে রাজনৈতিক প্রচার চালানো হয়েছে।

ভারতের অন্যান্য রাজ্যের নির্বাচনেও এই ইস্যুকে প্রধান রাজনৈতিক উপাদান করেছে ক্ষমতাসীন দল। সামাজিক মাধ্যমে ভারতের প্রভাবশালী ও সরকারঘেঁষা ব্যক্তিরা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতোই বড় শত্রু হিসেবে তুলে ধরছেন।

দুই দেশের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত আক্রমণাত্মক ভাষার মধ্যেও দারুণ মিল রয়েছে। পাকিস্তানকে ব্যঙ্গ করে ডাকা হয় ‘ভিখারিস্তান’ (ভিক্ষুকদের দেশ)। বাংলাদেশকে ডাকা হচ্ছে ‘কাঙ্গালদেশ’।

সামাজিক মাধ্যমের এই বক্তব্যগুলো সাধারণ প্রতিক্রিয়া বলে অনেকে যুক্তি দিতে পারেন। ভারতের উগ্র জাতীয়তাবাদী জনমত এমন সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝার মতো ধৈর্য রাখে না। ভৌগোলিক বাস্তবতায় ‘ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্র’ হওয়ার মানসিক নিরাপত্তাহীনতা ঢাকার ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভারতীয়দের এসব বক্তব্যের পেছনে রাজনৈতিক মহলের পরোক্ষ অনুমোদন রয়েছে বলে অনেকেই বিশ্বাস করেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলে। তবে বাংলাদেশকে কি পাকিস্তানের সঙ্গে একই পাল্লায় মাপা ভারতের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে?

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিশেষত অবিরাম নির্বাচনের চাপে রাজনৈতিক দলগুলো যেসব তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তার হিসেবে ঢাকাকে ইসলামাবাদের কাতারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির ঘটনায় ভারতের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তবে তাঁকে ক্ষমতায় ফেরানো কখনোই দুই দেশের স্বাভাবিক সম্পর্কের পূর্বশর্ত হতে পারে না।

বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন ঘটানো ভারতের এজেন্ডা নয়। মোদি সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব এই বাস্তবতা ভালো করেই বোঝে। ঢাকায় অভিজ্ঞ রাজনীতিক দিনেশ ত্রিবেদীকে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে সেই দূরদর্শিতার প্রমাণ মেলে।

ঘরোয়া রাজনীতিতে যখন ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ স্লোগান প্রধান অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়, তখন ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে।

দিল্লি এখন নিজেদের তৈরি করা রাজনৈতিক ফাঁদে আটকে গেছে। ২০১৫ সালে নরেন্দ্র মোদির প্রথম কূটনৈতিক উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পর থেকেই পাকিস্তানের বিরোধিতাকে রাজনীতির কেন্দ্রে রেখেছে বিজেপি।

২০১৭ সালে উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে দলটির বড় জয়ের পেছনে উরি হামলা ও পুলওয়ামা-পরবর্তী জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা বড় ভূমিকা রেখেছিল। পেহেলগাম ঘটনা ও ‘অপারেশন সিঁদুর’ ইস্যুকে পুঁজি করেই আগামী বছর উত্তর প্রদেশের রাজনীতি আবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টের এডিটর-ইন-চিফ শেখর গুপ্তের বিশ্লেষণ

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত