leadT1ad

এক্সপ্লেইনার

নগরে নীরব ঘাতক সিসা, বাজেটে নেই প্রতিকার

স্ট্রিম গ্রাফিক

ফাহিম (ছদ্মনাম) ঢাকার লালবাগের একটি বেসরকারি স্কুলের প্রথম শ্রেণির ছাত্র। তার শিক্ষক ফাহিমের মাকে জানান, সে প্রায়ই ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। পড়াও ঠিকমতো মনে রাখতে পারছে না। আবার, ফাহিমের মা-ও বলেন, বাসায়ও একই পরিস্থিতি। তিনি বলেন, ফাহিমকে নিয়মিতই পড়তে বসান তিনি। তবে তাঁর ছেলে যেকোনো কাজেই বেশিক্ষণ মনোযোগ রাখতে পারছে না, মনে রাখতে পারছে না পড়াও।

ফাহিমের শিক্ষক জানান, ফাহিম একা নয়, ক্লাসের এমনকি স্কুলের অনেক শিশুদের মধ্যেই এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অনেকেই একে স্মার্টফোনের প্রতি আসক্তির ফল বললেও এর পেছনে বড় কারণ হলো লেড দূষণ।

সিসা দূষণ বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের একটি আলোচিত স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষত, সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে আছে শিশুরা। ইউনিসেফ, পিউর আর্থের মতো সংস্থাগুলো বরাবরই এই সংকটের কথা বলে গেলেও, বাজেটের ভেতরে এ সংকটের জন্য আলাদা কোনো দৃশ্যমান বরাদ্দ বা জাতীয় কর্মসূচি খুঁজে পাওয়া কঠিন।

গত ১১ জুন ঘোষণা করা হয়েছে ২০২৬-২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেট। এই বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহন, জ্বালানি, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতগুলো গুরুত্ব পেয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে প্রস্তাবিত বরাদ্দ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জন্য ২ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। কাগজে-কলমে এসব সংখ্যা বড়। তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যে খাতগুলোতে জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলার মতো বিষয় রয়েছে, সেগুলোতে বাজেটের বরাদ্দ কেমন বা সরকার কি আদৌ এসব সংকট মোকাবিলায় কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না?

কেন সিসা দূষণ ভয়ংকর

সিসা এমন একটি ভারী ধাতু, যার কার্যত নিরাপদ মাত্রা নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতি সামান্য পরিমাণ সিসাও শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। এটি মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, রক্ত, কিডনি এবং বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর প্রভাব ফেলে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, সিসা বিষক্রিয়ার অনেক লক্ষণ প্রথমদিকে চোখে পড়ে না। ফলে একটি শিশু হয়তো স্বাভাবিকভাবেই বড় হচ্ছে বলে মনে হলেও তার শেখার ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের (সংক্রামক রোগ ও জিওগ্রাফিক মেডিসিন) অধ্যাপক স্টিফেন লুবি বলেন, ‘এ ধরনের ব্যাপক সিসা সংস্পর্শ ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ৮০ কোটি শিশু রক্তে উচ্চমাত্রার সিসা নিয়ে বসবাস করছে এবং সিসা দূষণের কারণে প্রতি বছর আনুমানিক ৯ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ

প্রায়ই শোনা যায়, শিশুরা ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না, কোনো বিষয় বুঝতেও তাদের অনেক সময় লাগছে। পড়া মনে রাখা বা চিন্তাশক্তিও আগের চেয়ে কম। অভিভাবকেরা এসব ক্ষেত্রে প্রথমেই দোষ দেন স্মার্টফোনের ব্যবহারকে। তবে, স্মার্টফোনের ভিডিও ছাড়াও এই বিষাক্ত সিসা নীরবে আমাদের ক্ষতি করছে। শুধু শিশুরা না, প্রাপ্তবয়স্কদের বেলাও হচ্ছে ক্ষতি।

২০২০ সালে প্রকাশিত ইউনিসেফ, পিউর আর্থের বহুল আলোচিত ‘দ্য টক্সিক ট্রুথ’ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৫৫ লাখ শিশুর রক্তে বিপজ্জনক মাত্রার সিসা থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এই হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে একটি। বাংলাদেশের বর্তমান স্থান চতুর্থ।

নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা পিউর আর্থের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে আইকিউ ক্ষতির দিক থেকে বাংলাদেশের স্থান বিশ্বে অষ্টম।

২০২২ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজের ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় সিসা দূষণের কারণে।

২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত আইসিডিডিআরবি ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই বছরব্যাপী যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার দুই থেকে চার বছর বয়সী ৫০০ শিশুর মধ্যে অন্তত ৯৮ শতাংশের রক্তে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় সিসা বা লেড পাওয়া গেছে।

গবেষণায় বলা হয়, ‘শিশুদের রক্তে সিসার মধ্যম মাত্রা ছিল ৬৭ মাইক্রোগ্রাম প্রতি লিটার। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গবেষণায় অংশ নেওয়া ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) নির্ধারিত ৩৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি লিটারের চেয়ে বেশি ছিল। এছাড়া শনাক্ত করা সিসা-সম্পর্কিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা পাঁচ কিলোমিটারের বেশি দূরে বসবাসকারী শিশুদের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি ছিল।’

এছাড়াও দেখা যায় ঢাকা উত্তরের তুলনায় ঢাকা দক্ষিণের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি। এর একটি কারণ হতে পারে, দেশে সিসা দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব ঢাকা দক্ষিণেই।

পরবর্তী সময়ে ইউনিসেফ আবারও সতর্ক করে জানায়, দেশের ৩ কোটিরও বেশি শিশু সিসা দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে। শুধু শিল্পাঞ্চল বা কারখানার আশপাশের শিশুরাই নয়, নগর এলাকায় বসবাসকারী অসংখ্য শিশুও এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ এটি কোনো নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

নেই কার্যকর পদক্ষেপ

ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ড. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান ঢাকা স্ট্রিমকে বলেন, হাম ও রুবেলা মোকাবিলার মতো জরুরি বিষয়ের কারণে সিসা সংকট আপাতত অগ্রাধিকার তালিকার পেছনে চলে গেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে ঢাকা দক্ষিণের তৎকালীন প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ড. নিশাত পারভীন ঢাকা স্ট্রিমকে বলেছিলেন, এ সমস্যা মোকাবিলায় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

সিসা আসছে কোথা থেকে

বাংলাদেশে সিসা দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বারবার উঠে এসেছে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ শিল্প। বর্তমানে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা এই প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরোনো ব্যাটারি খোলা জায়গায় ভেঙে ফেলা হয়। পরে ব্যাটারির ভেতরের সিসা গলিয়ে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য ধাতু তৈরি করা হয়। এসব কার্যক্রমের সময় বিপুল পরিমাণ সিসার ধুলো, ধোঁয়া ও বর্জ্য পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৫ সালের আইসিডিডিআরবির গবেষণায় ঢাকা শহরের সিসা দূষণের উৎস হিসেবে বাদামতলী, শ্যামবাজার, চকবাজার, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, জিঞ্জিরা–কেরানীগঞ্জ সংলগ্ন এলাকা, সুত্রাপুর, বংশাল, আরমানিটোলাকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সমস্যা হলো, এ ধরনের অনেক কার্যক্রম আবাসিক এলাকার কাছাকাছি ঘটে। ফলে শ্রমিকদের পাশাপাশি আশপাশে বসবাসকারী পরিবার, নারী ও শিশুরাও দূষণের শিকার হয়।

এ ছাড়া রঙ, কিছু ধাতব পণ্য, ই-বর্জ্য এবং অন্যান্য শিল্প উৎস থেকেও সিসা পরিবেশে প্রবেশ করতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ আছে, নেই সিসা পর্যবেক্ষণ

২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু সিসার বিষক্রিয়ার ঝুঁকিতে থাকা কোটি কোটি শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা পরিমাপের জন্য কোনো জাতীয় কর্মসূচি নেই।

বাজেট নথি এবং প্রকাশ্য সরকারি তথ্য ঘেঁটে এমন কোনো জাতীয় উদ্যোগের স্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় না। অর্থাৎ নিয়মিতভাবে দেশের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা পরীক্ষা করা হচ্ছে কি না, তার একটি জাতীয় কাঠামো দৃশ্যমান নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এখানে সবচেয়ে বড় নীতিগত শূন্যতা হচ্ছে, কোনো সমস্যার মাত্রা জানতেই যদি নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ না করা হয়, তাহলে সেই সমস্যার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কতটা সম্ভব?

যদি সিসা দূষণকে জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে স্বাস্থ্য বাজেটের ভেতরে পরিবেশগত স্বাস্থ্য, শিশু স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ বা বিষাক্ত রাসায়নিক নজরদারির মতো কর্মসূচির অধীনে দৃশ্যমান বরাদ্দ থাকা উচিত ছিল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বাজেটে সিসা দূষণ

২০২৬-২৭ অর্থবছরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জন্য ২ হাজার ২৪০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাজেট বক্তৃতায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, বনায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং গাছ লাগানোর নানা উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। তবে এখানেও সিসা দূষণের মতো একটি নির্দিষ্ট এবং প্রমাণিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় কোনো আলাদা কর্মসূচি রাখা হয়নি।

ইউনিসেফ, পিউর আর্থ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বারবার বাংলাদেশে সিসা দূষণকে জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাই পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বাজেটে দূষণ পর্যবেক্ষণ, হটস্পট শনাক্তকরণ, দূষণ মানচিত্র তৈরি এবং দূষিত এলাকা পুনর্বাসনের মতো কর্মসূচির বা এমন কোনো উদ্যোগের উপস্থিতি দেখা যায়নি।

ব্যাটারিচালিত রিকশা

শহরগুলোতে এখন মানুষদের কাছে জনপ্রিয় বাহনের নাম ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। এটি সময় ও টাকা বাঁচায় বলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের প্রতিদিনের যাতাযাতের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা শহরে বর্তমানে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা আনুমানিক ১০ থেকে ১২ লাখ।

ব্যাটারিচালিত রিকশা বর্তমানে সীসা দূষণের সবচেয়ে বড় উৎস। ছবি: সংগৃহীত
ব্যাটারিচালিত রিকশা বর্তমানে সীসা দূষণের সবচেয়ে বড় উৎস। ছবি: সংগৃহীত

ইউনিসেফ, পিউর আর্থ ও স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর এটমোস্ফেয়ারিক পলিউশন স্টাডিজ’ কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে সিসা দূষণ ও ব্যাটারি রিসাইক্লিং নিয়ে কাজ করছে। তাদের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা বর্তমানে সিসা দূষণের সবচেয়ে বড় উৎস। ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর এই ব্যাটারি তৈরি থেকে শুরু করে তা স্থাপন ও ঠিক করা পর্যন্ত—পুরো প্রক্রিয়া সিসার সরাসরি সংস্পর্শে সম্পন্ন হয়। ঢাকার সিসার ব্যাটারির কারখানাগুলোতে দেখা যায়, সেগুলো একদমই খোলা, কোনোটিতেই স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বাঁচতে ‘সেফটি মেজারমেন্ট’ নেই। শিশু, নারী, পুরুষ সবাই যেকোনো জায়গায় বসে কাজ করছে।

বিবিসি বাংলার ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিসা দূষণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য উৎস হলো বাজারে বিক্রি হওয়া হলুদের গুঁড়ো। এতে হলুদ রঙকে আকর্ষণীয় করতে লেড ক্রোমিয়াম মেশানো হয় যা খাবারের মাধ্যমে মানুষের দেহে ছড়িয়ে যায়। বাংলাদেশের নয়টি জেলায় গর্ভবতী মায়েদের রক্তে সিসার পরিমাণ মাত্রার চেয়ে অধিক পরিমাণ পাওয়া যায়। অনুসন্ধানে উঠে আসে হলুদের গুঁড়োর নাম। তবে, সরকার সেসময় কঠোর আইন প্রয়োগ করায় ২০২১ সালের পর হলুদের গুঁড়োর নমুনায় লেড ক্রোমিয়াম পাওয়া যায়নি। তবে বর্তমানে হলুদের গুঁড়োয় লেড ক্রোমিয়াম থাকছে কি না, সে ব্যাপারে সাম্প্রতিক কোনো গবেষণা নেই।

হলুদের গুঁড়োয় ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকার সীসা। ছবি: সংগৃহীত
হলুদের গুঁড়োয় ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকার সীসা। ছবি: সংগৃহীত

শিল্প খাতে নিয়ন্ত্রণ

সিসা দূষণের আলোচনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর সঙ্গে শিল্প নিয়ন্ত্রণ ও লাইসেন্সিংয়ের বিষয় জড়িত। অবৈধ বা নিম্নমানের পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলো দূষণের বড় উৎস। তাই এসব কারখানা শনাক্তে বরাদ্দ অর্থ কত, পরিদর্শক বা নিয়মিত তদারকি হয় কি না বা এসব বন্ধে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হবে কি না—এসব প্রশ্ন চলে আসে। তবে বাজেটে এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না।

দূষিত এলাকা পুনর্বাসনের জন্য জাতীয় কর্মসূচি কোথায়

ইউনিসেফ ও পিউর আর্থের সহযোগিতায় গাজীপুরের কথগড়া এলাকায় পরিচালিত এক প্রকল্পে দেখা গেছে, দূষিত মাটি অপসারণ এবং পরিবেশ পুনর্বাসনের মাধ্যমে শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এ গবেষণা থেকে বোঝা যায়, সিসা দূষণ অপরিবর্তনীয় নয়, যথাযথ বিনিয়োগ ও হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

ইউনিসেফ ও পিউর আর্থের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি একটি এলাকায় এমন ফল পাওয়া যায়, তাহলে দেশের অন্যান্য দূষিত এলাকায় একই ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় পর্যায়ে কোনো তহবিল বা পরিকল্পনা নেওয়া উচিত।

মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন

বাংলাদেশের শিশুদের ওপর সিসা বিষক্রিয়ার এই সংকট সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত জীবনের অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন। অর্থাৎ, যেকোনো নাগরিক জনস্বার্থে রিট করতে পারেন। এনজিও, সাংবাদিক, পরিবেশকর্মী, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকেরাও এটি করতে পারেন।

এর আগে এ ধরনের বিষয়ে আদালতের রায়ের নজিরও রয়েছে। ১৯৯৬ সালের ঐতিহাসিক ড. মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন, পরিবেশগত ক্ষতি সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত জীবনের অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

ওই মামলার পর আদালত সরকার, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং বিএসটিআই-কে ক্ষতিকর বায়ুদূষণ মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।

এছাড়াও, সিসা, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মতো ক্ষতিকর ভারী ধাতু পাওয়ায় ২০১৯ সালের হাকিমপুরী জর্দা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

এর আগে ২০২১ সালে পরিবেশ মন্ত্রণালয় লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির নিরাপদ ব্যবহার, পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্ট্যাচুটরি রেগুলেটরি অর্ডার (এস আর ও) নং ৪৫ জারি করে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত