গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছে, তাদের অবস্থান আগের মতোই স্পষ্ট। তারা চায় বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষা করা হোক। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেয় না। তাদের মূল আগ্রহ বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। তবে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
মাহবুবুল আলম তারেক

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। শেখ হাসিনার আমলকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ‘সোনালি যুগ’ বলা হতো। তখন ভারতপন্থী আওয়ামী লীগ সরকারের কারণে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা দৃঢ় ছিল।
কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব তুঙ্গে উঠে। ফলে দুদেশের সম্পর্কে দ্রুত অবনতি ঘটে। সর্বশেষ জুলাই অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা জনপ্রিয় তরুণ নেতা ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর তা একেবারে তলানিত নেমে যায়।
তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় সীমিত আশাবাদ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গত বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা এই আশার কারণ। বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি।
এই প্রেক্ষাপটে গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছে, তাদের অবস্থান আগের মতোই স্পষ্ট। তারা চায় বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষা করা হোক।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেয় না। তাদের মূল আগ্রহ বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। তবে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বয়ানের যুদ্ধ
এখন ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক সহযোগিতার জায়গা থেকে কথার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। দুই দেশ এখন একে অপরের বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন বয়ান তুলে ধরছে। এতে শেখ হাসিনা-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
গত শুক্রবারের (২৬ ডিসেম্বর) ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নেয়। তারা জানায়, বাংলাদেশে হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধদের ওপর সহিংসতা চলছে। ভারত একে ‘অবিরাম শত্রুতা’ বলে উল্লেখ করে। তাদের দাবি, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সংগঠিতভাবে উগ্রপন্থীরা হামলা চালাচ্ছে।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি দুই হিন্দু যুবকের নির্মম হত্যাকাণ্ড ভারতের এই অবস্থানকে আরও কঠোর করে তোলে। ভারত এসব হত্যাকে বর্বর আখ্যা দিয়ে দোষীদের শাস্তির দাবি জানায়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার অভিযোগ করে, ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং ভারত থেকেই সরকারবিরোধী তৎপরতা চলছে। ভারত এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে এবং এগুলোকে ‘ভুল ও বিভ্রান্তিকর’ বলে মন্তব্য করে।
ভারত পাল্টা অভিযোগ করে যে বাংলাদেশ সরকার সঠিক তদন্ত করছে না। বরং নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে। এই টানাপোড়েনের ফলে দুই দেশ কনস্যুলার সেবা স্থগিত করে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ভারত চট্টগ্রামে ভিসা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। জবাবে বাংলাদেশ আগরতলায় কনস্যুলার সেবা বন্ধ করে।
ভূরাজনীতিতে মানবাধিকার
বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এখন শুধু মানবাধিকার ইস্যু নয়, বরং ভূরাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। এটি ভারতের বাংলাদেশ নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যদিও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগকে ‘ভারতের মিডিয়ার অতিরঞ্জিত প্রচারণা’ বলে নাকচ করে আসছে।
বাংলাদেশ সরকার বলছে, এসব সহিংসতা রাজনৈতিক। মূলত আওয়ামী লীগ সমর্থক হিন্দুদের হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। কিন্তু ভারত এই যুক্তি মানছে না। ভারতের মতে, হিন্দু পরিচয়ের কারণেই মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। ভারতের দাবি, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর প্রায় তিন হাজার সহিংস ঘটনার তথ্য তাদের কাছে রয়েছে।
ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ইসলামপন্থী উগ্রবাদ ও ভারতবিরোধী মনোভাব একসঙ্গে বেড়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু আচরণ উগ্রপন্থীদের উৎসাহ দিচ্ছে বলেও ভারত মনে করছে।
এই সহিংসতার প্রভাব ভারতের ভেতরেও পড়ছে। দিল্লি ও কলকাতায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে প্রতিবাদ হয়েছে। এই বাস্তবতায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত শুক্রবারের ব্রিফিংয়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানায়।
কৌশলগত উদ্বেগ
বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান বদলে যাওয়া ভারতকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। শেখ হাসিনার আমলের ভারতের প্রতি নতজানু নীতির বদলে বাংলাদেশ এখন ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর পথে হাঁটছে।
এই পরিবর্তনের বড় উদাহরণ হলো গত নভেম্বরে পাকিস্তান নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের চট্টগ্রাম সফর। ৫৪ বছর পর এটি ছিল পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজের প্রথম বাংলাদেশ সফর। ভারত একে সাধারণ সফর হিসেবে দেখছে না। তারা মনে করছে, এর মাধ্যমে কৌশলগত বার্তা দেওয়া হয়েছে।
এই সফরে পাকিস্তান ও চীনের যৌথ সামরিক সম্পর্কের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। একই সময়ে পাকিস্তানের নৌবাহিনী প্রধান ঢাকায় উপস্থিত ছিলেন। এতে ভবিষ্যতে তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভারত আশঙ্কা করছে, এতে বঙ্গোপসাগরে তাদের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
একই সঙ্গে শিলিগুড়ি করিডর নিয়েও ভারতের উদ্বেগ বেড়েছে। এটি ভারতের মূল ভূখণ্ড ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একমাত্র স্থলসংযোগ। আগে বাংলাদেশ এই অঞ্চলে ভারতবিরোধী তৎপরতা ঠেকাত। এখন সেই নিশ্চয়তা আর নেই।
কিছু বাংলাদেশি রাজনৈতিক নেতার উসকানিমূলক বক্তব্য এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। এসব বক্তব্যে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ভারত মনে করছে, বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকার এসব বক্তব্যে কার্যকর বাধা দিচ্ছে না।
২০২৬-এর নির্বাচন
ভারত বাংলাদেশের ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। নয়াদিল্লির দৃষ্টিতে, এই নির্বাচন নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ভারতের অংশীদার থাকবে, নাকি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হবে। ভারতের অবস্থান হলো—নির্বাচন হতে হবে স্বাধীন, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। এখানে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বলতে আওয়ামী লীগকে বাদ না দেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ভারতের আশঙ্কা, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হলে সংসদে বিএনপি ও জামায়াতের প্রাধান্য বাড়বে এবং ভারতবিরোধী মনোভাব প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। তাই ভারত বারবার ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভু্ক্তিমূলক’ নির্বাচনের কথা বলছে—যার মূল অর্থ আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। দিল্লির মতে, চলমান সংস্কার কার্যক্রমও মূলত ভোটের আগে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল করার কৌশল।
ভারত বাংলাদেশের ভেতরে চলমান ভারতবিরোধী প্রচারণাকে ‘ভিত্তিহীন বয়ান’ হিসেবে দেখে। দিল্লির অবস্থান হলো, এসব প্রচারণা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ ভারত বরাবরই বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতার ইতিবাচক মনোভাব বজায় রেখেছে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ভারতের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হলেও ভারত এখনো এতে সম্মতি দেয়নি। দিল্লির বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি আইনি জটিলতার সঙ্গে যুক্ত এবং ‘যেখানে ছিল, সেখানেই আছে।’
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে বর্তমান টানাপোড়েন কোনো সাময়িক সংকট নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত ও গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান মনে করেন, দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান সংকটের মূল কারণ ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ভারত এখনো পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। তাঁর মতে, এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে সামনে এগোনো সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে সুস্থ ও কার্যকর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে এই পরিবর্তনকে স্বীকার করা এবং তা মেনে নেওয়া জরুরি।
আন্তর্জাতিক সংকট বিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) গত ২৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছে, নতুন নির্বাচন দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এতে ভারতকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় পরিসর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশকেও ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়ান স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের পরিচালক সি. রাজা মোহন মনে করেন, আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভরশীল ভারতের কৌশল, যা ‘হাসিনা ডকট্রিন’ নামে পরিচিত, তা ভেঙে পড়েছে এবং আর পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব নয়। ভারতের উচিত শেখ হাসিনার পতনকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা মেনে নিয়ে নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে কাজ করা।
দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অভিনাশ পালিওয়াল এই সংকটকে ভারতের ‘নিয়ার ইস্ট’ অঞ্চলের নিরাপত্তা ঝুঁকির অংশ হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা সীমান্তছাড়ানো অপরাধ ও বিদ্রোহকে উসকে দিতে পারে। তিনি মনে করেন, বিএনপির ভেতরে বাস্তববাদী অংশ রয়েছে এবং ভারত আপাতত নির্বাচন পরিস্থিতি পরিষ্কার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছে, তবে নির্বাচন প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হলে বাংলাদেশ গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়তে পারে।
জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের বাংলাদেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্ত বর্তমান সম্পর্ককে ‘স্লিপ মোড’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, ভারত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বড় কোনো পদক্ষেপ নেবে না। তবে বাণিজ্য ও যোগাযোগের বাস্তব প্রয়োজনে শেষ পর্যন্ত দুই দেশকেই সম্পর্ক নতুনভাবে গড়তে হবে।
ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা শিক্রি দিল্লিকে সতর্ক করে বলেছেন, সম্পর্ক আরও দুর্বল হলে জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব বাড়তে পারে। এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি অন এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স এই পরিস্থিতিকে ১৯৭১ সালের পর ভারতের জন্য ‘সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। কমিটির মতে, নীতিগত পুনর্গঠন ছাড়া এই পরিস্থিতিতে ভারতের প্রভাব কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশের বিশ্লেষকরাও বলছেন, অতিরিক্ত ভারতবিরোধী বক্তব্য দেশকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনটি মৌলিক এবং উভয় দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনে নতুন করে সমন্বয় ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
ইউনূস সরকারও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। এর মধ্যে ভারত থেকে চাল আমদানির উদ্যোগও রয়েছে, যা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতি বর্তমান নীতিকে বলা যায়— ‘কৌশলগত ধৈর্য’ এবং ‘চাপ সৃষ্টি’র মিশ্রণ। ভারত বুঝে গেছে, আগের সোনালি সময় আর ফিরবে না। তাই তারা দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই কৌশলের অংশ হিসেবে ভারত সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করছে এবং বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তান-চীন অক্ষের তৎপরতার ওপর নজরে রাখছে। পাশাপাশি বাণিজ্য, জ্বালানি ও ভিসা নীতির মতো অর্থনৈতিক হাতিয়ার ব্যবহার করে ভারতবিরোধী অবস্থানের মূল্য স্মরণ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু অধিকার ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক চাপ তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে।
সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ভর করছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ওপর। ইতিবাচক পরিস্থিতিতে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হলে বাস্তববাদী জোট সরকার গঠিত হতে পারে, যা অর্থনৈতিক সংকট এড়াতে ভারতসহ আঞ্চলিক সহযোগিতা পুনরুদ্ধারে আগ্রহী হবে। বিপরীতে, সহিংসতা বা রাজনৈতিক বর্জনের পথে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—যার প্রভাব শুধু বাংলাদেশ বা ভারত নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেই পড়বে।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। শেখ হাসিনার আমলকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ‘সোনালি যুগ’ বলা হতো। তখন ভারতপন্থী আওয়ামী লীগ সরকারের কারণে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা দৃঢ় ছিল।
কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব তুঙ্গে উঠে। ফলে দুদেশের সম্পর্কে দ্রুত অবনতি ঘটে। সর্বশেষ জুলাই অভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা জনপ্রিয় তরুণ নেতা ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর তা একেবারে তলানিত নেমে যায়।
তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় সীমিত আশাবাদ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গত বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা এই আশার কারণ। বাংলাদেশের আগামী জাতীয় নির্বাচন হবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি।
এই প্রেক্ষাপটে গত শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছে, তাদের অবস্থান আগের মতোই স্পষ্ট। তারা চায় বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকুক। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষা করা হোক।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেয় না। তাদের মূল আগ্রহ বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। তবে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বয়ানের যুদ্ধ
এখন ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক সহযোগিতার জায়গা থেকে কথার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। দুই দেশ এখন একে অপরের বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন বয়ান তুলে ধরছে। এতে শেখ হাসিনা-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
গত শুক্রবারের (২৬ ডিসেম্বর) ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নেয়। তারা জানায়, বাংলাদেশে হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধদের ওপর সহিংসতা চলছে। ভারত একে ‘অবিরাম শত্রুতা’ বলে উল্লেখ করে। তাদের দাবি, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সংগঠিতভাবে উগ্রপন্থীরা হামলা চালাচ্ছে।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি দুই হিন্দু যুবকের নির্মম হত্যাকাণ্ড ভারতের এই অবস্থানকে আরও কঠোর করে তোলে। ভারত এসব হত্যাকে বর্বর আখ্যা দিয়ে দোষীদের শাস্তির দাবি জানায়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার অভিযোগ করে, ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং ভারত থেকেই সরকারবিরোধী তৎপরতা চলছে। ভারত এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে এবং এগুলোকে ‘ভুল ও বিভ্রান্তিকর’ বলে মন্তব্য করে।
ভারত পাল্টা অভিযোগ করে যে বাংলাদেশ সরকার সঠিক তদন্ত করছে না। বরং নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে। এই টানাপোড়েনের ফলে দুই দেশ কনস্যুলার সেবা স্থগিত করে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ভারত চট্টগ্রামে ভিসা কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। জবাবে বাংলাদেশ আগরতলায় কনস্যুলার সেবা বন্ধ করে।
ভূরাজনীতিতে মানবাধিকার
বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এখন শুধু মানবাধিকার ইস্যু নয়, বরং ভূরাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। এটি ভারতের বাংলাদেশ নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যদিও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগকে ‘ভারতের মিডিয়ার অতিরঞ্জিত প্রচারণা’ বলে নাকচ করে আসছে।
বাংলাদেশ সরকার বলছে, এসব সহিংসতা রাজনৈতিক। মূলত আওয়ামী লীগ সমর্থক হিন্দুদের হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। কিন্তু ভারত এই যুক্তি মানছে না। ভারতের মতে, হিন্দু পরিচয়ের কারণেই মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। ভারতের দাবি, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর প্রায় তিন হাজার সহিংস ঘটনার তথ্য তাদের কাছে রয়েছে।
ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ইসলামপন্থী উগ্রবাদ ও ভারতবিরোধী মনোভাব একসঙ্গে বেড়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু আচরণ উগ্রপন্থীদের উৎসাহ দিচ্ছে বলেও ভারত মনে করছে।
এই সহিংসতার প্রভাব ভারতের ভেতরেও পড়ছে। দিল্লি ও কলকাতায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে প্রতিবাদ হয়েছে। এই বাস্তবতায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত শুক্রবারের ব্রিফিংয়ে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানায়।
কৌশলগত উদ্বেগ
বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান বদলে যাওয়া ভারতকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। শেখ হাসিনার আমলের ভারতের প্রতি নতজানু নীতির বদলে বাংলাদেশ এখন ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর পথে হাঁটছে।
এই পরিবর্তনের বড় উদাহরণ হলো গত নভেম্বরে পাকিস্তান নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের চট্টগ্রাম সফর। ৫৪ বছর পর এটি ছিল পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজের প্রথম বাংলাদেশ সফর। ভারত একে সাধারণ সফর হিসেবে দেখছে না। তারা মনে করছে, এর মাধ্যমে কৌশলগত বার্তা দেওয়া হয়েছে।
এই সফরে পাকিস্তান ও চীনের যৌথ সামরিক সম্পর্কের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। একই সময়ে পাকিস্তানের নৌবাহিনী প্রধান ঢাকায় উপস্থিত ছিলেন। এতে ভবিষ্যতে তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভারত আশঙ্কা করছে, এতে বঙ্গোপসাগরে তাদের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
একই সঙ্গে শিলিগুড়ি করিডর নিয়েও ভারতের উদ্বেগ বেড়েছে। এটি ভারতের মূল ভূখণ্ড ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একমাত্র স্থলসংযোগ। আগে বাংলাদেশ এই অঞ্চলে ভারতবিরোধী তৎপরতা ঠেকাত। এখন সেই নিশ্চয়তা আর নেই।
কিছু বাংলাদেশি রাজনৈতিক নেতার উসকানিমূলক বক্তব্য এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। এসব বক্তব্যে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ভারত মনে করছে, বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকার এসব বক্তব্যে কার্যকর বাধা দিচ্ছে না।
২০২৬-এর নির্বাচন
ভারত বাংলাদেশের ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। নয়াদিল্লির দৃষ্টিতে, এই নির্বাচন নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ভারতের অংশীদার থাকবে, নাকি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হবে। ভারতের অবস্থান হলো—নির্বাচন হতে হবে স্বাধীন, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। এখানে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বলতে আওয়ামী লীগকে বাদ না দেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ভারতের আশঙ্কা, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হলে সংসদে বিএনপি ও জামায়াতের প্রাধান্য বাড়বে এবং ভারতবিরোধী মনোভাব প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। তাই ভারত বারবার ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভু্ক্তিমূলক’ নির্বাচনের কথা বলছে—যার মূল অর্থ আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। দিল্লির মতে, চলমান সংস্কার কার্যক্রমও মূলত ভোটের আগে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল করার কৌশল।
ভারত বাংলাদেশের ভেতরে চলমান ভারতবিরোধী প্রচারণাকে ‘ভিত্তিহীন বয়ান’ হিসেবে দেখে। দিল্লির অবস্থান হলো, এসব প্রচারণা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ ভারত বরাবরই বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে সহযোগিতার ইতিবাচক মনোভাব বজায় রেখেছে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ভারতের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হলেও ভারত এখনো এতে সম্মতি দেয়নি। দিল্লির বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি আইনি জটিলতার সঙ্গে যুক্ত এবং ‘যেখানে ছিল, সেখানেই আছে।’
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে বর্তমান টানাপোড়েন কোনো সাময়িক সংকট নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত ও গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান মনে করেন, দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান সংকটের মূল কারণ ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ভারত এখনো পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। তাঁর মতে, এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে সামনে এগোনো সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে সুস্থ ও কার্যকর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে এই পরিবর্তনকে স্বীকার করা এবং তা মেনে নেওয়া জরুরি।
আন্তর্জাতিক সংকট বিষয়ক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) গত ২৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছে, নতুন নির্বাচন দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। এতে ভারতকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় পরিসর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশকেও ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়ান স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের পরিচালক সি. রাজা মোহন মনে করেন, আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভরশীল ভারতের কৌশল, যা ‘হাসিনা ডকট্রিন’ নামে পরিচিত, তা ভেঙে পড়েছে এবং আর পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব নয়। ভারতের উচিত শেখ হাসিনার পতনকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা মেনে নিয়ে নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে কাজ করা।
দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অভিনাশ পালিওয়াল এই সংকটকে ভারতের ‘নিয়ার ইস্ট’ অঞ্চলের নিরাপত্তা ঝুঁকির অংশ হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা সীমান্তছাড়ানো অপরাধ ও বিদ্রোহকে উসকে দিতে পারে। তিনি মনে করেন, বিএনপির ভেতরে বাস্তববাদী অংশ রয়েছে এবং ভারত আপাতত নির্বাচন পরিস্থিতি পরিষ্কার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছে, তবে নির্বাচন প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হলে বাংলাদেশ গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়তে পারে।
জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের বাংলাদেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্ত বর্তমান সম্পর্ককে ‘স্লিপ মোড’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, ভারত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে বড় কোনো পদক্ষেপ নেবে না। তবে বাণিজ্য ও যোগাযোগের বাস্তব প্রয়োজনে শেষ পর্যন্ত দুই দেশকেই সম্পর্ক নতুনভাবে গড়তে হবে।
ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা শিক্রি দিল্লিকে সতর্ক করে বলেছেন, সম্পর্ক আরও দুর্বল হলে জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব বাড়তে পারে। এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি অন এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স এই পরিস্থিতিকে ১৯৭১ সালের পর ভারতের জন্য ‘সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। কমিটির মতে, নীতিগত পুনর্গঠন ছাড়া এই পরিস্থিতিতে ভারতের প্রভাব কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বাংলাদেশের বিশ্লেষকরাও বলছেন, অতিরিক্ত ভারতবিরোধী বক্তব্য দেশকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনটি মৌলিক এবং উভয় দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনে নতুন করে সমন্বয় ও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
ইউনূস সরকারও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। এর মধ্যে ভারত থেকে চাল আমদানির উদ্যোগও রয়েছে, যা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতি বর্তমান নীতিকে বলা যায়— ‘কৌশলগত ধৈর্য’ এবং ‘চাপ সৃষ্টি’র মিশ্রণ। ভারত বুঝে গেছে, আগের সোনালি সময় আর ফিরবে না। তাই তারা দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই কৌশলের অংশ হিসেবে ভারত সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করছে এবং বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তান-চীন অক্ষের তৎপরতার ওপর নজরে রাখছে। পাশাপাশি বাণিজ্য, জ্বালানি ও ভিসা নীতির মতো অর্থনৈতিক হাতিয়ার ব্যবহার করে ভারতবিরোধী অবস্থানের মূল্য স্মরণ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু অধিকার ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক চাপ তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে।
সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ভর করছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ওপর। ইতিবাচক পরিস্থিতিতে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হলে বাস্তববাদী জোট সরকার গঠিত হতে পারে, যা অর্থনৈতিক সংকট এড়াতে ভারতসহ আঞ্চলিক সহযোগিতা পুনরুদ্ধারে আগ্রহী হবে। বিপরীতে, সহিংসতা বা রাজনৈতিক বর্জনের পথে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—যার প্রভাব শুধু বাংলাদেশ বা ভারত নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াতেই পড়বে।

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এ বছর অন্তত ৩৮ জন শিশু হাম ও এর জটিলতায় মারা গেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এই সংক্রামক ব্যাধি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু মার্চ মাসেই ঢাকার মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে (আইডিএইচ) ২১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে ।
৮ ঘণ্টা আগে
২০২৫ সালের শুরু থেকে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বর্ণের বাজারে অস্থিরতা চলছে। এই সময়ে স্বর্ণের দাম নজিরবিহীনভাবে বেড়েছে। জেপি মরগ্যান, ব্ল্যাকরক, গোল্ডম্যান স্যাকস, ওয়েলস ফার্গো, ইউবিএস, ডয়েচে ব্যাংকসহ বড় বড় বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো স্বর্ণে বিনিয়োগে ব্যাপকভাবে আশাবাদী। জেপি মরগ্যানের পূর্বাভাস
১৬ ঘণ্টা আগে
গণতন্ত্রকে বিবেচনা করা হয় জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিফলন হিসেবে। জনগণের ম্যান্ডেট বা জনসমর্থনই হলো গণতান্ত্রিক ক্ষমতার মূল উৎস। কিন্তু একুশ শতকের বিশ্ব রাজনীতিতে এই দৃশ্যমান ক্ষমতার সমান্তরালে এক অদৃশ্য শক্তির সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যাকে বলা হয় ‘ডিপ স্টেট’ বা ‘রাষ্ট্রের অভ্যন্ত
২ দিন আগে
১৯৯২ সালে জাইদি শিয়া মতাদর্শের পুনর্জাগরণ এবং সৌদি আরবের ওয়াহাবি প্রভাব মোকাবিলার জন্য হুসেইন বদরেদ্দীন আল-হুথি 'বিলিভিং ইয়ুথ' নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
২ দিন আগে