কিচেন কেবিনেট কী, কেন আলোচনায়

এআই জেনারেটেড ছবি

আক্ষরিক অর্থে ‘কিচেন কেবিনেট’ বলতে রান্নাঘরের আলমারি বা ফার্নিচারকে বোঝায়। কিন্তু রাজনৈতিক অর্থে ‘কিচেন কেবিনেট’ বলতে বোঝায় এমন একটি অনানুষ্ঠানিক ও অনির্বাচিত উপদেষ্টা গোষ্ঠীকে, যারা সরকারের আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভাকে পাশ কাটিয়ে পর্দার আড়াল থেকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করে।

চলতি মাসের শুরুতে সরকারি কেনাকাটায় আসবাবপত্র দুর্নীতির নানা অডিট প্রতিবেদন প্রকাশের পর জনগণের মধ্যে ‘ফার্নিচার কেলেঙ্কারি’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এর মধ্যেই নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের সূচনা হয়। সাবেক পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো একটি অনানুষ্ঠানিক সাত সদস্যের কিচেন কেবিনেট গোপনে নিয়ন্ত্রণ করত।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘কিচেন কেবিনেট’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে কিচেন কেবিনেট বলতে এমন একটি অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতাকেন্দ্রকে বোঝানো হয়, যা সাংবিধানিক বা আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার বাইরে থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলে। ইতিহাসে শব্দটির ব্যবহার শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসের আমলে (১৮২৯–১৮৩৭)। তিনি প্রায়ই আনুষ্ঠানিক মন্ত্রীদের মতামত উপেক্ষা করে নিজের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও রাজনৈতিক সহযোগীদের ছোট একটি গোষ্ঠীর পরামর্শে সিদ্ধান্ত নিতেন। সেখান থেকেই কিচেন কেবিনেট ধারণার জন্ম।

রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় মন্ত্রীরা সরাসরি রাষ্ট্রপতির অধীন থাকায়, এমন অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা গোষ্ঠীর প্রভাব অনেকাংশে নির্ভর করে শাসকের ব্যক্তিগত নেতৃত্বের ধরণের ওপর। অন্যদিকে, ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় ব্যবস্থায় মন্ত্রিসভাকে সাধারণত একটি যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে ধরা হয় মন্ত্রীসভার ‘সমমর্যাদাবানদের মধ্যে প্রথম’ ব্যক্তি হিসেবে। অর্থাৎ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভার সম্মিলিত দায়িত্ব ও প্রশাসনিক ঐকমত্য গুরুত্বপূর্ণ।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) কিচেন কেবিনেটকে এমন একটি অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে, যেখানে সরকারপ্রধানসহ প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি গোপনে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেয়। তারা আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভার ক্ষমতা ব্যবহার করলেও অনেক সময় পুরো প্রক্রিয়াটি জনসমক্ষে স্বচ্ছ থাকে না।

গত কয়েক দশকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা লক্ষ্য করেছেন, অনেক সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রিসভার সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর ফলে ‘ছায়া ক্ষমতাকেন্দ্র’ বা অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠীর উত্থান ঘটছে।

তৌহিদ হোসেনের সাক্ষাৎকার এবং বিতর্কের সূচনা

গত ২৫ মে সাবেক পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন যমুনা টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, একটি গোপন ও অনির্বাচিত সাত সদস্যের কিচেন কেবিনেট বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রণ করত।

মো. তৌহিদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অনানুষ্ঠানিক কিচেন কেবিনেট প্রতি মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বৈঠকে বসত এবং সেখান থেকেই রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। নিজের ১৮ মাসের দায়িত্বকাল স্মরণ করে তিনি বলেন, তাঁর প্রত্যাশার বড় অংশই পূরণ হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, একসময় তাঁকেও কিচেন কেবিনেট-এর একটি বৈঠকে অংশ নিতে হয়েছিল।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, কয়েকজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা নিয়মিতভাবে তাঁর মন্ত্রণালয়ের কাজেও অননুমোদিত হস্তক্ষেপ করতেন। প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়া, বাইরের হস্তক্ষেপ এবং স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ার প্রতিবাদে তিনি তিনবার পদত্যাগের চেষ্টা করেছিলেন। তবে প্রতিবারই তাঁর পদত্যাগের আবেদন নাকচ করা হয়। তাঁকে বলা হয়, তাঁর চলে যাওয়া সরকারের জন্য ‘গুরুতর অস্বস্তি’ তৈরি করবে এবং অন্তর্বর্তী প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অস্বীকার, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ

মো. তৌহিদ হোসেনের সাক্ষাৎকার প্রচারের পরপরই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এতে অন্তর্বর্তীকালীন রূপান্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক ও ছাত্রনেতৃত্বের ভেতরের বিভাজন প্রকাশ্যে চলে আসে। একই সঙ্গে সাবেক সরকারি কর্মকর্তারাও আত্মপক্ষ সমর্থনে বিবৃতি দিতে শুরু করেন।

তৌহিদ হোসেনের সাক্ষাৎকার প্রচারের একদিন পর (২৬ মে) ছাত্রনেতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ঢাকায় জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

কিচেন কেবিনেটের সদস্য ছিলেন—এমন অভিযোগ তিনি সরাসরি অস্বীকার করেন। একই সঙ্গে বিতর্কিত যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গেও নিজের বা এনসিপির কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন তিনি।

আসিফ মাহমুদের অভিযোগ অনুযায়ী, তখনকার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পরবর্তীকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এই চুক্তির আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরে বিএনপির পরামর্শে পুরো দায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় বলেও তিনি দাবি করেন।

মাহফুজ আলমের ‘আমলাতান্ত্রিক কিচেন কেবিনেট’ সমালোচনা

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম গত ১৯ মে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার তার মূল ‘বিপ্লবী’ ও সংস্কারমুখী লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে ধীরে ধীরে একটি কেন্দ্রীভূত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোয় পরিণত হয়েছিল।

মাহফুজ আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার পরিচালনায় একটি ‘আমলাতান্ত্রিক কিচেন কেবিনেট’ গড়ে উঠেছিল। সেখানেবিএনপি, জামায়াত ইসলামি এবং এমনকি আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ কিছু গোপন অনুগত ব্যক্তিও ছিলেন।

তিনি অভিযোগ করেন, এই অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী কাঠামোগত সংস্কার আটকে দেয়, নতুন স্বাধীন গণমাধ্যমের অনুমোদন বাধাগ্রস্ত করে এবং গুরুত্বপূর্ণ কমিশন ও ট্রাইব্যুনালগুলোকে রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।

মাহফুজ আলমের মতে, এই আমলাতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ শেষ পর্যন্ত পুরোনো ও প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তির জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক আদর্শ পুনর্বাসনের পথ সহজ করে দেয়।

শাসনব্যবস্থার সংকট: ‘ট্রানজিশন ট্র্যাপ’ ও ছায়া ক্ষমতাকাঠামো

যখন কোনো কর্তৃত্ববাদী সরকার ক্ষমতা হারায়, তখন নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হয় জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা। আর সেটি সম্ভব হয় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারগুলো প্রায়ই সাংবিধানিক ও আইনগত অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করে। এই শূন্যতার সুযোগে গড়ে ওঠে অনানুষ্ঠানিক ও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকাঠামো।

শুরুতে এসব গোষ্ঠীকে সংকট মোকাবিলা বা স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরা হলেও, ধীরে ধীরে তারা অঘোষিত ক্ষমতাকেন্দ্রে পরিণত হয়। এদের ওপর জনগণ, সংসদ বা প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

যখন দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও আনুষ্ঠানিক মন্ত্রণালয় বা উপদেষ্টা পরিষদের ঐকমত্য ছাড়া নেওয়া হয়, তখন পুরো অন্তর্বর্তী প্রক্রিয়ার গণতান্ত্রিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

সুশাসনের জন্য করণীয়

দেশে কিচেন কেবিনেট ঘিরে যে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা মূলত রাষ্ট্র পরিচালনায় অস্বচ্ছ ক্ষমতাকাঠামো, জবাবদিহিতার ঘাটতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার গভীর সংকেত বহন করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এ ধরনের শাসনসংকট ঠেকাতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

মন্ত্রিসভার সম্মিলিত সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক করা

সরকারের নির্বাহী বিভাগকে এমন আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে, যাতে বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক চুক্তি বা কৌশলগত সমঝোতা অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা বা উপদেষ্টা পরিষদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের মাধ্যমে গৃহীত হয়।

কোনো অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠী বা সীমিত পরিসরের বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তকে আইনগত বৈধতা দেওয়া যাবে না। এতে ব্যক্তিনির্ভর ক্ষমতার পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা শক্তিশালী হবে।

মন্ত্রণালয়ের স্বাধীনতা ও পেশাদারত্ব রক্ষা

উপদেষ্টা বা রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের অননুমোদিত হস্তক্ষেপ ঠেকাতে প্রশাসনিক সীমারেখা স্পষ্ট করতে হবে। একটি মন্ত্রণালয়ের কাজে অন্য মন্ত্রণালয় বা অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টাদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে না পারলে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে।

একই সঙ্গে পেশাদার আমলা, কূটনীতিক ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের রাজনৈতিক চাপমুক্ত রেখে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা গুরুত্ব পায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ

অন্তর্বর্তী সরকারগুলোর জন্য সুস্পষ্ট আইনগত কাঠামো থাকা জরুরি। তাদের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত—রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালু রাখা এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা।

দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক চুক্তি, কৌশলগত বাণিজ্য সমঝোতা বা বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে থাকা উচিত নয়। কারণ এসব সিদ্ধান্ত জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে নেওয়াই গণতান্ত্রিকভাবে অধিক বৈধ ও গ্রহণযোগ্য।

সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তাই শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

সম্পর্কিত