মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ/‘কালচার’ কি শুধু শিক্ষিতের ধর্ম: মোতাহের হোসেন চৌধুরী ও ক্লাইভ বেলের সভ্যতা-ভাবনা

‘ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম।’ মোতাহের হোসেন চৌধুরীর এই বাক্য বাংলাভাষী পাঠকের কাছে প্রায় প্রবচনের মর্যাদা পেয়েছে। পাঠ্যবইয়ের পাতা থেকে আলোচনাসভার মঞ্চ পর্যন্ত এত বার এটি উচ্চারিত হয়েছে যে এর ধার অনেকখানি ক্ষয়ে গেছে। কোনো উদ্ধৃতি একবার প্রবচন হয়ে উঠলে তাকে আর কেউ জেরা করে না। শ্রোতা সম্মতিতে মাথা নাড়েন, বক্তা পরের প্রসঙ্গে চলে যান। একটু থেমে পড়লেই কিন্তু বাক্যটির ভেতরে এক অস্বস্তিকর বিভাজনরেখা চোখে পড়ে। এক পাশে ‘সাধারণ লোক’, অপর পাশে ‘শিক্ষিত, মার্জিত লোক’। প্রথম দলের ভাগে ধর্ম, দ্বিতীয় দলের ভাগে কালচার। তাহলে কি সংস্কৃতির অধিকার বিদ্যায়তনের সনদের সঙ্গে বাঁধা?
প্রশ্নটির মীমাংসা খুঁজতে হলে বাক্যটিকে তার উৎসের কাছে ফিরিয়ে নিতে হয়। মোতাহের হোসেন যে চিন্তাপরম্পরার ভেতরে থেকে সংস্কৃতির সংজ্ঞা নির্মাণ করেছেন তার প্রধান এক ধারা এসেছে ইংরেজ শিল্পসমালোচক ক্লাইভ বেলের কাছ থেকে। বেলের ‘সিভিলাইজেশন’ (১৯২৮) তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন ‘সভ্যতা’ নামে। দুই লেখককে পাশাপাশি রেখে পড়ার প্রবণতা অবশ্য আমাদের সমালোচনাসাহিত্যে বিরল। অথচ এই যুগল-পাঠেই ধরা পড়ে বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের এক মনস্বী প্রতিনিধি লন্ডনের ব্লুমসবেরি গোষ্ঠীর অভিজাত সভ্যতাতত্ত্ব থেকে কী গ্রহণ করলেন, কী বর্জন করলেন, আর কোন বিন্দুতে এসে ‘সংস্কৃতি কার’ প্রশ্নটি অমীমাংসিত থেকে গেল সেই প্রশ্ন।
মোতাহের হোসেন চৌধুরীর জন্ম ১৯০৩ সালের ১ এপ্রিল, তৎকালীন নোয়াখালী (বর্তমান লক্ষ্মীপুর) জেলার রামগঞ্জের কাঞ্চনপুর গ্রামে। কুমিল্লায় বিদ্যালয় ও কলেজে পড়াশোনার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর উপাধি লাভ করেন। জীবিকা ছিল শিক্ষকতা, দেশভাগের আগে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে, দেশভাগের পর চট্টগ্রাম কলেজে। ১৯৫৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে। এ বছর সেই প্রয়াণের সাত দশক। বিস্ময়ের বিষয়, জীবদ্দশায় তাঁর একটি গ্রন্থও মুদ্রিত হয়নি। যে ‘সংস্কৃতি কথা’ আজ তাঁর পরিচয়ের প্রধান অবলম্বন, সেটিও মরণোত্তর প্রকাশনা।
মোতাহের হোসেন চৌধুরীর মননের ভিত রচিত হয়েছিল ঢাকার মুসলিম সাহিত্য-সমাজের পরিমণ্ডলে। ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের বার্ষিক মুখপত্র ‘শিখা’র প্রতিটি সংখ্যায় মুদ্রিত থাকত এই বাক্য— ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের সঙ্গে মোতাহের হোসেন চৌধুরীও যুক্ত ছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরীর গদ্য তাঁর মানসগঠনে যেমন ছাপ রেখেছে তেমনি ছাপ রেখেছেন দুই ব্রিটিশ চিন্তক বার্ট্রান্ড রাসেল ও ক্লাইভ বেল। দুজনের সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক অনুবাদের সূত্রে গাঁথা। রাসেলের ‘দ্য কনকোয়েস্ট অব হ্যাপিনেস’ তাঁর হাতে হয়েছে ‘সুখ’, বেলের ‘সিভিলাইজেশন’ হয়েছে ‘সভ্যতা’।
‘ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম। কালচার মানে উন্নততর জীবন সম্বন্ধে চেতনা–সৌন্দর্য, আনন্দ ও প্রেম সম্বন্ধে অবহিতি। সাধারণ লোকেরা ধর্মের মারফতেই তা পেয়ে থাকে। তাই তাদের ধর্ম থেকে বঞ্চিত করা আর কালচার থেকে বঞ্চিত করা এক কথা।’
উদ্ধৃতির শেষ বাক্যটি বেশির ভাগ সময় বাদ পড়ে যায় যদিও বক্তব্যের ভারকেন্দ্র সেখানেই। মোতাহের হোসেন এখানে সাধারণ মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে তুচ্ছ করছেন না। যাঁরা বিকল্প কিছু না দিয়েই জনসাধারণের জীবন থেকে ধর্ম সরিয়ে দিতে চান বাক্যটি তাঁদের উদ্দেশে এক ধরনের সতর্কবাণী। ধর্ম এখানে মাধ্যমমাত্র। লেখকের ভাষায় ‘মারফত’। যে গন্তব্যে শিক্ষিত মানুষ পৌঁছান সাহিত্য আর শিল্পের পথ ধরে, সাধারণ মানুষ সেখানে পৌঁছান ধর্মের পথে। এই পাঠে দুই ভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবনে ধর্ম ও কালচারকে একই দায়িত্ব অর্পণ করে। দায়িত্ব অভিন্ন হলেও মর্যাদা কিন্তু অভিন্ন নয়। অন্যত্র মোতাহের হোসেন দুই পথের মধ্যে স্পষ্ট তারতম্য নির্দেশ করেছেন।
‘ধার্মিকের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে ভয় আর পুরস্কারের লোভ। সংস্কৃতিবান মানুষের জীবনে ওসবের বালাই নেই। তারা সবকিছু করে ভালোবাসার তাগিদে।’
এই বিচারে ধর্ম পরনির্ভর নৈতিকতার প্রতিরূপ যার চালিকাশক্তি বাইরে থেকে আসা দণ্ডের আশঙ্কা ও প্রাপ্তির প্রলোভন। সংস্কৃতি স্বাধীন নৈতিকতার প্রতিরূপ যার উৎস অন্তরের অনুরাগ। কান্টের পরিভাষা ধার করলে প্রথমটি পরশাসিত আর দ্বিতীয়টি স্বশাসিত। নিচের স্তরে ভয় ও লোভে চালিত ধর্ম ওপরের স্তরে ভালোবাসায় চালিত কালচার। সংস্কৃতির ইতিবাচক সংজ্ঞাও তিনি দিয়েছেন সহজভাবে, ‘সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে বাঁচা’। সেই বাঁচার ধরন বোঝাতে তিনি উদ্ভিদজগৎ থেকে উপমা এনেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় সংস্কৃতি মানে ‘প্রকৃতি-সংসার ও মানব-সংসারের মধ্যে অসংখ্য অনুভূতির শিকড় চালিয়ে দিয়ে বিচিত্র রস টেনে নিয়ে বাঁচা’।
সভ্যতা ও সংস্কৃতির পার্থক্যও তাঁর এক স্মরণযোগ্য বাক্যে ধরা আছে, ‘এ জীবনে যা না হলে আমরা বাঁচি না, তা–ই আমাদের সভ্যতা, আর যার জন্য বাঁচি তাই সংস্কৃতি’। সভ্যতা এখানে উপায়, সংস্কৃতি উদ্দেশ্য। আবার প্রগতির যে ধারণা ‘প্রকৃতিবিজয়লব্ধ সমৃদ্ধির সার্থক বিতরণ’-এ এসে থেমে যায়, তার পাশে তিনি রেখেছেন আরেকটি বাক্য, ‘সভ্যতা শুধু প্রগতি নয়, আরো কিছু’। সেই আরো কিছুর ব্যাখ্যাও তিনি দিয়েছেন, ‘প্রগতির সঙ্গে সৌন্দর্যের সম্বন্ধ, প্রেমের সম্বন্ধ স্থাপিত না হলে সভ্যতা হয় না’। তাহলে ‘সভ্যতা’ শব্দটি তাঁর লেখায় দুই স্তরে সক্রিয়। কখনো তা জীবনধারণের উপকরণ কখনো সৌন্দর্য ও প্রেমে সিক্ত এক পূর্ণতর অবস্থা।
শব্দের এই দোলাচল কি নিছক আকস্মিক? উত্তর খুঁজতে গেলে ক্লাইভ বেলের দরজায় কড়া নাড়তে হয়। ক্লাইভ বেল (১৮৮১–১৯৬৪) শিল্পসমালোচক হিসেবেই সমধিক পরিচিত। সভ্য সমাজ বোঝার জন্য বেল দুটি লক্ষণ নির্দেশ করেন। যেমন, মূল্যবোধ এবং যুক্তির প্রতিষ্ঠা। প্রথমটি হলো কোন বস্তু স্বতোমূল্যবান আর কোনটি উপায়মাত্র, সে বিষয়ে পরিচ্ছন্ন বোধ। দ্বিতীয়টি হলো সব প্রশ্নকে উন্মুক্ত রেখে যুক্তির আদালতে বিচার করার প্রস্তুতি। যে তিনটি পর্বকে তিনি উচ্চ সভ্যতার আদর্শ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেন, সেগুলো হলো পেরিক্লিসের এথেন্স, রেনেসাঁর ফ্লোরেন্স এবং বিপ্লবপূর্ব অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্স।
মোতাহের হোসেন চৌধুরীর একটি প্রবন্ধের নাম ‘মূল্যবোধ ও যুক্তিবিচার’। বেলের দুই লক্ষণের সঙ্গে এই শিরোনামের সাযুজ্য সহজেই ধরা পড়ে। এটি সচেতন ঋণ কি না তা প্রবন্ধের পাঠ মিলিয়ে বিচার্য। তবে দুই লেখকের চিন্তা যে একই অক্ষকে কেন্দ্র করে আবর্তিত, সে কথা বলা চলে। বেলের গ্রন্থের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ অবশ্য অন্যত্র। সভ্যতার বস্তুগত শর্ত নিয়ে তিনি কোনো রাখঢাক করেননি।
‘সভ্যতার জন্য একটি অবকাশভোগী শ্রেণির অস্তিত্ব আবশ্যক, আর অবকাশভোগী শ্রেণির জন্য আবশ্যক দাসের অস্তিত্ব— দাস বলতে আমি সেই মানুষদের বোঝাচ্ছি, যাঁরা নিজেদের উদ্বৃত্ত সময় ও শক্তির একাংশ অন্যের ভরণপোষণে ব্যয় করেন। ক্লাইভ বেল, ‘সিভিলাইজেশন’ (১৯২৮)
বেলের যুক্তি সরল। উৎকৃষ্ট মনোদশার চর্চার জন্য প্রয়োজন অবকাশ ও নিরাপত্তা। অবকাশ আকাশ থেকে নামে না, কাউকে না কাউকে শ্রম দিয়ে তা জোগাতে হয়। সভ্যতা-নির্মাতা মুষ্টিমেয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও অবকাশ বহুজনের মূল্য না দিয়ে কীভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব, এই প্রশ্ন তিনি নিজেই তুলেছেন। তাঁর উত্তর—সব সভ্যতার ভিত্তি অসমতা। এথেন্সের ছিল দাস আর যে শ্রেণি ফ্লোরেন্সকে তার সংস্কৃতি দিয়েছিল তাকে প্রতিপালন করেছিল ভোটাধিকারহীন এক শ্রমজীবী জনতা। এই স্পষ্টবাদিতা অস্বস্তিকর কিন্তু শিক্ষণীয়ও। সভ্য ব্যক্তির যে আদর্শ সচরাচর বায়বীয় উচ্চতায় ভেসে বেড়ায়, বেল তাকে মাটিতে নামিয়ে দেখিয়েছেন, তার পায়ের নিচে কারা আছে।
মনে রাখা দরকার, বেলের পারিবারিক বিত্ত এসেছিল ওয়েলসের মার্থার টিডফিলের কয়লাখনি থেকে। তাঁর নিজের সংজ্ঞা মানলে ভূগর্ভে যে শ্রমিকেরা কয়লা কেটেছেন, তাঁরাই ছিলেন বেলের অবকাশের জোগানদার। বেলের প্রায় ষাট বছর আগে ১৮৬৯ সালে ম্যাথু আর্নল্ড ‘কালচার অ্যান্ড অ্যানার্কি’ গ্রন্থে সংস্কৃতিকে বলেছিলেন ‘পূর্ণতার অন্বেষণ’। তাঁর ঘোষণা ছিল সংস্কৃতি শ্রেণিভেদ বিলুপ্ত করতে চায়, পৃথিবীতে যা কিছু শ্রেষ্ঠ চিন্তা ও জ্ঞান, তাকে সব জায়গায় ছড়িয়ে দিতে চায়। আর্নল্ডের সংস্কৃতি অন্তত আকাঙ্ক্ষায় সম্প্রসারণশীল। বেলের সভ্যতা আত্মসংকোচী। সে জানে তার পরিধি সংকীর্ণ এবং সেই সংকীর্ণতাকেই সভ্যতার শর্ত বলে মেনে নেয়। মোতাহের হোসেনের সূত্রের অবস্থান এই দুইয়ের মধ্যবর্তী। আর্নল্ডের মতো তিনি সংস্কৃতিকে প্রায় ধর্মের আসনে বসিয়েছেন আবার বেলের মতো স্বীকার করেছেন যে সমাজের সবাই সেই আসনের নাগাল পায় না।
এবার অনুবাদকের প্রসঙ্গে আসা যাক। বাংলা ‘সভ্যতা’য় বেলের দাস-সংক্রান্ত অনুচ্ছেদটির কী হয়েছে? আক্ষরিক অনুসরণ, মৃদু পরিমার্জন, টীকাসহ উপস্থাপন, নাকি বর্জন, সে প্রশ্নের মীমাংসা মূল ও অনুবাদ পাশাপাশি রেখে পড়ার অপেক্ষায়। তারপরও তাঁর মৌলিক রচনা পড়লে বেলের তত্ত্ব আত্মস্থ করার ধরনটি আঁচ করা যায়। বেলের সভ্যতাতত্ত্বে দুটি স্তর আছে। ওপরের স্তরে সভ্য ব্যক্তির মনোজগৎ যেখানে মূল্যবোধ, যুক্তি, সৌন্দর্যানুভূতি ও প্রীতির বাস। নিচের স্তরে সেই মনোজগতের অর্থনৈতিক ভিত অর্থাৎ অবকাশ, নিরাপত্তা ও অন্যের শ্রম। ওপরের স্তরটি মোতাহের হোসেন বহুলাংশে গ্রহণ করেছেন। তাঁর ‘সৌন্দর্য, আনন্দ ও প্রেম’ মূর ও বেলের স্বতোমূল্যবান কল্যাণের তালিকার সঙ্গে সহজেই মিলিয়ে নেওয়া যায়। ‘সভ্যতা শুধু প্রগতি নয়’ বাক্যেও বেলের সেই অবস্থানের ছায়া আছে যেখানে সভ্যতা মাপার নিক্তি মূল্যবোধ ও যুক্তি। সভ্যতাকে উপায় আর সংস্কৃতিকে উদ্দেশ্য বলে চিহ্নিত করার মধ্যেও বেলের কাঠামোর চিহ্ন মেলে।
বেলের কাছে সভ্যতা উৎকৃষ্ট মনোদশার উপায়। বাঙালি অনুবাদক সেই উপায়ের নাম রাখলেন সভ্যতা, আর উৎকৃষ্ট মনোদশার নাম দিলেন সংস্কৃতি। এভাবে পড়লে মনে হয় বেলের একটিমাত্র প্রত্যয় বাংলায় এসে দুই ভাগ হয়েছে আর সে কারণেই ‘সভ্যতা’ শব্দটি তাঁর লেখায় দুই অর্থের মধ্যে দোল খায়। নিচের স্তরটি নিয়ে তাঁর বহুল পঠিত রচনাগুলোতে বিশেষ উচ্চবাচ্য নেই। তাঁর সংস্কৃতি-সূত্রে দাস নেই অবকাশভোগী শ্রেণিও নেই। আছে ‘সাধারণ লোক’, যাঁরা ভিন্ন এক পথে অর্থাৎ ধর্মের পথে একই গন্তব্যে পৌঁছান। বেলের অর্থনৈতিক সোপানক্রম মোতাহের হোসেনের হাতে শিক্ষাগত ও নৈতিক সোপানক্রমে রূপান্তরিত হয়েছে।
এই রূপান্তরের দুটি দিক আছে। একদিকে এটি মানবিক সংশোধন কারণ বাঙালি অধ্যাপক কোনো জনগোষ্ঠীকে দাস অভিধা দিতে সম্মত নন। অন্যদিকে এটি এক ধরনের আড়ালও। কারণ শিক্ষিত ও সাধারণের ব্যবধান কেন তৈরি হয়, আবার কার শ্রমে কার শিক্ষা সম্ভব হয়, সে প্রশ্ন আর উচ্চারিত হয় না।
ঔপনিবেশিক বাংলায় ‘শিক্ষিত’ অভিধাটি নিজেই ছিল শ্রেণিচিহ্ন। ভূসম্পত্তির আয় সরকারি চাকরি আর ইংরেজি বিদ্যার সুযোগ যাদের নাগালে ছিল, শিক্ষিত বলতে প্রধানত তাদেরই বোঝাত। এই পাঠে বেলের ‘নিম্নশ্রেণি’ পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। সামাজিক বিন্যাসে তার জায়গাটি ‘সাধারণ লোক’ নামে থেকে যায়। তবে বেলের সঙ্গে এখানে একটি ফারাক আছে।
বাঙালি মুসলমান সমাজে শিক্ষিত স্তর তখন সবে গড়ে উঠছে আর তার অনেক সদস্যের শিকড় গ্রামীণ কৃষিনির্ভর পরিবারে। মোতাহের হোসেন নিজেও কাঞ্চনপুর গ্রামের সন্তান। ‘সাধারণ লোক’ তাই এই শিক্ষিতজনের কাছে অনেক সময় নিজেরই স্বজন। সূত্রটির দ্বিধা হয়তো এই নৈকট্য থেকেও জন্মেছে। ব্রিটিশ সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক রেমন্ড উইলিয়ামস ১৯৭৮ সালে রচিত ‘দ্য ব্লুমসবেরি ফ্র্যাকশন’ প্রবন্ধে বেলদের গোষ্ঠীকে ইংরেজ উচ্চশ্রেণির এক ‘ভগ্নাংশ’ হিসেবে পাঠ করেছেন।
উইলিয়ামসের বিশ্লেষণে ব্লুমসবেরির বিদ্রোহ আন্তরিক ছিল। তাঁরা নিজেদের শ্রেণির ভণ্ডামি ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু সেই বিদ্রোহের মানদণ্ড এবং সভ্য ব্যক্তির অবাধ বিকাশ ওই শ্রেণির স্বাচ্ছন্দ্য থেকেই জাত। সামাজিক দায়বোধ তাঁদের ছিল, তবে তা ওপর থেকে নিচের দিকে প্রসারিত সহমর্মিতা। নিচের মানুষের নিজস্ব সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব সেখানে স্বীকৃতি পায়নি। কিছুটা সংশোধিত রূপে এই বিশ্লেষণ শিখা-গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায়; যদিও বিত্তের বিচারে তাঁরা বেলের সমকক্ষ ছিলেন না। তাঁরাও বাঙালি মুসলমান সমাজের শিক্ষিত ভগ্নাংশ যাঁরা স্বসমাজের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লড়েছেন অথচ সংস্কৃতির মানদণ্ড নির্ধারণের ভার রেখেছেন নিজেদের হাতে। ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়ের বুর্দিয়ো পরে দেখিয়েছেন যে, রুচি নিজেই শ্রেণিভেদের চিহ্ন হয়ে ওঠে আর ‘মার্জিত’ রুচির দাবি অনেক সময় সামাজিক দূরত্ব রক্ষার কৌশল।
ইতালীয় মার্ক্সবাদী আন্তোনিও গ্রামশি কারাগারে বসে লেখা নোটবুকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রস্তাব রেখেছিলেন। তাঁর মতে, সব মানুষই বুদ্ধিজীবী যদিও সমাজে সবার দায়িত্ব বুদ্ধিজীবীর নয়। তিনি আরও বলেছেন, দর্শন কতিপয় পেশাদার বিশেষজ্ঞের দুরূহ চর্চা এই বদ্ধমূল সংস্কার ভাঙতে হবে কারণ সব মানুষই এক অর্থে ‘দার্শনিক’। প্রত্যেকের ভেতরে ক্রিয়াশীল এক ‘স্বতঃস্ফূর্ত দর্শন’। তার আধার তিনটি যেমন: ভাষা, সাধারণ বোধ ও সুবোধ এবং লোকধর্ম। লোকধর্মের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিশ্বাস, সংস্কার, মতামত আর আচরণের সেই সমগ্র ব্যবস্থা যাকে সাধারণত ফোকলোর বলা হয়। দুই চিন্তকের মধ্যে এই জায়গায় অপ্রত্যাশিত এক সংযোগবিন্দু আছে। মোতাহের হোসেন ও গ্রামশি উভয়েই মনে করেন সাধারণ মানুষের জীবনদৃষ্টি আশ্রয় নেয় লোকধর্মে। পার্থক্য সিদ্ধান্তে। ‘সংস্কৃতি কথা’র লেখকের কাছে লোকধর্ম সংস্কৃতির নিম্নতর বিকল্প, ভয় ও লোভে চালিত। গ্রামশির কাছে তা কাঁচামাল যার ভেতরে সুবোধের সুস্থ কেন্দ্র আছে এবং যাকে বিকশিত করে ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগত রূপ দেওয়া সম্ভব। প্রথম দৃষ্টিতে সাধারণ মানুষ সংস্কৃতির গ্রহীতা আর দ্বিতীয় দৃষ্টিতে তার সম্ভাব্য স্রষ্টা।
এ প্রশ্নে বাংলার নিজস্ব অভিজ্ঞতা গ্রামশির পক্ষেই সাক্ষ্য দেয়। লালন ফকির গেয়েছেন, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।/ মানুষ ছেড়ে ক্ষ্যাপারে, তুই মূল হারাবি।’ এই সাধনার চালিকাশক্তি নরকের ভয় কিংবা স্বর্গের প্রলোভন নয় উল্টো মানুষের প্রতি অনুরাগ। বাউল, মারফতি ও মুর্শিদি গানের ধারায় ভক্তি ও নান্দনিকতা, সাধনা ও সুর এমনভাবে মিশে আছে যে কোথায় ধর্ম শেষ আর কোথায় কালচার শুরু সে রেখা টানা দুঃসাধ্য। যে রবীন্দ্রনাথ মোতাহের হোসেনের মানসগঠনে ছাপ রেখেছেন তাঁর অক্সফোর্ড হিবার্ট বক্তৃতামালা (১৯৩০) পরের বছর ‘দ্য রিলিজিয়ন অব ম্যান’ নামে গ্রন্থিত হয়। সেই গ্রন্থের ‘দ্য ম্যান অব মাই হার্ট’ অধ্যায়ে বাউলের ভাষায় যা ‘মনের মানুষ’, রবীন্দ্রনাথ একটি বাউলগান উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে সাধকের আক্ষেপ, মন্দির আর মসজিদ মনের মানুষের পথ আগলে দাঁড়ায়।
গুরু-পুরোহিতের রুষ্ট ভিড়ে তিনি সেই ডাক শুনতে পান না, এক পা-ও এগোতে পারেন না। প্রথাগত বিদ্যায়তনের বাইরের এই সাধকের ধর্মকে মোতাহের হোসেনের ভাষাতেই বর্ণনা করা চলে আর তা ‘ভালোবাসার তাগিদ’-এর ধর্ম। তাহলে সাধারণ মানুষের ধর্মকে ভয় ও লোভের খোপে আটকে রাখা যায় কীভাবে? তবু মোতাহের হোসেনকে অভিজাত অহমিকার প্রবক্তা বললে অবিচার হবে। তাঁর বক্তব্যের শেষ বাক্যটি সাধারণ মানুষের পক্ষেই উচ্চারিত। যে আধুনিকতা দরিদ্রের জীবন থেকে তার অর্থবোধের প্রধান উৎস কেড়ে নিয়ে বিনিময়ে কিছুই দেয় না তার বিরুদ্ধে তিনি সতর্ক করেছেন। তা ছাড়া ‘কালচার শিক্ষিতের ধর্ম’ কথাটি শিক্ষিতের জন্য সুবিধা না বলে দায় বলতে পারি। ধর্ম যেমন নিষ্ঠা ও অনুশীলন দাবি করে তেমনি সংস্কৃতিও দাবি করে নিত্যচর্চা। যে উপাধিধারী ব্যক্তি সৌন্দর্য, আনন্দ ও প্রেম সম্পর্কে উদাসীন, যাঁর কাছে বিদ্যা পদ ও বিত্তের সিঁড়িমাত্র এই যুক্তি মানলে তিনি এক অর্থে ধর্মচ্যুত।
আজকের সনদসর্বস্ব শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দাবিটির কাঠিন্য বোঝা যায়। ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের কর্মসূচিই ছিল জ্ঞানের পরিধি প্রসারিত করা। জ্ঞান সীমাবদ্ধ থাকলে মুক্তি অসম্ভব এই ঘোষণার ভেতরকার প্রতিজ্ঞা হলো জ্ঞানের সীমা ভাঙলে আরও মানুষ মুক্তির নাগাল পাবে। সেই অর্থে মোতাহের হোসেনের সোপান ক্রম-প্রসারমান। শিক্ষার বিস্তারের সঙ্গে সংস্কৃতির পরিধিও বাড়বে এই আশা তাঁর বক্তব্যের ভেতরে প্রচ্ছন্ন। বেল যেখানে অসমতাকে সভ্যতার স্থায়ী শর্ত বলে ধরে নেন মোতাহের হোসেন সেখানে অন্তত উত্তরণের পথ খোলা রাখেন। ধর্ম ও কালচারকে পৃথক বর্গ হিসেবে দেখার মধ্যে ইতিহাসের বিচারে সাহসিকতাও নিহিত। দেশভাগের আগে-পরে পূর্ব বাংলায় নানা মহল যখন ধর্মপরিচয়কেই সংস্কৃতির একমাত্র মাপকাঠি করে তুলতে সচেষ্ট তখন এই পার্থক্যরেখা তত্ত্বচর্চায় আবদ্ধ থাকে না। বক্তব্যটির যুক্তি অনুসরণ করলে ধর্মপরিচয় দিয়ে সংস্কৃতির সীমানা নির্ধারণের যুক্তি আর টেকে না।
এবার মূল প্রশ্নে ফেরা যাক। কালচার কি শিক্ষিতের একচেটিয়া ধর্ম? উত্তর হলো ‘না’। মোতাহের হোসেনের বাক্যটিকে সংস্কৃতির সংজ্ঞা হিসেবে না পড়ে অসম সমাজের রোগনির্ণয় হিসেবে পড়াই সংগত। যে সমাজে শিক্ষা ও অবকাশ অসমভাবে বণ্টিত সেখানে সংস্কৃতির রূপগুলোও অসমভাবে বণ্টিত হয়। এই সত্য সমাজতাত্ত্বিক কিন্তু শাশ্বত নয়। বেল এই অসমতাকে খোলাখুলি স্বীকার করে সভ্যতার অনিবার্য মূল্য বলে মেনে নিয়েছিলেন। মোতাহের হোসেন তাকে নৈতিক পরিভাষায় কোমল করেছিলেন। আজকের পাঠকের কাজ ভিন্ন। অসমতাকে মেনে নেওয়া বা নীতিকথায় ঢেকে দেওয়ার বদলে তার বস্তুগত শর্তগুলো বদলানোই সেই কাজ। সংস্কৃতির গণতন্ত্রায়ণের জন্য চাই অবকাশ, শিক্ষা ও জীবিকার নিরাপত্তা।
বেল এগুলোকে মুষ্টিমেয়ের প্রাপ্য বলে গণ্য করেছিলেন আর মোতাহের হোসেনের মতো বেতনজীবী মধ্যবিত্তকে এগুলো অর্জন করতে হয়েছে পরিশ্রমে। সেই সঙ্গে প্রয়োজন আরেকটি স্বীকৃতি আর তা হলো, সাধারণ মানুষ সংস্কৃতিহীন নন। সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে বাঁচার যে আদর্শ মোতাহের হোসেন সন্ধান করেছেন তার অজস্র নিদর্শন ছড়িয়ে আছে সেই মানুষদের গানে, আখ্যানে, সূচিকর্মে ও উৎসবে, যাঁদের তিনি ‘সাধারণ লোক’ বলেছেন।
মোতাহের হোসেনের নিজের উপমাতেই ফেরা যায়। সংস্কৃতিকে তিনি কল্পনা করেছিলেন শিকড়ের মতো যা প্রকৃতি-সংসার ও মানব-সংসার থেকে রস টেনে আনে। শিকড় নামে মাটিতে। আর সেই মাটিতে যাঁরা লাঙল চালান, বীজ বোনেন, ফসল তোলেন, তাঁদের বাদ দিয়ে কোনো শিকড় রস পায় না। শিক্ষিতের সংস্কৃতি যদি সেই মাটির কথা বিস্মৃত হয় তবে তা টবের গাছের মতো সুদৃশ্য হতে পারে কিন্তু তার শিকড় ছড়ানোর জমি থাকে না। প্রয়াণের সাত দশক পরে মোতাহের হোসেন চৌধুরীর বাক্যটিকে এভাবে পড়াই হয়তো তাঁর প্রতি সবচেয়ে সৎ শ্রদ্ধাঞ্জলি।
• সামিয়া রহমান: প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, নেত্রকোণা বিশ্ববিদ্যালয়
.png)










