আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার
আল জাজিরা

পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটায় রোববার সেনাসদস্য বহনকারী একটি ট্রেনে আত্মঘাতী গাড়িবোমা বিস্ফোরণে অন্তত ২৪ জন নিহত এবং ৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের চার দিনের চীন সফরের মধ্যে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার পরেরদিন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠক ঠিক হয়েছিল। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
ট্রেন হামলার দায় স্বীকার করেছে সশস্ত্র বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবির পাশাপাশি গোষ্ঠীটি এই অঞ্চলে চীনের বৃহৎ বিনিয়োগেরও তীব্র বিরোধিতা করে।
বিএলএ দীর্ঘদিন ধরে বেলুচিস্তান ও এর বাইরে বেসামরিক নাগরিক এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
রোববারের হামলায় কী ঘটেছিল
ঘটনাস্থল থেকে আল জাজিরার কামাল হায়দার জানান, রেললাইনের পাশের কয়েকটি বাড়ি ও ভবন বিস্ফোরণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্ফোরণের ফলে ট্রেনের বগিগুলো উল্টে গিয়ে আগুন ধরে যায়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, কোয়েটার সরকারি হাসপাতালগুলোতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় এবং চিকিৎসকসহ অন্যান্য চিকিৎসাকর্মীদের ডিউটিতে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া গাড়ি ও ট্রেনের বগি উল্টে পড়ে আছে। আকাশে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর একাধিক হামলা হয়েছে, যা দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে কোয়েটার এই ট্রেন হামলার নিন্দা জানান। তিনি বলেন, এ ধরনের কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পাকিস্তানের জনগণের সংকল্প দুর্বল করতে পারবে না। আমরা সব ধরনের ও রূপের সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে অটল।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ব্র্যাডফোর্ডের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ইমেরিটাস অধ্যাপক ইউনাস সামাদ আল জাজিরাকে বলেন, এটি প্রতিফলিত করে যে অঞ্চলের বিদ্রোহী সংগঠনগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের কৌশল গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের পর ফেলে যাওয়া অস্ত্রভান্ডার থেকে আসা উন্নত অস্ত্রের প্রচলন সম্পর্কেও স্থায়ী দাবি রয়েছে।
বেলুচিস্তানে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী হামলার নতুন মাত্রা
ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বেলুচিস্তানে অন্তত ২৫৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি।
স্বাধীন সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা (এসিএলইডি) তাদের ডিসেম্বর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে জানায়, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) ও গ্রেনেড ব্যবহার করে চালানো হামলার সংখ্যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ৬৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
এ বছরের গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স (জিটিআই) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ২০২৫ সালে আরও তীব্র হয়েছে। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (আইইপি) এই বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
জিটিআই-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলার জন্য দায়ী ছিল বিএলএ। মার্চ মাসে তারা কোয়েটা থেকে পেশোয়ারগামী জাফর এক্সপ্রেস ট্রেন ছিনতাই করে।
বিএলএ ওই হামলার দায় স্বীকার করে জানায়, ৪০০ যাত্রী বহনকারী ট্রেনটি থেকে শত শত মানুষকে জিম্মি করা হয়েছিল। হামলায় ছয়জন সামরিক সদস্য নিহত হন।
যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইউনাস সামাদ আল জাজিরাকে বলেন, জাফর এক্সপ্রেসে আগের সমন্বিত হামলার পর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পরিবহন অবকাঠামো, সামরিক সদস্য ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথে নিরাপত্তা জোরদার করেছে বলেই ধারণা করা হয়।
তবে তাঁর মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে যে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখনো উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে।
২০২২ সালে সেনা ও নৌঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে বিএলএ পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
এরপর ২০২৪ সালের আগস্টে বেলুচিস্তানজুড়ে সমন্বিত হামলা চালানো হয়। এসব হামলার মধ্যে মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে পরিচয় যাচাইয়ের পর যাত্রীদের গুলি করে হত্যার ঘটনাও ছিল।
সামাদের মতে, এ ধরনের সংঘাতে ব্যবহৃত পরিসংখ্যান সব সময়ই বিতর্কের বিষয় এবং সেগুলো সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা উচিত। তবে এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, সংঘাতের তীব্রতা এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। তবে এটি স্পষ্ট যে বালুচ বিদ্রোহের একটি অংশের মধ্যে সশস্ত্র সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিএলএ সশস্ত্র গোষ্ঠী কারা
বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) হলো পাকিস্তানের অন্যতম বৃহৎ জাতিগত বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী। সংগঠনটির একটি আত্মঘাতী ইউনিটের নাম ‘মাজিদ ব্রিগেড’। তাদের দাবি, তারা বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার লক্ষ্যে লড়াই করছে।
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত বেলুচিস্তান প্রদেশের উত্তরে আফগানিস্তান এবং পশ্চিমে ইরানের সীমান্ত রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চল বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও সশস্ত্র সংঘাতের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
বিএলএ কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের ফেডারেল সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তানের দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত অঞ্চল বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধা এবং বিভিন্ন ইসলামপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
গোষ্ঠীটি মূলত বেলুচিস্তানে অবকাঠামো, নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। তবে তারা করাচির মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরেও হামলা পরিচালনা করেছে।
বিএলএ নারী আত্মঘাতী হামলাকারী ব্যবহারের জন্যও পরিচিত। করাচিতে চীনা নাগরিকদের ওপর চালানো কয়েকটি হামলায় নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের দলে ভেড়ানোর সক্ষমতার কারণে বিএলএ অন্য অনেক সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে।
২০২৪ সালে ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায়ও গোষ্ঠীটির নাম সামনে আসে। তখন উভয় দেশ একে অপরের ভূখণ্ডে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঘাঁটি থাকার অভিযোগ তোলে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল যে দুই প্রতিবেশী দেশ কার্যত যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।
বালুচ আন্দোলনের কারণ কী
২০২৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রায় ২৪ কোটি মানুষের মধ্যে আনুমানিক দেড় কোটি মানুষের বসবাস বেলুচিস্তানে। কয়লা, স্বর্ণ, তামা ও প্রাকৃতিক গ্যাসসহ বিপুল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও অঞ্চলটি পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশগুলোর একটি।
বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) দাবি, এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে অর্জিত বিপুল আয়ের বড় অংশ অন্যায্যভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। তাদের মতে, বেলুচিস্তানের সম্পদের মালিকানা স্থানীয় জনগণের হাতে থাকা উচিত এবং সম্পদ উত্তোলন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর ফেডারেল নিয়ন্ত্রণ গ্রহণযোগ্য নয়।
আয়তনের দিক থেকে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ হলেও জনসংখ্যার হিসেবে এটি সবচেয়ে ছোট। আরব সাগরসংলগ্ন দীর্ঘ উপকূল এবং হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থান প্রদেশটিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
এই প্রদেশেই অবস্থিত পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ গভীর সমুদ্রবন্দর গওয়াদার, যা চীনের ৬৫ বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) প্রকল্পের একটি প্রধান অংশ। এটি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভেরও অন্তর্ভুক্ত।
বেলুচিস্তানে রেকো দিকসহ বেশ কয়েকটি বড় খনিপ্রকল্প রয়েছে। কানাডীয় প্রতিষ্ঠান ব্যারিক গোল্ড পরিচালিত রেকো দিককে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণ ও তামার খনি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া চীনও এ অঞ্চলে স্বর্ণ ও তামা উত্তোলন কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে।
১৯৪৮ সালে, ভারত বিভক্ত হওয়ার প্রায় ছয় মাস পর পাকিস্তান বেলুচিস্তানকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর থেকে অঞ্চলটি অন্তত পাঁচটি বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহের সাক্ষী হয়েছে।
২০০০-এর দশকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আরও জোরালো হয়ে ওঠে, বিশেষ করে বিএলএর উত্থানের পর। বিশ্লেষকদের মতে, প্রবীণ বালুচ জাতীয়তাবাদী নেতা নবাব খায়ের বখশ মারির ছেলে বালাচ মাররি এই আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন।
২০০৬ সালে সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফের সরকারের হাতে বিশিষ্ট বালুচ নেতা নবাব আকবর বুগতির নিহত হওয়ার পর আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিশেষ করে গওয়াদার বন্দরে চীনা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তাদের অভিযোগ, বেইজিং ইসলামাবাদের সঙ্গে মিলে বেলুচিস্তানের সম্পদ শোষণে সহযোগিতা করছে।
এছাড়া চীনা নাগরিকদের ওপর হামলা, করাচিতে চীনা কনস্যুলেট ও ভাষাকেন্দ্রে আক্রমণের ঘটনাও ঘটেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএলএ বেসামরিক নাগরিক এবং অন্য প্রদেশ থেকে আসা শ্রমিকদের ওপরও হামলা চালিয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, এটি তাদের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তার অভিযোগ তুললেও দুই দেশই তা অস্বীকার করে এসেছে।
বিশ্লেষক ইউনাস সামাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছে এবং সম্প্রতি ভারতের কাছেও কূটনৈতিক স্বীকৃতির আহ্বান জানিয়েছে।
তবে সরাসরি কোনো রাষ্ট্রীয় সহায়তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া কঠিন এবং এ নিয়ে বিতর্ক এখনো চলমান।
এদিকে বহু বালুচ অধিকারকর্মী, যাদের মধ্যে নারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য, নিরাপত্তা বাহিনীর কথিত নির্যাতন ও নিখোঁজের ঘটনার প্রতিবাদে ইসলামাবাদ ও বেলুচিস্তানে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিএলএ নিজেকে এমন একটি সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যারা পাকিস্তান থেকে বেলুচিস্তানের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানায়। অন্যদিকে তুলনামূলক মধ্যপন্থি বালুচ জাতীয়তাবাদী দলগুলো বেশি স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে অবস্থান নিলেও বিএলএ আপসের পথকে ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এখন এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
এই হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বেইজিং সফরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করছেন। আর এই চীনঘনিষ্ঠ সহযোগিতার বিরোধিতা করে আসছে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি সাম্প্রতিক হামলাগুলো গভীরতর অস্থিতিশীলতার ইঙ্গিত বহন করে, তাহলে তা পাকিস্তানে চীনা ও মার্কিন বিনিয়োগ ধরে রাখার প্রচেষ্টার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তাদের ভাষ্য, বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন পাকিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম জটিল ও অমীমাংসিত সংকট। এটি দেশটির ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ঐক্য রক্ষার প্রশ্নকে বারবার সামনে নিয়ে আসছে।
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক ইউনাস সামাদ মনে করেন, দীর্ঘস্থায়ী এই বিদ্রোহ পাকিস্তানের সামগ্রিক রাজনৈতিক কাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলছে। তার মতে, বেলুচিস্তানকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ ক্রমেই রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রাখছে। এর ফলে সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বাড়ছে, আর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সামাদ বলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পাকিস্তান একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা এখনো অনেকটাই আগাম। তবে একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিকভাবেই বৈশ্বিক উদ্বেগ তৈরি করে। এ কারণেই বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিরল খনিজ ধাতু
বেলুচিস্তানকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর বিপুল বিরল খনিজসম্পদ। ভূতাত্ত্বিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, পর্যায় সারণির ১৭টি বিরল খনিজের মধ্যে অন্তত ১২টির উপস্থিতি রয়েছে এই অঞ্চলে।
আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে এসব বিরল খনিজের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ব্যাটারি, ঘড়ি, বৈদ্যুতিক তার, সামরিক সরঞ্জাম, স্মার্টফোন, সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তি পণ্য তৈরিতে এগুলো অপরিহার্য উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ খনিজের উৎস বৈচিত্র্যময় করার ওপর জোর দিয়ে আসছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। বর্তমানে বিরল খনিজের সরবরাহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বৈশ্বিক বাজারে চীনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠককালে যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ ও বিরল খনিজসম্পদে প্রবেশাধিকারের প্রস্তাব দেন।
এর কয়েক মাস পর, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র রেকো দিক প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলনের জন্য ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। এই বিনিয়োগের লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়, ‘বেলুচিস্তানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা।’
(আল জাজিরা থেকে আনুবাদ করেছেন আব্দুর রহমান সার্জিল)

পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটায় রোববার সেনাসদস্য বহনকারী একটি ট্রেনে আত্মঘাতী গাড়িবোমা বিস্ফোরণে অন্তত ২৪ জন নিহত এবং ৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের চার দিনের চীন সফরের মধ্যে এ হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার পরেরদিন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠক ঠিক হয়েছিল। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
ট্রেন হামলার দায় স্বীকার করেছে সশস্ত্র বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবির পাশাপাশি গোষ্ঠীটি এই অঞ্চলে চীনের বৃহৎ বিনিয়োগেরও তীব্র বিরোধিতা করে।
বিএলএ দীর্ঘদিন ধরে বেলুচিস্তান ও এর বাইরে বেসামরিক নাগরিক এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
রোববারের হামলায় কী ঘটেছিল
ঘটনাস্থল থেকে আল জাজিরার কামাল হায়দার জানান, রেললাইনের পাশের কয়েকটি বাড়ি ও ভবন বিস্ফোরণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্ফোরণের ফলে ট্রেনের বগিগুলো উল্টে গিয়ে আগুন ধরে যায়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, কোয়েটার সরকারি হাসপাতালগুলোতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় এবং চিকিৎসকসহ অন্যান্য চিকিৎসাকর্মীদের ডিউটিতে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া গাড়ি ও ট্রেনের বগি উল্টে পড়ে আছে। আকাশে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর একাধিক হামলা হয়েছে, যা দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে কোয়েটার এই ট্রেন হামলার নিন্দা জানান। তিনি বলেন, এ ধরনের কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পাকিস্তানের জনগণের সংকল্প দুর্বল করতে পারবে না। আমরা সব ধরনের ও রূপের সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে অটল।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ব্র্যাডফোর্ডের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ইমেরিটাস অধ্যাপক ইউনাস সামাদ আল জাজিরাকে বলেন, এটি প্রতিফলিত করে যে অঞ্চলের বিদ্রোহী সংগঠনগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের কৌশল গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের পর ফেলে যাওয়া অস্ত্রভান্ডার থেকে আসা উন্নত অস্ত্রের প্রচলন সম্পর্কেও স্থায়ী দাবি রয়েছে।
বেলুচিস্তানে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী হামলার নতুন মাত্রা
ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর পিস স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বেলুচিস্তানে অন্তত ২৫৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি।
স্বাধীন সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা (এসিএলইডি) তাদের ডিসেম্বর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে জানায়, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) ও গ্রেনেড ব্যবহার করে চালানো হামলার সংখ্যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ৬৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
এ বছরের গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স (জিটিআই) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ২০২৫ সালে আরও তীব্র হয়েছে। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস (আইইপি) এই বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
জিটিআই-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলার জন্য দায়ী ছিল বিএলএ। মার্চ মাসে তারা কোয়েটা থেকে পেশোয়ারগামী জাফর এক্সপ্রেস ট্রেন ছিনতাই করে।
বিএলএ ওই হামলার দায় স্বীকার করে জানায়, ৪০০ যাত্রী বহনকারী ট্রেনটি থেকে শত শত মানুষকে জিম্মি করা হয়েছিল। হামলায় ছয়জন সামরিক সদস্য নিহত হন।
যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইউনাস সামাদ আল জাজিরাকে বলেন, জাফর এক্সপ্রেসে আগের সমন্বিত হামলার পর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পরিবহন অবকাঠামো, সামরিক সদস্য ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথে নিরাপত্তা জোরদার করেছে বলেই ধারণা করা হয়।
তবে তাঁর মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে যে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এখনো উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে।
২০২২ সালে সেনা ও নৌঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে বিএলএ পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
এরপর ২০২৪ সালের আগস্টে বেলুচিস্তানজুড়ে সমন্বিত হামলা চালানো হয়। এসব হামলার মধ্যে মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে পরিচয় যাচাইয়ের পর যাত্রীদের গুলি করে হত্যার ঘটনাও ছিল।
সামাদের মতে, এ ধরনের সংঘাতে ব্যবহৃত পরিসংখ্যান সব সময়ই বিতর্কের বিষয় এবং সেগুলো সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা উচিত। তবে এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, সংঘাতের তীব্রতা এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। তবে এটি স্পষ্ট যে বালুচ বিদ্রোহের একটি অংশের মধ্যে সশস্ত্র সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিএলএ সশস্ত্র গোষ্ঠী কারা
বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) হলো পাকিস্তানের অন্যতম বৃহৎ জাতিগত বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী। সংগঠনটির একটি আত্মঘাতী ইউনিটের নাম ‘মাজিদ ব্রিগেড’। তাদের দাবি, তারা বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার লক্ষ্যে লড়াই করছে।
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত বেলুচিস্তান প্রদেশের উত্তরে আফগানিস্তান এবং পশ্চিমে ইরানের সীমান্ত রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চল বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও সশস্ত্র সংঘাতের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
বিএলএ কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের ফেডারেল সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তানের দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত অঞ্চল বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধা এবং বিভিন্ন ইসলামপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
গোষ্ঠীটি মূলত বেলুচিস্তানে অবকাঠামো, নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। তবে তারা করাচির মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরেও হামলা পরিচালনা করেছে।
বিএলএ নারী আত্মঘাতী হামলাকারী ব্যবহারের জন্যও পরিচিত। করাচিতে চীনা নাগরিকদের ওপর চালানো কয়েকটি হামলায় নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের দলে ভেড়ানোর সক্ষমতার কারণে বিএলএ অন্য অনেক সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে।
২০২৪ সালে ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায়ও গোষ্ঠীটির নাম সামনে আসে। তখন উভয় দেশ একে অপরের ভূখণ্ডে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঘাঁটি থাকার অভিযোগ তোলে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল যে দুই প্রতিবেশী দেশ কার্যত যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়।
বালুচ আন্দোলনের কারণ কী
২০২৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রায় ২৪ কোটি মানুষের মধ্যে আনুমানিক দেড় কোটি মানুষের বসবাস বেলুচিস্তানে। কয়লা, স্বর্ণ, তামা ও প্রাকৃতিক গ্যাসসহ বিপুল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও অঞ্চলটি পাকিস্তানের সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশগুলোর একটি।
বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) দাবি, এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে অর্জিত বিপুল আয়ের বড় অংশ অন্যায্যভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। তাদের মতে, বেলুচিস্তানের সম্পদের মালিকানা স্থানীয় জনগণের হাতে থাকা উচিত এবং সম্পদ উত্তোলন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর ফেডারেল নিয়ন্ত্রণ গ্রহণযোগ্য নয়।
আয়তনের দিক থেকে বেলুচিস্তান পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ হলেও জনসংখ্যার হিসেবে এটি সবচেয়ে ছোট। আরব সাগরসংলগ্ন দীর্ঘ উপকূল এবং হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থান প্রদেশটিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
এই প্রদেশেই অবস্থিত পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ গভীর সমুদ্রবন্দর গওয়াদার, যা চীনের ৬৫ বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) প্রকল্পের একটি প্রধান অংশ। এটি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভেরও অন্তর্ভুক্ত।
বেলুচিস্তানে রেকো দিকসহ বেশ কয়েকটি বড় খনিপ্রকল্প রয়েছে। কানাডীয় প্রতিষ্ঠান ব্যারিক গোল্ড পরিচালিত রেকো দিককে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণ ও তামার খনি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া চীনও এ অঞ্চলে স্বর্ণ ও তামা উত্তোলন কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে।
১৯৪৮ সালে, ভারত বিভক্ত হওয়ার প্রায় ছয় মাস পর পাকিস্তান বেলুচিস্তানকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর থেকে অঞ্চলটি অন্তত পাঁচটি বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহের সাক্ষী হয়েছে।
২০০০-এর দশকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আরও জোরালো হয়ে ওঠে, বিশেষ করে বিএলএর উত্থানের পর। বিশ্লেষকদের মতে, প্রবীণ বালুচ জাতীয়তাবাদী নেতা নবাব খায়ের বখশ মারির ছেলে বালাচ মাররি এই আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন।
২০০৬ সালে সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফের সরকারের হাতে বিশিষ্ট বালুচ নেতা নবাব আকবর বুগতির নিহত হওয়ার পর আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিশেষ করে গওয়াদার বন্দরে চীনা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তাদের অভিযোগ, বেইজিং ইসলামাবাদের সঙ্গে মিলে বেলুচিস্তানের সম্পদ শোষণে সহযোগিতা করছে।
এছাড়া চীনা নাগরিকদের ওপর হামলা, করাচিতে চীনা কনস্যুলেট ও ভাষাকেন্দ্রে আক্রমণের ঘটনাও ঘটেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএলএ বেসামরিক নাগরিক এবং অন্য প্রদেশ থেকে আসা শ্রমিকদের ওপরও হামলা চালিয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, এটি তাদের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তার অভিযোগ তুললেও দুই দেশই তা অস্বীকার করে এসেছে।
বিশ্লেষক ইউনাস সামাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছে এবং সম্প্রতি ভারতের কাছেও কূটনৈতিক স্বীকৃতির আহ্বান জানিয়েছে।
তবে সরাসরি কোনো রাষ্ট্রীয় সহায়তার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া কঠিন এবং এ নিয়ে বিতর্ক এখনো চলমান।
এদিকে বহু বালুচ অধিকারকর্মী, যাদের মধ্যে নারীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য, নিরাপত্তা বাহিনীর কথিত নির্যাতন ও নিখোঁজের ঘটনার প্রতিবাদে ইসলামাবাদ ও বেলুচিস্তানে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিএলএ নিজেকে এমন একটি সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যারা পাকিস্তান থেকে বেলুচিস্তানের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানায়। অন্যদিকে তুলনামূলক মধ্যপন্থি বালুচ জাতীয়তাবাদী দলগুলো বেশি স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে অবস্থান নিলেও বিএলএ আপসের পথকে ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এখন এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
এই হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বেইজিং সফরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করছেন। আর এই চীনঘনিষ্ঠ সহযোগিতার বিরোধিতা করে আসছে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি সাম্প্রতিক হামলাগুলো গভীরতর অস্থিতিশীলতার ইঙ্গিত বহন করে, তাহলে তা পাকিস্তানে চীনা ও মার্কিন বিনিয়োগ ধরে রাখার প্রচেষ্টার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তাদের ভাষ্য, বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন পাকিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম জটিল ও অমীমাংসিত সংকট। এটি দেশটির ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ঐক্য রক্ষার প্রশ্নকে বারবার সামনে নিয়ে আসছে।
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্লেষক ইউনাস সামাদ মনে করেন, দীর্ঘস্থায়ী এই বিদ্রোহ পাকিস্তানের সামগ্রিক রাজনৈতিক কাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলছে। তার মতে, বেলুচিস্তানকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ ক্রমেই রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা রাখছে। এর ফলে সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বাড়ছে, আর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সামাদ বলেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পাকিস্তান একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র।
তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙে পড়ার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা এখনো অনেকটাই আগাম। তবে একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিকভাবেই বৈশ্বিক উদ্বেগ তৈরি করে। এ কারণেই বেলুচিস্তানের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিরল খনিজ ধাতু
বেলুচিস্তানকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর বিপুল বিরল খনিজসম্পদ। ভূতাত্ত্বিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, পর্যায় সারণির ১৭টি বিরল খনিজের মধ্যে অন্তত ১২টির উপস্থিতি রয়েছে এই অঞ্চলে।
আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে এসব বিরল খনিজের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ব্যাটারি, ঘড়ি, বৈদ্যুতিক তার, সামরিক সরঞ্জাম, স্মার্টফোন, সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন উচ্চপ্রযুক্তি পণ্য তৈরিতে এগুলো অপরিহার্য উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকেই গুরুত্বপূর্ণ খনিজের উৎস বৈচিত্র্যময় করার ওপর জোর দিয়ে আসছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের চীনের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। বর্তমানে বিরল খনিজের সরবরাহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বৈশ্বিক বাজারে চীনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠককালে যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ ও বিরল খনিজসম্পদে প্রবেশাধিকারের প্রস্তাব দেন।
এর কয়েক মাস পর, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র রেকো দিক প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলনের জন্য ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। এই বিনিয়োগের লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়, ‘বেলুচিস্তানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা।’
(আল জাজিরা থেকে আনুবাদ করেছেন আব্দুর রহমান সার্জিল)

সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফলের পর তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থান ও কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ভূমিধস বিজয়ের পর তৃণমূলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বিষয়ের সমীকরণ নতুনভাবে সামনে আসছে। তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী পরামর্শদাতা সংস্থা আই-প্যাক নিয়েও তাই আলোচনা-সমালো
২ দিন আগে
কোটি কোটি বছর আগে ডাইনোসররা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিন্তু নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তেলাপোকা আজও টিকে রয়েছে। এমনকি বিজ্ঞানীদের ধারণা, পারমাণবিক বিস্ফোরণের তীব্র বিকিরণ সহ্য করেও এরা বেঁচে থাকতে সক্ষম।
২ দিন আগে
গত বছরের মার্চে মাগুরায় আট বছরের শিশু আছিয়াকে ধর্ষণের ঘটনায় উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি ওঠে সর্বত্র। বিচারিক আদালত প্রধান আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রায় কার্যকর হয়নি। মামলাটি এখনও আপিলের ধাপে ঝুলে আছে।
২ দিন আগে
ভারতের প্রধান বিচারপতির বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে গড়ে ওঠা ব্যঙ্গাত্মক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) সামাজিক মাধ্যমে নজিরবিহীন জোয়ার এনেছে। প্রশ্ন উঠছে অনলাইন ম্যাজিক পেরিয়ে প্রথাগত রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচনে লড়তে পারবে সিজেপি?
৩ দিন আগে