৬০ হাজার কোটি টাকা থেকে কারা পাবেন ঋণ, কীভাবে হবে নির্বাচন

প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১৭: ৫৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

শিল্প উৎপাদনে স্থবিরতা, বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দা, উচ্চ সুদহার, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং রপ্তানির ওপর বাড়তি চাপের মধ্যে দেশের অর্থনীতি কঠিন সময় পার করছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ প্রণোদনা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ২৩ মে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ-২০২৬’ এখন চূড়ান্ত নীতিমালা ও বাস্তবায়ন প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, কোভিড-১৯ মহামারির সময়ের প্রণোদনার মতো এবার লক্ষ্য শুধু স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণ নয়। বরং প্রকৃত উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানকে পুনরায় সচল করা, রপ্তানি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কর্মসূচিটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান হবে।

ব্যাংক খাতের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে ১ হাজার ২০০টির বেশি বন্ধ বা আংশিক সচল শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করে একটি প্রাথমিক তথ্যভান্ডার তৈরি করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা, উৎপাদন সক্ষমতা, ঋণের অবস্থান এবং পুনরায় চালুর সম্ভাবনা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। তবে এটি চূড়ান্ত অনুমোদিত তালিকা নয়; সম্ভাব্য ঋণগ্রহীতাদের প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের জন্য প্রস্তুত করা একটি অভ্যন্তরীণ তথ্যভান্ডার। আবেদন শুরুর আগে বিভিন্ন ব্যাংক, শিল্প সংগঠন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রাথমিক তথ্যভান্ডার তৈরি করা হয়েছে।

কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আবেদন গ্রহণ ও পৃথকভাবে যাচাই-বাছাই করছে। এ জন্য উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক, কারখানা পরিদর্শন এবং প্রকৃত কার্যকর মূলধনের প্রয়োজন নির্ধারণ করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষ হলে ধাপে ধাপে ঋণ বিতরণ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তবে এখনো মোট আবেদন, অনুমোদিত ঋণ, ছাড় করা অর্থ কিংবা চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের কোনো তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

কেন এল এই প্রণোদনা

গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। প্রবৃদ্ধির গতি কমে যায়, বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ে এবং ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমে। একই সময়ে ব্যাংক খাত থেকে অর্থ পাচার ও বড় অঙ্কের ঋণ অনিয়মের কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যায়। ফলে অনেক ব্যাংক শিল্প খাতে নতুন ঋণ দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে।

অন্য দিকে, শিল্প ও ব্যবসায়িক ঋণের সুদহার বেড়ে অনেক ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছায়। ফলে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য নতুন বিনিয়োগ বা কার্যকর মূলধন সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে।

এর প্রভাবে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, ইস্পাত, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি ও হালকা প্রকৌশলসহ বিভিন্ন খাতের ১ হাজার ২০০-র বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় অথবা পূর্ণ সক্ষমতার অনেক নিচে পরিচালিত হতে থাকে। অনেক প্রতিষ্ঠানের কারখানা, যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল ও রপ্তানি বাজার থাকলেও শুধু কার্যকর মূলধনের অভাবে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানে স্বল্পসুদে কার্যকর মূলধন সরবরাহ করা গেলে উৎপাদন দ্রুত বাড়বে, যা রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

কীভাবে গঠন করা হয়েছে তহবিল

৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি দুটি অর্থায়ন কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হবে।

প্রথম অংশে রয়েছে ৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল। এই অর্থ আসবে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই অর্থ স্বল্প সুদে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের ঋণ হিসেবে বিতরণ করবে। এ ক্ষেত্রে সরকার সুদ ভর্তুকি দেবে, যাতে উদ্যোক্তারা বাজারের তুলনায় কম সুদে ঋণ পান।

দ্বিতীয় অংশে রয়েছে ১৯ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে পরিচালিত হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য, এই অর্থ নতুন টাকা ছাপিয়ে নয়; বরং তাদের পরিচালন মুনাফা ও বিদ্যমান সম্পদের ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে।

কোন খাতে কত টাকা

৪১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মধ্যে সবচেয়ে বড় ২০ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে ‘ক্লোজড ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সার্ভিস সেক্টর ফ্যাসিলিটেশন প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম’-এর আওতায় বন্ধ বা উৎপাদন সক্ষমতার নিচে পরিচালিত শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের জন্য। এই তহবিল থেকে এমন প্রতিষ্ঠানকে মূলধন দেওয়া হবে, যারা পর্যাপ্ত কার্যকর মূলধন পেলে পুনরায় উৎপাদনে ফিরতে সক্ষম।

এ ছাড়া ৪১ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১০ হাজার কোটি টাকা, কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে ‘উত্তরবঙ্গ কৃষি হাব’ প্রকল্পে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৯ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল থেকে প্রি-শিপমেন্ট রপ্তানি ঋণে ৫ হাজার কোটি টাকা, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, চামড়া ও পাদুকা শিল্পের জন্য ২ হাজার কোটি টাকা, হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রপ্তানিতে ২ হাজার কোটি টাকা, প্রবাসী কর্মসংস্থানে ১ হাজার কোটি টাকা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে ১ হাজার কোটি টাকা, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১ হাজার কোটি টাকা, পরিবেশবান্ধব বা সবুজ পণ্যে ১ হাজার কোটি টাকা, স্টার্টআপ খাতে ৫০০ কোটি টাকা এবং সৃজনশীল অর্থনীতিতে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

কারা পাবেন এই ঋণ, কীভাবে হবে নির্বাচন

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রণোদনার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবে উৎপাদনমুখী ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সক্ষম প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে ২০ হাজার কোটি টাকার স্কিমের আওতায় মূলধনের সংকট, জ্বালানি সমস্যা বা ব্যাংকঋণের অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা উৎপাদন সক্ষমতার নিচে পরিচালিত শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান অগ্রাধিকার পাবে। এ ছাড়া রপ্তানিমুখী ও ডিমড এক্সপোর্ট ইউনিট, নিশ্চিত রপ্তানি আদেশ থাকা প্রতিষ্ঠান এবং বন্ধ কারখানা লিজ বা অধিগ্রহণ করে পুনরায় চালু করতে আগ্রহী উদ্যোক্তারাও বিবেচনায় থাকবেন।

ঋণগ্রহীতা নির্বাচন করবে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক। তবে প্রতিটি আবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী যাচাই করে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা, কার্যকর মূলধনের প্রয়োজন, আর্থিক অবস্থা ও নগদ প্রবাহ, বাজার ও রপ্তানির সম্ভাবনা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং পুনরায় চালুর বাস্তব সম্ভাবনা মূল্যায়ন করতে হবে।

কেবল অর্থসংকটের কারণে বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানই এই সুবিধা পাবে। ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতা, প্রযুক্তিগত অযোগ্যতা বা বাজার হারিয়ে স্থায়ীভাবে অকার্যকর হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠান বিবেচনায় আসবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী বিজিএমইএ, বিকেএমইএ বা এফবিসিসিআইসহ সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের প্রত্যয়নও নিতে হবে, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় প্রতিষ্ঠানটি পুনরুজ্জীবনের উপযোগী।

কারা পাবেন না, ঋণের শর্ত কী

বাংলাদেশ ব্যাংক এই কর্মসূচিতে কয়েকটি বিষয়ে ‘শূন্য সহনশীলতার নীতি’ নিয়েছে। সিআইবিতে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত, অর্থ পাচার, জালিয়াতি বা তহবিল আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, ঋণের অর্থ অপব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে এমন উদ্যোক্তা এবং নতুন উৎপাদনের পরিবর্তে পুরোনো ঋণ সমন্বয়ের উদ্দেশ্যে আবেদনকারীরা এই প্রণোদনার আওতায় আসতে পারবেন না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এ ঋণ কেবল নতুন উৎপাদন ও কার্যকর মূলধনের জন্য। পুরোনো ঋণ পরিশোধ, সুদ পরিশোধ বা ঋণ পুনঃতফসিলের কাজে এটি ব্যবহার করা যাবে না।

প্রণোদনা কর্মসূচির অন্যতম আকর্ষণ হলো স্বল্প সুদে অর্থায়ন। বাজারে শিল্প ও ব্যবসায়িক ঋণের সুদ যেখানে অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ, সেখানে এই কর্মসূচির অধিকাংশ ঋণ ৬ থেকে ৭ শতাংশ সুদে দেওয়া হবে। স্টার্টআপের মতো কিছু বিশেষ খাতে আরও কম সুদে অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে।

বন্ধ শিল্প পুনরুজ্জীবন স্কিমের আওতায় একটি কোম্পানি বা শিল্পগোষ্ঠী সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে। ঋণের মেয়াদ নির্ধারিত থাকবে; সন্তোষজনক কার্যক্রমের ভিত্তিতে তা নবায়নের সুযোগ থাকবে। কিছু ক্ষেত্রে সুদ পরিশোধে প্রাথমিক গ্রেস পিরিয়ডও রাখা হয়েছে।

কঠোর নজরদারিতে বাস্তবায়ন

কোভিড-১৯ সময়ের প্রণোদনা কর্মসূচির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার তদারকিতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, শ্রমিকদের মজুরি সরাসরি ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে পরিশোধ করতে হবে; নগদে বেতন দেওয়া যাবে না। ঋণগ্রহীতাকে নিয়মিত উৎপাদন ও বিক্রির তথ্য জমা দিতে হবে এবং অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর কারখানা পরিদর্শন করতে হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংক সরেজমিনে পরিদর্শন করতে পারবে।

ঋণের অর্থ অপব্যবহার বা অন্য খাতে স্থানান্তরের প্রমাণ মিললে তাৎক্ষণিকভাবে ঋণ আদায়, অতিরিক্ত আর্থিক জরিমানা এবং প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই কর্মসূচির সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন ও স্বচ্ছ বাস্তবায়নের ওপর।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রভাবমুক্তভাবে প্রকৃত উৎপাদনক্ষম প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা গেলে এই কর্মসূচি শিল্পায়ন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। অন্যথায় অতীতের কিছু প্রণোদনা কর্মসূচির মতো এর সুফল অল্প কিছু প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আটকে থাকার ঝুঁকি থাকবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত