ইলেকট্রিক গাড়িতে ঝুঁকছে সরকার, বদলের ধাক্কা বাজারে

স্ট্রিম গ্রাফিক্স

বদলে যাচ্ছে দেশের অটোমোবাইল খাত। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর পরিবহন ব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড যানবাহনের দিকে ঝুঁকছে সরকার।

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রস্তাব এবং শিল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে স্পষ্ট— বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি), হাইব্রিড, প্লাগ-ইন হাইব্রিড, ব্যাটারি উৎপাদন ও স্থানীয় সংযোজন শিল্পে ব্যাপক কর এবং শুল্ক-সুবিধা দেওয়ার আলোচনা চলছে।

গত ৩ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বৈদ্যুতিক যানবাহন আমদানিতে বড় ধরনের কর-সুবিধা অনুমোদন করা হয়। অন্তত ১৭ আসনের বৈদ্যুতিক বাস এবং পাঁচ টন বা তার বেশি বহনক্ষমতার বৈদ্যুতিক ট্রাক আমদানিতে মাত্র ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হবে।

একইসঙ্গে এসব যানবাহনের ওপর কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, অগ্রিম কর ও অগ্রিম আয়কর পুরোপুরি মওকুফ করা হয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক বাস আমদানিতেও সব ধরনের শুল্ক এবং কর প্রত্যাহার করে এনবিআর।

স্থানীয় শিল্প গড়তে নতুন নীতি

‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি ২০২৫’ নামে প্রস্তাবিত নীতিমালায় স্থানীয় উৎপাদনকারীদের জন্য কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে মাত্র ১ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় ইভি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত আয়কর ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

প্রস্তাবিত নীতিমালায় বলা হয়েছে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বৈদ্যুতিক যানবাহনের ওপর মোট করের হার প্রায় ৩৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকবে। অন্যদিকে, সম্পূর্ণ আমদানি করা বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৮৯ শতাংশ। এছাড়া ইভি নিবন্ধন ফিতে ৫০ শতাংশ ছাড় এবং ২০৩০ সাল পর্যন্ত নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদে অগ্রিম আয়কর মওকুফের প্রস্তাবও রয়েছে।

নীতিমালায় আরও বলা হয়, বৈদ্যুতিক গাড়ি কপপ্লিট বিল্ট-আপ (সিবিউ) অবস্থায় আমদানি শুল্ক ৮৯ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৭ শতাংশ করার প্রস্তাব করা যেতে পারে। দেশে এ ধরনের গাড়ি সংযোজনের জন্য যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কহার ১৫ দশমিক ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি তৈরিতে শুল্কহার প্রস্তাব করা হয়েছে ২৬ দশমিক ২০ শতাংশ।

খসড়া নীতিমালায় বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের সীমা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন ইভি কেনার ক্ষেত্রে গাড়ির মূল্যের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে এবং ঋণের মেয়াদ হবে আট বছর।

বৈদ্যুতিক গাড়ির উচ্চ মূল্য কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকও গত মাসে নতুন সবুজ অর্থায়ন নীতি চালু করেছে। এর আওতায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এখন ইভি ও হাইব্রিড গাড়ি কেনার জন্য সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে। প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির ক্ষেত্রে এই সীমা ৬০ লাখ টাকা।

এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও করপোরেট সংস্থাগুলোর নতুন কেনা গাড়ির অন্তত ৩০ শতাংশ বৈদ্যুতিক করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ধীরে বাড়ছে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার

বাংলাদেশে ২০১৫ সালে বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন শুরু হলেও প্রথম দিকে বাজারে তেমন সাড়া ছিল না। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিবন্ধন বাড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে বৈদ্যুতিক প্রাইভেট কারে কর ছাড় দেওয়ার পর থেকে আমদানি বাড়তে থাকে।

এনবিআরের তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সম্পূর্ণ সিবিইউ গাড়ি আমদানি হয়েছিল ৭৭টি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৮টিতে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যান এখনো আসেনি।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট নিবন্ধিত বৈদ্যুতিক যানবাহনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৬৯টি।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসেল পার্টনার্সের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের চার চাকার বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে বর্তমানে চীনের বিওয়াইডি শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫০টি করে গাড়ি বিক্রি করছে। মার্সিডিজ-বেঞ্জ মাসে গড়ে ১২টি গাড়ি বিক্রি করছে। এছাড়া দেশে প্রায় ২০টি টেসলা প্রাইভেট কার আমদানির তথ্যও উঠে এসেছে।

বর্তমানে বাজারে ৩৫ লাখ টাকা দামের ছোট আকারের ব্যক্তিগত ব্যবহারের বৈদ্যুতিক গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে। বিওয়াইডির সবচেয়ে কমদামি গাড়ির মূল্য আগে ৪৮ লাখ টাকা হলেও, সম্প্রতি তারা ৪০ লাখ টাকার নিচে নতুন মডেল বাজারে এনেছে।

উৎপাদনে নামছে বড় শিল্পগোষ্ঠী

দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোও বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা বিনিয়োগে বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানা নির্মাণ করছে। প্রতিষ্ঠানটির অংশীদার চীনা কোম্পানি ডংফেং মোটর গ্রুপ।

শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গ্যাস সংযোগের কাজ শেষ হলে আগামী জুলাই থেকে প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদনে যেতে পারবে।

শিল্প সচিব ওবায়দুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ এসইউভি, সেডান কার, ট্রাক, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল উৎপাদন করবে। বাস সংযোজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রায় ৩০ লাখ টাকার মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে আনা সম্ভব হবে।

এদিকে, রানার অটোমোবাইলস চীনের বিওয়াইডির সঙ্গে বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাইয়ে চুক্তি করেছে। ওয়ালটন ইতোমধ্যে ১২ কোটি ডলার বিনিয়োগে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি কারখানা স্থাপন করেছে। রহিম আফরোজও চীনের তিয়ানেন ব্যাটারি গ্রুপের সঙ্গে অংশীদারত্বে উন্নত ব্যাটারি উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে।

অন্যদিকে, নিটল-নিলয় গ্রুপ ‘সুভারে’ ব্র্যান্ডে স্থানীয় বৈদ্যুতিক সেডান তৈরির কাজ করছে। প্রায় ১২ লাখ টাকা মূল্যের এই গাড়ি একবার চার্জে ২০০ কিলোমিটার চলতে পারবে বলে দাবি করা হয়েছে।

চার্জিং অবকাঠামো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ

ইভির বাজার বাড়লেও, চার্জিং অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এখনো বড় বাধা। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মাত্র ১৪টি পাবলিক চার্জিং স্টেশন ছিল। ফলে দীর্ঘ দূরত্বে যাতায়াতের ক্ষেত্রে চালকদের মধ্যে ‘রেঞ্জ অ্যাংজাইটি’ তৈরি হচ্ছে।

এই সংকট কাটাতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মহাসড়কভিত্তিক চার্জিং নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। ক্র্যাক প্লাটুন চার্জিং সলিউশন লিমিটেড ‘চার্জইজি’ অ্যাপের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ফাস্ট-চার্জিং স্টেশন বসাচ্ছে। ইতোমধ্যে কুমিল্লার কয়েকটি হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে ডিসি ফাস্ট চার্জার বসানো হয়েছে, যেখানে ২০ থেকে ৩০ মিনিটে গাড়ির চার্জ ৩০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত নেওয়া সম্ভব।

বিওয়াইডি বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ঢাকার তেজগাঁও, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, বগুড়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আটটি কৌশলগত চার্জিং স্টেশন স্থাপন করেছে।

সরকারও চার্জিং অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী। প্রস্তাবিত অটো নীতিতে পাবলিক চার্জিং স্টেশন স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধার কথা বলেছে।

সম্পর্কিত