জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ইসরায়েল-ইরান সংঘাত: বিশ্ব কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে?

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬, ২০: ০০
এআই জেনারেটেড ছবি

বাবা ভাঙ্গা আর নস্ত্রাদামুসের কয়েক শতাব্দী পুরোনো সতর্কবার্তা আজ আর কেবল কথার কথা বলে মনে হচ্ছে না; ২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্র যেন তাদের সেই প্রলয়ংকরী পূর্বাভাসকেই সত্য প্রমাণ করতে চাইছে। প্রতি বছর সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসা এই দুই ভবিষ্যদ্বক্তার বাণী এবার যেন ভিন্ন এক মাত্রা পেয়েছে। ২০২৬ সাল নিয়ে বাবা ভাঙ্গা বলে গিয়েছিলেন বিশ্বের পূর্বাঞ্চলে এক সংঘাত শুরু হবে যা ধীরে ধীরে পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়বে, আর নস্ত্রাদামুস ইঙ্গিত দিয়েছিলেন এক মহাজাগতিক সংকটের। বর্তমানে যখন ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধে পুরো পৃথিবী টালমাটাল, তখন এসব ‘পূর্বাভাস’ বিজ্ঞানীদের উপাত্ত-নির্ভর সংকেত আর রণক্ষেত্রের বাস্তবতাকে এক বিন্দুতে মিলিয়ে দিচ্ছে।

বর্তমান বিশ্ব আজ এক ভয়াবহ দোদুল্যমান অবস্থায়—একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি আর অন্যদিকে ইরানের ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-৪’-এর বিধ্বংসী ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। গত ১০০ ঘণ্টা ধরে ইসরায়েল ও গাল্ফ দেশগুলোর আকাশে বেজে চলা অবিরাম সাইরেন কেবল যুদ্ধের সংকেত নয়, বরং এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ভঙ্গুর বিশ্বব্যবস্থার আর্তনাদ। ছায়াযুদ্ধের পর্দা ছিঁড়ে যখন তেহরান ও তেল আবিব সরাসরি সম্মুখ সমরে লিপ্ত, তখন চীন-রাশিয়ার নেপথ্য সমর্থন এই আঞ্চলিক আগুনকে বৈশ্বিক দাবানলে রূপ দিচ্ছে।

ছায়াযুদ্ধ থেকে সরাসরি সংঘাত: এক নতুন বাস্তবতা

দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ সালের শুরুতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও আইআরজিসি প্রধানের মৃত্যু এই সংঘাতকে ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর চূড়ান্ত লড়াইয়ে রূপ দিয়েছে। এর ভয়াবহ জবাবে ইরান কেবল ইসরায়েল নয়, বরং বাহরাইনের ক্রাউন প্লাজা হোটেল এবং আবুধাবির ইত্তিহাদ টাওয়ারের মতো কৌশলগত স্থাপনায় নিখুঁত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যেখানে মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের অবস্থান নিশ্চিত ছিল।

অপারেশন ‘ট্রু প্রমিজ-৪’-এর ১৯তম দফায় ইরান এ পর্যন্ত প্রায় ৫৮৫টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ১,৫২২টি ড্রোন ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন প্রতিরক্ষা বলয়কে তছনছ করে দিয়েছে। চীনের রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট ডাটা ব্যবহার করে চালানো এই হামলায় তেল আবিবসহ ১৯৪টি বসতিতে একযোগে সাইরেন বেজে ওঠে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে পুরোপুরি ধসিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে প্রতিপক্ষের ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের মজুত ফুরিয়ে আসায় এবং তেলের দাম ১৫% বৃদ্ধি পাওয়ায় এই সংঘাত এখন একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও সামরিক মহাপ্রলয়ের রূপ নিয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্যের লড়াই: ইরান কি একা?

ইরান বর্তমানে মোটেও একা নয়; বরং চীনের উন্নত স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক এবং রাশিয়ার রিয়েল-টাইম কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্সের সমন্বিত শক্তিতে তারা আজ এক অপরাজেয় গোয়েন্দা বলয় তৈরি করেছে। বাহরাইন ও আবুধাবির হাই-প্রোফাইল ভবনগুলোতে নিখুঁত ড্রোন হামলা প্রমাণ করে যে, ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের কৌশলগত চুক্তির আড়ালে বেইজিং সরাসরি তেহরানকে নিখুঁত টার্গেট ডাটা সরবরাহ করছে। এই ত্রিভুজ জোটের গোপন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ওয়াশিংটনের সনাতন গোয়েন্দা আধিপত্যকে চূর্ণ করে ২০২৬ সালের রণক্ষেত্রে এক নতুন 'সভ্যতা-রাষ্ট্র' শক্তির উত্থান ঘটিয়েছে।

রিয়েল-টাইম ইন্টেলিজেন্স ও ড্রোন যুদ্ধের নতুন সমীকরণ

অনেকেই ইরানের গোয়েন্দা সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করেছিলেন, কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চ মাসের ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ-৪’ সেই ধারণা পাল্টে দিয়েছে। বাহরাইনের মানামায় অবস্থিত ক্রাউন প্লাজা হোটেলে নিখুঁত ড্রোন হামলা, যেখানে আমেরিকার ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ারের দুই কর্মকর্তা আহত হয়েছেন, তা প্রমাণ করে ইরানের কাছে উচ্চপর্যায়ের রিয়েল-টাইম ইন্টেলিজেন্স রয়েছে।

আবুধাবির ইত্তিহাদ টাওয়ার কমপ্লেক্সে ইসরায়েলি দূতাবাসের ফ্লোর লক্ষ্য করে চালানো হামলা কিংবা নির্দিষ্ট অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের টার্গেট করা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরান এখন কেবল স্যাটেলাইট ইমেজের ওপর নির্ভর করছে না, বরং চীনের পক্ষ থেকে আসা সেকেন্ডে সেকেন্ডে সরাসরি গোয়েন্দা তথ্য ও কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করছে। ইরানের প্রায় ৫৮৫টি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ১,৫২২টি ড্রোনের এই বিশাল বহর পরিচালনায় চীনের হাই-টেক নেভিগেশন সাপোর্ট এক অপরাজেয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এই ড্রোনগুলো দুবাইয়ের রাডারকে ফাঁকি দিয়ে লো-অল্টিটিউডে উড়ে গিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের তথাকথিত নিশ্ছিদ্র প্রতিরক্ষা বলয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মূলত চীনের প্রযুক্তিগত ছত্রছায়ায় ইরান এখন মার্কিন ও ইসরায়েলি মুভমেন্টের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছে।

ত্রিভুজ জোট ও দুই হাজার বছরের সভ্যতার ঐক্য

রাশিয়া, চীন ও ইরানের মধ্যকার এই কৌশলগত সহযোগিতা কেবল বর্তমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দুই হাজার বছরের ঐতিহাসিক সম্পর্কের এক আধুনিক প্রতিফলন। সপ্তম শতাব্দীর সাসানীয় পারস্য এবং চীনের তাং রাজবংশের মধ্যকার সিল্ক রোড বাণিজ্যের সেই প্রাচীন বন্ধন আজ ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল অবকাঠামো বনাম জ্বালানি চুক্তিতে রূপ নিয়েছে। চীনের কাছে ইরান এখন কেবল একটি দেশ নয়, বরং তাদের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ'-এর প্রধান কানেক্টিভিটি করিডর এবং জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মস্কোতে পুতিনের ঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক সের্গেই কারাগানভ যেমনটা বলছেন, এই ‘গ্রেটার ইউরেশিয়া পার্টনারশিপ’ মূলত পশ্চিমের আধিপত্য ভাঙার এক দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। গত বছরের শেষ দিকে পুতিনকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টার পর রাশিয়া এখন আমেরিকানদের সাথে কোনো ধরণের কূটনৈতিক আলোচনার নাটক থেকে সরে এসেছে। লাভরভের ঘোষণা অনুযায়ী, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার এই যুদ্ধকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে ‘ইম্পসিবল’ করে তোলার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ব্রিকস এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে এই ত্রিভুজ জোট এখন ইউরেশিয়ার কেন্দ্রে একটি নতুন পরাশক্তি বলয় তৈরি করেছে, যা ওয়াশিংটনের ‘বর্বর’ নীতিনির্ধারকদের হিসাবের বাইরে।

অর্থনৈতিক ও অ্যাট্রিশন যুদ্ধের কৌশল

ইরান সরাসরি বড় যুদ্ধের বদলে দীর্ঘমেয়াদী অ্যাট্রিশন যুদ্ধের কৌশল নিয়েছে, যার মূল লক্ষ্য প্রতিপক্ষকে আর্থিকভাবে ক্লান্ত করা। এই কৌশলে সস্তা ড্রোন ও মিসাইল ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের অত্যন্ত ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক রুটগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ফলে সামরিক সংঘাতের চেয়েও অর্থনৈতিক ক্ষতি ও সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হওয়ার চাপ প্রতিপক্ষকে কৌশলগতভাবে পিছু হটতে বাধ্য করে।

ব্যয় বৈষম্য

২০২৬ সালের যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানের গৃহীত অ্যাট্রিশন যুদ্ধের কৌশলটি মূলত একটি সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ফাঁদ। ইরানের প্রতিটি 'শাহেদ' ড্রোনের উৎপাদন খরচ মাত্র ২৫ থেকে ৫০ হাজার ডলার, অথচ এগুলো ধ্বংস করতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ৫ থেকে ১২ মিলিয়ন ডলার মূল্যের প্যাট্রিয়ট বা থাড ইন্টারসেপ্টর মিসাইল ব্যবহার করতে হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ মার্চের মধ্যে ইরান প্রায় ১,৫২২টি ড্রোন এবং ৫৮৫টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়েছে, যা প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা বাজেটে কয়েক বিলিয়ন ডলারের বিশাল গর্ত তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইরানের হাইপারসোনিক মিসাইল ঠেকাতে প্রতিটি ১২.৬ মিলিয়ন ডলারের থাড ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারের এই অসম যুদ্ধ আমেরিকার পেন্টাগনকেও আর্থিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই খরচের ব্যবধান বা 'কস্ট-ইমপোজিশন স্ট্র্যাটেজি' মূলত পশ্চিমাদের সামরিক সক্ষমতাকে অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া করার এক দীর্ঘমেয়াদী নীল নকশা।

স্টক সংকট

সামরিক সক্ষমতার চেয়েও বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের দ্রুত ফুরিয়ে আসা মজুদ। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল, ইউএই এবং বাহরাইনের মতো দেশগুলোর কাছে বর্তমানে মাত্র ১ থেকে ২ সপ্তাহের আক্রমণ ঠেকানোর মতো ইন্টারসেপ্টর অবশিষ্ট আছে। গত জুন মাসে আমেরিকা একাই ১৫০টি থাড ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করার পর তাদের বর্তমান স্টক আশঙ্কাজনক পর্যায়ে নেমে এসেছে।

ইউএই দাবি করছে যে, প্রতিদিনের তীব্র ড্রোন হামলার মুখে তাদের প্রতিরক্ষা মজুদ কয়েক দিনের মধ্যেই শূন্য হয়ে যেতে পারে। যদি ইরান পরবর্তী দুই সপ্তাহ একইভাবে আক্রমণ চালিয়ে যেতে পারে, তবে ইসরায়েল ও গাল্ফ দেশগুলো আকাশপথে সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়বে। ইরানের এই 'লঞ্চার বনাম ইন্টারসেপ্টর' ক্যালকুলাসই মূলত নির্ধারণ করছে যে, সামনের দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

তেলের বাজারে অস্থিরতা

রণক্ষেত্রের বাইরে এই সংঘাতের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিঘাত লেগেছে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে। ইরানের ড্রোন হামলার সরাসরি প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতিমধ্যে ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো 'ট্যাক্স-ফ্রি হ্যাভেন' এবং বৈশ্বিক ট্রেডিং হাবগুলোর নিরাপত্তা ইমেজ এখন ধূলিসাৎ, কারণ দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট ও বুর্জ আল আরবের মতো ল্যান্ডমার্কে ইরানি ড্রোন সরাসরি আঘাত হেনেছে। ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক আরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতা মিলে পুরো বিশ্বকে এক প্রলম্বিত মুদ্রাস্ফীতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। তেলের দামের এই ঊর্ধ্বগতি এবং বাণিজ্যিক করিডোরগুলোর অনিরাপত্তা প্রমাণ করছে যে, এই যুদ্ধ কেবল সামরিক শক্তির নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার এক বৈশ্বিক সংঘাত।

ধর্মযুদ্ধের উসকানি ও আদর্শিক সংঘাত

২০২৬ সালের এই সংঘাত এখন আর কেবল ভূ-রাজনৈতিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি ভয়াবহ মধ্যযুগীয় ধর্মযুদ্ধের রূপ নিয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইরানিদের বাইবেলে উল্লিখিত প্রাচীন শত্রু ‘আমালেক’-এর সঙ্গে তুলনা করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ সমূলে বিনাশের যে উগ্র বয়ান দিয়েছেন, তা গাজার পর এখন তেহরানের দিকে ধাবিত হচ্ছে। অন্যদিকে মার্কিন ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান গোষ্ঠী এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কট্টরপন্থী কমান্ডাররা এই যুদ্ধকে ‘গডস ডিভাইন প্ল্যান’ বা ঈশ্বরের দৈব পরিকল্পনা বলে অভিহিত করছেন। তারা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘জিসাসের দ্বারা অভিষিক্ত’ নেতা হিসেবে প্রচার করে এই সংঘাতকে বাইবেলে বর্ণিত মহাপ্রলয় বা ‘আর্মাগেডন’-এর দিকে উসকে দিচ্ছেন।

এই উগ্র ধর্মীয় মতাদর্শের প্রভাবে মার্কিন সেনারা যুদ্ধকে তাদের পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে দেখছে, যা আধুনিক রণক্ষেত্রকে এক রক্তক্ষয়ী ক্রুসেডে পরিণত করেছে। জায়নিস্ট এবং খ্রিস্টান ডানপন্থীদের এই সম্মিলিত ‘মেসিয়ানিক’ উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিশ্বশান্তিকে বিসর্জন দিয়ে এক ধর্মীয় মহাবিপর্যয়ের পথ প্রশস্ত করছে। আদর্শিক এই উন্মাদনা পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোকে এমন এক বিন্দুতে নিয়ে গেছে, যেখান থেকে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব।

ট্রাম্পের আধিপত্যবাদ ও ন্যাটোর মৃত্যুঘণ্টা

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এখন এক চরম আধিপত্যবাদে রূপ নিয়েছে, যার প্রথম শিকার হয়েছে ভেনেজুয়েলা এবং কয়েক দশকের পুরনো সামরিক জোট ন্যাটো। ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গ্রিনল্যান্ড দখলের আকস্মিক হুমকি এবং ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর নজিরবিহীন শুল্ক আরোপ ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ ফাটলকে চূড়ান্ত বিচ্ছেদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের ফলে জাতিসংঘ এখন বিশ শতকের অকার্যকর ‘লীগ অফ নেশনস’-এর প্রেতাত্মায় পরিণত হয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের উন্মুক্ত সংঘাত বিশ্বসংস্থাকে এক ‘খোঁড়া হাতি’তে রূপান্তরিত করেছে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন যে, তারা ইউরেশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার এই যুদ্ধংদেহী মিশনকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে ‘ইম্পসিবল’ বা অসম্ভব করে তুলবেন। মস্কোর এই হুঁশিয়ারি এবং ট্রাম্পের একতরফা আগ্রাসন প্রমাণ করে যে, পরাশক্তিগুলোর মধ্যে আলোচনার ন্যূনতম জায়গাটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। মূলত গ্রিনল্যান্ড ইস্যু থেকে শুরু করে মেক্সিকো ও কিউবাকে দেওয়া সামরিক হুমকি বিশ্বকে এক নৈরাজ্যবাদী মেরুকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কূটনীতির পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং মিত্রদের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতায় ২০২৬ সালটি ন্যাটোর মৃত্যুঘণ্টা এবং একটি নতুন অস্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থার সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

২০২৬ সালের এই অগ্নিগর্ভ সময় ইতিহাসের এক চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে, যেখানে ছায়াযুদ্ধের পর্দা ছিঁড়ে পরাশক্তিগুলো সরাসরি একে অপরের মুখোমুখি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির পাঠানো সামরিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ট্রাম্প প্রশাসন যখন ইরানের ‘শাহেদ’ ড্রোন ঠেকানোর প্রযুক্তিগত কৌশল খুঁজছে, ঠিক তখনই ক্রেমলিন থেকে লাভরভের ঘোষণা এই যুদ্ধকে ‘অসম্ভব’ করে তোলার শপথ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন কেবল ড্রোন আর মিসাইলের রণক্ষেত্র নয়, বরং এটি ওয়াশিংটন, মস্কো এবং বেইজিংয়ের শক্তির মহড়া। গত কয়েক দিনের হামলায় দুবাই ও আবুধাবির মতো নিরাপদ বাণিজ্যিক হাবগুলোর পতন এবং তেলের বাজারে ১৫% ঊর্ধ্বগতি প্রমাণ করে যে, বিশ্ব এক দীর্ঘমেয়াদী অনিশ্চয়তার যুগে প্রবেশ করেছে। এই সংঘাতের সমীকরণ এখন আর হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিস কিংবা তেহরানের নীতিনির্ধারকদের টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি এখন ড্রোনের উৎপাদন ক্ষমতা আর ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের অবশিষ্ট মজুদের ওপর ঝুলে আছে।

পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্য আর কখনোই তার আগের স্থিতিশীলতায় ফিরে যেতে পারবে না; এই অঞ্চলের মানচিত্র ও ভূ-রাজনীতি এখন এক আমূল পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে। হয় শিয়া-সুন্নি একতাবদ্ধ হয়ে এই পশ্চিমা আধিপত্যবাদ ও ‘আমালেক’ তত্ত্বের মতো চরমপন্থী বয়ানকে রুখে দেবে, অন্যথায় পুরো ইউরেশিয়া অঞ্চল আগামী কয়েক দশকের জন্য এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। ২০২৬ সালের এই বসন্ত কি তবে মানব ইতিহাসের শেষ বসন্ত হতে যাচ্ছে—এই প্রশ্নটি এখন প্রতিটি বিশ্বনাগরিকের মনে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। যদি কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর হস্তক্ষেপ ব্যর্থ হয়, তবে আধুনিক সভ্যতার চাকাটি পারমাণবিক যুদ্ধের এক অন্ধকার গহ্বরে নিমজ্জিত হবে। বাবা ভাঙ্গা বা নস্ত্রাদামুসের ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং বর্তমানে তছনছ হয়ে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থা এবং পরাশক্তিগুলোর একগুঁয়েমিই বলে দিচ্ছে যে, আমরা হয়তো নিজেদের অজান্তেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি।

সম্পর্কিত