পেডোফিলিয়া কী, কেন বাড়ছে উদ্বেগজনকভাবে

প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬, ১৬: ৪২
স্ট্রিম গ্রাফিক

গত বছরের মার্চে মাগুরায় আট বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণের ঘটনায় উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি ওঠে সর্বত্র। বিচারিক আদালত প্রধান আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রায় কার্যকর হয়নি। মামলাটি এখনও আপিলের ধাপে ঝুলে আছে।

এই ঘটনার এক বছর যেতে না যেতেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি নির্জন এলাকায় গলাকাটা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় সাত বছরের শিশু ইরাকে। রক্তাক্ত ছোট্ট শরীর নিয়ে নিজেই বেরিয়ে আসে সাহায্যের আশায়। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ২০২৬ সালের ৩ মার্চ ভোরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তার। চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেন, ইরাও ধর্ষণের শিকার হয়েছিল।

এরপর গত ১৯ মে সকালে আবারও এক শিশু হত্যাকাণ্ডের খবরে কেঁপে ওঠে পুরো দেশ। নাম রামিসা। প্রতিবেশীর বিকৃতির শিকার হয়ে জীবন দিতে হয় এই ছোট্ট শিশুকে। তবে এই নিষ্ঠুরতার তালিকা এখানেই শেষ নয়। হয়ত আমাদের আশেপাশে এমন আছিয়া, রামিসা বা ইরা আছে, যাদের সঙ্গে অন্যায় ঘটলেও তার কিছুই আমরা জানি না। আমাদের সমাজে পেডোফিলিয়া বা শিশুকাম এখন এমন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, ভাগ্য খুব ভালো না হলে ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে প্রায় সবাইকে এই বিকৃত পেডোফাইলদের হাতে পড়তে হয়।

সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার সাত থেকে বারো বছরের শিশুরা

কিছুদিন আগেও মেয়ে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হতো অভিভাবকদের। কিন্তু সময় পাল্টেছে, পাল্টেছে অপরাধের ধরনও। শিশুদের যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের বেলায় ছেলে-মেয়ে বিচার করে না অপরাধীরা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র চার মাসে ১৫ জন ছেলেশিশু ধর্ষণের শিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এই আক্রান্তদের মধ্যে ১২ জনই ছিল ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী ছেলে শিশু। এছাড়া এই একই সময়ে অন্যান্য সাধারণ যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে আরও ৯টি।

মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে এই চিত্র আরও বেশি শিউরে ওঠার মতো। গত চার মাসে ধর্ষণ ও গণ-ধর্ষণ মিলিয়ে মোট আক্রান্ত হয়েছে ৮১ জন মেয়ে শিশু। এর মধ্যে ছয় বছরের নিচে ১৬ জন মেয়ে শিশু, সাত থেকে বারো বছরের মধ্যে ৪০ জন এবং তেরো থেকে আঠারো বছরের মধ্যে ২৫ জন শিশু এই পাশবিকতার শিকার হয়েছে। এই চার মাসে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছে ১২ জন মেয়ে শিশু।

‘পেডোফিলিয়া’ বলতে কী বোঝায়

সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের ওপর পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা সমাজকে এক ভয়ানক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এই অপরাধগুলোর পেছনে যে মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি কাজ করে, তা নিয়ে আমাদের ধারণা বেশ সীমিত। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যারা শিশুদের প্রতি যৌন আকৃষ্ট হয় বা তাদের সঙ্গে যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হয় কিংবা হতে চায়, তারা ‘পেডোফিলিয়া’ আক্রান্ত। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধি হয়নি এমন শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণকে ‘পেডোফিলিয়া’ বলা হয়। মানসিক রোগের আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা ‘ডিএসএম-৫-টিআর’ অনুযায়ী, এই রোগটি নিশ্চিত করতে হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বয়স ১৬ বছরের বেশি হতে হবে এবং সে যার সঙ্গে এই সম্পর্কে জড়াচ্ছে, তার চেয়ে তাকে অন্তত ৫ বছরের বড় হতে হবে।

তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই নিয়মের সঙ্গে আইনি নিয়মের পার্থক্য থাকতে পারে।

এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের এমফিল গবেষক শুভাশিষ কুমার চ্যাটার্জী। তিনি বলেন, পেডোফিলিয়া ব্যক্তির মানসিক বিকৃতি বা বিচ্যুতি। অর্থাৎ ব্যক্তির মানুষের সুস্থ-স্বাভাবিক আচরণ থেকে সরে যাওয়াকে আমরা মানসিক বিকৃতি বলে থাকি।

সাধারণত বিকৃতির ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজের আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে। কিছু ব্যবস্থা নিলে সে এই অবস্থা থেকে সরে আসতে পারে বা পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু পেডোফিলিয়ায় আক্রান্ত অপরাধী বা বিকৃতমনা ব্যক্তিরা এই মানসিক বিচ্যুতি দীর্ঘদিন ধরে নিজের ভেতর লালন করতে থাকে। কারণ তারা এই অস্বাভাবিক আচরণ থেকে এক ধরণের ‘রিইনফোর্সমেন্ট’ বা বিকৃত আনন্দ বা সুখ পায়। এই মানসিক বিকৃতি যাদের রয়েছে তাদের মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘পেডোফাইল’।

মানসিক রোগের ক্ষেত্রে অনেক সময় রোগীর ইনসাইট থাকে না বা আংশিক থাকে, অর্থাৎ সে বুঝতে পারে না যে সে অসুস্থ। কিন্তু বিকৃতির ক্ষেত্রে অধিকাংশেরই ইনসাইট বা কাণ্ডজ্ঞান থাকে। সাধারণত পেডোফাইলরা খুব ভালো করেই জানে তারা অপরাধ করছে। কিন্তু তারা নিজেদের এই বিকৃতিকে সমস্যা হিসেবে স্বীকার করতে চায় না।

পেডোফাইলদের চিনবেন কীভাবে

সাধারণত নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে পেডোফিলিয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। গবেষক শুভাশিষ কুমার চ্যাটার্জির তথ্যমতে, পেডোফিলিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা বেশ চতুর এবং ছদ্মবেশী বা ম্যানিপুলেটিভ হয়ে থাকে। তাই বাইরে থেকে দেখে এদের চেনা কঠিন। সাধারণত এদের শনাক্ত করার জন্য বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার ও ফরেনসিক আচরণ বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়।

মনস্তাত্ত্বিক স্ক্রিনিংয়ের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইসিডি-১০ এবং ডিএসএম-৫ নির্দেশিকা রয়েছে। এই টেস্টের মাধ্যমে ব্যক্তিত্বের বিশৃঙ্খলা ও ইমপালস কন্ট্রোল বা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা মাপা যায়। টেস্টের স্কোর যদি নির্দিষ্ট মাত্রা অর্থাৎ ৫ বা তার বেশি অতিক্রম করে, তবে ব্যক্তির ভেতরের সমাজবিরোধী, বিকৃত মানসিক বিশৃঙ্খলা ধরা পড়ে। অর্থাৎ চোখ-কান খোলা রাখা ছাড়া পেডোফাইলদের শনাক্ত করার সুযোগ খুব কম।

চিকিৎসকদের রেফারেন্স বই হিসেবে ব্যবহৃত ‘এমএসডি ম্যানুয়ালস’- এ পাওয়া তথ্যমতে, পেডোফাইলদের প্রধান শিকার ছেলে নাকি মেয়ে, তা পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। পেডোফাইলরা ছোট ছেলে, ছোট মেয়ে অথবা উভয়ের প্রতিই সমানভাবে আকর্ষিত হতে পারে। তবে বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে, যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে মেয়েরাই বেশি শিকার হয়ে থাকে।

অপরাধের ধরনও ভিন্ন প্রকৃতির

পেডোফিলিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অপরাধের ধরনও ভিন্ন ভিন্ন হয়।

কিছু পেডোফাইল কেবল একটি নির্দিষ্ট বয়স বা শারীরিক গঠনের শিশুদের প্রতিই আকর্ষণ বোধ করে। আবার অনেকে শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক, উভয়ের প্রতিই সমানভাবে আকর্ষিত হতে পারে।

এমনকি অনেকেই আছে যারা শিশুদের প্রতি বিকৃত আকর্ষণ বোধ করলেও কখনও তা কাজেকর্মে প্রকাশ করে না। এটা হতে পারে সুযোগের অভাবে কিংবা নিজেকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।

কারও কারও আবার সরাসরি আক্রমণ করার চেয়ে দূর থেকে লুকিয়ে দেখা, ছবি বা ভিডিও ধারণ করা কিংবা ‘ব্যাড টাচের’ বদলে সাধারণভাবে স্পর্শ করার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

তবে হিংস্র প্রকৃতির পেডোফাইলরা শিশুদের যৌনকর্মে বাধ্য করতে বলপ্রয়োগ করে বা ভয়ভীতি দেখায়। শিশুটি যাতে কাউকে কিছু না বলে, সেজন্য তাকে বা তার প্রিয় পোষা প্রাণীকে মেরে ফেলার হুমকিও দেয় কেউ কেউ।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নির্যাতনকারী ব্যক্তি শিশুটির পূর্বপরিচিত বা চেনা কেউ হয়ে থাকে। সে হতে পারে পরিবারের কোনো আপন সদস্য,পাড়াপ্রতিবেশি কিংবা শিক্ষক।

পেডোফিলিয়ার কারণ কী

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, পেডোফিলিয়া বা শিশুদের প্রতি এই বিকৃত আকর্ষণের পেছনে কিছু মনস্তাত্ত্বিক কারণও থাকতে পারে, আবার সামাজিক কারণও থাকতে করে। প্রথমত, এ ধরনের বিকৃতমনা ব্যক্তির ব্যক্তিত্বে কিছু বিশৃঙ্খলা থাকে, যাকে সাইকোলজির ভাষায় ‘পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার’ বলা হয়। বিশেষ করে তাদের মধ্যে অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার বা সমাজবিরোধী ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য বেশি দেখা যায়। গবেষক শুভাশিষ কুমার চ্যাটার্জি বলেন, পেডোফাইলদের ভেতর সহানুভূতির অভাব থাকে এবং সাধারণত অপরাধ করার পর কোনো অনুশোচনা বা অনুতাপ দেখা যায় না।

মনোবিশ্লেষক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনুযায়ী, এই বিকৃতির পেছনে ‘ডিসপ্লেসমেন্ট’ বা ‘ক্ষোভের ভুল বহিঃপ্রকাশ’ কাজ করতে পারে। অনেকসময় দেখা যায় পেডোফিলিয়ার শিকার ব্যক্তিরা অনেক সময় তাদের ব্যক্তিগত বা দাম্পত্য জীবনে সুখী বা তৃপ্ত থাকে না। এই অতৃপ্তি বা অপ্রাপ্তির কারণে তারা নিজেদের ক্ষমতাহীন মনে করতে পারে। যেহেতু শিশুদের কোনো শারীরিক ক্ষমতা নেই এবং তারা প্রতিরোধ করতে পারে না, তাই এই বিকৃতমনা ব্যক্তিরা শিশুদের ওপর নিজেদের ক্ষমতা জাহির করতে চায়। শিশুদের নির্যাতন বা ধর্ষণ করে তারা নিজেদের শক্তিশালী ভাবার চেষ্টা করে, নিজেদের জীবনের অপ্রাপ্তিগুলোকে জাস্টিফাই করে।

পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ সামাজিকীকরণও এর জন্য দায়ী। এ ছাড়া পারিবারিক অশান্তি, মা-বাবার মধ্যে খারাপ সম্পর্ক, নৈতিক ও সামাজিক বিকাশের অভাব, মাদকাসক্তি এবং সঠিক মূল্যবোধ না শেখার কারণে মনের ভেতর এই বিকৃতি দানা বাঁধতে পারে। এদের অনেকের মাঝেই মাদকের ভয়াবহ ইতিহাস পাওয়া যায়। এমনও রেকর্ড আছে যেখানে দেখা যায়, এই পেডোফাইলদের অনেকেই ছোটবেলায় কোনো না কোনোভাবে অন্য কারও দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল।

সমাজে পেডোফিলিয়া বাড়ছে কেন

গবেষকেরা বলছেন, পেডোফিলিয়া শুধু ব্যক্তিগত ‘নৈতিক ব্যর্থতার’ কারণে ঘটে না। এর পেছনে মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক ও ডিজিটাল পরিবেশও প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। মার্কিন সাময়িকী জেএএমএ নেটওয়ার্কে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, শৈশবে যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক বিকার ও মাদকাসক্তি—এসব বিষয় ভবিষ্যতে বিকৃত যৌন আচরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

আবার চাইল্ড অ্যাবইউজ অ্যান্ড নেগলেক্ট জার্নালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারে সহিংসতা, আবেগগত অবহেলা, বিকৃত যৌন ধারণা, আত্মনিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা ও সামাজিক দক্ষতার ঘাটতি শিশু যৌন নির্যাতনের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত।

ডিজিটাল যুগেও এ সংকট নতুন মাত্রা পেয়েছে। অনলাইন পর্নোগ্রাফি, গোপন নেটওয়ার্ক ও শিশু নির্যাতনমূলক কনটেন্টের সহজলভ্যতা অনেক ক্ষেত্রে বিকৃত আকাঙ্ক্ষাকে স্বাভাবিক করে তুলছে বলে কর্নেল ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে।

তবে গবেষকেরা এটিও জোর দিয়ে বলেন, শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ থাকা আর শিশু নির্যাতন করা এক জিনিস নয়। অনেকেই কোনো অপরাধে জড়ান না; বরং চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

সম্পর্কিত