আমরা কেন বাবাকে সুপারহিরো বানিয়ে ফেলি

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ছোটবেলায় কমিকস, কার্টুন আর সিনেমায় দেখেছি সুপারম্যান উড়তে পারে। ব্যাটম্যান অন্ধকারকে ভয় পায় না। আয়রনম্যান নিজের বুদ্ধি দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে। বড় হতে হতে আমাদের মনে এক ধরনের ধারণা তৈরি হয়, সুপারহিরো মানেই কি এমন কেউ, যে সব সমস্যার সমাধান করবে, কখনো হারবে না, কখনো কাঁদবে না? যার থাকবে সুপারপাওয়ার?

কিন্তু বাস্তবে আমরা যাদের সুপারহিরো বলি, তাদের কোনো সুপারপাওয়ার নেই। তারা প্রতিদিন ভোরে উঠে বের হন কাজে, রাতে ক্লান্ত শরীরে ফেরেন, নিজের স্বপ্নের চেয়ে সন্তানের স্বপ্নকে বড় করে দেখেন। তারা হলেন বাবা। এই বাবারা কি আসলেই এই চরিত্রগুলোর মতো হন, নাকি আমরা নিজেরাই তাদের ঘিরে একটা সুপারহিরো মিথ তৈরি করে ফেলি?

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশু বয়সে আমরা যাকে সবচেয়ে বেশি ভরসা করি, নিরাপত্তা খুঁজি, তাকেই আমরা অজান্তে এক ধরনের ‘অপরাজেয়’ রূপ দিয়ে ফেলি। বাবার কাঁধে চড়ে বিশ্ব দেখা শিশুর কাছে বাবা তখন সত্যিকারের সুপারম্যান। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝতে শিখি, বাবা একজন মানুষ। তার ভুল হয়, তার ক্লান্তি আছে, তার ভয় আছে। এই বোঝাপড়াটাই আসলে সম্পর্ককে আরও গভীর করে। সুপারহিরোর প্রতি ভক্তি থেকেই মানুষের বাবার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধার অনুভূতি তৈরি হয়।

সিনেমা, নাটক, গল্পে এই মানুষটির গল্প আমরা প্রায় দেখি। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, পর্দার সেই বাবাদের সঙ্গে বাস্তবের বাবাদের মিল অনেক বেশি, পার্থক্য শুধু একটাই— সিনেমায় বাবার সংগ্রাম দেখানো হয় দুই-তিন ঘণ্টায়, কিন্তু বাস্তবে একজন বাবার সংগ্রাম চলে আমৃত্যু। পরিবারে বাবাকে দেখা হয় বটবৃক্ষ হিসেবে। বাবা পুরো পরিবারকে একটি জালে, একটি ছায়ায় আটকে রাখে। খালি চোখে তার এই শক্তি দেখা না গেলেও তার শূন্যতা আমাদের বুঝিয়ে দেয় তার শক্তির অনুভূতি।

বলিউডের বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘দাঙ্গাল’। সিনেমাটি এক সাবেক কুস্তিগির বাবা মহাবীর সিং ফোগাটের আত্মজীবনী অবলম্বনে নির্মিত। মহাবীর সিং তার মেয়েদের নিয়ে স্বপ্ন দেখেন, তারা একদিন দেশসেরা কুস্তিগির হবে। নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণের জন্য মেয়েদের কঠোর প্রশিক্ষণ দেন। প্রথমে মেয়েদের কাছে সেই বাবা কঠিন, একগুঁয়ে, এমনকি নিষ্ঠুরও মনে হয়। কিন্তু গল্পের শেষে বোঝা যায়, তার কঠোরতার ভেতরে লুকিয়ে ছিল অগাধ বিশ্বাস ‘আমার মেয়েরা পারবে।’

বাস্তব জীবনেও অনেক বাবা এমনই হন। তারা হয়তো সন্তানের কাছে সবচেয়ে কঠোর মানুষ। কারণে-অকারণে শাসন করেন। সন্তান যখন বড় হয়, তখন বুঝতে শেখে, সেই বকুনি আসলে ভালোবাসারই অন্য ভাষা।

আমরা প্রায় মোবাইল ফোন, টেলিভিশন খুললেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখি শ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাওয়ালার সন্তানও চিকিৎসক, বিসিএস ক্যাডার কিংবা বিশ্বজয়ী মানুষ হয়। তারা তাদের কষ্টের উপার্জনে তাদের অপূর্ণ স্বপ্ন সন্তানের দ্বারা পূরণ করেন। আব্রাহাম লিংকন, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, এপিজে আব্দুল কালাম, প্রমুখ ব্যক্তি তারই উদাহরণ।

অন্যদিকে হলিউডে অন্যতম হৃদয়স্পর্শী সিনেমা ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’-এ বাবা গুইদো নাৎসি যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যেও ক্যাম্পের ভেতরে ছেলেকে বোঝান যে সবকিছুই একটা খেলা মাত্র। চারপাশে মৃত্যু, ভয়, অনিশ্চয়তা কিন্তু সন্তান যেন আতঙ্কিত না হয়, তাই বাবা নিজের ভয় লুকিয়ে হাসেন। যে দৃশ্য কোটি দর্শকের চোখে পানি এনে দেয়।

বাস্তবেও অসংখ্য বাবা চাকরি হারানোর খবর, ঋণের চাপ কিংবা ব্যক্তিগত কষ্ট নিয়ে ঘরে ফেরেন। তা লুকিয়ে রেখে সন্তানের সামনে হাসিমুখে বসেন। কারণ তারা জানেন, পরিবারের সবচেয়ে নির্ভরশীল, নিরাপত্তা বোধটি অনেক সময় বাবার মুখের সেই হাসিতেই লুকিয়ে থাকে। তাই বাবাদের কাঁদতে নেই, হাল ছাড়তে নেই।

‘দ্য পারস্যুট অব হ্যাপিনেস’ চলচ্চিত্রে একজন সংগ্রামী বাবার গল্প দেখানো হয়। যেখানে বাবা ক্রিস গার্ডনার রাস্তায় রাত কাটিয়েও ছেলের সামনে হাসিমুখ ধরে রাখেন। দারিদ্র্য, গৃহহীনতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও ছেলের হাত ছাড়েন না। তিনি ব্যর্থ হন, আবার ঘুরে দাঁড়ান। হারেন, আবার চেষ্টা করেন। কারণ তার কাছে সফল হওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সন্তানের সামনে হার না মানা।

এ দৃশ্য পৃথিবীর লাখো পরিবারের গল্প। অনেক বাবা হয়তো দিনের শেষে ক্লান্ত হন, তবু সন্তানের স্কুলের বেতন, বই, চিকিৎসা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েন। নিজের প্রয়োজনীয় জিনিস বা চিকিৎসা পিছিয়ে সন্তানের আবদার পূরণ করেন। এই বাবারা আমাদের কাছে সুপারম্যান, ব্যাটম্যান বা আয়রনম্যানের চেয়ে কম নন।

বাস্তবে আমরা যাদের সুপারহিরো বলি, তাদের কোনো সুপারপাওয়ার নেই। তারা প্রতিদিন ভোরে উঠে বের হন কাজে, রাতে ক্লান্ত শরীরে ফেরেন, নিজের স্বপ্নের চেয়ে সন্তানের স্বপ্নকে বড় করে দেখেন। তারা হলেন বাবা।

বাস্তবের বাবাদের এই এক টুকরো মুহূর্তকে পর্দায় বড় করে দেখায়। তাই তো মহাবীর ফোগাটের জেদ, গুইদোর হাস্যরসে বিপদ ঢেকে রাখার চেষ্টা, ক্রিস গার্ডনারের হার না মানা মনোভাব এসবই বাস্তব বাবাদের মধ্যে কম-বেশি থাকে, শুধু সেটা প্রতিদিনের ঘরের মধ্যে চাপা থাকে, কেউ দেখে না।

সুপারম্যান, ব্যাটম্যান বা আয়রনম্যানের শক্তি আসে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা, অস্ত্র বা প্রযুক্তি থেকে। তাদের লড়াই হয় ভিনগ্রহী শত্রু বা ভিলেনের সঙ্গে, আর জয় আসে এক রাতের অ্যাকশনে। বাবাদের লড়াই কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। তাদের শত্রু কোনো জোকার বা লেক্স লুথর নয়, তাদের শত্রু হলো মাস শেষে বেতনের হিসাব, সন্তানের স্কুলের ফি, পরিবারের অসুস্থতা, নিজের শরীরের ক্ষয়, আর সমাজের প্রত্যাশার চাপ। এই লড়াইয়ে কোনো ক্যামেরা থাকে না, কোনো স্লো-মোশন শট থাকে না, করতালি থাকে না।

আসলে বাবাদের সুপারহিরোগিরি লুকিয়ে থাকে অতি সাধারণ মুহূর্তে ভোর পাঁচটায় উঠে অফিসের জন্য তৈরি হওয়া, নিজের পছন্দের জিনিস না কিনে সন্তানের জন্য টাকা জমানো, অসুস্থ শরীরেও হাসিমুখে বাড়ি ফেরা। এই বীরত্ব চোখে পড়ে না, কারণ এটা প্রতিদিনের একটা নিঃশব্দ দায়িত্ব।

বাবা হতে গেলে সুপারহিরো হতে হয় না সবসময়, বরং বাবা হওয়াটাই এক ধরনের নীরব বীরত্ব। যে বাবা নিজের অসুখ চেপে রেখে সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যান, যে বাবা সারাদিনের পরিশ্রমের পরও সন্তানের পড়াশোনায় সময় দেন, যে বাবা নিজের স্বপ্নের চাকরি ছেড়ে পরিবারের জন্য নিরাপদ পথ বেছে নেন তিনিই আসল হিরো।

বাস্তবের বাবাদের কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি নেই। নেই জাদুর হাতিয়ার। আছে শুধু দায়িত্ব, প্রতিশ্রুতি, পরিশ্রম এবং নিঃশব্দ ভালোবাসা। হয়তো এ কারণেই তারা সিনেমার সুপারহিরোদের মতো আলোয় থাকেন না। কিন্তু প্রতিটি পরিবারের গল্পে, প্রতিটি সন্তানের বেড়ে ওঠায় এবং প্রতিটি স্বপ্নের পেছনে একজন বাবার অদৃশ্য উপস্থিতি থেকে যায়। সুপারহিরোরা পৃথিবী বাঁচান আর বাবারা নীরবে একটি পরিবার বাঁচিয়ে রাখেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত