ডিমের দাম কমছে না কেন, সংকট কি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে

দেশে ডিমের বাজারের অস্থিরতা এখন আর সাময়িক সরবরাহ সংকটের বিষয় নয়। দীর্ঘ লোকসানে ক্ষুদ্র খামার বন্ধ হয়ে যাওয়া, ফিড ও বাচ্চার দাম বেড়ে যাওয়া, বন্যা-তাপপ্রবাহে মুরগি মারা যাওয়া, বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত এবং খামার থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থার নানা স্তরে অতিরিক্ত ব্যয়—সব মিলিয়ে ডিমের বাজারে তৈরি হয়েছে কাঠামোগত সংকট। উৎপাদন ঘাটতি, বাড়তি ব্যয় ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় সেই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
নিম্ন আয়ের মানুষের প্রাণিজ আমিষের সবচেয়ে সাশ্রয়ী উৎস হিসেবে বিবেচিত ডিম অনেক পরিবারের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। ঢাকার বাজারে বাদামি ডিমের ডজন ১৫৫-১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। খুচরা পর্যায়ে প্রতি পিসের দাম ১৩-১৪ টাকা।
ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার উৎপাদক, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। নির্ধারিত রেফারেন্স অনুযায়ী, খামার পর্যায়ে প্রতি ডিমের দাম ১০ টাকা ৫৮ পয়সা, পাইকারি পর্যায়ে ১১ টাকা ১ পয়সা এবং খুচরা পর্যায়ে ১১ টাকা ৮৭ পয়সা। সেই হিসাবে খুচরা পর্যায়ে এক ডজন ডিমের দাম হওয়ার কথা ১৪২ টাকা ৪৪ পয়সা।
পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের এক্সিকিউটিভ মেম্বার মো. নজরুল ইসলামের দাবি, বর্তমানে ডিমের উৎপাদন খরচ প্রতি পিস প্রায় ১১ টাকা। তিনি বলেন, ফিড ও অন্যান্য উপকরণের মূল্য এবং খামারিদের আনুষঙ্গিক খরচ বিবেচনায় নিয়ে ডিমের বর্তমান বাজারদর যৌক্তিক কিনা, তা পর্যালোচনা করা দরকার। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত ও মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের ওপর জোর দেন তিনি।
কৃষি বিপণন অধিদফতরের সহকারী পরিচালক সুলতানা নাসিরা বলেন, ২০২৪ সালে ডিমের যে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা বর্তমান উৎপাদন ব্যয় ও বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে ফিডসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় ডিম উৎপাদনের খরচ বেড়েছে। ফিড ও অন্যান্য উপকরণের দাম, উৎপাদন ব্যয় এবং চাহিদা-সরবরাহ নিয়মিত পর্যালোচনা করে ডিমের মূল্য নির্ধারণ ও পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
দীর্ঘ লোকসানে উৎপাদন সক্ষমতা কমেছে
ডিমের দাম স্থিতিশীল না হওয়ার প্রধান কারণ উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি ও দীর্ঘদিনের লোকসান। শিল্প সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, পোল্ট্রিতে মোট উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ যায় ফিডে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লেয়ার ফিডের দাম প্রায় ৫৯ শতাংশ এবং ব্রয়লার ফিডের দাম প্রায় ৫১ শতাংশ বেড়েছে। ৫০ কেজির এক বস্তা লেয়ার ফিডের দাম এক সময় ১ হাজার ৭০০ টাকার মতো থাকলেও এখন তা ২ হাজার ৫০০ টাকার বেশি।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রচার সম্পাদক ডা. সফিকুল ইসলাম বলেন, ফিডের প্রধান উপাদান ভুট্টা ও সয়াবিন মিলের বড় অংশ আমদানিনির্ভর। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক শস্যবাজারের অস্থিরতা এবং স্থানীয় মজুত কমে যাওয়ায় এসব উপকরণের দাম বাড়ছে। একই সঙ্গে একদিন বয়সী বাচ্চার দাম এক বছরের ব্যবধানে ২৫ টাকা থেকে ৫৫-৬০ টাকায় উঠেছে। খামারের খাঁচা, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ আর পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।
অন্যদিকে অতিরিক্ত সরবরাহের সময় খামারিরা উৎপাদন ব্যয়ের নিচে ডিম বেচতে বাধ্য হন। কোনো কোনো অঞ্চলে টানা সাত-আট মাস প্রতি ডিমে ১ থেকে ২ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত লোকসান হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন, মুরগির সংখ্যা কমিয়েছেন অথবা নতুন ব্যাচ তোলেননি। তবে ডা. সফিকুল ইসলাম আশাবাদী, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দুই সপ্তাহের মধ্যে ডিমের দাম কমে আসবে।
বন্ধ খামার দ্রুত চালু হচ্ছে না
শিল্প সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশের ২০-৩০ শতাংশ লেয়ার খামার বর্তমানে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। প্রায় ৩০ শতাংশ উৎপাদন শেড খালি পড়ে আছে।
বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে প্রায় ৬৪ হাজার খামারি পোল্ট্রি ব্যবসা ছেড়েছেন। ২০২০ সালের আগে খামারি প্রায় ২ লাখ থাকলেও এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজারে। এর ফলে দৈনিক ডিমের উৎপাদন আনুমানিক ৩ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৪ কোটি পিস বা ক্ষেত্রবিশেষে ৪ কোটি ৫০ লাখে নেমে এসেছে। বিপরীতে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৫ কোটি ডিম।
এখানে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, দাম বাড়লেই উৎপাদন বাড়ে না। নতুন লেয়ার মুরগি ডিম দেওয়ার উপযোগী হতে ১৮-২২ সপ্তাহ লাগে। ফলে আজ খামার চালু করলেও আগামী সপ্তাহে বাজারে বাড়তি ডিম আসবে না।
প্রাকৃতিক দুর্যোগও ডিমের সরবরাহ সংকটকে আরও তীব্র করেছে। জুলাইয়ের বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৬ হাজারের বেশি পোল্ট্রি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে লেয়ার খামারও রয়েছে। গত কয়েক মাসে অতিবৃষ্টি, বন্যা ও অতিরিক্ত গরমে বিভিন্ন অঞ্চলে মুরগি মারা গেছে।
তাপমাত্রা বাড়লে মুরগির খাবার গ্রহণ কমে যায়, ডিম উৎপাদন হ্রাস পায়। রোগের ঝুঁকিও বাড়ে। অনেক খামারি ক্ষতির পর নতুন করে মুরগি তোলেননি। লোডশেডিংয়ে খামারে ভেন্টিলেশন, কুলিং ব্যবস্থা সচল রাখাও কঠিন হচ্ছে। এতে মুরগির মৃত্যুহার বাড়ছে এবং উৎপাদন কমছে। জেনারেটর চালানোর খরচও বেড়ে গেছে।
করপোরেট নিয়ন্ত্রণ ও বাজার ক্ষমতার প্রশ্ন
এক দিন বয়সী মুরগির বাচ্চা, ফিড ও অন্যান্য উপকরণের বাজার কয়েকটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে বলে ক্ষুদ্র খামারিদের অভিযোগ। এসব প্রতিষ্ঠান ফিড ও বাচ্চা উৎপাদনের পাশাপাশি সরাসরি লেয়ার আর ব্রয়লার উৎপাদনেও যুক্ত।
ক্ষুদ্র খামারিরা উচ্চমূল্যে ফিড আর বাচ্চা কিনলেও ডিম বিক্রির সময় তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা সীমিত। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও তারা সব সময় সেই ব্যয় ভোক্তার ওপর চালান করতে পারেন না।
অন্যদিকে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য, বড় আকারের উৎপাদন না থাকলে সরবরাহ পরিস্থিতি আরও খারাপ হতো। তারা ফিডের দাম বৃদ্ধির জন্য ডলার সংকট, আমদানি শুল্ক ও বৈশ্বিক খাদ্যশস্যের মূল্য বৃদ্ধিকে দায়ী করেন।
বাংলাদেশ ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক বলেন, পোল্ট্রি শিল্পে ব্যবহৃত ফিডের প্রায় ৭০ শতাংশ কাঁচামাল আমদানিনির্ভর। ফলে আমদানি ব্যয়ের ওঠানামার প্রভাব সরাসরি ফিডের মূল্যে পড়ে। তিনি জানান, গত এক মাসে ফিডের দাম বেড়েছে। আগামী ডিসেম্বর থেকে বাড়তি দামের ফিড বাজারে আসতে পারে। এতে ভবিষ্যতে পোল্ট্রিতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বাজারদরেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিকল্প খাদ্যের দাম বাড়ায় ডিমের চাহিদা
ডিমের বাজারে চাহিদার চাপও কম নয়। বর্ষায় ৪০টির বেশি জেলায় সবজি উৎপাদন ও পরিবহন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কাঁচামরিচ, বেগুন, বরবটি ও শসার দাম বেড়েছে। একই সময়ে গরু-খাসির মাংস, ইলিশ ও রুই মাছের দাম বেড়েছে। পাঙাশ-তেলাপিয়ার মতো মাছও ২৩০-২৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। ফলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো মাংস ও মাছের পরিবর্তে ডিমের ওপর বেশি নির্ভর করছে। বিকল্প খাদ্যের দাম বাড়ায় ডিমের চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
ডিমের বাজারে মৌসুমি ওঠানামাও রয়েছে। শীতকালে সামাজিক অনুষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনের কারণে ডিমের চাহিদা বেড়ে যায়। তবে শীতে সবজির সরবরাহ প্রচুর হলে ডিমের দাম কমে। কোনো কোনো সময় খামারগেটে প্রতি ডিম ৭ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৭ টাকা ৮০ পয়সায় নেমে আসে। এতে ভোক্তা স্বস্তি পেলেও খামারিরা উৎপাদন ব্যয় তুলতে পারেন না। এ ধরনের লোকসানও পরবর্তী সময়ে খামার বন্ধের কারণ হয়। তখন সেটা আবার ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা তীব্র করে।
.png)








