আজাদ কাশ্মীর নিয়ন্ত্রণ কেন মানছে না, কতটা চ্যালেঞ্জে পাকিস্তান

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ অঞ্চল হিমালয়ের কাশ্মীর। ছবি: সংগৃহীত

কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান একাধিকবার যুদ্ধে জড়িয়েছে। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের রাজনৈতিক সমস্যা এতদিন আড়ালেই ছিল। এখন সেই চিত্র বদলেছে, মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে, যা পাকিস্তান সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

কাশ্মীরের সাম্প্রতিক আন্দোলন শুরু হয় জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায়। পরে তা রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও স্থানীয় রাজনীতিকদের নিয়ে গঠিত জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাদের কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণকে পাকিস্তান সরকার বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।

সংগঠনটি জুনের শুরুতে আঞ্চলিক রাজধানী মুজাফফরাবাদের উদ্দেশে লং মার্চের ঘোষণা দেয়। তাদের দাবি, আজাদ কাশ্মীরের আরও স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। ৯ জুন রাওয়ালাকোট থেকে এই কর্মসূচি শুরুর পরিকল্পনা ছিল। শহর নিয়ন্ত্রণরেখা থেকে ২০ মাইল দূরে রাওয়ালাকোটই কাশ্মীরকে ভারত ও পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত দুই অংশে ভাগ করেছে।

জেএএসির নতুন দাবি, নতুন সংকট

লং মার্চ কর্মসূচি ঘোষণার পর গত ৫ জুন পাকিস্তান সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জেএএসি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পরে সংগঠনের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবু আন্দোলন থামেনি। সমর্থকেরা রাওয়ালাকোটে টানা কয়েক সপ্তাহ অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যান।

স্থানীয় কর্মকর্তা ও সূত্রের হিসাবে, জুনের শুরু থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে বিক্ষোভকারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও সাধারণ মানুষ রয়েছেন।

এবার আন্দোলনের লক্ষ্য বদলেছে। সংগঠনটি সাংবিধানিক সংস্কারের দাবি তুলেছে। তাদের দাবি, অঞ্চলটির ৪৫ সদস্যের আইনসভায় পাকিস্তানের অন্যত্র বসবাসকারীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসনের ব্যবস্থা বাতিল করতে হবে।

গত সপ্তাহে এলাকাটি ঘুরে দেখা যায়, আজাদ কাশ্মীরের অনেক এলাকা কার্যত বিশ্বের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন। কয়েক সপ্তাহ ইন্টারনেট সেবা বন্ধ ছিল। এতে ব্যাংক ও এটিএম সেবা ব্যাহত হয়। মুজাফফরাবাদের পথে পথে পুলিশের চেকপোস্ট। নীলম ও ঝিলম নদীঘেরা পর্যটন এলাকা ছিল প্রায় ফাঁকা। গ্রীষ্মে যেসব এলাকায় পর্যটকদের ভিড় থাকে, সেখানে এবার নেমে এসেছে নীরবতা।

গত ৩১ জুলাই মুজাফফরাবাদে আবার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। তা ২ জুলাই পর্যন্ত চলে। একদিনের জন্য ইন্টারনেট চালু হলেও, তা আবার বন্ধ করে কর্তৃপক্ষ।

পাকিস্তান সরকার জানিয়েছে, তারা কঠোর অবস্থান থেকে সরবে না। প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের দাবি, এই আন্দোলনে ‘সশস্ত্র গোষ্ঠী’ জড়িত। তাই সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যবস্থা নিচ্ছে।

জেএএসি ২০২৩ সালে গঠিত। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাদের আন্দোলনের মুখে সরকার বিদ্যুতের দাম কমায় এবং আটার দামে ভর্তুকি দেয়। ফলে পাকিস্তানের অন্য অঞ্চলের তুলনায় সেখানকার মানুষ বিদ্যুৎ ও আটা সস্তায় কিনতে পারছেন।

তবে এবার আন্দোলনের লক্ষ্য বদলেছে। সংগঠনটি সাংবিধানিক সংস্কারের দাবি তুলেছে। তাদের দাবি, অঞ্চলটির ৪৫ সদস্যের আইনসভায় পাকিস্তানের অন্যত্র বসবাসকারীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসনের ব্যবস্থা বাতিল করতে হবে। এতে স্থানীয় মানুষের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা আসবে।

তবে, পাকিস্তান সরকারের বক্তব্য, এই ব্যবস্থা পরিবর্তন করলে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে বিরোধে পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে।

ইন্টারনেট বন্ধ, পর্যটন ব্যবসার ক্ষতি

আন্দোলনে সহিংসতা ও দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। নদীর ধারের একটি পর্যটনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ আকবর বলেন, অস্থিরতার কারণে স্থানীয় ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত বছর ভারত-পাকিস্তান সামরিক উত্তেজনার ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই নতুন সংকট দেখা দিয়েছে।

এদিকে, পাকিস্তান একই সময়ে আরও কয়েকটি নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলা করছে। বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব সংঘাতে হাজারো নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন শান্ত বলে পরিচিত আজাদ কাশ্মীরে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেওয়া সরকারের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা ব্যর্থ হওয়ায় সরকার কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরীর দাবি, সাংবিধানিক সংস্কার ছাড়া আন্দোলনকারীদের বাকি সব দাবি সরকার মেনে নিয়েছে। তিনি বলেন, এটি আর প্রতিবাদ নয়, এখন এটি দাঙ্গায় পরিণত হয়েছে।

অঞ্চলবিষয়ক গবেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের ফ্র্যাঙ্কলিন অ্যান্ড মার্শাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ড্যানিশ খান মনে করেন, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকলে তাদের মূল অভিযোগ আরও শক্তিশালী হবে। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরীদের বৈধ রাজনৈতিক দাবি-দাওয়া জনগোষ্ঠী হিসেবে নয়, বরং নিরাপত্তা সমস্যার এলাকা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, সরকার বিক্ষোভকারীদের প্রতি সংযম দেখিয়েছে। ২৭ জুলাই শুরু হওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়ে আইনগত উপায়ে দাবি আদায়ের আহ্বান তাদের বারবার জানানো হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও জানান, তারা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে চায়। অথচ বলপ্রয়োগের বৈধ ক্ষমতা শুধু রাষ্ট্রের হাতে।

নির্বাচন বর্জনের আহ্বান, কী করবে সরকার

ইসলামাবাদভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক কামার চিমার মতে, অতীতে আন্দোলনকারীদের দাবির কিছু অংশ মেনে নেওয়ায় মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, রাজপথের চাপ কার্যকর। এতে আন্দোলনকারীরা জনঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে সংসদের রাজনৈতিক বিতর্ক রাজপথে নিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছে।

আন্দোলনকারী জোট জানিয়েছে, তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। তবে তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের অভিযোগ, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই নির্বাচন কর্মকর্তারা তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ। জোটটি ভোট বর্জনের আহ্বানও জানিয়েছে।

নির্বাচনের তৃতীয় ধাপ ১০ আগস্ট থেকে। তবে এরই মধ্যে বড় রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সোমবার জোটটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে।

সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত