ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ ও ‘পুশ-ব্যাক’ বির্তক আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সীমান্তে আটক ব্যক্তিদের এক দেশ থেকে আরেক দেশে জোরপূর্বক পাঠানো, নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা, কিংবা অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ—এসব ঘিরে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী, কূটনীতিক এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
বিশেষ করে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ শনাক্ত করার অভিযান জোরদার হওয়ার পর সীমান্তে উত্তেজনা বেড়েছে। এরই মধ্যে কুড়িগ্রাম জেলার সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করে নজরদারি বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
সরকার বলছে, যাচাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশি হিসেবে পাঠানো আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পরিপন্থী। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দেশের বর্ডার সীমান্তে বিজিবি সদস্যদের বিশেষ সর্তক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে ভারত সরকার দাবি করছে, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়া ছাড়া তাদের বিকল্প নেই।
‘পুশ-ইন’ ও ‘পুশ-ব্যাক’ কী
সীমান্ত রাজনীতিতে সাধারণত ‘পুশ-ইন’ বলতে বোঝানো হয় জোরপূর্বক সীমান্তের এক দেশ থেকে অন্য দেশের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া। আর ‘পুশ-ব্যাক’ বলতে বোঝানো হয় এক দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী অন্য দেশের নাগরিক বলে সন্দেহভাজন কাউকে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্ত পার করে ফেরত পাঠানো।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এ ধরনের কার্যক্রম প্রায়ই আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন, মানবাধিকার নীতি এবং দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বাইরে পরিচালিত হয়। এতে প্রকৃত নাগরিক, সীমান্তবাসী কিংবা পাচারের শিকার ব্যক্তিরাও ভুক্তভোগী হতে পারেন।
কেন বাড়ছে বিতর্ক
অধ্যাপক আলী রীয়াজের মতে, কয়েকটি কারণে বিষয়টি এখন বেশি আলোচিত হচ্ছে। সেগুলো হলো:
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
ভারতে নাগরিকত্ব, অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যু নির্বাচনী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) প্রক্রিয়া এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ঘিরে বিতর্কের পর থেকে অবৈধ অভিবাসন প্রশ্নটি আরও রাজনৈতিক রূপ পায়। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, বাংলাদেশ থেকে দীর্ঘদিন ধরে এই অনুপ্রবেশ হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ সরকার বারবার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এ বিষয়ে গত ২ জানুয়ারি বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাসে প্রায় দুই হাজার অবৈধ বিদেশিকে সীমান্ত দিয়ে পুশ ব্যাক করানো হয়েছে।
সীমান্তের ভৌগোলিক বাস্তবতা
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা বিশ্বের অন্যতম জটিল স্থলসীমান্ত। নদী, পাহাড়, বনাঞ্চল ও জনবসতিপূর্ণ এলাকা দিয়ে গঠিত এই সীমান্ত পুরোপুরি নজরদারির আওতায় রাখা কঠিন।
অনেক জায়গায় একই পরিবারের সদস্যরা দুই দেশে বসবাস করেন। ফলে বৈধ ও অবৈধ চলাচল আলাদা করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এ বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে মানবপাচার, চোরাচালান ও অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটে।
গত বছর ডেইলি স্টার বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ৯ মে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার পশ্চিম সুন্দরবনের মান্দারবাড়িয়া চরে ৭৮ জনকে ফেলে যায় বিএসএফ। এদের মধ্যে ৭৫ জন বাংলাদেশি ও তিনজন ভারতীয় নাগরিক। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, তাদের গুজরাট থেকে উড়োজাহাজে-লঞ্চে করে চোখ বেঁধে আনা হয়েছে, অনেকে অসুস্থ এবং কারও কারও শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন আছে।
সেই তথ্যের সত্যতা মেলে, ৭ মে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে পুশ ইন করানোর পর ১২৩ জনকে আটক করে বিজিবি। তাদের ভেতর খাগড়াছড়ির মাটিরাঙা, শান্তিপুর ও পানছড়ি সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশকারী ব্যক্তিরাও জানান, তাদের গুজরাট থেকে বিমানে করে প্রথমে ত্রিপুরায় নিয়ে আসেন বিএসএফ সদস্যরা। তারপর এক ঘণ্টা হাঁটিয়ে সীমান্ত দিয়ে এ পারে জোর করে পাঠানো হয়। এই অনুপ্রবেশকারীদের ভেতর বাংলা ভাষাভাষী ছাড়াও রোহিঙ্গা ও গুজরাটি ভাষায় কথা বলা মানুষও ছিল বলে জানায় স্থানীয় প্রশাসন।
নিরাপত্তা ও জনমিতির প্রশ্ন
বিজেপি নেতাদের মতে, অবৈধ অভিবাসন সীমান্তবর্তী অঞ্চলের জনমিতিক ভারসাম্য ও নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে অধ্যাপক আলী রীয়াজের মতে, এই ইস্যুকে অনেক সময় রাজনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত করা হয়।
তাঁর মতে, অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলে যাওয়ায় এখন আর আগের মতো ব্যাপক হারে বাংলাদেশি শ্রমিক ভারতে যাওয়ার প্রবণতা নেই। বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির কারণে অভিবাসনের চিত্রও বদলেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অভিবাসন নিয়ে গত বছর রিসার্চ গেটোর একটি গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে ভারতের দিকে শ্রমভিত্তিক অভিবাসনের ধরণ বদলেছে। এখন অভিবাসনের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য দেশে যাচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নগরভিত্তিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধিও এতে ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ কী বলছে
বাংলাদেশের অবস্থান বরাবরই স্পষ্ট। অন্তর্বতী সরকারের আমলে দায়িত্বপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন সীমান্তে পুশ-ইন পুশ-ব্যাক ইস্যুতে বলেন—যাচাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশি হিসেবে গ্রহণ করা হবে না।
তিনি আরও বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক হন, তাহলে বিদ্যমান কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করে ফেরত পাঠানো যেতে পারে। কিন্তু সীমান্তে রাতের অন্ধকারে কিংবা আনুষ্ঠানিক নথি ছাড়া কাউকে বলপ্রয়োগ করে পাঠানো গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিকবার বলেছে, সীমান্তে এমন আচরণ দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ব্যাপারে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে সীমান্তে গুলি, নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনাও বাংলাদেশ উদ্বেগের সঙ্গে তুলে ধরে। ২০১১ সালে ফেলানি হত্যা তার একটি উদাহরণ। এরকম বহু অলিখিত সীমান্ত হত্যা প্রতিদিন ঘটছে। যার কোন সুষ্ঠু বিচার দেশের মানুষ পাচ্ছে না।
ভারতের ভাবনা কী
ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এবং দেশটির সরকারি মহল বলছে, সীমান্ত অপরাধ ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো তাদের দায়িত্ব। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দাবি, বহু মানুষ ভুয়া পরিচয়ে ভারতে অবস্থান করছেন এবং তাদের শনাক্ত করা হচ্ছে।
তবে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছে, প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠন ও স্থানীয় সূত্রগুলো মাঝে মাঝে অভিযোগ তোলে যে বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হয় না।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, গত ১০ বছরে প্রায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এর হাতে অন্তত ৩০৫ জন বাংলাদেশি নিহত ও ২৮২ জন আহত হয়েছেন। শুধু ২০২৪ সালেই নিহত হন ২৮ জন।
তাদের মতে, ‘পুশ-ব্যাক’ নীতির সবচেয়ে বড় শিকার হন দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ। অনেক সময় আটক ব্যক্তিদের কাছে বৈধ কাগজপত্র না থাকলেও তারা প্রকৃতপক্ষে সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা হতে পারেন।
কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে, মানবপাচারের শিকার নারী ও শিশুরাও এ ধরনের ঘটনার মধ্যে পড়ে যান। আবার কেউ কেউ বছরের পর বছর ভারতে কাজ করার পর হঠাৎ ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত হন।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নির্ধারণ একটি আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। সেটিকে সীমান্তে তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করা ঝুঁকিপূর্ণ।
সীমান্ত-হত্যা
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ‘পুশ-ব্যাক’ বিতর্ক উঠলেই সীমান্ত-হত্যার বিষয়টিও সামনে আসে। বহু বছর ধরে সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে অস্বস্তির কারণ।
নিউ এজ পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর সীমান্তে বিএসএফ এর হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। যা পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ হত্যাকাণ্ড।
এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি-মে মাস পর্যন্ত প্রায় ১৫ জনের মতো হত্যার ঘটনা ঘটেছে। যা দেশের শীর্ষস্হানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
ভারত দাবি করে, অধিকাংশ ঘটনা ঘটে চোরাচালান বা অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে গিয়ে। তবে বাংলাদেশে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির পরিপন্থী।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় আস্থার সংকট তৈরি হলে ‘পুশ-ব্যাক’ বিতর্ক আরও তীব্র হয়।
কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক গত এক দশকে অর্থনীতি, বিদ্যুৎ, সংযোগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখেছে। কিন্তু সীমান্ত ইস্যু এখনও সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও বিশ্লেষক ইমতিয়াজ আহমেদ তাঁর ‘দ্য প্লাইট অব এনভায়রনমেন্টাল রিফিউজিস: রিইনভেনটিং বাংলাদেশ সিকিউরিটি’ শীর্ষক আর্টিকেলে বলেছেন, সীমান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বাড়লে জনমনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ঘটনার ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দুই দেশের জনগণের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়।
ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন নাহলে এ ধরনের বিতর্ক চলতেই থাকবে।
সমাধান কী
এই সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যেমন: নাগরিকত্ব যাচাইয়ে যৌথ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া জোরদার করা, সীমান্তে যৌথ টহল ও তথ্য বিনিময় বাড়ানো, মানবপাচার ও চোরাচালান প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে সহযোগিতা বৃদ্ধি, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জন্য মানবাধিকার ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও সীমান্তবাসীর জন্য বৈধ বাণিজ্য ও চলাচলের সুযোগ বাড়ানো।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বাস্তবতা হলো দুই দেশ একে অপরের কৌশলগত প্রতিবেশী। তাই সীমান্তকে শুধু নিরাপত্তা নয়, মানবিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখতে হবে।
সীমান্তে ‘পুশ-ইন’ বা ‘পুশ-ব্যাক’ হয়তো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই তৎপরতা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা নষ্ট করে দেয়। আর সেই আস্থাই দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সবচেয়ে বড় ভিত্তি।