‘তেলাপোকাদের’ ধরপাকড় ঘিরে চাপ বাড়ছে, কী চাইছে ককরোচ জনতা পার্টি

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৫: ০৯
ভারতে ককরোচদের আন্দোলন। ছবি: ইনস্ক্রিপ্ট থেকে নেওয়া

কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর দিল্লির যন্তর মন্তরে চলা দীর্ঘ নিট প্রশ্নফাঁস-বিরোধী আন্দোলন শেষ হলেও, আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তাদের লড়াই এখনও শেষ হয়নি। সংগঠনের দাবি, সরকারের সঙ্গে যে সমঝোতার ভিত্তিতে আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছিল, তার অন্যতম শর্ত ছিল আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহার এবং গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্র-যুবকদের মুক্তি। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হলে তারা ফের রাস্তায় নামবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছিল।

এই চাপের মধ্যেই বিজেপি-শাসিত বিহার, আসাম এবং মহারাষ্ট্র সরকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি পদক্ষেপ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে ধর্মতলার বিক্ষোভে গ্রেপ্তার হওয়া ১৬ জন আন্দোলনকারী জামিন পেয়েছেন। তবে উত্তরপ্রদেশে এখনও পুলিশি ধরপাকড় অব্যাহত রয়েছে। ফলে আন্দোলন না চললেও রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক শেষ হয়নি।

যন্তর মন্তরের আন্দোলন শুরু হয়েছিল নিটসহ একাধিক সর্বভারতীয় পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়ম এবং শিক্ষাক্ষেত্রে জবাবদিহির দাবিকে সামনে রেখে। প্রথমে এটি দিল্লিকেন্দ্রিক ছাত্র আন্দোলন হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বিহার, আসাম, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশসহ দেশের একাধিক রাজ্যে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় বহু শহরে সংহতি মিছিল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি হয়।

আন্দোলনের চাপের মুখে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে একাধিক দফা বৈঠক হয়। সিজেপির দাবি, সেই আলোচনায় সরকার আশ্বাস দিয়েছিল যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-যুবকদের বিরুদ্ধে আর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর সংগঠনটি আন্দোলন স্থগিত করলেও তারা জানিয়ে দেয়, মামলা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না হলে আবার আন্দোলন শুরু হবে।

২৭ জুলাই গভীর রাত পর্যন্ত সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সিজেপি নেতৃত্বের বৈঠক চলে। বৈঠকের পর সংগঠনের মুখপাত্র সৌরভ দাস এক্সে লেখেন—‘কোনো আন্দোলনকারীকে একা ফেলে রাখা হবে না।’ তাঁর দাবি, সরকার বিভিন্ন রাজ্যে মামলা প্রত্যাহার এবং আটক আন্দোলনকারীদের মুক্তির বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে।

এর পরেই প্রথম বড় পদক্ষেপ দেখা যায় বিহারে। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানায়, ২৬ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার আগে আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো শাস্তিমূলক আইনি পদক্ষেপ নেবে না। বিহার পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২৫ জুলাই মোট ৬৯৪ জনকে আটক করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ৩৩৯ জন নাবালক হওয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকি ৩৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি পদক্ষেপও প্রত্যাহারের পথে।

আসাম সরকারও একই ধরনের অবস্থান নিয়েছে। রাজ্যে নিট আন্দোলনের সময় মোট ১৩ জন আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পাঁচটি মামলার ভিত্তিতে এই গ্রেপ্তার হয়। রাজ্য সরকার জানিয়েছে, ওই সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করে আন্দোলনকারীদের মুক্তি দেওয়া হবে।

মহারাষ্ট্রেও বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেবেন্দ্র ফড়ণবীস সরকার। মুম্বইয়ের ওরলি, দাদর, সিয়ন, মাহিম এবং শিবাজি পার্ক থানায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মোট ১৩টি মামলা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক মামলা করা হয়েছিল। সরকারের সিদ্ধান্তে আপাতত স্বস্তি পেয়েছেন তাঁরা।

শীর্ষ আদালত বলেছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব পুলিশের থাকলেও সেই অজুহাতে নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব করা যায় না। তবে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের বক্তব্য, বর্তমান মামলাগুলোতে শুধু প্রতিবাদ নয়, অপরাধমূলক কাজেরও অভিযোগ রয়েছে। তাই সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ এখানে সরাসরি প্রযোজ্য নয়।

পশ্চিমবঙ্গেও আন্দোলন ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। কলকাতার ধর্মতলায় বিক্ষোভের সময় ১৬ জন আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ব্যাঙ্কশাল আদালত গ্রেপ্তারকৃত সকলকেই জামিন দেয়। তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার জন্যই তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

অন্যদিকে উত্তরপ্রদেশে অন্তত ১০ জন আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বিজেপির স্থানীয় নেতাদের অভিযোগের ভিত্তিতে পাঁচটি এফআইআর দায়ের হয় এবং সেই মামলার ভিত্তিতেই এই গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশের দাবি।

উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জেলায়ও ছাত্র-যুবদের বিক্ষোভে প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে মিছিল হয়েছিল। দিল্লির আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়েই এই কর্মসূচিগুলি নেওয়া হয়। কিন্তু বিক্ষোভের পর পুলিশ রাস্তা অবরোধ, সরকারি কাজে বাধা এবং আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অভিযোগে মামলা দায়ের করে।

আন্দোলনকারীদের বক্তব্য অবশ্য সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিবাদ ছিল শান্তিপূর্ণ। শুধুমাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণেই তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ আনা হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা।

এই ঘটনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ। শীর্ষ আদালত বলেছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব পুলিশের থাকলেও সেই অজুহাতে নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব করা যায় না। তবে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের বক্তব্য, বর্তমান মামলাগুলোতে শুধু প্রতিবাদ নয়, অপরাধমূলক কাজেরও অভিযোগ রয়েছে। তাই সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ এখানে সরাসরি প্রযোজ্য নয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ অবশ্য এই যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, কোনো আন্দোলনকে অপরাধমূলক বলে চিহ্নিত করার আগে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। শুধুমাত্র রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হলে তা গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন তুলতে পারে।

এদিকে দিল্লিতেও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সিপিএম অভিযোগ করেছে, এসএফআই-এর যুগ্ম সম্পাদক ঐশী ঘোষকে পুরনো একটি মামলায় গ্রেপ্তারের চেষ্টা করেছে দিল্লি পুলিশ। তাদের দাবি, যন্তর মন্তরে সিজেপির আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যদিও এই অভিযোগ নিয়ে দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

আন্দোলনের প্রভাব সংসদেও পৌঁছেছে। লোকসভায় বিরোধীরা মোদী সরকারের আমলে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের একাধিক ঘটনার তালিকা তুলে ধরে কেন্দ্রকে আক্রমণ করেছে। সরকারের জবাব, পরীক্ষা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করতে সংস্কারের কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রুখতে কঠোর আইন আনা হবে।

আপাতত দিল্লির ধর্নামঞ্চ সরিয়ে নেওয়া হলেও আন্দোলনের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ভর করছে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। বিহার, আসাম এবং মহারাষ্ট্র মামলা প্রত্যাহারের পথে হাঁটলেও উত্তরপ্রদেশে এখনও গ্রেপ্তার ও মামলার প্রক্রিয়া চলছে। পশ্চিমবঙ্গে ধৃতদের জামিন মিলেছে, কিন্তু মামলা প্রত্যাহার নিয়ে এখনও স্পষ্ট ঘোষণা নেই।

সিজেপি ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, তাদের কাছে আন্দোলনের সাফল্য শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ নয়। যাঁরা আন্দোলনে অংশ নিয়ে আইনি জটিলতায় পড়েছেন, তাঁদের সম্পূর্ণ মুক্তি এবং সব মামলা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তারা বিষয়টিকে শেষ বলে মনে করছে না। ফলে যন্তর মন্তরের আন্দোলন আপাতত থেমে থাকলেও, তার রাজনৈতিক ও আইনি অভিঘাত আগামী দিনেও দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত