leadT1ad

এক্সপ্লেইনার

এন্ডলেস স্ক্রলিং: হারিয়ে যাচ্ছে ভাবনার অভ্যাস

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৬, ১৩: ২৬
‘মানুষের মস্তিষ্ক একসঙ্গে অসংখ্য নোটিফিকেশন, সংবাদ, মতামত ও ছোট ছোট ভিডিও গ্রহণ করার জন্য তৈরি হয়নি।’ ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

বর্তমান সময়ের মতো তথ্যের এমন সহজলভ্যতা মানুষের ইতিহাসে আগে কখনো ছিল না। এখন কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই তা আমাদের সামনে চলে আসে। তাই কোনো বিষয় সম্পর্কে জানা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ। আগে কোনো খবর সম্পর্কে জানতে হলে কখন তা টিভিতে দেখাবে বা পরদিনের খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করতে হতো।

তবে এখন ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আমলে শিক্ষামূলকসহ সব ধরনের কনটেন্ট পাওয়া যায় হাতের মুঠোয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কয়েক সেকেন্ডেই নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। তবে তথ্যের এই প্রাচুর্যের যুগেও অনেক মানুষই মনে করছেন, তারা যেকোনো বিষয়ে আগের চেয়ে কম জানেন, তথ্য নিয়ে তারা আগের চেয়ে বেশি অনিশ্চিত। এর কারণে তারা মানসিকভাবেও বেশি চাপ অনুভব করছেন। অতিরিক্ত কনটেন্ট যেন আমাদের গভীরভাবে বোঝার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে, তৈরি করেছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য।

ভ্রম

ভারতের দিব্যা জৈন পডকাস্ট ও সেইফএডুকেটের প্রতিষ্ঠাতা ও সঞ্চালক দিব্যা জৈন মনে করেন, সমস্যাটি তথ্যের অভাব নয়, তথ্য নিয়ে ভাবার অভাব। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি কনটেন্ট গ্রহণ করছি, কিন্তু সেগুলো নিয়ে চিন্তা বা বিশ্লেষণ করার জন্য খুব কম সময় ব্যয় করছি।’

আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায় মানুষ এক ভিডিও থেকে আরেক ভিডিওতে, এক পোস্ট থেকে আরেক পোস্টে, এক নোটিফিকেশন থেকে পরের নোটিফিকেশনে ছুটে চলেছে। ক্রমাগত স্ক্রল করে যাচ্ছে রিল। ফলে আমরা তথ্যের সংস্পর্শে আসছি ঠিকই, কিন্তু তা আত্মস্থ করতে পারছি না।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য হলো, কোনো তথ্য চোখে পড়া আর সেটি থেকে জ্ঞান অর্জন করা এক বিষয় নয়। জ্ঞান তৈরি হয় প্রেক্ষাপট বোঝা, বিশ্লেষণ করা এবং বিভিন্ন ধারণার মধ্যে সংযোগ তৈরি করার মাধ্যমে। কিন্তু কেবল কনটেন্ট দেখে যাওয়ার অভ্যাস আমাদের মনে এমন একটি ভ্রম তৈরি করতে পারে যে আমরা অনেক কিছু জানি, যদিও বাস্তবে আমাদের বোঝাপড়া খুব গভীর নয়।

কনটেন্টের শব্দদূষণ

প্রযুক্তি ও এআই নিঃসন্দেহে তথ্যের প্রবেশাধিকারকে সবার জন্য সহজ করেছে। এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ জানার ও শেখার সুযোগ পাচ্ছে। তবে দিব্যা জৈনের মতে, বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কোন কনটেন্ট শুধু বিনোদন দিচ্ছে আর কোনটি সত্যিই জ্ঞান বাড়াচ্ছে, তা আলাদা করে বুঝতে পারা।

তথ্যের স্রোতে ভাসমান এই যুগে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি বা ‘ক্রিটিক্যাল থিংকিং’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। কোনো তথ্যের উৎস যাচাই করা, প্রশ্ন তোলা এবং প্রেক্ষাপট খোঁজার ক্ষমতাই আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্যকে অপ্রয়োজনীয় শব্দ থেকে আলাদা করতে সাহায্য করে। সঠিক ও ভুল তথ্য আলাদা করাও সহজ হয়।

অতিরিক্ত কনটেন্টের মানসিক চাপ

এই প্রবণতা শুধু আমাদের শেখার ক্ষমতাকেই নয়, আমাদের চিন্তাভাবনা ও আবেগকেও প্রভাবিত করছে।

‘ইমোশোনাল ইন্টেলিজেন্স ও এটিকেট এক্সপার্ট’ টেইলর এলিজাবেথ। তিনি ‘দ্য এলিগেন্স এডভাইসর’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী। তিনি মনে করেন আজকের কনটেন্ট-নির্ভর পৃথিবীতে তথ্যের অভাব নেই, তবে জ্ঞানের অভাব রয়েছে। তাঁর মতে, আমরা যে কনটেন্টগুলো দেখি, তার বেশিরভাগই খণ্ডিত, খুব ছোট আকারে উপস্থাপিত এবং মানুষের অল্প সময়ের জন্য মনোযোগ ধরে রাখতে তৈরি। কিন্তু এগুলো মানুষকে গভীরভাবে ভাবতে উৎসাহ দেয় না।

টেইলর এলিজাবেথ বলেন, ‘মানুষের মস্তিষ্ক একসঙ্গে অসংখ্য নোটিফিকেশন, সংবাদ, মতামত ও ছোট ছোট ভিডিও গ্রহণ করার জন্য তৈরি হয়নি।’

ফলে তথ্যের লাগাতার প্রবাহ আমাদের আরও শিক্ষিত করে তুলবে—এমনটা সবসময় হয় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি মানসিক ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি এবং তথ্যের চাপে বিপর্যস্ত হওয়ার অনুভূতি তৈরি করে।

বেশি স্ক্রিন টাইম মানেই বেশি শেখা নয়

এ কারণেই দেখা যায়, অনেক মানুষ প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইনে সময় কাটালেও সেখান থেকে খুব কম অর্থবহ বিষয় মনে রাখতে পারেন। কারণ সমস্যা তথ্যের পরিমাণে নয়, তথ্য গ্রহণের গতিতে। আমরা দ্রুত কনটেন্ট দেখি, আবার দ্রুতই ভুলে যাই।

কোনো তথ্য নিয়ে চিন্তা, আলোচনা বা বাস্তবে প্রয়োগ না করলে তা সাময়িক তথ্য হিসেবেই থেকে যায়। অন্যদিকে শেখার জন্য প্রয়োজন কৌতূহল, সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং শিরোনাম বা ছোট ভিডিওর বাইরে গিয়ে বিষয়টিকে গভীরভাবে বোঝার আগ্রহ থাকতে হয়। ছোট ছোট কনটেন্ট দেখার অভ্যাস হওয়ার ফলে বড় কনটেন্ট দেখা ও বোঝার ধৈর্য পান না বেশিরভাগ মানুষ।

হারিয়ে যাচ্ছে ভাবনার অভ্যাস

দুই বিশেষজ্ঞই একমত যে সত্যিকার শেখার জন্য এমন একটি বিষয় প্রয়োজন, যা আজকের ডিজিটাল সংস্কৃতিতে ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে—থামা এবং চিন্তা করা।

এলিজাবেথের মতে, সমৃদ্ধ শিক্ষার অভিজ্ঞতা তৈরি হয় যখন মানুষ নিজের ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করে, ভিন্ন মতামত নিয়ে ভাবতে শেখে এবং বিভিন্ন ধারণার মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করে।

গতি ও দক্ষতাকে সবচেয়ে বেশি মূল্য দেওয়া এই সময়ে ধীরে চিন্তা করার ক্ষমতাই হয়তো সবচেয়ে মূল্যবান দক্ষতাগুলোর একটি।

ভবিষ্যৎ তাদেরই, যারা চিন্তা করতে জানে

দিব্যা জৈনের মতে, ভবিষ্যৎ তাদের হাতে থাকবে না যারা সবচেয়ে বেশি কনটেন্ট গ্রহণ করে। সফল হবে তারা, যারা তথ্য থেকে শিক্ষা নিতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে এবং সেই জ্ঞানকে বাস্তবে কাজে লাগাতে পারে।

একসময় তথ্যের প্রবেশাধিকার ছিল বড় সুবিধা। এখন আর সেটি মূল পার্থক্য নয়। আজকের আসল শক্তি হলো প্রজ্ঞা—অর্থাৎ তথ্যের অর্থ বোঝা, তার গুরুত্ব মূল্যায়ন করা এবং তা থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো যখন মানুষের মনোযোগের জন্য প্রতিযোগিতা করছে, তখন আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আরও বেশি কনটেন্ট খুঁজে পাওয়া নয়। কী দেখছি, কীভাবে তা বুঝছি এবং পরে সেটি নিয়ে কী করছি—সেই বিষয়ে সচেতন হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যের বাইরে, প্রজ্ঞার দিকে

শুধু তথ্যের নাগাল পাওয়াই যথেষ্ট নয়। সত্যিকার অর্থে অবগত হতে হলে প্রয়োজন আত্মনিয়ন্ত্রণ, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি এবং আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা। কারণ তথ্য আমাদের কিছু জানাতে পারে, বোঝাপড়া আমাদের বিষয়টি উপলব্ধি করতে শেখায়, আর প্রজ্ঞা সেই উপলব্ধিকে সঠিক সিদ্ধান্তে রূপান্তরিত করে।

নিউজ-১৮ অবলম্বনে লিখেছেন মাহজাবিন নাফিসা

Ad 300x250

সম্পর্কিত