জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

কীভাবে হন স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার, সংসদে তাদের কাজ কী

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০: ০০
স্ট্রিম গ্রাফিক

আগামী ১২ মার্চ বসতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের দেওয়া তথ্যমতে, এই অধিবেশনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হলো নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন। সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামোতে স্পিকারের পদ কেবল একটি আলঙ্কারিক পদ নয়; বরং তিনি হলেন সংসদের অভিভাবক। সরকারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার গুরুদায়িত্ব থাকে তাঁর কাঁধে।

আসন্ন অধিবেশনকে কেন্দ্র করে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং তাঁদের সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে জনমনে নানা কৌতূহল রয়েছে। সংবিধান ও সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধির আলোকে এই বিষয়গুলো তলিয়ে দেখা যাক।

নির্বাচন প্রক্রিয়া ও সাংবিধানিক বিধান
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়। একটি নতুন সংসদ গঠিত হওয়ার পর প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া বাধ্যতামূলক। সাধারণত সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল, যা এবারের প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা, তাদের পছন্দের প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করে।

যদি একক কোনো নাম প্রস্তাব করা হয় এবং অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকে, তবে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। আর যদি একাধিক প্রার্থী থাকেন, তবে সংসদ সদস্যদের ভোটে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ গ্রহণ করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে কার্যভার গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাক্রম বা ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পরেই স্পিকারের অবস্থান। এমনকি প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির চেয়েও প্রটোকলে স্পিকারের অবস্থান ওপরে।

স্পিকারের ক্ষমতা ও কার্যাবলি
সংসদ অধিবেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে স্পিকারের ক্ষমতাই চূড়ান্ত। ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি’ এবং সংবিধান তাঁকে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়েছে। সংসদে কে কথা বলবেন, কতক্ষণ বলবেন এবং কোন বিষয় আলোচনার জন্য গৃহীত হবে—সবটাই স্পিকার নির্ধারণ করেন। তাঁর অনুমতি ছাড়া কোনো সদস্য ফ্লোর বা কথা বলার সুযোগ পান না। স্পিকার কোনো নির্দিষ্ট দলের টিকিটে এমপি নির্বাচিত হলেও, স্পিকারের আসনে বসার পর তিনি দলমত নির্বিশেষে ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থানে থাকেন। কোনো সদস্য অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করলে স্পিকার তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন।

জাতীয় সংসদ ভবন। ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় সংসদ ভবন। ছবি: সংগৃহীত

এমনকি কেউ বিশৃঙ্খলা করলে তিনি তাকে সতর্ক করতে পারেন বা অধিবেশন কক্ষ থেকে বের করে দেওয়ার ক্ষমতাও রাখেন। এছাড়া কোনো বিল ‘অর্থ বিল’ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সংবিধানের ৮১(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্পিকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এবং তিনি বিলে সনদ প্রদান করেন।

কাস্টিং ভোট ও বিশেষ ক্ষমতা

সাধারণত কোনো বিল পাসের সময় বা কোনো প্রস্তাবে স্পিকার ভোট দেন না; তিনি নিরপেক্ষ থাকেন। তবে সংবিধানের ৭৫(১)(খ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি সংসদে কোনো বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী পক্ষের ভোট সমান সমান হয়ে যায়, কেবল তখনই স্পিকার একটি ভোট দিতে পারেন। একে ‘নির্ণায়ক ভোট’ বা ‘কাস্টিং ভোট’ বলা হয়, যা অচলাবস্থা নিরসনে ব্যবহৃত হয়।

স্পিকারের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে, স্পিকার অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত বা রাষ্ট্রপতি সুস্থ হয়ে না ফেরা পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে থাকেন।

ডেপুটি স্পিকারের ভূমিকা
ডেপুটি স্পিকার মূলত স্পিকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। স্পিকার যখন অসুস্থ থাকেন, বিদেশে অবস্থান করেন কিংবা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন, তখন ডেপুটি স্পিকার সংসদের সভাপতিত্ব করেন এবং স্পিকারের সব ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন। তবে স্পিকার যখন সভাপতিত্ব করেন, তখন ডেপুটি স্পিকার একজন সাধারণ সংসদ সদস্যের মতোই আচরণ করেন। তিনি আলোচনায় অংশ নিতে পারেন এবং ভোট দিতে পারেন।

পদ শূন্য হওয়ার কারণ

সংবিধানের ৭৪(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কয়েকটি কারণে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য হতে পারে। যদি তিনি সংসদ সদস্য না থাকেন, মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান, পদত্যাগ করেন কিংবা সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভোটে তাঁকে অপসারণের প্রস্তাব পাস হয়—তবে তাঁর পদ শূন্য হবে। তবে কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলেও পরবর্তী স্পিকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত বর্তমান স্পিকার স্বপদে বহাল থাকেন। এটি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থেই করা হয়।

আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরুর প্রথম ধাপ। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করা এবং দেশের প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন স্পিকারের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসদকে কার্যকর রাখতে এবং বিরোধী মতকে গুরুত্ব দিতে একজন দক্ষ ও নিরপেক্ষ স্পিকারের কোনো বিকল্প নেই।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত