বন্ধু দিবস

পলিটিকস অব ফ্রেন্ডশিপ

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

এআই জেনারেটেড ছবি

ফরাসি দার্শনিক জাঁক দেরিদা যখন ১৯৯৪ সালে লিখেছিলেন, ‘বন্ধুরা শোনো, আসলে বন্ধু বলে কিছু নেই’, তখন হয়তো তিনি নিজেও ভাবেননি, তিন দশক পর এই একই প্রশ্ন আমাদের ফোনের স্ক্রিনে, সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডে আর রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে নতুন করে ফিরে আসবে। বন্ধুত্বকে যতই রাজনীতির বাইরের বিষয় ভাবা হোক না কেন, তা কখনোই ক্ষমতাচর্চা ও রাজনীতির বাইরে ছিল না।

দেরিদা দেখিয়েছিলেন, ‘বন্ধু কে’ এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে থাকে ‘শত্রু কে’ উত্তর। আজকের বিশ্বে দাঁড়িয়ে এই কথাটা আগের চেয়ে বেশি সত্যি মনে হয়।

আবার জার্মান তাত্ত্বিক কার্ল শ্মিট বলেছিলেন, রাজনীতির মূল কথাই হলো বন্ধু ও শত্রু চিহ্নিত করা। একটি জাতি বা রাষ্ট্র তার পরিচয় গড়ে তোলে ‘আমরা’ আর ‘ওরা’ সীমারেখা টেনে। দেরিদা এই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন এই বলে যে, এই সীমারেখা কখনো স্থায়ী নয়। শত্রুই কখনো কখনো আমাদের নিজেদের পরিচয়ের শর্ত হয়ে দাঁড়ায়। আজকের বিশ্বে এই তত্ত্ব যেন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। জাতীয়তাবাদের নতুন ঢেউ, অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক, ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি—সবখানে একই প্রশ্ন। সেটি হচ্ছে, কে ‘আমাদের লোক’, কে নয়। এমনকি পারিবারিক আড্ডা বা বন্ধুদের আড্ডাতেও রাজনৈতিক মতবিরোধ এখন সম্পর্ক ভাঙার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ‘সে তো অমুক দলের সমর্থক, ওর সাথে আর বন্ধুত্ব রাখা যায় না’—এই বাক্য এখন অনেকের মুখেই শোনা যায়।

সোশ্যাল মিডিয়া: বন্ধুত্বের নতুন বাজার

ফেসবুকের ‘ফ্রেন্ড’ শব্দটি বেশ ভাবনা জাগানিয়া। যাকে জীবনে কখনো দেখিনি, তাকেও আমরা বন্ধু বলি, আবার যার সঙ্গে বছরের পর বছর কথা হয় না, সেও তালিকায় থেকে যায় বন্ধু হয়ে। এই ডিজিটাল বন্ধুত্ব মূলত সংখ্যার রাজনীতি—কার কত ফলোয়ার, কার কত লাইক, কে কাকে আনফ্রেন্ড করল, এসবই এখন সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি। অ্যালগরিদম আমাদের এমন এক বুদ্বুদে (ইকো চেম্বার) আটকে রাখে, যেখানে আমরা মূলত তাদেরই দেখি যারা আমাদের সঙ্গে একমত। ফলে বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে সমমনাদের একটি ঘেরাটোপ, যেখানে ভিন্নমত মানেই সম্পর্ক ছিন্ন করার যথেষ্ট কারণ। দেরিদার ভাষায় বললে, শত্রু নির্ধারণের রাজনীতি এখন হাতের মুঠোয়। ‘ব্লক’ আর ‘আনফলো’ বোতামের মধ্যে চলে এসছে শত্রু-মিত্র খেলা।

এই খেলার খেলোয়াড় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী জেন-জি থেকে ছেলে-বুড়ো সবাই। তবে স্মার্টফোনের যুগে বেড়ে ওঠা জেন-জি প্রজন্মের কাছে বন্ধুত্বের রাজনীতি একেবারে ভিন্ন রূপ নিয়েছে। এই প্রজন্মের কাছে বন্ধুত্ব মানে শুধু রক্তসম্পর্ক বা প্রতিবেশী-সহপাঠীর গণ্ডি নয়। তাদের কাছে বন্ধুত্ব মানে একই ‘ফ্যান্ডম’, একই গেমিং কমিউনিটি বা একই সামাজিক আন্দোলনে বিশ্বাসী মানুষদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক। ভৌগোলিক দূরত্ব এখানে বাধা নয়। ডিসকর্ড সার্ভার বা রেডিটের কোনো গ্রুপে হাজার মাইল দূরের একজনের সঙ্গে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা তাদের কাছে বাস্তব বন্ধুত্বের চেয়ে কম কিছু নয়।

জাঁক দেরিদার বই পলিটিকস অব ফ্রেন্ডশিপ। ছবি: গুডরিডস
জাঁক দেরিদার বই পলিটিকস অব ফ্রেন্ডশিপ। ছবি: গুডরিডস

জেনজির কাছে বন্ধুত্বের রাজনীতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মূল্যবোধ-ভিত্তিক। জলবায়ু সংকট, লিঙ্গ-সমতা, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন বা সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে অবস্থান এখন বন্ধুত্বের একটি অলিখিত শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে এই প্রজন্মের কাছে। ‘ভ্যালুজ অ্যালাইনমেন্ট’ অর্থাৎ মূল্যবোধের মিল ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী বন্ধুত্ব টেকে না, এমন ধারণা তাদের মধ্যে প্রবল। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি ইতিবাচক। কারণ এতে বন্ধুত্ব হয়ে ওঠে সচেতন পছন্দ, শুধু পারিপার্শ্বিকতার ফল নয়।

এটি আবার দেরিদার সেই সতর্কবার্তার প্রতিধ্বনিও বটে। দেরিদা বলেছেন, বন্ধু নির্বাচনের প্রক্রিয়াই আসলে শত্রু বাছাইয়ের প্রক্রিয়া। রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমতের কাউকে জেনজি অনেক সময় সহজেই ‘টক্সিক’ আখ্যা দিয়ে জীবন থেকে বাদ দিয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়াকে তারা বলে ‘কাটিং অফ’ বা ‘নো টলারেন্স ফর টক্সিসিটি’। এটি ব্যক্তিগত মানসিক সুস্থতার দিক থেকে প্রয়োজনীয় হলেও সামাজিকভাবে এটি একধরনের নতুন ভ্রাতৃত্ব-মডেল তৈরি করছে। এই মডেলে ‘শুদ্ধ’ মতাদর্শের বাইরে যে কাউকে সহজেই বহিষ্কার করা হয়।

বন্ধুত্ব কি সত্যিই রাজনীতির ঊর্ধ্বে

দেরিদা তাঁর পরবর্তী কাজে ‘আতিথেয়তা’ নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, তা আজকের বন্ধুত্বের রাজনীতিতেও প্রাসঙ্গিক। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, আমরা কি ভিন্নমতের মানুষকে আমাদের বৃত্তে জায়গা দিতে প্রস্তুত, নাকি শুধু নিজেদের মতো মানুষদের নিয়েই একটি নিরাপদ ঘেরাটোপ বানাতে চাই?

আধুনিক সমাজে বন্ধুত্ব যতটা ‘সংযোগ’ তৈরি করছে, ততটাই তৈরি করছে ‘বিচ্ছিন্নতা’। একই শহরে বাস করেও রাজনৈতিক মতের কারণে মানুষ একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আবার এর বিপরীতে ডিজিটাল যুগ এমন সব বন্ধুত্বের সুযোগও তৈরি করেছে যা আগে কল্পনাও করা যেত না। এখন সীমানা, ভাষা বা সংস্কৃতির বাধা পেরিয়ে মানুষ একে অপরের সাথে যুক্ত হচ্ছে অভিন্ন আগ্রহ বা মূল্যবোধের ভিত্তিতে।

দেরিদার ‘আগামীর গণতন্ত্র’ ধারণার মতোই বন্ধুত্বও বোধহয় কখনো একটি ‘সম্পূর্ণ’ বা ‘স্থির’ অবস্থা নয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত ঠিক করি কাকে আপন ভাবব, কাকে নয়। জেনজি প্রজন্মের হাতে এই প্রক্রিয়া নতুন রূপ পাচ্ছে। একদিকে মূল্যবোধ-সচেতন, সীমানাহীন বন্ধুত্বের সম্ভাবনা, অন্যদিকে মতাদর্শগত বিশুদ্ধতার নামে নতুন বেড়াজাল তৈরির ঝুঁকি। প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়, বন্ধুত্ব কি সত্যিই রাজনীতির ঊর্ধ্বে, নাকি রাজনীতিই বন্ধুত্বের সবচেয়ে গভীর স্তরে বসে আছে, অদৃশ্য অথচ সদা-সক্রিয়?

জাঁক দেরিদার পলিটিকস অব ফ্রেন্ডশিপ অবলম্বনে

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত