এক্সপ্লেইনার
মাহবুবুল আলম তারেক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিকে ঘিরে শুরু হয়েছে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধ, যেখানে মুখোমুখি বিশ্বের দুই পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। প্রথম নজরে এটি উন্নত চ্যাটবট বা আরও স্মার্ট সফটওয়্যার তৈরির প্রতিযোগিতা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক গভীর। এই প্রতিযোগিতা নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে কে প্রযুক্তির নেতৃত্ব দেবে, কার হাতে থাকবে বৈশ্বিক অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ, কোন দেশের শিল্প সবচেয়ে দ্রুত এগোবে এবং ভবিষ্যতের সামরিক শক্তির ভারসাম্য কোন দিকে যাবে।
এই যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছে এআই মডেল, সেমিকন্ডাক্টর চিপ, সুপারকম্পিউটার, ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ উৎপাদন, অ্যালগরিদম এবং বিপুল পরিমাণ তথ্য।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের বিশ্ব অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, শিল্প উৎপাদন, এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনার ধরনও নির্ধারণ করবে এআই। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, একে কেবল ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ হিসেবে দেখলে ঝুঁকি রয়েছে। এতে দুই দেশের মধ্যে এমন এক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগকে সংকুচিত করবে।
বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ মনে করেন, এই প্রতিয়োগিতাকে ‘যে আগে এআই বানাবে, সেই জিতবে’—এভাবে দেখা উচিত নয়। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং ওপেনএআইয়ের সাবেক বোর্ড সদস্য হেলেন টোনার মনে করেন, ‘এটি কোনো ১০০ মিটার দৌড় নয়, যেখানে একটি নির্দিষ্ট ফিনিশ লাইন আছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা।’
আগে কোনো দেশের শক্তি নির্ভর করত তার সামরিক বাহিনী, শিল্প উৎপাদন বা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কারণ এআই এমন একটি প্রযুক্তি, যা জ্ঞান সৃষ্টি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, উৎপাদনশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক খাত, সাইবার নিরাপত্তা এবং আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থার সক্ষমতা বদলে দিচ্ছে।
এআইয়ের সবচেয়ে উন্নত বা ফ্রন্টিয়ার মডেল তৈরিতে এখনও যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট নেতৃত্ব রয়েছে। ওপেনএআই, গুগল ডিপমাইন্ড, অ্যানথ্রপিক এবং এক্সএআই (গ্রক)-এর মতো প্রতিষ্ঠান জটিল যুক্তি বিশ্লেষণ, প্রোগ্রামিং, বৈজ্ঞানিক সমস্যা সমাধান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে বিশ্বের সেরা মডেল তৈরি করছে।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে বিপুল কম্পিউটিং শক্তি। মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, গুগল ও মেটার মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শুধু ২০২৬ সালেই এআই অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে পারে। তারা হাজার হাজার সর্বাধুনিক সুবিধা নিয়ে বিশাল ডেটা সেন্টার তৈরি করছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইপোক এআইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের পর থেকে চীনের সবচেয়ে উন্নত এআই মডেলগুলো গড়ে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় সাত মাস পিছিয়ে রয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র উন্নত সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ফলে চীন সর্বাধুনিক এআই প্রশিক্ষণ চিপ সহজে সংগ্রহ করতে পারছে না। এটিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত ব্যবধান ধরে রাখতে সাহায্য করছে।
সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন অ্যানথ্রপিককে তাদের সর্বাধুনিক দুটি মডেল—ফ্যাবল ও মিথোসকে বিদেশি ব্যবহারকারীদের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে।
মার্কিন সরকারের দাবি, মডেলটিতে এমন একটি নিরাপত্তা দুর্বলতা পাওয়া গেছে, যার মাধ্যমে হ্যাকিং বা জৈব অস্ত্রসংক্রান্ত বিপজ্জনক তথ্য তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। পরে অ্যানথ্রপিক মডেল দুটি সাময়িকভাবে সবার জন্যই বন্ধ করে দেয়।
ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—ভবিষ্যতে অত্যাধুনিক এআই ব্যবহার করার সুযোগ শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর নয়, বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপরও নির্ভর করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি অনেকটা আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের সুইফট নেটওয়ার্কের মতো। কোনো দেশ যদি পুরোপুরি অন্য দেশের এআই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে প্রয়োজনে সেই প্রবেশাধিকারও সীমিত করে দেওয়া সম্ভব।
চীনের লক্ষ্য সবচেয়ে বড় বা সবচেয়ে ব্যয়বহুল এআই তৈরি করা নয়; বরং এমন এআই তৈরি করা, যা কম খরচে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাবে।
এই কারণেই তারা ওপেন-সোর্স বা ওপেন-ওয়েট মডেলের ওপর জোর দিচ্ছে। ডিপসিক, আলিবাবার কুয়েন, ঝিপুর জিএলএম এবং মুনশট এআইয়ের কিমির মতো মডেল বিশ্বজুড়ে গবেষক ও সফটওয়্যার ডেভেলপাররা সহজেই ব্যবহার করতে পারছেন।
চীনের এই কৌশলকে অনেক বিশ্লেষক ‘উন্মুক্ততার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার’ বলছেন। ঝিপুর সহপ্রতিষ্ঠাতা তাং জিয়ে সম্প্রতি দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, ‘আমাদের অবস্থান হলো মৌলিকভাবে উন্মুক্ততা।’
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত মডেল যেকোনো সময় ব্যবহারকারীদের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ওপেন-সোর্স মডেল একবার ডাউনলোড করে স্থানীয়ভাবে চালানো হলে তা আর সহজে কারও নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
চীনের আরেকটি বড় শক্তি হলো কম খরচে উন্নত এআই সরবরাহ। উদাহরণ হিসেবে, ডিপসিকের একটি মডেল প্রতি ১০ লাখ আউটপুট টোকেনের জন্য মাত্র ০.৮৭ ডলার নেয়। অন্যদিকে একই ধরনের সেবার জন্য অ্যানথ্রপিকের ফ্যাবল ৫-এর মূল্য প্রায় ৫০ ডলার।
চীন ইতিমধ্যে উৎপাদনশিল্প, বৈদ্যুতিক গাড়ি, রোবোটিক্স, স্মার্ট কারখানা, ড্রোন এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থায় ব্যাপকভাবে এআই ব্যবহার করছে। এর ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বাস্তব তথ্য তৈরি হচ্ছে। এই তথ্য আবার ভবিষ্যতের আরও উন্নত এআই তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক কাইল চ্যান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ভিন্ন কৌশল অনুসরণ করছে। আমরা একে প্রায়ই একই দৌড় হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে এটি দুটি ভিন্ন পথের প্রতিযোগিতা।
এ কারণেই বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভবিষ্যতের এআই প্রতিযোগিতা শুধু সবচেয়ে বুদ্ধিমান মডেল তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং কোন দেশের প্রযুক্তি সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং বাস্তব অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একটি আধুনিক এআই মডেল তৈরি ও পরিচালনার জন্য শুধু সফটওয়্যার যথেষ্ট নয়। দরকার বিশাল ডেটা সেন্টার, বিপুল বিদ্যুৎ, উচ্চগতির নেটওয়ার্ক, জমি, কুলিং ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। অর্থাৎ ভবিষ্যতের এআই শক্তি নির্ভর করবে কে কত বেশি কম্পিউটিং শক্তি ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে পারে, তার ওপরও।
মার্কিন রেটিং সংস্থা মুডিজ-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হতে পারে। এর বড় অংশই যাবে যুক্তরাষ্ট্রে।
তবে মার্কিন নাগরিকদের একটি বড় অংশ নিজেদের এলাকায় বিশাল ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতা করছেন। কারণ, এগুলো বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, প্রচুর পানি লাগে এবং স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে ৪২ বিলিয়ন ডলারের অন্তত ২০টি ডেটা সেন্টার প্রকল্প বাতিল হয়েছে। এ পরিস্থিতিকে ওয়াশিংটন এখন কৌশলগত ঝুঁকি হিসেবে দেখছে।
মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট বলেছেন, ‘চীনের চেয়ে আমাদের এগিয়ে থাকতে হবে। ডেটা সেন্টার দ্রুত নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।’
বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র যেখানে স্থানীয় বিরোধিতা ও অনুমোদন জটিলতার মুখে পড়ছে, সেখানে চীন তুলনামূলক দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারছে।
দেশটি এআইকে শুধু সফটওয়্যার খাতের বিষয় হিসেবে দেখছে না; বরং বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পনীতি, উৎপাদনশিল্প এবং জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে একীভূত করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় শুধু সবচেয়ে ভালো এআই মডেল থাকাই যথেষ্ট হবে না। সেটি চালানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎও নিশ্চিত করতে হবে।
এআই নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো রিকারসিভ সেলফ ইমপ্রুভমেন্ট (আরএসআই) বা স্বয়ংউন্নয়ন।
এর অর্থ হলো, একটি এআই নিজেই নিজের কোড উন্নত করবে, আরও দক্ষ সংস্করণ তৈরি করবে এবং সেই নতুন সংস্করণ আবার পরবর্তী আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করবে। অর্থাৎ মানুষ নয়, এআই নিজেই নিজের গবেষক হয়ে উঠবে।
এটি এখনো পুরোপুরি বাস্তবে ঘটেনি। তবে গবেষকেরা বলছেন, এর প্রাথমিক লক্ষণ ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। অ্যানথ্রপিকের ক্লড কোড সফটওয়্যার ডেভেলপারদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহকারী হয়ে উঠেছে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, তাদের অভ্যন্তরীণভাবে প্রকাশিত কোডের ৮০ শতাংশেরও বেশি এখন ক্লড নিজেই লিখছে।
অ্যানথ্রপিকের সহপ্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক মনে করেন, ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ ৬০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যে কোনো এআই ব্যবস্থা মানুষের সহায়তা ছাড়াই নিজের পরবর্তী সংস্করণ তৈরি করতে পারবে।
এআই কত দ্রুত নিজেকে উন্নত করতে পারে, তার একটি উদাহরণ দিয়েছেন গবেষক আন্দ্রেজ কারপাথি।
একসময় যে ধরনের একটি মডেল প্রশিক্ষণে ৩২টি উন্নত জিপিইউতে ১৬৮ ঘণ্টা লাগত, সেটি পরে মাত্র ৮টি জিপিইউতে ৩ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
এরপর যখন পুরো অপ্টিমাইজেশনের দায়িত্ব অটো রিসার্চ নামের একটি এআই এজেন্টকে দেওয়া হয়, তখন মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে প্রশিক্ষণের সময় কমে দাঁড়ায় এক ঘণ্টা ৩৯ মিনিটে।
কারপাথির ভাষায়, ‘আমি কিছুই করিনি। এআই নিজেই নিজের উন্নতি করেছে।’ এই ধরনের অগ্রগতি ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নয়, এআই এখন নৈতিকতার প্রশ্নও তৈরি করছে। একটি এআই কী সত্য বলবে? কোন পরিস্থিতিতে মানুষের নির্দেশ মানবে? ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে কী করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বড় বড় এআই কোম্পানি এখন দার্শনিক নিয়োগ দিচ্ছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লুসিয়ানো ফ্লোরিদি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এআই প্রতিষ্ঠানে দার্শনিকদের চলে যাওয়া এখন এক ধরনের ‘রক্তক্ষরণ’।
অন্যদিকে গবেষক ইয়াসন গ্যাব্রিয়েল মনে করেন, দর্শন দীর্ঘ যুক্তিপ্রক্রিয়া উন্নত করতে এবং এআইকে অযথা আত্মবিশ্বাসী বা তোষামোদকারী হওয়া থেকে বিরত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অ্যানথ্রপিক তাদের এআই পরিচালনার নীতিমালা তৈরিতে ইমানুয়েল কান্টের নৈতিক দর্শন, জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্র এবং অ্যাপলের সেবার শর্তাবলি পর্যন্ত ব্যবহার করেছে।
বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষা নিয়ে এসেছে।
প্রথমত, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি শুধু সফটওয়্যার নয়; এর জন্য শক্তিশালী বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ডেটা সেন্টার, দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দরকার।
দ্বিতীয়ত, শুধু নিজস্ব হার্ডওয়্যার তৈরির চেষ্টা করলেই সফল হওয়া যায় না। অতীতের ‘দোয়েল’ ল্যাপটপ প্রকল্প দেখিয়েছে, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ছাড়া রাষ্ট্রনির্ভর প্রযুক্তি উদ্যোগ টেকসই হয় না।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের সামনে সুযোগ রয়েছে দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করার।
কম খরচের ওপেন-সোর্স এআই, দক্ষ জনবল তৈরি, জাতীয় ডেটা অবকাঠামো, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারে (ডিপিআই) বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের সুফল নিতে পারে।
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র এখনও সবচেয়ে উন্নত এআই মডেল, চিপ এবং কম্পিউটিং শক্তিতে এগিয়ে। চীন এগিয়ে কম খরচে প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া, ওপেন-সোর্স উদ্ভাবন এবং শিল্পখাতে দ্রুত ব্যবহারে।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ভবিষ্যতের বিজয়ী শুধু সেই দেশ হবে না, যারা সবচেয়ে বুদ্ধিমান এআই তৈরি করবে। প্রকৃত বিজয়ী হবে সেই রাষ্ট্র, যার প্রযুক্তি বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরক্ষা এবং সরকারি সেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে।
অর্থাৎ এআই স্নায়ুযুদ্ধের আসল লড়াই কোনো একটি চ্যাটবট বা সফটওয়্যারকে ঘিরে নয়। এটি প্রযুক্তিগত প্রভাব, অর্থনৈতিক নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা।
আর সেই কারণেই এই প্রতিযোগিতার ফল শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জন্য নয়, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভবিষ্যতের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিকে ঘিরে শুরু হয়েছে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধ, যেখানে মুখোমুখি বিশ্বের দুই পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। প্রথম নজরে এটি উন্নত চ্যাটবট বা আরও স্মার্ট সফটওয়্যার তৈরির প্রতিযোগিতা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক গভীর। এই প্রতিযোগিতা নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে কে প্রযুক্তির নেতৃত্ব দেবে, কার হাতে থাকবে বৈশ্বিক অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ, কোন দেশের শিল্প সবচেয়ে দ্রুত এগোবে এবং ভবিষ্যতের সামরিক শক্তির ভারসাম্য কোন দিকে যাবে।
এই যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছে এআই মডেল, সেমিকন্ডাক্টর চিপ, সুপারকম্পিউটার, ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ উৎপাদন, অ্যালগরিদম এবং বিপুল পরিমাণ তথ্য।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের বিশ্ব অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, শিল্প উৎপাদন, এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনার ধরনও নির্ধারণ করবে এআই। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, একে কেবল ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ হিসেবে দেখলে ঝুঁকি রয়েছে। এতে দুই দেশের মধ্যে এমন এক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগকে সংকুচিত করবে।
বিশেষজ্ঞদের বড় একটি অংশ মনে করেন, এই প্রতিয়োগিতাকে ‘যে আগে এআই বানাবে, সেই জিতবে’—এভাবে দেখা উচিত নয়। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এবং ওপেনএআইয়ের সাবেক বোর্ড সদস্য হেলেন টোনার মনে করেন, ‘এটি কোনো ১০০ মিটার দৌড় নয়, যেখানে একটি নির্দিষ্ট ফিনিশ লাইন আছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা।’
আগে কোনো দেশের শক্তি নির্ভর করত তার সামরিক বাহিনী, শিল্প উৎপাদন বা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কারণ এআই এমন একটি প্রযুক্তি, যা জ্ঞান সৃষ্টি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, উৎপাদনশিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক খাত, সাইবার নিরাপত্তা এবং আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থার সক্ষমতা বদলে দিচ্ছে।
এআইয়ের সবচেয়ে উন্নত বা ফ্রন্টিয়ার মডেল তৈরিতে এখনও যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট নেতৃত্ব রয়েছে। ওপেনএআই, গুগল ডিপমাইন্ড, অ্যানথ্রপিক এবং এক্সএআই (গ্রক)-এর মতো প্রতিষ্ঠান জটিল যুক্তি বিশ্লেষণ, প্রোগ্রামিং, বৈজ্ঞানিক সমস্যা সমাধান এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে বিশ্বের সেরা মডেল তৈরি করছে।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে বিপুল কম্পিউটিং শক্তি। মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, গুগল ও মেটার মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শুধু ২০২৬ সালেই এআই অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে পারে। তারা হাজার হাজার সর্বাধুনিক সুবিধা নিয়ে বিশাল ডেটা সেন্টার তৈরি করছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইপোক এআইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের পর থেকে চীনের সবচেয়ে উন্নত এআই মডেলগুলো গড়ে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় সাত মাস পিছিয়ে রয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র উন্নত সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ফলে চীন সর্বাধুনিক এআই প্রশিক্ষণ চিপ সহজে সংগ্রহ করতে পারছে না। এটিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত ব্যবধান ধরে রাখতে সাহায্য করছে।
সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন অ্যানথ্রপিককে তাদের সর্বাধুনিক দুটি মডেল—ফ্যাবল ও মিথোসকে বিদেশি ব্যবহারকারীদের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে।
মার্কিন সরকারের দাবি, মডেলটিতে এমন একটি নিরাপত্তা দুর্বলতা পাওয়া গেছে, যার মাধ্যমে হ্যাকিং বা জৈব অস্ত্রসংক্রান্ত বিপজ্জনক তথ্য তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। পরে অ্যানথ্রপিক মডেল দুটি সাময়িকভাবে সবার জন্যই বন্ধ করে দেয়।
ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—ভবিষ্যতে অত্যাধুনিক এআই ব্যবহার করার সুযোগ শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর নয়, বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপরও নির্ভর করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি অনেকটা আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের সুইফট নেটওয়ার্কের মতো। কোনো দেশ যদি পুরোপুরি অন্য দেশের এআই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে প্রয়োজনে সেই প্রবেশাধিকারও সীমিত করে দেওয়া সম্ভব।
চীনের লক্ষ্য সবচেয়ে বড় বা সবচেয়ে ব্যয়বহুল এআই তৈরি করা নয়; বরং এমন এআই তৈরি করা, যা কম খরচে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাবে।
এই কারণেই তারা ওপেন-সোর্স বা ওপেন-ওয়েট মডেলের ওপর জোর দিচ্ছে। ডিপসিক, আলিবাবার কুয়েন, ঝিপুর জিএলএম এবং মুনশট এআইয়ের কিমির মতো মডেল বিশ্বজুড়ে গবেষক ও সফটওয়্যার ডেভেলপাররা সহজেই ব্যবহার করতে পারছেন।
চীনের এই কৌশলকে অনেক বিশ্লেষক ‘উন্মুক্ততার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার’ বলছেন। ঝিপুর সহপ্রতিষ্ঠাতা তাং জিয়ে সম্প্রতি দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, ‘আমাদের অবস্থান হলো মৌলিকভাবে উন্মুক্ততা।’
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত মডেল যেকোনো সময় ব্যবহারকারীদের জন্য বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ওপেন-সোর্স মডেল একবার ডাউনলোড করে স্থানীয়ভাবে চালানো হলে তা আর সহজে কারও নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
চীনের আরেকটি বড় শক্তি হলো কম খরচে উন্নত এআই সরবরাহ। উদাহরণ হিসেবে, ডিপসিকের একটি মডেল প্রতি ১০ লাখ আউটপুট টোকেনের জন্য মাত্র ০.৮৭ ডলার নেয়। অন্যদিকে একই ধরনের সেবার জন্য অ্যানথ্রপিকের ফ্যাবল ৫-এর মূল্য প্রায় ৫০ ডলার।
চীন ইতিমধ্যে উৎপাদনশিল্প, বৈদ্যুতিক গাড়ি, রোবোটিক্স, স্মার্ট কারখানা, ড্রোন এবং লজিস্টিকস ব্যবস্থায় ব্যাপকভাবে এআই ব্যবহার করছে। এর ফলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বাস্তব তথ্য তৈরি হচ্ছে। এই তথ্য আবার ভবিষ্যতের আরও উন্নত এআই তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক কাইল চ্যান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ভিন্ন কৌশল অনুসরণ করছে। আমরা একে প্রায়ই একই দৌড় হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে এটি দুটি ভিন্ন পথের প্রতিযোগিতা।
এ কারণেই বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভবিষ্যতের এআই প্রতিযোগিতা শুধু সবচেয়ে বুদ্ধিমান মডেল তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং কোন দেশের প্রযুক্তি সবচেয়ে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং বাস্তব অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একটি আধুনিক এআই মডেল তৈরি ও পরিচালনার জন্য শুধু সফটওয়্যার যথেষ্ট নয়। দরকার বিশাল ডেটা সেন্টার, বিপুল বিদ্যুৎ, উচ্চগতির নেটওয়ার্ক, জমি, কুলিং ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। অর্থাৎ ভবিষ্যতের এআই শক্তি নির্ভর করবে কে কত বেশি কম্পিউটিং শক্তি ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে পারে, তার ওপরও।
মার্কিন রেটিং সংস্থা মুডিজ-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হতে পারে। এর বড় অংশই যাবে যুক্তরাষ্ট্রে।
তবে মার্কিন নাগরিকদের একটি বড় অংশ নিজেদের এলাকায় বিশাল ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরোধিতা করছেন। কারণ, এগুলো বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, প্রচুর পানি লাগে এবং স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে ৪২ বিলিয়ন ডলারের অন্তত ২০টি ডেটা সেন্টার প্রকল্প বাতিল হয়েছে। এ পরিস্থিতিকে ওয়াশিংটন এখন কৌশলগত ঝুঁকি হিসেবে দেখছে।
মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট বলেছেন, ‘চীনের চেয়ে আমাদের এগিয়ে থাকতে হবে। ডেটা সেন্টার দ্রুত নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করাই এখন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।’
বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র যেখানে স্থানীয় বিরোধিতা ও অনুমোদন জটিলতার মুখে পড়ছে, সেখানে চীন তুলনামূলক দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারছে।
দেশটি এআইকে শুধু সফটওয়্যার খাতের বিষয় হিসেবে দেখছে না; বরং বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পনীতি, উৎপাদনশিল্প এবং জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে একীভূত করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় শুধু সবচেয়ে ভালো এআই মডেল থাকাই যথেষ্ট হবে না। সেটি চালানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎও নিশ্চিত করতে হবে।
এআই নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো রিকারসিভ সেলফ ইমপ্রুভমেন্ট (আরএসআই) বা স্বয়ংউন্নয়ন।
এর অর্থ হলো, একটি এআই নিজেই নিজের কোড উন্নত করবে, আরও দক্ষ সংস্করণ তৈরি করবে এবং সেই নতুন সংস্করণ আবার পরবর্তী আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করবে। অর্থাৎ মানুষ নয়, এআই নিজেই নিজের গবেষক হয়ে উঠবে।
এটি এখনো পুরোপুরি বাস্তবে ঘটেনি। তবে গবেষকেরা বলছেন, এর প্রাথমিক লক্ষণ ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। অ্যানথ্রপিকের ক্লড কোড সফটওয়্যার ডেভেলপারদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহকারী হয়ে উঠেছে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, তাদের অভ্যন্তরীণভাবে প্রকাশিত কোডের ৮০ শতাংশেরও বেশি এখন ক্লড নিজেই লিখছে।
অ্যানথ্রপিকের সহপ্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক মনে করেন, ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ ৬০ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে যে কোনো এআই ব্যবস্থা মানুষের সহায়তা ছাড়াই নিজের পরবর্তী সংস্করণ তৈরি করতে পারবে।
এআই কত দ্রুত নিজেকে উন্নত করতে পারে, তার একটি উদাহরণ দিয়েছেন গবেষক আন্দ্রেজ কারপাথি।
একসময় যে ধরনের একটি মডেল প্রশিক্ষণে ৩২টি উন্নত জিপিইউতে ১৬৮ ঘণ্টা লাগত, সেটি পরে মাত্র ৮টি জিপিইউতে ৩ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
এরপর যখন পুরো অপ্টিমাইজেশনের দায়িত্ব অটো রিসার্চ নামের একটি এআই এজেন্টকে দেওয়া হয়, তখন মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে প্রশিক্ষণের সময় কমে দাঁড়ায় এক ঘণ্টা ৩৯ মিনিটে।
কারপাথির ভাষায়, ‘আমি কিছুই করিনি। এআই নিজেই নিজের উন্নতি করেছে।’ এই ধরনের অগ্রগতি ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নয়, এআই এখন নৈতিকতার প্রশ্নও তৈরি করছে। একটি এআই কী সত্য বলবে? কোন পরিস্থিতিতে মানুষের নির্দেশ মানবে? ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে কী করবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বড় বড় এআই কোম্পানি এখন দার্শনিক নিয়োগ দিচ্ছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লুসিয়ানো ফ্লোরিদি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এআই প্রতিষ্ঠানে দার্শনিকদের চলে যাওয়া এখন এক ধরনের ‘রক্তক্ষরণ’।
অন্যদিকে গবেষক ইয়াসন গ্যাব্রিয়েল মনে করেন, দর্শন দীর্ঘ যুক্তিপ্রক্রিয়া উন্নত করতে এবং এআইকে অযথা আত্মবিশ্বাসী বা তোষামোদকারী হওয়া থেকে বিরত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অ্যানথ্রপিক তাদের এআই পরিচালনার নীতিমালা তৈরিতে ইমানুয়েল কান্টের নৈতিক দর্শন, জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্র এবং অ্যাপলের সেবার শর্তাবলি পর্যন্ত ব্যবহার করেছে।
বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষা নিয়ে এসেছে।
প্রথমত, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি শুধু সফটওয়্যার নয়; এর জন্য শক্তিশালী বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, ডেটা সেন্টার, দক্ষ জনবল এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দরকার।
দ্বিতীয়ত, শুধু নিজস্ব হার্ডওয়্যার তৈরির চেষ্টা করলেই সফল হওয়া যায় না। অতীতের ‘দোয়েল’ ল্যাপটপ প্রকল্প দেখিয়েছে, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ছাড়া রাষ্ট্রনির্ভর প্রযুক্তি উদ্যোগ টেকসই হয় না।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের সামনে সুযোগ রয়েছে দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করার।
কম খরচের ওপেন-সোর্স এআই, দক্ষ জনবল তৈরি, জাতীয় ডেটা অবকাঠামো, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারে (ডিপিআই) বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের সুফল নিতে পারে।
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র এখনও সবচেয়ে উন্নত এআই মডেল, চিপ এবং কম্পিউটিং শক্তিতে এগিয়ে। চীন এগিয়ে কম খরচে প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া, ওপেন-সোর্স উদ্ভাবন এবং শিল্পখাতে দ্রুত ব্যবহারে।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ভবিষ্যতের বিজয়ী শুধু সেই দেশ হবে না, যারা সবচেয়ে বুদ্ধিমান এআই তৈরি করবে। প্রকৃত বিজয়ী হবে সেই রাষ্ট্র, যার প্রযুক্তি বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরক্ষা এবং সরকারি সেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে।
অর্থাৎ এআই স্নায়ুযুদ্ধের আসল লড়াই কোনো একটি চ্যাটবট বা সফটওয়্যারকে ঘিরে নয়। এটি প্রযুক্তিগত প্রভাব, অর্থনৈতিক নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা।
আর সেই কারণেই এই প্রতিযোগিতার ফল শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জন্য নয়, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভবিষ্যতের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
.png)

২০১১ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল পাশ হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আনা এ সংশোধনীটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম সংবেদনশীল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলা একটি বিল।
২ ঘণ্টা আগে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি চিকিৎসক দম্পতি ডা. সুষমা রেজা ও ডা. সায়েদুল আশরাফ কুশলের বিবাহবিচ্ছেদ। দাম্পত্য, সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তাঁদের জনপ্রিয় ভিডিও সিরিজ ‘কাপলস কর্নার’ একসময় অসংখ্য মানুষের কাছে সুখী সংসার গড়ার অনুপ্রেরণা হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই ভিডিওগুলোতে ত
২ দিন আগে
দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯৪ শতাংশ পণ্য সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে শুরু করে কয়লা, ক্লিংকার, স্ক্র্যাপ লোহা, জ্বালানি, সার কিংবা খাদ্যশস্য—সবকিছুর বড় অংশই আসে কিংবা যায় সমুদ্রপথে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই বিপুল বাণিজ্য প্রায় পুরোপুরি বিদেশি জাহাজের ওপর নির্ভরশীল।
২ দিন আগে
বিয়ে শুধু দুটি মানুষের নয়, দুটি পরিবারেরও বন্ধন। কিন্তু সব সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে না। মতের অমিল, সহিংসতা, বিশ্বাসভঙ্গ কিংবা অন্য নানা কারণে অনেক দম্পতিই শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের পথ বেছে নেন।
২ দিন আগে