জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

সংসদীয় বির্তকের সংস্কৃতি কি ফিরবে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ১২: ৩২
এআই জেনারেটেড ছবি

বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম প্রাণ ছিল সংসদে প্রাণবন্ত বিতর্কের সংস্কৃতি। আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদ সদস্যদের যুক্তি-তর্কে ভরপুর আলোচনা ছিল সংসদের স্বাভাবিক চিত্র। একসময় সংসদে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য, পরিসংখ্যান ও রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরে বক্তব্য রাখতেন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা। কিন্তু সময়ের পালা বদলে সেই বিতর্কের ঐতিহ্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে বিতর্কের শক্তিশালী সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকেই। তৎকালীন সংসদ সদস্যরা শুধু দলীয় অবস্থান তুলে ধরতেন না, বরং রাষ্ট্রীয় নীতি নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করতেন। সংসদে যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহির মুখে দাঁড় করানোই ছিল বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করতেন তৎকালীন বর্ষীয়ান নেতারা। যেমন তাজউদ্দীন আহমদ সংসদে তাঁর যুক্তিনির্ভর বক্তব্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। একইভাবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তাঁর তীক্ষ্ণ রসবোধ, আইনি জ্ঞান এবং শক্তিশালী যুক্তির মাধ্যমে সংসদীয় বিতর্ককে প্রাণবন্ত করে তুলতেন। কামাল হোসেন তাঁর আইন ও সংবিধান বিষয়ে দীর্ঘ যুক্তি, আলোচনা বক্তব্য দিয়ে সংসদে গভীর প্রভাব ফেলতেন। তেমনিভাবে তোফায়েল আহমেদ, মওদুদ আহমদ, প্রমুখসহ আরো অনেক বাঘা বাঘা রাজনৈতিক নেতাবৃন্দ যাঁরা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যই রাখতেন না, বরং সংসদকে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

১৯৫৪ পরবর্তী সংসদের কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তৎকালীন বিতর্কগুলো ছিল দীর্ঘ, আলোচনাসমৃদ্ধ এবং তথ্যবহুল। সেসময় সংসদে দলমত নির্বিশেষে আলোচনার পরিবেশ থাকত। বিরোধী দলের উপস্থিতি এবং তাদের সমালোচনায় প্রাণবন্ত থাকত জাতীয় সংসদ। বিরোধী দলের কঠোর সমালোচনার জবাব দিতে সরকারদলীয় সদস্যদেরও প্রস্তুতি নিয়ে সংসদে হাজির হতে হতো। ফলে সংসদ কার্যত হয়ে উঠত গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রধান মঞ্চ।

তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংস্কৃতি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। বিশেষ করে বিগত ১৬ বছরে সংসদীয় বিতর্কের প্রাণবন্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গত প্রায় দেড় দশকে সংসদে বিরোধী দলের কার্যকর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম থাকায় বিতর্কের পরিবেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।

গত ১৬ বছরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক সময় বিরোধী দলের অনুপস্থিতি বা সীমিত অংশগ্রহণের কারণে সংসদে আলোচনা একমুখী হয়ে পড়েছিল। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বিল বা নীতিগত সিদ্ধান্ত পাসের ক্ষেত্রে গভীর বিতর্কের সুযোগও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত ছিল। সংসদে বিরোধী দলের কণ্ঠ দুর্বল হলে গণতান্ত্রিক বিতর্কও স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমন মত অনেক বিশ্লেষকের। যেমন বিখ্যাত চিন্তক জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর ‘অন লিবার্টি’ ও ‘কনসিডারেশনস অন রিপ্রেজেনটেটিভ গভর্নমেন্ট’ বইয়ে বলেছেন, কোনো সত্যই পূর্ণাঙ্গ নয় যতক্ষণ না তাকে বিরোধী পক্ষের যুক্তির মুখোমুখি হতে হয়।

অন্যদিকে সংসদীয় আচরণ ও বক্তব্যের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। অতীতে সংসদে বক্তব্যের সময় তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, নীতি-আলোচনা ও রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন বেশি দেখা যেত। তবে সর্বশেষ তিনটি সংসদে রাজনৈতিক আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ কিংবা দলীয় অবস্থান তুলে ধরার প্রবণতাই বেশি ছিল। এমনকি সংসদে স্তুতিমূলক গান গাইতেও দেখা গেছে সংসদ সদস্যদের।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় বিতর্কের শক্তিশালী সংস্কৃতি গড়ে উঠতে হলে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সংসদকে কেবল আনুষ্ঠানিক আইন পাসের জায়গা হিসেবে নয়, বরং নীতি, যুক্তি ও আলোচনার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। যেমন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল তাঁর ‘পলিয়ার্কি’ তত্ত্বে বলেছেন, ‘কার্যকর বিরোধিতার অধিকার গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদি বিরোধী দল দুর্বল থাকে, তবে সরকার জনগণের সত্যিকারের জনমত বা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর দাবি অগ্রাহ্য করতে পারে। ফলে জাতীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাণ হলো যুক্তি-তর্ক ও মতের বহুমাত্রিকতা। অতীতের সেই সমৃদ্ধ বিতর্কের ঐতিহ্য ফিরে পেলে সংসদ আবারও কার্যকর হয়ে উঠবে এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাও শক্তিশালী হবে।

বাংলাদেশের সংসদীয় বিতর্কের ইতিহাস আজ অনেকটাই ম্লান। প্রশ্ন উঠেছে, সংসদ কি আবার সেই প্রাণবন্ত বিতর্কের সংস্কৃতি ফিরে পাবে, যেখানে যুক্তি-তর্ক, তথ্য ও নীতিগত আলোচনায় মুখর থাকত অধিবেশন কক্ষ? নাকি একমুখী আলোচনার ধারা অব্যাহত থাকবে? উত্তরটি নির্ভর করছে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সংসদীয় চর্চার ওপরই।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত