এক্সপ্লেইনার

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, আবার কি সংঘাত শুরু হতে যাচ্ছে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ১৩: ২২
এআই জেনারেটেড ছবি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এখন ‘লাইফ সাপোর্টে আছে’, অর্থাৎ কার্যত ধুঁকছে। অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ ও অন্যান্য শীর্ষ নেতারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে তারা ‘শিক্ষা দেবে’।

দুই দেশের পাল্টাপাল্টি এমন বক্তব্যে ইরানে আবার সংঘাত শুরু হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকেরা মূলত কয়েকটি কারণে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা দেখছেন।

প্রথমত, যুদ্ধবিরতির ভিত্তি দুর্বল। গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় প্রথমে দুই সপ্তাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়। পরে ‘আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত’ যুক্তরাষ্ট্র এর মেয়াদ বাড়ানোর কথা বলেছে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা মেনে নিক। অন্যদিকে তেহরানের পাল্টা শর্ত হচ্ছে—নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সামরিক চাপ বন্ধ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নিজেদের ভূমিকার স্বীকৃতি। এই মৌলিক মতপার্থক্যের কারণে যুদ্ধবিরতি এখনো নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

সামরিক প্রস্তুতি এখনো বহাল

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে নৌ ও বিমান শক্তি প্রস্তুত রেখেছে। একই সঙ্গে ইরানও ‘বন্দুক তাক করে রাখার’ কথা বলছে। অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি থাকলেও দুই পক্ষই আবার হামলার আশঙ্কা মাথায় রেখে চলছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌবাহিনী সক্রিয়ভাবে টহল ও জাহাজ এসকর্ট করছে এবং মার্কিন কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ইরানকে সতর্ক করেছেন, যেন তারা মার্কিন সামরিক সম্পদের কাছে না আসে।

অন্যদিকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ও আইআরজিসি বারবার বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন হামলা চালালে তারা কঠোর জবাব দেবে। রয়টার্স জানিয়েছে, ইরান হরমুজকে এখন আরও বড় ‘অপারেশনাল এরিয়া’ হিসেবে দেখছে এবং সেখানে নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ জোরদারের কথা বলছে।

হরমুজ প্রণালি বড় ঝুঁকি

বিশ্বের তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা এখনো কমেনি। ইরান যদি আবার সেখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করে বা মার্কিন নৌবাহিনী চাপ বাড়ায়, তাহলে দ্রুত সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজে ছোট কোনো ঘটনা—যেমন একটি ড্রোন ভূপাতিত হওয়া, ট্যাংকারে হামলা বা মার্কিন জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষ খুব দ্রুত পাল্টাপাল্টি হামলায় রূপ নিতে পারে। কারণ সেখানে উভয় পক্ষের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান কঠোর

ট্রাম্প বারবার বলছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের কাছাকাছি যেতেও দেওয়া হবে না। এমনকি অর্থনৈতিক চাপ বাড়লেও তিনি নীতিতে ছাড় দেবেন না বলে জানিয়েছেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকেরা যখন ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেন যে ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বাড়া তাঁর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে কি না, তখন ট্রাম্প বলেন, ‘একটুও না।’ তিনি আরও বলেন, তাঁর প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়া।

তবে সব বিশ্লেষকই যে যুদ্ধ অনিবার্য বলছেন, তা নয়। কিছু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, উভয় পক্ষই এখনো ‘পূর্ণ যুদ্ধ’ এড়াতে চায়। কারণ—যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি আরেকটি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ নিয়ে চিন্তিত। ইরানও ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা আরও বাড়াতে চায় না বলে মত দিয়েছেন আল জাজিরার বিশ্লেষক ও ইতালির ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ভার্জিনিয়া পিয়েট্রোমার্চি। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল না হলে ইরান আরও অস্থিরতা ও চাপের মুখে পড়তে পারে। ফলে তেহরানের “কঠিন সমঝোতা’’ করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। ‘

অন্যদিকে চীন, উপসাগরীয় দেশ ও কিছু মধ্যস্থতাকারী রাষ্ট্র কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছে।

সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে বিশ্লেষকেরা ‘অত্যন্ত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি’ হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ বড় যুদ্ধ এখনই শুরু না হলেও, একটি ভুল হামলা বা হরমুজে সংঘর্ষ আবার পূর্ণ সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা, সিবিএস নিউজ ও সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত