প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: বিশ্ব গণমাধ্যম কী বলছে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৬, ২২: ১২
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের প্রধান প্রধান গণমাধ্যম এ সফর নিয়ে বিশেষ সম্পাদকীয় ও বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

লন্ডনভিত্তিক সংবাদসংস্থা রয়টার্স মূলত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং চীনের সরকারের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের ওপর জোর দিয়েছে। তারেক রহমানের দেওয়া বক্তব্য উদ্ধতি করে রয়টার্স লিখেছে:

‘চীনকে আমাদের আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, জলজ পণ্য, কাঁচা চামড়া, পাটজাত পণ্য ও ওষুধপত্র আমদানির বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করছি।… আমাদের প্রধান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে এবং বিদ্যমান শিল্প ইউনিটগুলোর উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণে আমাদের চীনের সমর্থন প্রয়োজন।’

রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ সফরের বৃহত্তর কূটনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। কারণ তারেক রহমান বেইজিং ও নয়াদিল্লি উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে চাইছেন।

ভারতের প্রধান প্রধান গণমাধ্যম এ সফরটিকে কিছুটা সতর্কমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে।

দ্য হিন্দু লিখেছে, ‘তারেক রহমান বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অবস্থিত আন্তঃসীমান্ত নদী তিস্তার উন্নয়ন পরিকল্পনায় কারিগরি সহায়তা প্রদানের জন্য চীনের প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। গ্রেট হল অফ দ্য পিপল-এ জনাব রহমান এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং-এর মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনায় এ বিষয়টি উঠে আসে, যেখানে উভয় পক্ষ ১৩টি চুক্তি স্বাক্ষর করে।

লন্ডনভিত্তিক সংবাদসংস্থা রয়টার্স মূলত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং চীনের সরকারের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের ওপর জোর দিয়েছে।

তিস্তা নদী ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিবাদের একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ঢাকা একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের দাবি করে আসছে, যা তাদের শীতের শুষ্ক মৌসুমে নদীটি থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।’

ইন্ডিয়া টুডে তাদের এক বিশ্লেষণে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তন নিয়ে মন্তব্য করেছে:

‘বাংলাদেশ মংলা বন্দরের কাছে একসময় ভারতকে বরাদ্দ করা জমিতে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের জন্য চীনের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ পদক্ষেপ বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার সম্পৃক্ততাকে আরও গভীর করেছে। একইসঙ্গে বঙ্গোপসাগরে ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।’

ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি তিস্তা-চুক্তি নিয়ে তাদের পর্যালোচনায় বলছে:

‘এ প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। এলাকাটির অবস্থান এবং কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডোরের (চিকেন’স নেক) কাছাকাছির কারণে, এ অঞ্চলে যেকোনো বহিরাগত প্রভাবের বিস্তার, বিশেষ করে চীনের উপস্থিতি ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলতে পারে। এবং ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলকে দেশের বাকি অংশের সঙ্গে সংযোগকারী এ করিডোরের জন্য সম্ভাব্য কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করতে পারে।’

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট তিস্তা-চুক্তির বিষয়টিকে ‘ভারতের জন্য সতর্কতা’ উল্লেখ করে বলছে:

‘বছরের পর বছর ধরে ভারত তিস্তা অববাহিকায় চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকাকে সতর্কতার সঙ্গে দেখে আসছে। নদীটি সিকিমের হিমালয় অঞ্চল থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যা এটিকে যৌথ পানিসম্পদ ও কৌশলগত উদ্বেগের কারণ করে তুলেছে।’

চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমগুলো এ সফরকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রচার করেছে।

গ্লোবাল টাইমস লিখেছে:

‘প্রথমত, শিল্প-সহযোগিতা জোরদার করা হবে। চীন তার শ্রমব্যয়ের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানির জন্য উচ্চমূল্য-সংযোজিত পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে বাংলাদেশে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে তার প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধারাবাহিকভাবে উৎসাহিত করে আসছে।

দ্বিতীয়ত, গ্লোবাল সাউথ ও আঞ্চলিক পর্যায়ে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হবে, যা এশীয় শিল্পশৃঙ্খল ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিকে সহজতর করবে। চীন-দক্ষিণ এশিয়া এক্সপো এবং চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা ব্যবস্থার মতো প্ল্যাটফর্মগুলো বাংলাদেশকে অন্যান্য আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযোগকারী সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে।

সর্বশেষে, বাংলাদেশকে তার জাতীয় পরিস্থিতির উপযোগী একটি উন্নয়নের পথ অন্বেষণে সহায়তা করার জন্য উভয় পক্ষ সুশাসন বিষয়ে বিনিময় জোরদার করবে। রাজনৈতিক দল, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ও স্থানীয় সরকারগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিময় বাড়ানো যেতে পারে। উন্নয়নের জন্য কোনো একটি সর্বজনীন মডেল নেই এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অভিজ্ঞতাকে সমন্বিত করে একটি আধুনিকীকরণের পথ অনুসরণ করার মতো পরিস্থিতি ও সক্ষমতা উভয়ই বাংলাদেশের রয়েছে।’

সিজিটিএন তাদের প্রতিবেদনে চীনের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা উল্লেখ করে জানায়:

‘চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং বৃহস্পতিবার বলেছেন, কৌশলগত পারস্পরিক আস্থা সুসংহত করতে, বাস্তব সহযোগিতা প্রসারিত করতে এবং উভয় দেশের জনগণের জন্য আরও বেশি সুবিধা বয়ে আনতে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।’

তুরস্কের গণমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও ​​জিয়াকুন-এর বক্তব্য উদ্ধতি করে বলছে:

‘এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগ বৃদ্ধি ও বন্ধুত্বকে চীন এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতাকে উন্নত করা, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিময় ও সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং বহুপাক্ষিক বিষয়ে সমন্বয় বাড়ানোর মাধ্যমে চীন-বাংলাদেশ সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারিকে একটি নতুন স্তরে উন্নীত করতে চীন কাজ করার প্রত্যাশা করে।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত