নাহিদা নাহিদ

বেশ কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় ছাত্র-আন্দোলনের এক অপ্রতিরোধ্য গণজোয়ার বইছে। ভারতের সমসাময়িক ছাত্র বিক্ষোভ, পাকিস্তানে বেলুচিস্তান বিদ্রোহ, শ্রীলংকায় আরাগলাইয়া, মালদ্বীপে নাগরিক প্রটেস্ট এবং বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন—সব যেন এক অভিন্ন সুতোয় গাঁথা। এই আন্দোলনগুলোর সিংহভাগে রয়েছে ‘জেন জি’ ও মিলেনিয়াল প্রজন্ম। প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার, সাইবার অ্যাক্টিভিজম, প্রথাগত রাজনৈতিক দলের প্রতি অনীহা এবং যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক নেটওয়ার্কযুক্ত প্রতিবাদে তারা নিজেদের শক্ত রাজনৈতিক অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। তাদের এই প্রয়াস কেবল ক্ষমতার পালাবদলে নিজেদের অংশগ্রহণই নিশ্চিত করছে না, বরং একটি প্রজন্মের শুভবুদ্ধি ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জকে প্রগাঢ়ভাবে চিহ্নিত করছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশের প্রতিটি সংকটময় পরিস্থিতিতে মানবসভ্যতার চাকা সচল রাখতে এবং কাঠামোগত বৈষম্য ও শোষণের শেকড় কাটাতে তরুণ প্রজন্ম সবসময় সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বৈরশাসনের অন্ধ অহংকার এবং জনবিরোধিতার বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসের আঙিনা থেকে রাজপথে তারা ছড়িয়েছে দ্রোহের আগুন। তারুণ্য, শিক্ষার্থী বা ছাত্রদের আন্দোলন কেবল নিজ নিজ প্রাতিষ্ঠানিক দাবি আদায়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি কখনো, বরং বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রকেও বদলে দিয়েছে বহুবার। এই রক্তঝরা অধ্যায়ে সামনের সারিতে থেকে মশাল জ্বেলে নেতৃত্ব দিয়ে নিজেদের অনন্য ও অপ্রতিরোধ্য প্রমাণ করেছে নারীশক্তি।
দক্ষিণ এশিয়ার এই তারুণ্যদীপ্ত অভ্যুত্থানের ধারায় সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা নিজেদের অধিকার রক্ষার্থে রাজপথে সোচ্চার হয়েছেন। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং ন্যায্যতার দাবিতে তরুণ প্রজন্ম যখন দিল্লির বিভিন্ন জনপদে ও রাজপথে সমবেত হয়েছে, তখন নারীরা কেবল সহযোদ্ধা হিসেবে নয়, বরং প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন। আফরিন নেওয়াজ শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে এবং গণমাধ্যমের সামনে দাবিগুলো তুলে ধরতে যে ভূমিকা রাখছেন, তা আন্দোলনের পরিধিকে প্রসারিত করেছে; অন্যদিকে রত্না সিং মাঠপর্যায়ের আন্দোলন এবং মিছিল পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং বৈষ্ণবী গৌর আইনি লড়াই, শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা ও প্রচারণায় যুক্ত থেকে বিশেষ অবদান রাখছেন।

শিক্ষার্থীরা পুলিশের নানা বাধা উপেক্ষা করে রাজপথে বুক পেতে দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবি জানাচ্ছেন, যেখানে নারীদের বলিষ্ঠ কণ্ঠ ক্ষমতার মসনদ পর্যন্ত প্রকম্পিত করে তুলছে। অনুরূপভাবে, পাকিস্তানের অবহেলিত ও খনিজসমৃদ্ধ প্রদেশে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের বিরুদ্ধে বেলুচ নারীরা সরাসরি রাজপথে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই আন্দোলনে ‘বলুচ সংহতি কমিটি’-এর শীর্ষ নেত্রী ডা. মাহরাং বালোচ বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বেলুচদের কণ্ঠস্বর জোরালো করার মাধ্যমে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখছেন। যাঁর সঙ্গে সামি দ্বীন বালোচ, ডা. সাবিহা বালোচ এবং ফারজানা মজিদের মতো লড়াকু নারী নেত্রীরা নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধান ও মানবাধিকার রক্ষার দাবিতে শত বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা গণবিক্ষোভেও তরুণী অ্যাক্টিভিস্টরা সম্মুখসারিতে থেকে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির প্রতিবাদ করেছিলেন। স্বস্থিকা অলিঙ্গম, মানবাধিকার আইনজীবী মারিসা ডি সিলভা, জলবায়ু ও নাগরিক অ্যাক্টিভিস্ট মেলানি গুনাতিলাকে এবং শ্রমিক নেত্রী চমিলা থুশারি প্রমুখ ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে ও তাঁর পরিবারের স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি এবং জনতাবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে ছিলেন। মারাত্মক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, চরম বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, খাদ্য, জ্বালানি ও রান্নার গ্যাসের তীব্র ঘাটতি এবং আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যখন অচল হয়ে পড়েছিল, তখন তাদের আপসহীন আন্দোলনের ফলস্বরূপ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়, যা দেশটির রাজনৈতিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনে গভীর প্রভাব ফেলে।
এই আঞ্চলিক ধারাবাহিকতার মাঝেই অত্যন্ত জোরালোভাবে সামনে আসে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে কোটা সংস্কার ও ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উমামা ফাতেমা, নুসরাত তাবাসসুমসহ শত শত সাহসী নারী শিক্ষার্থী কারাফটকের সামনে দাঁড়িয়ে, পুলিশের লাঠিপেটা ও টিয়ারগ্যাস উপেক্ষা করে রাজপথের ব্যারিকেড টিকিয়ে রেখেছিলেন; যাঁদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল—‘মেধা না কোটা? মেধা, মেধা! স্বাধীনতা না দাসত্ব? স্বাধীনতা, স্বাধীনতা!’ এবং ‘দফা এক দাবি এক, স্বৈরাচারের পতন!’
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছাত্র আন্দোলনের এই তীব্র ও ঐতিহাসিক রূপ আমরা সর্বপ্রথম দেখেছিলাম ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে। সেসময়েও সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের হাত ধরে রোকেয়া হল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সাহসী ছাত্রীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে অসামান্য সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এই সংগ্রামে সম্মুখসারির নেতৃত্বে সুফিয়া আহমেদ, রওশন আরা বাচ্চু, শাফিয়া খাতুন, শামসুন্নাহার, সারা তৈফুর, হালিমা খাতুন, কায়সার সিদ্দিকী প্রমুখ ছাত্রীর নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। হাজারো তরুণের সঙ্গে তাঁদের কণ্ঠেও প্রতিধ্বনিত হয়েছিল অমর সেই স্লোগান—‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই!’—যার চূড়ান্ত ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
বিশ্ব ইতিহাসের অন্যান্য গণআন্দোলনেও নারীদের এই ভূমিকা ছিল সমান্তরাল ও অতুলনীয়। ১৯৬৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদে সৃষ্ট ‘ফ্রি স্পিচ মুভমেন্ট’-এ নারী শিক্ষার্থীরা বিপুল তেজে অংশ নিয়েছিলেন। বেটিনা আপথেকার, জ্যাকি গোল্ডবার্গ এবং জো ফ্রিম্যানের মতো নারী শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অন্যায় নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন। তাঁরা আন্দোলনের মূল নীতি নির্ধারণী ‘স্টিয়ারিং কমিটি’ পরিচালনা করেছেন, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনকে একজোট করেছেন এবং আইন অমান্য করে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক লিফলেট বিতরণ ও তহবিল সংগ্রহের মতো সাহসী কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শত শত শিক্ষার্থীর গণ-গ্রেপ্তারের সময়ও তাঁরা প্রশাসনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ফ্রন্টলাইনে থেকে আন্দোলনের কণ্ঠস্বর সচল রেখেছিলেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ক্যাম্পাসে বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করেছিল।
১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ছাত্র-শ্রমিক অভ্যুত্থানে ক্রিস্টিন ডেলফি, অ্যান জেলিনস্কি এবং তৎকালীন ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও নারীবাদী দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার-এর মতো নারীরা পুরুষতান্ত্রিক শৃঙ্খল ভেঙে সক্রিয়তা দেখিয়েছেন নিজ নিজ অঙ্গনে। সেসময় তারুণ্যের মূল মন্ত্র ছিল মার্ক্সবাদী ও অস্তিত্ববাদী দর্শনের প্রভাব, বুর্জোয়া সংস্কৃতির পতন ঘটানো এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য আমূল পরিবর্তন দাবি করা। তৎকালীন মূলধারার গণমাধ্যম ও পুরুষ নেতৃত্ব নারীদের মূল আলোচনা থেকে কিছুটা পেছনে রাখার চেষ্টা করলেও এই নারী আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড তৈরি, লিফলেট বিতরণ ও সাধারণ ধর্মঘট সংগঠনে সমান তালে অবদান রাখেন। তাঁরা কেবল রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদেরই বিরোধিতা করেননি, বরং বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর ভেতরে থাকা অভ্যন্তরীণ লিঙ্গবৈষম্য এবং নারীদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখার মানসিকতার বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানান। প্যারিসের দেয়ালে দেয়ালে খোদাই করা সেই ঐতিহাসিক স্লোগান—‘নিষেধ করা নিষিদ্ধ!’—এবং রাজপথের এই যৌথ লড়াইয়ের ফলেই ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গলের দীর্ঘমেয়াদি শাসনের ভিত কেঁপে ওঠে এবং আমূল সংস্কার সাধিত হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার সোয়েটো জনপদে বর্ণবাদী আপার্টহাইট সরকারের জোরপূর্বক আফ্রিকান ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার কৃষ্ণাঙ্গ আইন ও বৈষম্যমূলক ‘বান্টু শিক্ষা’ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ১৯৭৬ সালের ১৬ জুন ছাত্রসমাজ যে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল, তার মূলে ছিল কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমজীবী ও ছাত্র প্রজন্মের তারুণ্য। জেন এক্স ও আফ্রিকান তরুণ প্রজন্মের এই ধারার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী চেতনা, বর্ণবাদের শিকল ভাঙার অদম্য জেদ এবং শারীরিক নির্যাতন বা বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়ার মতো চরম সাহসিকতা। সোয়েটো স্টুডেন্টস রিপ্রেজেন্টেটিভ কাউন্সিলের নেতৃত্বে পরিচালিত এই রক্তাক্ত লড়াইয়ে সিবোঙ্গিল এমখাবেলা প্রথম শহীদ হেক্টর পিটারসনের বোন ও আন্দোলনের প্রতীক অ্যান্টোনেট সিথোল, ১৯ বছর বয়সে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনৈতিক তৎপরতার জন্য কারাবরণকারী লিন্ডিওয়ে সিসুলু এবং পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েও অদম্য সাহসিকতার নজির গড়া পপি বুথেলেজির মতো নারীরা সম্মুখসারিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মুক্তিকামী তরুণেরা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল—‘বর্ণবাদ নিপাত যাক, মুক্তি আমাদের পেতেই হবে!’ স্লোগানে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার স্বরূপ উন্মোচিত করেছিল এবং দেশটিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চূড়ান্ত উদয় ঘটিয়েছিল।
সর্বোপরি, ১৯৮৯ সালের বসন্তে চীনের বেইজিংয়ের তিয়েন আনমেন চত্বরে কমিউনিস্ট একদলীয় শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিতে লাখ লাখ শিক্ষার্থী যে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছিল, সেখানে অংশ নেওয়া তরুণরা ছিল মিলেনিয়াল ও জেন এক্স প্রজন্মের কাছাকাছি এক শিক্ষিত শহুরে তারুণ্য। রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও মুক্তবাজার অর্থনীতির সুফল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, বাক্স্বাধীনতা রক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের মুখে উচ্চারিত হয়েছিল অমর সেই স্লোগান—‘গণতন্ত্রই আমাদের জীবন, অন্যথায় মৃত্যু!’ বিশ্ব ইতিহাসের এই অন্যতম বৃহত্তম গণতান্ত্রিক ছাত্র আন্দোলনে ২৩ বছর বয়সী ছাত্রী চাই লিং ‘কমান্ডার-ইন-চিফ’ নির্বাচিত হয়ে অনশন ও আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হন।
রাষ্ট্রশক্তির শত দমনপীড়নের মুখেও অত্যন্ত আপসহীন ও দৃঢ় নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বিশ্ব ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। যদিও ৪ জুনের রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযানের অব্যবহিত পূর্বে তাঁর কিছু কঠিন অবস্থান ও মন্তব্য ঐতিহাসিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, তবুও কঠোর রাষ্ট্রীয় সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলনটি সাময়িকভাবে পিষে ফেলা হলেও এটি বিশ্ববাসীর সামনে একদলীয় স্বৈরাচারের নিপীড়ক মুখচ্ছবি চিরতরে উন্মোচন করেছিল।
প্রাক-আধুনিক যুগের আদর্শবাদী তারুণ্য থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের টেক-স্যাভি ‘জেন জি’ প্রজন্ম—প্রতিটি যুগের তারুণ্যের রক্তস্রোত প্রমাণ করেছে যে বন্দুকের নল বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন দিয়ে মানুষের মুক্তির স্পৃহাকে চিরতরে বন্দি করা যায় না। আর এই প্রতিটি রক্তঝরা লড়াইয়ে নারীর সক্রিয়, সমান্তরাল, আপসহীন ও বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ পিতৃতান্ত্রিক, বৈষম্যমূলক ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোর মূলে চরম আঘাত হেনেছে। বর্তমান ও ভবিষ্যতের জটিল বৈশ্বিক সংকটে তারুণ্যের এই অদম্য বিদ্রোহী সত্তা এবং সাম্য ও মুক্তির চেতনাই মানবসভ্যতার একমাত্র ভরসা ও পথপ্রদর্শক।

বেশ কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় ছাত্র-আন্দোলনের এক অপ্রতিরোধ্য গণজোয়ার বইছে। ভারতের সমসাময়িক ছাত্র বিক্ষোভ, পাকিস্তানে বেলুচিস্তান বিদ্রোহ, শ্রীলংকায় আরাগলাইয়া, মালদ্বীপে নাগরিক প্রটেস্ট এবং বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন—সব যেন এক অভিন্ন সুতোয় গাঁথা। এই আন্দোলনগুলোর সিংহভাগে রয়েছে ‘জেন জি’ ও মিলেনিয়াল প্রজন্ম। প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার, সাইবার অ্যাক্টিভিজম, প্রথাগত রাজনৈতিক দলের প্রতি অনীহা এবং যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক নেটওয়ার্কযুক্ত প্রতিবাদে তারা নিজেদের শক্ত রাজনৈতিক অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। তাদের এই প্রয়াস কেবল ক্ষমতার পালাবদলে নিজেদের অংশগ্রহণই নিশ্চিত করছে না, বরং একটি প্রজন্মের শুভবুদ্ধি ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জকে প্রগাঢ়ভাবে চিহ্নিত করছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশের প্রতিটি সংকটময় পরিস্থিতিতে মানবসভ্যতার চাকা সচল রাখতে এবং কাঠামোগত বৈষম্য ও শোষণের শেকড় কাটাতে তরুণ প্রজন্ম সবসময় সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বৈরশাসনের অন্ধ অহংকার এবং জনবিরোধিতার বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসের আঙিনা থেকে রাজপথে তারা ছড়িয়েছে দ্রোহের আগুন। তারুণ্য, শিক্ষার্থী বা ছাত্রদের আন্দোলন কেবল নিজ নিজ প্রাতিষ্ঠানিক দাবি আদায়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি কখনো, বরং বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রকেও বদলে দিয়েছে বহুবার। এই রক্তঝরা অধ্যায়ে সামনের সারিতে থেকে মশাল জ্বেলে নেতৃত্ব দিয়ে নিজেদের অনন্য ও অপ্রতিরোধ্য প্রমাণ করেছে নারীশক্তি।
দক্ষিণ এশিয়ার এই তারুণ্যদীপ্ত অভ্যুত্থানের ধারায় সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা নিজেদের অধিকার রক্ষার্থে রাজপথে সোচ্চার হয়েছেন। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং ন্যায্যতার দাবিতে তরুণ প্রজন্ম যখন দিল্লির বিভিন্ন জনপদে ও রাজপথে সমবেত হয়েছে, তখন নারীরা কেবল সহযোদ্ধা হিসেবে নয়, বরং প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন। আফরিন নেওয়াজ শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে এবং গণমাধ্যমের সামনে দাবিগুলো তুলে ধরতে যে ভূমিকা রাখছেন, তা আন্দোলনের পরিধিকে প্রসারিত করেছে; অন্যদিকে রত্না সিং মাঠপর্যায়ের আন্দোলন এবং মিছিল পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং বৈষ্ণবী গৌর আইনি লড়াই, শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা ও প্রচারণায় যুক্ত থেকে বিশেষ অবদান রাখছেন।

শিক্ষার্থীরা পুলিশের নানা বাধা উপেক্ষা করে রাজপথে বুক পেতে দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবি জানাচ্ছেন, যেখানে নারীদের বলিষ্ঠ কণ্ঠ ক্ষমতার মসনদ পর্যন্ত প্রকম্পিত করে তুলছে। অনুরূপভাবে, পাকিস্তানের অবহেলিত ও খনিজসমৃদ্ধ প্রদেশে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের বিরুদ্ধে বেলুচ নারীরা সরাসরি রাজপথে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই আন্দোলনে ‘বলুচ সংহতি কমিটি’-এর শীর্ষ নেত্রী ডা. মাহরাং বালোচ বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বেলুচদের কণ্ঠস্বর জোরালো করার মাধ্যমে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখছেন। যাঁর সঙ্গে সামি দ্বীন বালোচ, ডা. সাবিহা বালোচ এবং ফারজানা মজিদের মতো লড়াকু নারী নেত্রীরা নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধান ও মানবাধিকার রক্ষার দাবিতে শত বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা গণবিক্ষোভেও তরুণী অ্যাক্টিভিস্টরা সম্মুখসারিতে থেকে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির প্রতিবাদ করেছিলেন। স্বস্থিকা অলিঙ্গম, মানবাধিকার আইনজীবী মারিসা ডি সিলভা, জলবায়ু ও নাগরিক অ্যাক্টিভিস্ট মেলানি গুনাতিলাকে এবং শ্রমিক নেত্রী চমিলা থুশারি প্রমুখ ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে ও তাঁর পরিবারের স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি এবং জনতাবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে ছিলেন। মারাত্মক অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, চরম বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, খাদ্য, জ্বালানি ও রান্নার গ্যাসের তীব্র ঘাটতি এবং আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যখন অচল হয়ে পড়েছিল, তখন তাদের আপসহীন আন্দোলনের ফলস্বরূপ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়, যা দেশটির রাজনৈতিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনে গভীর প্রভাব ফেলে।
এই আঞ্চলিক ধারাবাহিকতার মাঝেই অত্যন্ত জোরালোভাবে সামনে আসে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামোর বিরুদ্ধে কোটা সংস্কার ও ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উমামা ফাতেমা, নুসরাত তাবাসসুমসহ শত শত সাহসী নারী শিক্ষার্থী কারাফটকের সামনে দাঁড়িয়ে, পুলিশের লাঠিপেটা ও টিয়ারগ্যাস উপেক্ষা করে রাজপথের ব্যারিকেড টিকিয়ে রেখেছিলেন; যাঁদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল—‘মেধা না কোটা? মেধা, মেধা! স্বাধীনতা না দাসত্ব? স্বাধীনতা, স্বাধীনতা!’ এবং ‘দফা এক দাবি এক, স্বৈরাচারের পতন!’
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছাত্র আন্দোলনের এই তীব্র ও ঐতিহাসিক রূপ আমরা সর্বপ্রথম দেখেছিলাম ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে। সেসময়েও সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের হাত ধরে রোকেয়া হল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন সাহসী ছাত্রীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে নেমে অসামান্য সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এই সংগ্রামে সম্মুখসারির নেতৃত্বে সুফিয়া আহমেদ, রওশন আরা বাচ্চু, শাফিয়া খাতুন, শামসুন্নাহার, সারা তৈফুর, হালিমা খাতুন, কায়সার সিদ্দিকী প্রমুখ ছাত্রীর নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। হাজারো তরুণের সঙ্গে তাঁদের কণ্ঠেও প্রতিধ্বনিত হয়েছিল অমর সেই স্লোগান—‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই!’—যার চূড়ান্ত ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
বিশ্ব ইতিহাসের অন্যান্য গণআন্দোলনেও নারীদের এই ভূমিকা ছিল সমান্তরাল ও অতুলনীয়। ১৯৬৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ওপর রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারির প্রতিবাদে সৃষ্ট ‘ফ্রি স্পিচ মুভমেন্ট’-এ নারী শিক্ষার্থীরা বিপুল তেজে অংশ নিয়েছিলেন। বেটিনা আপথেকার, জ্যাকি গোল্ডবার্গ এবং জো ফ্রিম্যানের মতো নারী শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অন্যায় নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন। তাঁরা আন্দোলনের মূল নীতি নির্ধারণী ‘স্টিয়ারিং কমিটি’ পরিচালনা করেছেন, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনকে একজোট করেছেন এবং আইন অমান্য করে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক লিফলেট বিতরণ ও তহবিল সংগ্রহের মতো সাহসী কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন। শত শত শিক্ষার্থীর গণ-গ্রেপ্তারের সময়ও তাঁরা প্রশাসনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ফ্রন্টলাইনে থেকে আন্দোলনের কণ্ঠস্বর সচল রেখেছিলেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ক্যাম্পাসে বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পথকে সুগম করেছিল।
১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্সের ঐতিহাসিক ছাত্র-শ্রমিক অভ্যুত্থানে ক্রিস্টিন ডেলফি, অ্যান জেলিনস্কি এবং তৎকালীন ফরাসি বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ও নারীবাদী দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার-এর মতো নারীরা পুরুষতান্ত্রিক শৃঙ্খল ভেঙে সক্রিয়তা দেখিয়েছেন নিজ নিজ অঙ্গনে। সেসময় তারুণ্যের মূল মন্ত্র ছিল মার্ক্সবাদী ও অস্তিত্ববাদী দর্শনের প্রভাব, বুর্জোয়া সংস্কৃতির পতন ঘটানো এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্য আমূল পরিবর্তন দাবি করা। তৎকালীন মূলধারার গণমাধ্যম ও পুরুষ নেতৃত্ব নারীদের মূল আলোচনা থেকে কিছুটা পেছনে রাখার চেষ্টা করলেও এই নারী আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড তৈরি, লিফলেট বিতরণ ও সাধারণ ধর্মঘট সংগঠনে সমান তালে অবদান রাখেন। তাঁরা কেবল রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদেরই বিরোধিতা করেননি, বরং বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলোর ভেতরে থাকা অভ্যন্তরীণ লিঙ্গবৈষম্য এবং নারীদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে দেখার মানসিকতার বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিবাদ জানান। প্যারিসের দেয়ালে দেয়ালে খোদাই করা সেই ঐতিহাসিক স্লোগান—‘নিষেধ করা নিষিদ্ধ!’—এবং রাজপথের এই যৌথ লড়াইয়ের ফলেই ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গলের দীর্ঘমেয়াদি শাসনের ভিত কেঁপে ওঠে এবং আমূল সংস্কার সাধিত হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার সোয়েটো জনপদে বর্ণবাদী আপার্টহাইট সরকারের জোরপূর্বক আফ্রিকান ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার কৃষ্ণাঙ্গ আইন ও বৈষম্যমূলক ‘বান্টু শিক্ষা’ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ১৯৭৬ সালের ১৬ জুন ছাত্রসমাজ যে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল, তার মূলে ছিল কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমজীবী ও ছাত্র প্রজন্মের তারুণ্য। জেন এক্স ও আফ্রিকান তরুণ প্রজন্মের এই ধারার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামী চেতনা, বর্ণবাদের শিকল ভাঙার অদম্য জেদ এবং শারীরিক নির্যাতন বা বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়ার মতো চরম সাহসিকতা। সোয়েটো স্টুডেন্টস রিপ্রেজেন্টেটিভ কাউন্সিলের নেতৃত্বে পরিচালিত এই রক্তাক্ত লড়াইয়ে সিবোঙ্গিল এমখাবেলা প্রথম শহীদ হেক্টর পিটারসনের বোন ও আন্দোলনের প্রতীক অ্যান্টোনেট সিথোল, ১৯ বছর বয়সে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনৈতিক তৎপরতার জন্য কারাবরণকারী লিন্ডিওয়ে সিসুলু এবং পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েও অদম্য সাহসিকতার নজির গড়া পপি বুথেলেজির মতো নারীরা সম্মুখসারিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। মুক্তিকামী তরুণেরা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল—‘বর্ণবাদ নিপাত যাক, মুক্তি আমাদের পেতেই হবে!’ স্লোগানে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার স্বরূপ উন্মোচিত করেছিল এবং দেশটিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার চূড়ান্ত উদয় ঘটিয়েছিল।
সর্বোপরি, ১৯৮৯ সালের বসন্তে চীনের বেইজিংয়ের তিয়েন আনমেন চত্বরে কমিউনিস্ট একদলীয় শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিতে লাখ লাখ শিক্ষার্থী যে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছিল, সেখানে অংশ নেওয়া তরুণরা ছিল মিলেনিয়াল ও জেন এক্স প্রজন্মের কাছাকাছি এক শিক্ষিত শহুরে তারুণ্য। রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও মুক্তবাজার অর্থনীতির সুফল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, বাক্স্বাধীনতা রক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের মুখে উচ্চারিত হয়েছিল অমর সেই স্লোগান—‘গণতন্ত্রই আমাদের জীবন, অন্যথায় মৃত্যু!’ বিশ্ব ইতিহাসের এই অন্যতম বৃহত্তম গণতান্ত্রিক ছাত্র আন্দোলনে ২৩ বছর বয়সী ছাত্রী চাই লিং ‘কমান্ডার-ইন-চিফ’ নির্বাচিত হয়ে অনশন ও আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হন।
রাষ্ট্রশক্তির শত দমনপীড়নের মুখেও অত্যন্ত আপসহীন ও দৃঢ় নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বিশ্ব ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। যদিও ৪ জুনের রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযানের অব্যবহিত পূর্বে তাঁর কিছু কঠিন অবস্থান ও মন্তব্য ঐতিহাসিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, তবুও কঠোর রাষ্ট্রীয় সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলনটি সাময়িকভাবে পিষে ফেলা হলেও এটি বিশ্ববাসীর সামনে একদলীয় স্বৈরাচারের নিপীড়ক মুখচ্ছবি চিরতরে উন্মোচন করেছিল।
প্রাক-আধুনিক যুগের আদর্শবাদী তারুণ্য থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের টেক-স্যাভি ‘জেন জি’ প্রজন্ম—প্রতিটি যুগের তারুণ্যের রক্তস্রোত প্রমাণ করেছে যে বন্দুকের নল বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন দিয়ে মানুষের মুক্তির স্পৃহাকে চিরতরে বন্দি করা যায় না। আর এই প্রতিটি রক্তঝরা লড়াইয়ে নারীর সক্রিয়, সমান্তরাল, আপসহীন ও বীরত্বপূর্ণ অংশগ্রহণ পিতৃতান্ত্রিক, বৈষম্যমূলক ও ফ্যাসিবাদী কাঠামোর মূলে চরম আঘাত হেনেছে। বর্তমান ও ভবিষ্যতের জটিল বৈশ্বিক সংকটে তারুণ্যের এই অদম্য বিদ্রোহী সত্তা এবং সাম্য ও মুক্তির চেতনাই মানবসভ্যতার একমাত্র ভরসা ও পথপ্রদর্শক।
.png)

এইতো কিছুদিন আগে কথা। অফিস থেকে বেরিয়ে বিশেষ একটি কাজে শাহবাগের উদ্দেশ্যে রিকশায় উঠেছিলাম। বিকেলের ব্যস্ত ঢাকার চিরচেনা যানজটে রিকশাটি একসময় থেমে গেল। চারপাশে শুধু হর্নের শব্দ, মানুষের কোলাহল আর অসংখ্য গাড়ির সারি। ঠিক সেই মুহূর্তেই কানে ভেসে এলো এক পরিচিত সুর ‘আলো আমার আলো ওগো, আলো ভুবনভরা’…!
৪০ মিনিট আগে
একসময় বইয়ের দোকানে মানুষ যেত বই কিনতে। এখন অনেকেই যান বই কিনতে, পড়তে, আড্ডা দিতে, কিংবা শুধু বইয়ের গন্ধে কিছুটা সময় কাটাতে। ঢাকার বাতিঘর, বুকওয়ার্ম, পাঠক সমাবেশ কিংবা বিভিন্ন রিডিং ক্যাফেতে ঢুকলে দেখা যায়, কেউ এক কোণে বসে নিজের মতো বই পড়ছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে বই নিয়ে তর্ক করছেন, আবার কোথাও
২ ঘণ্টা আগে
ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বয়ান অনেক সময়ই ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে আসে না; আসে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ ও অভিজ্ঞতার গল্প থেকে। চব্বিশের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সেই জনতার গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র ‘জুলাই ডায়েরিজ’।
৩ ঘণ্টা আগে
সংগঠক, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ৮৭তম জন্মদিন আজ। ১৯৩৯ সালের ২৫ জুলাই কলকাতার পার্ক সার্কাসে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
৩ ঘণ্টা আগে