মাহবুবুল আলম তারেক

২০২৫ সালের জুলাইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের চারজন প্রভাবশালী প্রযুক্তি উদ্যোক্তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর রিজার্ভ বাহিনীতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদ দেওয়া হয়। তারা যোগ দেন নতুন একটি ইউনিটে, যার নাম ‘ডিট্যাচমেন্ট ২০১’ বা ‘এক্সিকিউটিভ ইনোভেশন কর্পস’। সামরিক অভিজ্ঞতা না থাকা প্রযুক্তি ব্যবসায়ীদের এমন পদ দেওয়া শুধু আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়; এর মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন শুধু ব্যবসার অংশ নয়, রাষ্ট্রের সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
অনেক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগন সিলিকন ভ্যালির বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করছে। তবে এবার প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের সরাসরি সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করার ঘটনা দেখাচ্ছে—প্রযুক্তি শিল্প এখন কেবল ব্যবসা নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও যুদ্ধনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। প্রযুক্তি খাতের বড় উদ্যোক্তারাও নিজেদেরকে এখন ‘জাতীয় নিরাপত্তার অংশ’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন।
একসময় প্রযুক্তি শিল্পের সঙ্গে যুক্তরা নিজেদের উদারতাবাদী, মুক্তচিন্তা ও যুদ্ধবিরোধী সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে তুলে ধরত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। সরকারি বড় চুক্তি, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, সাইবার যুদ্ধের আশঙ্কা এবং বৈশ্বিক উত্তেজনা প্রযুক্তি খাতকে ধীরে ধীরে সামরিক কাঠামোর দিকে টেনে নিচ্ছে।
গুগল, স্পেসএক্সের মতো বড় প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে নতুন প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তি স্টার্টআপ—অনেকেই এখন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে। সিলিকন ভ্যালির নতুন প্রজন্মের এসব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নিজেদের পুরোনো অস্ত্র কোম্পানির আধুনিক সংস্করণ হিসেবে তুলে ধরছে। আর বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই প্রবণতার মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে নতুন ধরনের ‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ’।
এই প্রবণতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো প্যালান্টির টেকনোলজিস নামের এআই প্রযুক্তি কোম্পানি। পিটার থিয়েল ও অ্যালেক্স কার্পের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান শুরু থেকেই নিজেদের সাধারণ এআই সফটওয়্যার কোম্পানি হিসেবে নয়, বরং ‘পশ্চিমা বিশ্বকে রক্ষা করার প্রযুক্তিগত অবকাঠামো’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ ও নজরদারিমূলক কাজে প্রযুক্তি খাতের যে নৈতিক সংকোচ ছিল, সেটিও ভাঙতে সাহায্য করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে প্যালান্টিরের বাজারমূল্য প্রায় ৩৬০ বিলিয়ন ডলার। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি টাকা পেয়েছিল ইন-কিউ-টেল থেকে, যা সিআইএ-সমর্থিত একটি বিনিয়োগ তহবিল। পরে ধীরে ধীরে প্যালান্টির যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ, হাসপাতাল ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ শুরু করে।
প্যালান্টিরের সবচেয়ে পরিচিত সামরিক প্রকল্পগুলোর একটি হলো ‘প্রজেক্ট মেভেন’। এটি প্রথমে ড্রোনের ভিডিও বিশ্লেষণের সফটওয়্যার হিসেবে শুরু হয়েছিল। শুরুতে গুগলও এতে যুক্ত ছিল। কিন্তু গুগলের কর্মীরা পেন্টাগনের সঙ্গে কাজ করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে প্রতিষ্ঠানটি সরে যায়। এরপর প্যালান্টিরসহ অন্য কোম্পানিগুলো প্রকল্পটির দায়িত্ব নেয়।
পরে মেভেন শুধু ভিডিও বিশ্লেষণ সফটওয়্যার হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি এমন এক এআই-ভিত্তিক যুদ্ধব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে, যা স্যাটেলাইট ছবি, ড্রোন ফুটেজ, গোয়েন্দা তথ্য, যোগাযোগের ডেটা ও সেনাদের অবস্থান—সবকিছু এক জায়গায় এনে বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে দ্রুত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও হামলার পরিকল্পনা করা সহজ হয়।
এখন অ্যানথ্রোপিকের ক্লডের মতো ভাষাভিত্তিক এআই চ্যাটবটও এ ধরনের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য বিশ্লেষণ ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে এআইয়ের ব্যবহার আরও বাড়ছে। প্যালান্টিরের এই ধরনের প্রযুক্তির প্রথম ব্যবহার হয় রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের যুদ্ধ ক্ষেত্রে এবং পরে গাজার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধে।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় দ্রুত হাজারো লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ক্লড ব্যবহার করা হয়েছে। একটি স্কুলে বোমা হামলায় শতাধিক ইরানি শিশু নিহত হওয়ার ঘটনায় এআই ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—মানুষকে ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া। এখন এমন প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে, যেখানে তথ্য বিশ্লেষণ, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, অনুমোদন এবং হামলার অনেক ধাপই যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা কমে গিয়ে মেশিনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আর এটা যুদ্ধগুলোকে আরও বেশি রক্তাক্ত করে তুলতে পারে।
প্যালান্টিরকে ঘিরে এখন শুধু প্রযুক্তি ব্যবসা নয়, এক ধরনের মতাদর্শও তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নেতাদের লেখা বই, বক্তৃতা ও বিভিন্ন বক্তব্যে এমন এক রাজনৈতিক দর্শন দেখা যায়, যেখানে তীব্র জাতীয়তাবাদ, প্রতিপক্ষের প্রতি অবজ্ঞা এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে এক অবিরাম সংঘাতের জায়গা হিসেবে কল্পনা করা হয়। তারা নিজেদেরকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন।
বিশ্লেষকেরা এই চিন্তাধারাকে ‘প্যালান্টিরিয়ানবাদ’ নামে ডাকছেন। এই মতবাদের মূল কথা হলো—বিশ্ব স্বভাবগতভাবেই সহিংস; প্রতিপক্ষ আলোচনায় বিশ্বাস করে না; তাই শান্তি নিশ্চিত করতে হলে শক্তি প্রদর্শন করতে হবে। অ্যালেক্স কার্পের ভাষায়, ‘মানুষ তখনই নিরাপদ বোধ করে, যখন প্রতিপক্ষ ভয় পায়।’
ফরেন পলিসিরি এক বিশ্লেষণে একে ‘ডিটারেন্স’ বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রতিরোধে প্রস্তুতি হিসেবে দেখানো হয়। তবে এটি ঠান্ডা যুদ্ধের সময়কার পারমাণবিক ভারসাম্য বা কূটনৈতিক সমঝোতার মতো নয়। বরং এআই, ড্রোন, সাইবার সক্ষমতা এবং দ্রুত হামলার প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোই এর মূল লক্ষ্য। কার্প এক লেখায় বলেছেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পূর্বশর্ত অনেক সময় বিশ্বাসযোগ্য যুদ্ধ-হুমকি।’
গত বছর কার্প ও নিকোলাস জামিসকা মিলে প্রকাশ করেন ‘দ্য টেকনোলজিত্যাল রিপাবলিক: হার্ড পাওয়ার, সফট বিলিফ অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব দ্য ওয়েস্ট’ বইটি। সেখানে প্রযুক্তিনির্ভর, সামরিকীকৃত এক পশ্চিমা রাষ্ট্রের ধারণা তুলে ধরা হয়, যেখানে দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
প্যালান্টিরের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা শ্যাম শংকরও ‘মবিলাইজ: হাউ টু রিবুট দ্য আমেরিকান ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেস অ্যান্ড স্টপ ওয়ার্ল্ড ওয়ার থ্রি’ নামে একটি বই লিখেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, আমেরিকান পুঁজিবাদ ও সামরিক শক্তি একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে টিকে থাকতে হলে দ্রুত সামরিক উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং এ কাজে সিলিকন ভ্যালিকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
সম্প্রতি প্যালান্টির ২২ দফার একটি ‘ম্যানিফেস্টো’ প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জাতীয় প্রতিরক্ষায় অংশ নেওয়া একটি ‘নৈতিক দায়িত্ব’। একই সঙ্গে জাতীয় সেবা চালু করা, ‘হার্ড পাওয়ার’ বা কঠোর সামরিক শক্তিকে গণতন্ত্র রক্ষার শর্ত হিসেবে দেখা হয়েছে। ম্যানিফেস্টোতে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তির নীতিরও সমালোচনা করা হয়।
এই ঘোষণাপত্র প্রকাশের পর সমালোচকেরা একে ‘টেকনোফ্যাসিজম’ বা প্রযুক্তিফ্যাসিবাদের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। বেলজিয়ান দার্শনিক মার্ক কোয়েকেলবার্গ একে সরাসরি টেকনোফ্যাসিজম বলেছেন।
অ্যালেক্স কার্প একসময় নিজেকে ‘নব্য-মার্কসবাদী’ ও ডেমোক্র্যাট সমর্থক বলতেন। কিন্তু পরে তিনি ধীরে ধীরে ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। এখন তাঁর কাছে জাতীয় নিরাপত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁর বিশ্বাস, প্রযুক্তি খাতের কাজ হওয়া উচিত সেনাবাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে আরও শক্তিশালী করা। কারণ তাঁর মতে, এভাবেই মানুষকে নিরাপদ রাখা সম্ভব।
প্যালান্টিরও সাধারণ সফটওয়্যার কোম্পানির মতো নয়। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের পদবিগুলোও অস্বাভাবিক—যেমন ‘ডিপ্লয়মেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট’, ‘ফরোয়ার্ড-ডিপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ার’ ইত্যাদি। এসব পদবিই দেখায়, প্রতিষ্ঠানটি শুধু সফটওয়্যার তৈরি করছে না; বরং সরাসরি মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা ও সামরিক কাজের সঙ্গে জড়িত।
কার্প নিজেও বেশ ব্যতিক্রমী চরিত্রের মানুষ। তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি আছে জার্মানির গ্যেটে ইউনিভার্সিটি ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে। তিনি সাবেক কমান্ডোদের সঙ্গে স্কিইং করেন, তাইচি চর্চা করেন এবং তাঁর কয়েকজন অস্ট্রীয় সহকারী আছেন, যাদের সঙ্গে তিনি জার্মান ভাষায় কথা বলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মধ্যে একজন সাবেক ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তাও আছেন।
একসময় তিনি বলতেন, বাড়ির পেছনে ১০ লাখ ডলারের বেশি খরচ করবেন না। কিন্তু ২০২০ সালে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের পারিশ্রমিক পাওয়ার পর তাঁর জীবনযাপন বদলে যায়। এখন তাঁর ব্যক্তিগত জেট বিমান আছে, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিলাসবহুল বাড়ি আছে, বিশেষ করে স্কি রিসোর্ট এলাকায়। তাঁর অদ্ভুত আচরণ, হাত-পা নেড়ে কথা বলা ও আত্মপ্রশংসামূলক রসিকতা প্যালান্টির সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। ফ্যাসিবাদী নেতাদের মধ্যেও এই ধরনের ‘আত্মমুগ্ধ’ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।
কার্পের পারিবারিক জীবনও তাঁর রাজনৈতিক মানসিকতায় প্রভাব ফেলেছে। তিনি একজন শ্বেতাঙ্গ ইহুদি বাবা ও কৃষ্ণাঙ্গ মায়ের সন্তান। শৈশবে তিনি স্কুলে নিপীড়নের শিকার হন। ফলে তাঁর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘তুমি যদি বর্ণগতভাবে অস্পষ্ট পরিচয়ের, বামপন্থী, ইহুদি এবং ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত হও—তাহলে সবসময় মনে হবে তুমি বিপদে আছ।’
কার্প আগে বলতেন, ফ্যাসিবাদ তাঁর সবচেয়ে বড় ভয়। কিন্তু পরে তাঁর প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। প্যালান্টির ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে। সীমান্ত নজরদারি, তথ্য বিশ্লেষণ ও সরকারি নজরদারি ব্যবস্থায় তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুটি বড় ঘটনা কার্পের রাজনৈতিক অবস্থান বদলে দেয়—কোভিড-১৯ মহামারি এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলা। মহামারির সময় তিনি টিনজাত খাবার ও গুলি মজুত করেছিলেন। আর ইসরায়েলে হামলার পর তিনি প্যালান্টিরকে জাতীয় প্রতিরক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করেন এবং পশ্চিমা বিশ্বের শত্রুদের বিরুদ্ধে সহিংস শক্তি ব্যবহারের পক্ষে আরও সরব হন।
৭ অক্টোবরের হামলার পর তিনি কর্মীদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইসরায়েলের পক্ষে তার প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়ে কোনো ভিন্নমত সহ্য করা হবে না। পরে প্যালান্টির নিউইয়র্ক টাইমসে পূর্ণ পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন দিয়ে ঘোষণা করে, ‘প্যালান্টির ইসরায়েলের পাশে আছে।’
এখন প্যালান্টিরকে অনেকে ‘পুলিশি রাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত হাতিয়ার’ হিসেবে দেখেন। নিউইয়র্ক শহরে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘শত্রু’ আখ্যা দিয়ে পোস্টারও দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক শ্রমমন্ত্রী রবার্ট রাইখ প্যালান্টিরকে ‘আমেরিকার সবচেয়ে বিপজ্জনক করপোরেশন’ বলেছেন।
তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্যালান্টিরের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলছে ‘প্যালান্টিরিয়ানবাদ’। এই মতাদর্শ প্রযুক্তি শিল্পকে ধীরে ধীরে সামরিক শক্তি, নজরদারি ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করছে। ফলে বড় প্রশ্নটি এখন হলো—প্রযুক্তি কি মানবকল্যাণ, উন্মুক্ত সমাজ ও গণতন্ত্রের হাতিয়ার থাকবে, নাকি তা ধীরে ধীরে যুদ্ধ, ভয় ও নিয়ন্ত্রণের প্রধান অবকাঠামোতে পরিণত হবে? প্যালান্টির এবং তাদের নতুন মতাদর্শ সেই প্রশ্নকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি করে তুলেছে।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের চারজন প্রভাবশালী প্রযুক্তি উদ্যোক্তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর রিজার্ভ বাহিনীতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদ দেওয়া হয়। তারা যোগ দেন নতুন একটি ইউনিটে, যার নাম ‘ডিট্যাচমেন্ট ২০১’ বা ‘এক্সিকিউটিভ ইনোভেশন কর্পস’। সামরিক অভিজ্ঞতা না থাকা প্রযুক্তি ব্যবসায়ীদের এমন পদ দেওয়া শুধু আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়; এর মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এখন শুধু ব্যবসার অংশ নয়, রাষ্ট্রের সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
অনেক বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগন সিলিকন ভ্যালির বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করছে। তবে এবার প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের সরাসরি সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করার ঘটনা দেখাচ্ছে—প্রযুক্তি শিল্প এখন কেবল ব্যবসা নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও যুদ্ধনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। প্রযুক্তি খাতের বড় উদ্যোক্তারাও নিজেদেরকে এখন ‘জাতীয় নিরাপত্তার অংশ’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন।
একসময় প্রযুক্তি শিল্পের সঙ্গে যুক্তরা নিজেদের উদারতাবাদী, মুক্তচিন্তা ও যুদ্ধবিরোধী সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে তুলে ধরত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। সরকারি বড় চুক্তি, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, সাইবার যুদ্ধের আশঙ্কা এবং বৈশ্বিক উত্তেজনা প্রযুক্তি খাতকে ধীরে ধীরে সামরিক কাঠামোর দিকে টেনে নিচ্ছে।
গুগল, স্পেসএক্সের মতো বড় প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে নতুন প্রতিরক্ষা-প্রযুক্তি স্টার্টআপ—অনেকেই এখন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে। সিলিকন ভ্যালির নতুন প্রজন্মের এসব প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নিজেদের পুরোনো অস্ত্র কোম্পানির আধুনিক সংস্করণ হিসেবে তুলে ধরছে। আর বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই প্রবণতার মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে নতুন ধরনের ‘প্রযুক্তি-ফ্যাসিবাদ’।
এই প্রবণতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো প্যালান্টির টেকনোলজিস নামের এআই প্রযুক্তি কোম্পানি। পিটার থিয়েল ও অ্যালেক্স কার্পের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান শুরু থেকেই নিজেদের সাধারণ এআই সফটওয়্যার কোম্পানি হিসেবে নয়, বরং ‘পশ্চিমা বিশ্বকে রক্ষা করার প্রযুক্তিগত অবকাঠামো’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ ও নজরদারিমূলক কাজে প্রযুক্তি খাতের যে নৈতিক সংকোচ ছিল, সেটিও ভাঙতে সাহায্য করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে প্যালান্টিরের বাজারমূল্য প্রায় ৩৬০ বিলিয়ন ডলার। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি টাকা পেয়েছিল ইন-কিউ-টেল থেকে, যা সিআইএ-সমর্থিত একটি বিনিয়োগ তহবিল। পরে ধীরে ধীরে প্যালান্টির যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ, হাসপাতাল ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ শুরু করে।
প্যালান্টিরের সবচেয়ে পরিচিত সামরিক প্রকল্পগুলোর একটি হলো ‘প্রজেক্ট মেভেন’। এটি প্রথমে ড্রোনের ভিডিও বিশ্লেষণের সফটওয়্যার হিসেবে শুরু হয়েছিল। শুরুতে গুগলও এতে যুক্ত ছিল। কিন্তু গুগলের কর্মীরা পেন্টাগনের সঙ্গে কাজ করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে প্রতিষ্ঠানটি সরে যায়। এরপর প্যালান্টিরসহ অন্য কোম্পানিগুলো প্রকল্পটির দায়িত্ব নেয়।
পরে মেভেন শুধু ভিডিও বিশ্লেষণ সফটওয়্যার হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি এমন এক এআই-ভিত্তিক যুদ্ধব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে, যা স্যাটেলাইট ছবি, ড্রোন ফুটেজ, গোয়েন্দা তথ্য, যোগাযোগের ডেটা ও সেনাদের অবস্থান—সবকিছু এক জায়গায় এনে বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে দ্রুত লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও হামলার পরিকল্পনা করা সহজ হয়।
এখন অ্যানথ্রোপিকের ক্লডের মতো ভাষাভিত্তিক এআই চ্যাটবটও এ ধরনের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য বিশ্লেষণ ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে এআইয়ের ব্যবহার আরও বাড়ছে। প্যালান্টিরের এই ধরনের প্রযুক্তির প্রথম ব্যবহার হয় রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের যুদ্ধ ক্ষেত্রে এবং পরে গাজার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধে।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় দ্রুত হাজারো লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে ক্লড ব্যবহার করা হয়েছে। একটি স্কুলে বোমা হামলায় শতাধিক ইরানি শিশু নিহত হওয়ার ঘটনায় এআই ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—মানুষকে ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া। এখন এমন প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে, যেখানে তথ্য বিশ্লেষণ, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, অনুমোদন এবং হামলার অনেক ধাপই যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা কমে গিয়ে মেশিনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আর এটা যুদ্ধগুলোকে আরও বেশি রক্তাক্ত করে তুলতে পারে।
প্যালান্টিরকে ঘিরে এখন শুধু প্রযুক্তি ব্যবসা নয়, এক ধরনের মতাদর্শও তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নেতাদের লেখা বই, বক্তৃতা ও বিভিন্ন বক্তব্যে এমন এক রাজনৈতিক দর্শন দেখা যায়, যেখানে তীব্র জাতীয়তাবাদ, প্রতিপক্ষের প্রতি অবজ্ঞা এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে এক অবিরাম সংঘাতের জায়গা হিসেবে কল্পনা করা হয়। তারা নিজেদেরকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে দেখতে পছন্দ করেন।
বিশ্লেষকেরা এই চিন্তাধারাকে ‘প্যালান্টিরিয়ানবাদ’ নামে ডাকছেন। এই মতবাদের মূল কথা হলো—বিশ্ব স্বভাবগতভাবেই সহিংস; প্রতিপক্ষ আলোচনায় বিশ্বাস করে না; তাই শান্তি নিশ্চিত করতে হলে শক্তি প্রদর্শন করতে হবে। অ্যালেক্স কার্পের ভাষায়, ‘মানুষ তখনই নিরাপদ বোধ করে, যখন প্রতিপক্ষ ভয় পায়।’
ফরেন পলিসিরি এক বিশ্লেষণে একে ‘ডিটারেন্স’ বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রতিরোধে প্রস্তুতি হিসেবে দেখানো হয়। তবে এটি ঠান্ডা যুদ্ধের সময়কার পারমাণবিক ভারসাম্য বা কূটনৈতিক সমঝোতার মতো নয়। বরং এআই, ড্রোন, সাইবার সক্ষমতা এবং দ্রুত হামলার প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোই এর মূল লক্ষ্য। কার্প এক লেখায় বলেছেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পূর্বশর্ত অনেক সময় বিশ্বাসযোগ্য যুদ্ধ-হুমকি।’
গত বছর কার্প ও নিকোলাস জামিসকা মিলে প্রকাশ করেন ‘দ্য টেকনোলজিত্যাল রিপাবলিক: হার্ড পাওয়ার, সফট বিলিফ অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব দ্য ওয়েস্ট’ বইটি। সেখানে প্রযুক্তিনির্ভর, সামরিকীকৃত এক পশ্চিমা রাষ্ট্রের ধারণা তুলে ধরা হয়, যেখানে দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
প্যালান্টিরের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা শ্যাম শংকরও ‘মবিলাইজ: হাউ টু রিবুট দ্য আমেরিকান ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেস অ্যান্ড স্টপ ওয়ার্ল্ড ওয়ার থ্রি’ নামে একটি বই লিখেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, আমেরিকান পুঁজিবাদ ও সামরিক শক্তি একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে টিকে থাকতে হলে দ্রুত সামরিক উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং এ কাজে সিলিকন ভ্যালিকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
সম্প্রতি প্যালান্টির ২২ দফার একটি ‘ম্যানিফেস্টো’ প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জাতীয় প্রতিরক্ষায় অংশ নেওয়া একটি ‘নৈতিক দায়িত্ব’। একই সঙ্গে জাতীয় সেবা চালু করা, ‘হার্ড পাওয়ার’ বা কঠোর সামরিক শক্তিকে গণতন্ত্র রক্ষার শর্ত হিসেবে দেখা হয়েছে। ম্যানিফেস্টোতে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তির নীতিরও সমালোচনা করা হয়।
এই ঘোষণাপত্র প্রকাশের পর সমালোচকেরা একে ‘টেকনোফ্যাসিজম’ বা প্রযুক্তিফ্যাসিবাদের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। বেলজিয়ান দার্শনিক মার্ক কোয়েকেলবার্গ একে সরাসরি টেকনোফ্যাসিজম বলেছেন।
অ্যালেক্স কার্প একসময় নিজেকে ‘নব্য-মার্কসবাদী’ ও ডেমোক্র্যাট সমর্থক বলতেন। কিন্তু পরে তিনি ধীরে ধীরে ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। এখন তাঁর কাছে জাতীয় নিরাপত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁর বিশ্বাস, প্রযুক্তি খাতের কাজ হওয়া উচিত সেনাবাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে আরও শক্তিশালী করা। কারণ তাঁর মতে, এভাবেই মানুষকে নিরাপদ রাখা সম্ভব।
প্যালান্টিরও সাধারণ সফটওয়্যার কোম্পানির মতো নয়। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের পদবিগুলোও অস্বাভাবিক—যেমন ‘ডিপ্লয়মেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট’, ‘ফরোয়ার্ড-ডিপ্লয়েড ইঞ্জিনিয়ার’ ইত্যাদি। এসব পদবিই দেখায়, প্রতিষ্ঠানটি শুধু সফটওয়্যার তৈরি করছে না; বরং সরাসরি মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা ও সামরিক কাজের সঙ্গে জড়িত।
কার্প নিজেও বেশ ব্যতিক্রমী চরিত্রের মানুষ। তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি আছে জার্মানির গ্যেটে ইউনিভার্সিটি ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে। তিনি সাবেক কমান্ডোদের সঙ্গে স্কিইং করেন, তাইচি চর্চা করেন এবং তাঁর কয়েকজন অস্ট্রীয় সহকারী আছেন, যাদের সঙ্গে তিনি জার্মান ভাষায় কথা বলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মধ্যে একজন সাবেক ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তাও আছেন।
একসময় তিনি বলতেন, বাড়ির পেছনে ১০ লাখ ডলারের বেশি খরচ করবেন না। কিন্তু ২০২০ সালে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের পারিশ্রমিক পাওয়ার পর তাঁর জীবনযাপন বদলে যায়। এখন তাঁর ব্যক্তিগত জেট বিমান আছে, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিলাসবহুল বাড়ি আছে, বিশেষ করে স্কি রিসোর্ট এলাকায়। তাঁর অদ্ভুত আচরণ, হাত-পা নেড়ে কথা বলা ও আত্মপ্রশংসামূলক রসিকতা প্যালান্টির সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। ফ্যাসিবাদী নেতাদের মধ্যেও এই ধরনের ‘আত্মমুগ্ধ’ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।
কার্পের পারিবারিক জীবনও তাঁর রাজনৈতিক মানসিকতায় প্রভাব ফেলেছে। তিনি একজন শ্বেতাঙ্গ ইহুদি বাবা ও কৃষ্ণাঙ্গ মায়ের সন্তান। শৈশবে তিনি স্কুলে নিপীড়নের শিকার হন। ফলে তাঁর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘তুমি যদি বর্ণগতভাবে অস্পষ্ট পরিচয়ের, বামপন্থী, ইহুদি এবং ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত হও—তাহলে সবসময় মনে হবে তুমি বিপদে আছ।’
কার্প আগে বলতেন, ফ্যাসিবাদ তাঁর সবচেয়ে বড় ভয়। কিন্তু পরে তাঁর প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছে। প্যালান্টির ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে। সীমান্ত নজরদারি, তথ্য বিশ্লেষণ ও সরকারি নজরদারি ব্যবস্থায় তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুটি বড় ঘটনা কার্পের রাজনৈতিক অবস্থান বদলে দেয়—কোভিড-১৯ মহামারি এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলা। মহামারির সময় তিনি টিনজাত খাবার ও গুলি মজুত করেছিলেন। আর ইসরায়েলে হামলার পর তিনি প্যালান্টিরকে জাতীয় প্রতিরক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করেন এবং পশ্চিমা বিশ্বের শত্রুদের বিরুদ্ধে সহিংস শক্তি ব্যবহারের পক্ষে আরও সরব হন।
৭ অক্টোবরের হামলার পর তিনি কর্মীদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইসরায়েলের পক্ষে তার প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়ে কোনো ভিন্নমত সহ্য করা হবে না। পরে প্যালান্টির নিউইয়র্ক টাইমসে পূর্ণ পৃষ্ঠার বিজ্ঞাপন দিয়ে ঘোষণা করে, ‘প্যালান্টির ইসরায়েলের পাশে আছে।’
এখন প্যালান্টিরকে অনেকে ‘পুলিশি রাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত হাতিয়ার’ হিসেবে দেখেন। নিউইয়র্ক শহরে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘শত্রু’ আখ্যা দিয়ে পোস্টারও দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক শ্রমমন্ত্রী রবার্ট রাইখ প্যালান্টিরকে ‘আমেরিকার সবচেয়ে বিপজ্জনক করপোরেশন’ বলেছেন।
তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্যালান্টিরের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলছে ‘প্যালান্টিরিয়ানবাদ’। এই মতাদর্শ প্রযুক্তি শিল্পকে ধীরে ধীরে সামরিক শক্তি, নজরদারি ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করছে। ফলে বড় প্রশ্নটি এখন হলো—প্রযুক্তি কি মানবকল্যাণ, উন্মুক্ত সমাজ ও গণতন্ত্রের হাতিয়ার থাকবে, নাকি তা ধীরে ধীরে যুদ্ধ, ভয় ও নিয়ন্ত্রণের প্রধান অবকাঠামোতে পরিণত হবে? প্যালান্টির এবং তাদের নতুন মতাদর্শ সেই প্রশ্নকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি করে তুলেছে।

এই অবস্থায় যুদ্ধ অবসানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রস্তাব দিয়েছে। ইরান সেই প্রস্তাবের জবাব দেওয়ার জন্য এখনো সময় নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে।
১৫ ঘণ্টা আগে
‘লাতমিয়া’ শোকগাথাগুলো আশুরার আচারের সঙ্গে যুক্ত। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার যুদ্ধে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন ইবনে আলীর শাহাদাতের স্মরণে এই আচার পালন করা হয়।
২ দিন আগে
নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন কীভাবে ভোটের সমীকরণ বদলে দিতে পারে, তার দারুণ এক উদাহরণ হয়ে থাকবে সদ্য শেষ হওয়া আসামের বিধানসভা নির্বাচন। শুধু সমর্থনের ভিত্তিতে নয়, নতুন এই প্রক্রিয়া বিজেপির পক্ষে ভোট টানতে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে, যা আগে ছিল না।
৪ দিন আগে
একবিংশ শতাব্দীর রণক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে নিঃশব্দে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, কোটি ডলারের ট্যাংক বা অত্যাধুনিক ফাইটার প্লেন এখন কয়েক হাজার ডলারের ড্রোনের কাছে অসহায়।
৪ দিন আগে