এক্সপ্লেইনার

ফিলিস্তিন আর ইসরায়েল নিয়ে ভারতের অবস্থান বদলে গেল কীভাবে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২২ জুন ২০২৬, ১১: ৩৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের ঘটনায় ভারতের অবস্থান দেশের কূটনৈতিক নৈতিকতাকে গভীর প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ব্যাপক বোমাবর্ষণের শিকার হয়। এমনকি সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হন। তখনও দিল্লি কোনো নিন্দাসূচক বিবৃতি দেওয়া থেকে বিরত থাকে।

একই ঘটনা ঘটে জুন ২০২৫-এর ১২ দিনব্যাপী বোমাবর্ষণ আর পরবর্তীতে ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবির ঘটনায়। এমনকি মিনাবে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬৫ স্কুলছাত্রীর মৃত্যুর মতো মানবিক বিপর্যয়েও ভারত নীরব। বিশ্লেষকদের মতে, এই নীরবতা ভীরুতা নয়। এটি নীরবতার মধ্য দিয়ে এইসব কর্মকাণ্ডে সক্রিয় সহযোগিতা।

অথচ ২০০৩ সালে বিজেপির বাজপেয়ী সরকারও ইরাকে মার্কিন অভিযানের বিরুদ্ধে লোকসভায় সর্বসম্মত প্রস্তাব গ্রহণ করার সাহস দেখিয়েছিল। ভারতের এই মার্কিনপন্থী নীতি ইরানের চাবাহার বন্দরের মতো কৌশলগত প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছে। ইরানবিরোধী ‘আই২ইউ২’ জোটে যোগ দিয়ে ভারত তার জ্বালানি নিরাপত্তা ও সংযোগমূলক স্বার্থ বিসর্জন দিচ্ছে। এর ফলে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। এলপিজির উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে পাকিস্তান যখন মধ্যস্থতাকারীর সুযোগ নিচ্ছে, ভারত তখন আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতায় নিজের প্রভাব ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে ভারতের ঐতিহাসিক অবস্থান

প্রায় ৭০ বছর ধরে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান ছিল দৃঢ়ভাবে ফিলিস্তিনপন্থী। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর ভারত সোভিয়েত-মার্কিন দ্বিমেরু রাজনীতির বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। সদ্য স্বাধীনতা লাভ করা দেশগুলো বিউপনিবেশায়ন ও উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেয়। এর ভিত্তিতেই জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি হয়। এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সদস্য হিসেবে ভারত আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী সার্বভৌমত্ব এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তির ওপর জোর দিয়েছিল। ১৯৪৭ সালের যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনের প্রতি ভারতের সংহতি ছিল নেহেরুর এই নীতিগুলোর ওপর ভিত্তি করে। এর ওপরে অবশ্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্কও প্রভাব রেখেছিল। গভীর সাংস্কৃতিক সংযোগ, শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ভারতের আঞ্চলিক নীতির একটি স্থায়ী উপাদানে পরিণত হয়েছিল।

সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট বিরোধিতা করেছিলেন ভারতের প্রতিষ্ঠাতা ও শুরুর দিকের রাজনৈতিক এলিটরা। মহাত্মা গান্ধী জায়নবাদী দাবিগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি ইহুদি নেতাদের আরব সম্প্রদায়ের সাথে সহযোগিতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসভূমি গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে ফিলিস্তিন ইস্যুটি জাতিসংঘের কাছে পাঠানো হয়। তখন ভারত, যুগোস্লাভিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলো একটি ফেডারেল ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু গৃহীত হয় পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিকল্পনা। সেখানে ছিল ফিলিস্তিনের বিভাজন এবং পৃথক ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান।

স্নায়ুযুদ্ধের কালজুড়ে ভারত ফিলিস্তিনিদের পক্ষ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক ফোরামে ইসরায়েলি দখলের বিরোধিতা করেছে। ১৯৭৪ সালে ভারত প্রথম প্রধান অ-মুসলিম ও অ-আরব দেশ হিসেবে ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশনকে (পিএলও) ফিলিস্তিনি জনগণের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৫০ সালে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেও ফিলিস্তিনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক মূলত অনানুষ্ঠানিক ও গোপন চ্যানেলের মাধ্যমে পরিচালিত হতো।

স্নায়ুযুদ্ধের পর ইসরায়েল ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আনুষ্ঠানিক হয়ে ওঠে। ১৯৯২ সালে ইসরায়েলকে ভারতে দূতাবাস খোলার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে এরপরও ভারত আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখে। ১৯৪৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদে ফিলিস্তিন সম্পর্কিত ইস্যুগুলো ৬১১ বার ভোটের জন্য আনা হয়েছিল। ২০১৪ সাল পর্যন্ত ভারত ধারাবাহিকভাবে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে ভোট দিয়েছে।

‘নতুন ভারত’ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ২০১৪ সালের মে মাসে বিজেপি ক্ষমতায় আসে। প্রশ্ন ওঠে যে এই সরকার কি ফিলিস্তিনি ইস্যুতে ভারতের অবস্থান বজায় রাখবে?

ইসরায়েলের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বললেও নয়াদিল্লি তখন একটি সার্বভৌম ও ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে। ২০১৪ সালে গাজায় ইসরায়েলের ‘অপারেশন প্রোটেক্টিভ এজ’-এ ৫১ দিনের হামলায় ২ হাজার ১৫৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছিলেন। সেই সময় ভারতের এই প্রতিশ্রুতির পরীক্ষা হয়। বিজেপি ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডের নিন্দাসূচক সংসদীয় প্রস্তাব সমর্থন করতে অস্বীকার করে।

প্রতিবাদে বিরোধী দলগুলো ওয়াকআউট করে। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে বলেছিলেন যে, এটি ফিলিস্তিনি ইস্যু থেকে সরে আসা নয়। কিন্তু ইসরায়েলি আচরণের প্রতীকী নিন্দাতেও সরকারের অনিচ্ছা বলে দেয় যে ভারত ফিলিস্তিন নিয়ে তার নীতি বদলাচ্ছে।

এভাবেই এক স্পষ্ট দ্বৈততা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে ভারত ফিলিস্তিনিদের পক্ষে ভোট দিলেও তা ইসরায়েলকে কোনো কার্যকর চাপ প্রয়োগ করেনি। বিজেপির অধীনে ইসরায়েল ও ভারতের মধ্যে প্রথম উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ হয় ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের অধিবেশনের সময়। সেখানে মোদি ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও প্রতিরক্ষা নিয়ে সহযোগিতার সম্ভাবনা অন্বেষণ করেন।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে ভারতের নীতির রূপান্তর

অপারেশন প্রোটেক্টিভ এজের সময় সংসদ ইসরায়েলের সমালোচনা করতে ব্যর্থ হলেও, গাজা আক্রমণের তদন্তের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। সেই সংসদ ‘অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের’ নিন্দা জানিয়েছিল। কায়রোতে ফিলিস্তিন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভারত গাজার পুনর্গঠনের জন্য ৪ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল।

এই পদক্ষেপগুলো বিজেপি শাসনের শুরুতে পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতার সম্ভাবনা দেখালেও, অভ্যন্তরীণভাবে নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল লক্ষণীয়ভাবে ভিন্ন। ২০২৪ সালের আগস্টে বিজেপির সমর্থকরা প্রায় ২০ হাজার মানুষের ইসরায়েলপন্থী একটি বিশাল র‍্যালির আয়োজন করে।

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া রাষ্ট্রীয় রীতি এবং হিন্দুত্ববাদী সরকারের আদর্শের ব্যবধান সময়ের সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৩ সালের পর এই পার্থক্য ফিকে হতে শুরু করে। বিজেপির রাজনৈতিক কর্তৃত্ব সুসংহত হওয়া ভারত ইসরায়েলপন্থী অবস্থানের দিকে আরও সরাসরি ঝুঁকে পড়ে। ফলে রাষ্ট্রীয় এবং সরকারি—এই দুই পর্যায়ের মধ্যকার দূরত্ব কমে আসে। ভারতের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আচরণে হিন্দুত্ববাদী প্রভাবই প্রতিফলিত হতে থাকে।

অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের গভীরতা

২০১৭ সালে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারিত্বের পর্যায়ে উন্নীত করা হয়। ২০২৩ সালে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও তীব্র হয়। ইসরায়েল প্রায় এক লক্ষ ফিলিস্তিনি শ্রমিকের কাজের অনুমতি বাতিল করে। ভারত ও ইসরায়েল কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কর্মী পাঠানোর একটি চুক্তি সম্পন্ন করে। ২০২৫ সালের মধ্যে ভারত ষোল হাজার নির্মাণ শ্রমিক ইসরায়েলে পাঠায়। কৃষি ও সেবাপ্রদানকারী খাত মিলিয়ে এই সংখ্যা বিশ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এমন সংবেদনশীল মুহূর্তে শ্রমিক পাঠানো ছিল মূলত ইসরায়েলের প্রতি ভারতের পরোক্ষ সমর্থন জানানোর স্পষ্ট পদক্ষেপ। চুক্তিটি কার্যকরভাবে ইসরায়েলের যুদ্ধকালীন অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের প্রতি ইসরায়েলের বৈরিতা কাজে লাগিয়ে ভারতের এই শ্রমশক্তি গাজার যুদ্ধে মজুদ ইসরায়েলি সেনাদের মোবিলাইজেশনে বিরাট সহযোগিতা করেছে।

ভারত-ইসরায়েল অর্থনৈতিক সম্পর্ক ১৯৯০-এর দশক থেকে সোভিয়েত ব্লক পতনের পর প্রসারিত হয়েছে। তবে বিজেপি আমলে তা পূর্ণতা পেয়েছে। ১৯৯২ সালে দুই দেশের মধ্যে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্কের পর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে যা ছিল ২০০ মিলিয়ন ডলারের সামান্য বেশি, ২০২৩ সালের মধ্যে তা ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এই প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি ঘটে ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে। ২০২৫ সালের নভেম্বর নাগাদ দুই দেশ দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা পুনরায় শুরু করতে সম্মত হয়।

সামরিক ক্ষেত্রে, ২০০০-এর দশকের শুরু থেকে ভারত-ইসরায়েল প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়েছে। গত এক দশকে তা উল্লেখযোগ্যভাবে তীব্র হয়েছে। ১৯৯২–২০১৩ সময়ে ইসরায়েল থেকে ভারতের অস্ত্র সংগ্রহ ছিল মোট আমদানির ৪.৫ শতাংশ। ২০১৪–২০২৪ সালে তা ১৩ শতাংশেরও বেশি হয়ে দাঁড়ায়। বিজেপি আমলে এই কেনাকাটা পূর্ববর্তী ২২ বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল।

তেল আবিবে ভারতের দূতাবাসের তথ্যমতে, ১৯৯২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট ৫০টি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে বিজেপি শাসনামলে ২৫টি চূড়ান্ত করা হয়। তার বেশিরভাগই ছিল প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও অস্ত্র বাণিজ্য কেন্দ্রিক।

আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস এবং এলবিট সিস্টেমসের যৌথ উদ্যোগে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২০টিরও বেশি হার্মিস ৯০০ ড্রোনের জন্য ভারতীয় অ্যারোস্ট্রাকচার এবং সাবসিস্টেম রপ্তানি করা হয়েছে। গাজা যুদ্ধের সময় ভারত ইসরায়েলে গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক সামগ্রী রপ্তানি চালিয়ে গেছে। ভারত থেকে একটি জাহাজ ২০ টন রকেট ইঞ্জিন, ১২.৫ টন রকেট এবং কামানের গোলার জন্য বিস্ফোরক চার্জ নিয়ে রওনা হয়েছিল। এমনকি গাজার ধ্বংসস্তূপে জাতিসংঘের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ চিহ্নিত ক্ষেপণাস্ত্রের অংশও পাওয়া গেছে।

এই সহযোগিতা নয়াদিল্লির জন্য একটি নৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে। কারণ গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি করছে। সেখানে ভারত উল্টো আচরণ করায় গণহত্যায় সহযোগিতার অভিযোগের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

সম্পর্কের গভীরতা ও ভবিষ্যতের মোড়

২০১৭ সাল ছিল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের শিখরে পোঁছানোর শুরু। সেই বছর ভারতীয় কোন প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ইসরায়েল সফরে যান। মোদির সফরের সময় দুই রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্বের’ পর্যায়ে নিয়ে যায়। বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে নেতানিয়াহু মোদিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা ৭০ বছর ধরে আপনার অপেক্ষায় ছিলাম।’ অনেক বিশ্লেষক মোদি ও নেতানিয়াহুর এই ঘনিষ্ঠতার মূলে পারস্পরিক স্বার্থের পাশাপাশি জায়নবাদ ও হিন্দু জাতীয়তাবাদের মধ্যকার গভীর আদর্শিক মিল খুঁজে পান। ভারতীয় ডানপন্থী মতাদর্শ চায় হিন্দু রাষ্ট্র। তেমনি জায়নবাদীরা চায় ইহুদি রাষ্ট্র।

ভবিষ্যতে সম্পর্কের মোড় নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে। ইরান ও আরব বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। এতে এই অঞ্চলে ভারতের ‘দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক শক্তি’ হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর (আইমেক) ইসরায়েলের সাথে যুক্ত থাকায় এটি ইরান ও রাশিয়ার সম্পর্কের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠতে পারে। ফলে ভারত উভয় করিডোরকে কীভাবে ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে ব্যবহার করবে, তা তার কানেক্টিভিটি স্ট্র্যাটেজির জন্য বড় পরীক্ষা।

ভারত একটি বড় শক্তি। তাই ভবিষ্যতে ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং একইসাথে ইরানকে একটি অংশীদার হিসেবে টিকিয়ে রাখা—এই দ্বিমুখী পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা ভারতের জন্য আরও কঠিন হবে।

গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা বিশ্বব্যাপী নিন্দিত। তখন ইসরায়েলের প্রতি মোদির সমর্থন আরও সুসংহত হয়েছে। আদানি এলবিট অ্যাডভান্সড সিস্টেমস ইন্ডিয়া, প্রিমিয়ার এক্সপ্লোসিভসের মতো ভারতের কোম্পানিগুলো গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধে ব্যবহৃত ড্রোন ও গোলাবারুদ সরবরাহে সরাসরি জড়িত। ২০২৪ সালের এপ্রিলে মোদি সরকার জাতিসংঘের যুদ্ধবিরতি ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। এমনকি ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় এআই-চালিত অস্ত্র ব্যবহার করছে যা ভারতীয় প্রতিরক্ষা সংস্থার সঙ্গে মিলে তৈরি করা হয়েছে। বিনিময়ে ইসরায়েল ভারতকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত