তুফায়েল আহমদ

রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে জেফ্রি এপস্টেইন সংশ্লিষ্ট সব নথি প্রকাশের নির্দেশনা দেওয়া বিলে সই করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বুধবার (১৯ নভেম্বর) ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ নামক এই বিলে সই করেন ট্রাম্প। আইনে বলা হয়েছে, মার্কিন বিচার বিভাগকে জেফ্রি এপস্টেইন মামলার তদন্ত সংক্রান্ত সব তথ্য ৩০ দিনের মধ্যে প্রকাশ করতে হবে। কয়েক মাস ধরে কংগ্রেসে বিতর্ক, রাজনৈতিক চাপ ও রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের পর এই সিদ্ধান্ত আসে।
মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও এই দৃশ্য অকল্পনীয় ছিল। ট্রাম্প বরাবরই এই বিলের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে আসছিলেন, সেই বিলেই শেষ পর্যন্ত সই করতে হলো তাকে। এই ঘটনাকে কেবল কোনো নীতিগত পরিবর্তন নয়, বরং ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাষ্ট্রপতিত্বের নতুন ও সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করল। ক্ষমতার অলিন্দে গুঞ্জন উঠেছে, আমেরিকার রাজনীতিতে এক অমোঘ বাস্তবতা ফিরে এসেছে, যার নাম ‘লেইম ডাক’ বা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পথে থাকা খোঁড়া হাঁস।
রিপাবলিকান পার্টির ওপর ট্রাম্পের যে লৌহকঠিন নিয়ন্ত্রণ গত কয়েক বছর ধরে ওয়াশিংটনের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেই দেয়ালে কি ফাটল ধরতে শুরু করেছে? এপস্টেইন ফাইল বিতর্কে ট্রাম্পের এই পিছু হটা কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি বৃহত্তর ভাঙনেরই প্রথম চিহ্ন? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করে দেবে আমেরিকার আগামী কয়েক বছরের রাজনীতি ও বিশ্বজুড়ে তার প্রভাবের গতিপ্রকৃতি।
ঘটনার সূত্রপাত জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্কিত গোপনীয় নথি প্রকাশের বিল নিয়ে। ট্রাম্প প্রথম থেকেই এই বিলের বিরোধিতা করে আসছিলেন। এমনকি সরকারের অচলাবস্থার কারণে যখন এক মাসেরও বেশি সময় ধরে হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস-এর অধিবেশন বন্ধ ছিল, তখনও তিনি এই ভোট এড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু অধিবেশন শুরু হতেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
কেন্টাকির রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান টমাস ম্যাসির মতো নেতারা এই ইস্যুতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একাট্টা হন। সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যাসি তার সহকর্মীদের সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘এই ভোটের ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের জন্য চুক্তিটা হলো, আপনি বিপক্ষে ভোট দেন তবে ট্রাম্প আপনাকে রক্ষা করবেন... কিন্তু আমি আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই, এই ভোট আপনার রেকর্ডে ট্রাম্প যতদিন প্রেসিডেন্ট থাকবেন তার চেয়েও বেশি সময় ধরে থাকবে।’
ম্যাসির বার্তা ছিল সুস্পষ্ট, ট্রাম্পের সুরক্ষা ক্ষণস্থায়ী কিন্তু একজন পেডোফাইলের পক্ষে দাঁড়ানোর কলঙ্ক চিরস্থায়ী। এই যুক্তির কাছেই শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয় ট্রাম্পকে। নিজ দলের মধ্যে এক গণ-বিদ্রোহের আশঙ্কায় তিনি বিলটিকে সমর্থন করতে বাধ্য হন ও হাউসে প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে বিলটি পাস হয়।
ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্প এই ইস্যুতে কতটা ক্ষুব্ধ, তা তার আচরণেই স্পষ্ট। যখন সাংবাদিকরা তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন, তখন তার উত্তর ছিল হয় তিরস্কার (‘চুপ করো, পিগি’), নয়তো সাংবাদিককে ‘খারাপ রিপোর্টার’ বলে আক্রমণ। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই ঘটনা প্রমাণ করে, নৈতিকতার প্রশ্নে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার বর্মও আর আগের মতো অভেদ্য নয়।

‘লেইম ডাক’ বা খোঁড়া হাঁস আমেরিকার রাজনীতির সুনির্দিষ্ট পরিভাষা। এর আনুষ্ঠানিক অর্থ হলো, যখন একজন নেতার উত্তরসূরি নির্বাচিত হয়ে গেছেন কিন্তু পুরনো নেতা এখনো ক্ষমতা হস্তান্তর করেননি, সেই মধ্যবর্তী সময়কাল। এই সময়ে নেতা ক্ষমতাবান থাকলেও ভোটারদের কাছে তার আর কোনো জবাবদিহিতা থাকে না।
কিন্তু এর অনানুষ্ঠানিক বা প্রচলিত অর্থও রয়েছে, যা এখন ট্রাম্পের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। এই অর্থে ‘লেইম ডাক’ হলেন সেই নেতা, যিনি সাংবিধানিকভাবে আর পুনর্নির্বাচিত হতে পারবেন না। আমেরিকার সংবিধান অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না।
ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিন থেকেই এই সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এতদিন তার ‘সুপারপাওয়ার’ ছিল: রিপাবলিকান পার্টির ওপর তার অসামান্য নিয়ন্ত্রণ। দলের যেকোনো সদস্য তার বিরুদ্ধে গেলেই তিনি প্রাইমারি নির্বাচনে তার বিরুদ্ধে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে তাকে হারানোর ক্ষমতা রাখতেন।
কিন্তু সম্প্রতি ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি ২০২৮ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না। এর অর্থ, ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে তার ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হবেই। এই অমোঘ বাস্তবতাই রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। তারা এখন বুঝতে পারছেন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সীমিত কিন্তু তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ দীর্ঘ।
বিবিসির ওয়াশিংটন সংবাদদাতা জন সোপেলের মতে, ‘রিপাবলিকানরা এখন ২০২৮-এর পরের কথা ভাবতে শুরু করেছেন। যেখানে ট্রাম্প নন, বরং তাদের নিজেদের নির্বাচনী এলাকার ভোটাররাই হবেন মূল নিয়ন্ত্রক।’
রিপাবলিকান শিবিরে অসন্তোষ দানা বাঁধার পেছনে এপস্টেইন ফাইল বিতর্কই একমাত্র বিষয় নয়। আল-জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতি দলের একটি বড় অংশকে হতাশ করেছে। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মতো বিতর্কিত নেতাদের পাশে দাঁড়ানো ও আমেরিকার দীর্ঘদিনের মিত্রদের উপেক্ষা করার নীতি দলের ঐতিহ্যবাহী আন্তর্জাতিকতাবাদী অংশের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি করেছে।
এর পাশাপাশি রয়েছে তার শুল্ক নীতি। বিভিন্ন সময় অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, ট্রাম্পের খামখেয়ালি শুল্ক নীতি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বা ‘অ্যাফোর্ডেবিলিটি’ সংকটকে তীব্রতর হচ্ছে। রিপাবলিকানদের একটি বড় অংশ মনে করে, ট্রাম্প এই সমস্যার গভীরতা বুঝতে পারছেন না ও তার নীতি দলের জন্যই বুমেরাং হচ্ছে।
সিএনএনের প্রতিবেদন মতে, হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইং ধ্বংস করে দেওয়া বা তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নিজেদের সমৃদ্ধ করার অভিযোগের মতো বিষয়গুলোও দলের মধ্যে চাপা ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। যদিও এই বিষয়গুলো নিয়ে এখনো কেউ প্রকাশ্যে মুখ খোলেনি, তবে এপস্টেইন বিতর্কের সাফল্য হয়তো অন্যদেরও সাহস জোগাবে।
ক্ষমতা হারানোর পথে থাকা একজন প্রেসিডেন্ট কেবল অভ্যন্তরীণভাবেই দুর্বল হন না, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার প্রভাব কমতে শুরু করে। একজন ‘লেইম ডাক’ প্রেসিডেন্ট আরও বেশি খামখেয়ালি ও আনপ্রেডিক্টেবল (অপ্রত্যাশিত) হয়ে উঠতে পারেন। তিনি হয়তো দীর্ঘমেয়াদী পরিণতির কথা না ভেবেই নিজের শাসনকালের শেষভাগে যুগান্তকারী ‘লেগ্যাসি’ বা উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। এক্ষেত্রে ট্রাম্পের ম্যাডম্যান থিওরি প্রয়োগ করে সবাইকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল আর খাটবে না।
সিএনএনের বিশ্লেষক জ্যাকারি বি. উলফের মতে, ট্রাম্প হয়তো ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত সংঘাতে জড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন অথবা এমন কোনো চুক্তি করতে পারেন, যা পরবর্তী প্রশাসনের জন্য নতুন সংকট তৈরি করবে। মিত্র দেশগুলো তার ওপর আস্থা রাখতে পারছে না, আর রাশিয়া বা চীনের মতো প্রতিপক্ষরা তার এই দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার জন্য ওঁত পেতে আছে।
ইতিহাস সাক্ষী, ‘লেইম ডাক’ সময়কাল প্রায়শই বিপজ্জনক হয়। ১৮৬০ সালে আব্রাহাম লিংকন নির্বাচিত হওয়ার পর ও ক্ষমতা গ্রহণের আগে বিদায়ী প্রেসিডেন্টের দুর্বলতার সুযোগেই দক্ষিণের রাজ্যগুলো ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছিল, যা আমেরিকাকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।
আবার, জর্জ ডব্লিউ বুশ তার ক্ষমতার শেষভাগে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় এক বিশাল বেইলআউট প্যাকেজ পাস করেছিলেন, যা পরবর্তী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জন্য এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করে।
আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্প এখনো ‘লেইম ডাক’ নন। আগামী বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ২০২৮ সালের চূড়ান্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন—উভয় ক্ষেত্রেই তার প্রভাব থাকবে। কিন্তু ক্ষমতার দৌড়ে ট্রাম্প হোঁচট খেয়েছেন, তা অনস্বীকার্য। ওয়াশিংটনের আকাশে এখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হলো—এই হোঁচট কি সাময়িক, নাকি এটিই ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষমতার দৌড়ের শেষ ল্যাপের সূচনা? এর উত্তর পেতে হলে হয়তো আমাদের ২০২৮ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। আগামী কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহই হয়তো দেখিয়ে দেবে, ট্রাম্পের লৌহবর্ম সত্যিই কতটা মজবুত, আর কতটা ভঙ্গুর।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, সিএনএন, আল-জাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ান

রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে জেফ্রি এপস্টেইন সংশ্লিষ্ট সব নথি প্রকাশের নির্দেশনা দেওয়া বিলে সই করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বুধবার (১৯ নভেম্বর) ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’ নামক এই বিলে সই করেন ট্রাম্প। আইনে বলা হয়েছে, মার্কিন বিচার বিভাগকে জেফ্রি এপস্টেইন মামলার তদন্ত সংক্রান্ত সব তথ্য ৩০ দিনের মধ্যে প্রকাশ করতে হবে। কয়েক মাস ধরে কংগ্রেসে বিতর্ক, রাজনৈতিক চাপ ও রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের পর এই সিদ্ধান্ত আসে।
মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও এই দৃশ্য অকল্পনীয় ছিল। ট্রাম্প বরাবরই এই বিলের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে আসছিলেন, সেই বিলেই শেষ পর্যন্ত সই করতে হলো তাকে। এই ঘটনাকে কেবল কোনো নীতিগত পরিবর্তন নয়, বরং ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাষ্ট্রপতিত্বের নতুন ও সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করল। ক্ষমতার অলিন্দে গুঞ্জন উঠেছে, আমেরিকার রাজনীতিতে এক অমোঘ বাস্তবতা ফিরে এসেছে, যার নাম ‘লেইম ডাক’ বা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পথে থাকা খোঁড়া হাঁস।
রিপাবলিকান পার্টির ওপর ট্রাম্পের যে লৌহকঠিন নিয়ন্ত্রণ গত কয়েক বছর ধরে ওয়াশিংটনের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেই দেয়ালে কি ফাটল ধরতে শুরু করেছে? এপস্টেইন ফাইল বিতর্কে ট্রাম্পের এই পিছু হটা কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি বৃহত্তর ভাঙনেরই প্রথম চিহ্ন? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করে দেবে আমেরিকার আগামী কয়েক বছরের রাজনীতি ও বিশ্বজুড়ে তার প্রভাবের গতিপ্রকৃতি।
ঘটনার সূত্রপাত জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্কিত গোপনীয় নথি প্রকাশের বিল নিয়ে। ট্রাম্প প্রথম থেকেই এই বিলের বিরোধিতা করে আসছিলেন। এমনকি সরকারের অচলাবস্থার কারণে যখন এক মাসেরও বেশি সময় ধরে হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস-এর অধিবেশন বন্ধ ছিল, তখনও তিনি এই ভোট এড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু অধিবেশন শুরু হতেই পরিস্থিতি বদলে যায়।
কেন্টাকির রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান টমাস ম্যাসির মতো নেতারা এই ইস্যুতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে একাট্টা হন। সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যাসি তার সহকর্মীদের সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘এই ভোটের ক্ষেত্রে রিপাবলিকানদের জন্য চুক্তিটা হলো, আপনি বিপক্ষে ভোট দেন তবে ট্রাম্প আপনাকে রক্ষা করবেন... কিন্তু আমি আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই, এই ভোট আপনার রেকর্ডে ট্রাম্প যতদিন প্রেসিডেন্ট থাকবেন তার চেয়েও বেশি সময় ধরে থাকবে।’
ম্যাসির বার্তা ছিল সুস্পষ্ট, ট্রাম্পের সুরক্ষা ক্ষণস্থায়ী কিন্তু একজন পেডোফাইলের পক্ষে দাঁড়ানোর কলঙ্ক চিরস্থায়ী। এই যুক্তির কাছেই শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয় ট্রাম্পকে। নিজ দলের মধ্যে এক গণ-বিদ্রোহের আশঙ্কায় তিনি বিলটিকে সমর্থন করতে বাধ্য হন ও হাউসে প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে বিলটি পাস হয়।
ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্প এই ইস্যুতে কতটা ক্ষুব্ধ, তা তার আচরণেই স্পষ্ট। যখন সাংবাদিকরা তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করেন, তখন তার উত্তর ছিল হয় তিরস্কার (‘চুপ করো, পিগি’), নয়তো সাংবাদিককে ‘খারাপ রিপোর্টার’ বলে আক্রমণ। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই ঘটনা প্রমাণ করে, নৈতিকতার প্রশ্নে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার বর্মও আর আগের মতো অভেদ্য নয়।

‘লেইম ডাক’ বা খোঁড়া হাঁস আমেরিকার রাজনীতির সুনির্দিষ্ট পরিভাষা। এর আনুষ্ঠানিক অর্থ হলো, যখন একজন নেতার উত্তরসূরি নির্বাচিত হয়ে গেছেন কিন্তু পুরনো নেতা এখনো ক্ষমতা হস্তান্তর করেননি, সেই মধ্যবর্তী সময়কাল। এই সময়ে নেতা ক্ষমতাবান থাকলেও ভোটারদের কাছে তার আর কোনো জবাবদিহিতা থাকে না।
কিন্তু এর অনানুষ্ঠানিক বা প্রচলিত অর্থও রয়েছে, যা এখন ট্রাম্পের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। এই অর্থে ‘লেইম ডাক’ হলেন সেই নেতা, যিনি সাংবিধানিকভাবে আর পুনর্নির্বাচিত হতে পারবেন না। আমেরিকার সংবিধান অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না।
ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিন থেকেই এই সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এতদিন তার ‘সুপারপাওয়ার’ ছিল: রিপাবলিকান পার্টির ওপর তার অসামান্য নিয়ন্ত্রণ। দলের যেকোনো সদস্য তার বিরুদ্ধে গেলেই তিনি প্রাইমারি নির্বাচনে তার বিরুদ্ধে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে তাকে হারানোর ক্ষমতা রাখতেন।
কিন্তু সম্প্রতি ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি ২০২৮ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না। এর অর্থ, ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে তার ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হবেই। এই অমোঘ বাস্তবতাই রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। তারা এখন বুঝতে পারছেন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সীমিত কিন্তু তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ দীর্ঘ।
বিবিসির ওয়াশিংটন সংবাদদাতা জন সোপেলের মতে, ‘রিপাবলিকানরা এখন ২০২৮-এর পরের কথা ভাবতে শুরু করেছেন। যেখানে ট্রাম্প নন, বরং তাদের নিজেদের নির্বাচনী এলাকার ভোটাররাই হবেন মূল নিয়ন্ত্রক।’
রিপাবলিকান শিবিরে অসন্তোষ দানা বাঁধার পেছনে এপস্টেইন ফাইল বিতর্কই একমাত্র বিষয় নয়। আল-জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতি দলের একটি বড় অংশকে হতাশ করেছে। সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মতো বিতর্কিত নেতাদের পাশে দাঁড়ানো ও আমেরিকার দীর্ঘদিনের মিত্রদের উপেক্ষা করার নীতি দলের ঐতিহ্যবাহী আন্তর্জাতিকতাবাদী অংশের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি করেছে।
এর পাশাপাশি রয়েছে তার শুল্ক নীতি। বিভিন্ন সময় অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, ট্রাম্পের খামখেয়ালি শুল্ক নীতি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বা ‘অ্যাফোর্ডেবিলিটি’ সংকটকে তীব্রতর হচ্ছে। রিপাবলিকানদের একটি বড় অংশ মনে করে, ট্রাম্প এই সমস্যার গভীরতা বুঝতে পারছেন না ও তার নীতি দলের জন্যই বুমেরাং হচ্ছে।
সিএনএনের প্রতিবেদন মতে, হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইং ধ্বংস করে দেওয়া বা তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নিজেদের সমৃদ্ধ করার অভিযোগের মতো বিষয়গুলোও দলের মধ্যে চাপা ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। যদিও এই বিষয়গুলো নিয়ে এখনো কেউ প্রকাশ্যে মুখ খোলেনি, তবে এপস্টেইন বিতর্কের সাফল্য হয়তো অন্যদেরও সাহস জোগাবে।
ক্ষমতা হারানোর পথে থাকা একজন প্রেসিডেন্ট কেবল অভ্যন্তরীণভাবেই দুর্বল হন না, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার প্রভাব কমতে শুরু করে। একজন ‘লেইম ডাক’ প্রেসিডেন্ট আরও বেশি খামখেয়ালি ও আনপ্রেডিক্টেবল (অপ্রত্যাশিত) হয়ে উঠতে পারেন। তিনি হয়তো দীর্ঘমেয়াদী পরিণতির কথা না ভেবেই নিজের শাসনকালের শেষভাগে যুগান্তকারী ‘লেগ্যাসি’ বা উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। এক্ষেত্রে ট্রাম্পের ম্যাডম্যান থিওরি প্রয়োগ করে সবাইকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল আর খাটবে না।
সিএনএনের বিশ্লেষক জ্যাকারি বি. উলফের মতে, ট্রাম্প হয়তো ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত সংঘাতে জড়ানোর চেষ্টা করতে পারেন অথবা এমন কোনো চুক্তি করতে পারেন, যা পরবর্তী প্রশাসনের জন্য নতুন সংকট তৈরি করবে। মিত্র দেশগুলো তার ওপর আস্থা রাখতে পারছে না, আর রাশিয়া বা চীনের মতো প্রতিপক্ষরা তার এই দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার জন্য ওঁত পেতে আছে।
ইতিহাস সাক্ষী, ‘লেইম ডাক’ সময়কাল প্রায়শই বিপজ্জনক হয়। ১৮৬০ সালে আব্রাহাম লিংকন নির্বাচিত হওয়ার পর ও ক্ষমতা গ্রহণের আগে বিদায়ী প্রেসিডেন্টের দুর্বলতার সুযোগেই দক্ষিণের রাজ্যগুলো ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছিল, যা আমেরিকাকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।
আবার, জর্জ ডব্লিউ বুশ তার ক্ষমতার শেষভাগে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় এক বিশাল বেইলআউট প্যাকেজ পাস করেছিলেন, যা পরবর্তী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জন্য এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করে।
আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্প এখনো ‘লেইম ডাক’ নন। আগামী বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ২০২৮ সালের চূড়ান্ত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন—উভয় ক্ষেত্রেই তার প্রভাব থাকবে। কিন্তু ক্ষমতার দৌড়ে ট্রাম্প হোঁচট খেয়েছেন, তা অনস্বীকার্য। ওয়াশিংটনের আকাশে এখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হলো—এই হোঁচট কি সাময়িক, নাকি এটিই ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্ষমতার দৌড়ের শেষ ল্যাপের সূচনা? এর উত্তর পেতে হলে হয়তো আমাদের ২০২৮ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। আগামী কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহই হয়তো দেখিয়ে দেবে, ট্রাম্পের লৌহবর্ম সত্যিই কতটা মজবুত, আর কতটা ভঙ্গুর।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, সিএনএন, আল-জাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ান

মোজতাবা খামেনির শাসনামলে ইরান কি শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা দেশগুলোর নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে, নাকি চীনের অখণ্ড সমর্থন ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে পুঁজি করে একটি নতুন এশীয় অক্ষের শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে আবির্ভূত হবে—তা-ই এখন বিশ্ব রাজনীতির প্রধান প্রশ্ন।
৬ মিনিট আগে
বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম প্রাণ ছিল সংসদে প্রাণবন্ত বিতর্কের সংস্কৃতি। আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদ সদস্যদের যুক্তি-তর্কে ভরপুর আলোচনা ছিল সংসদের স্বাভাবিক চিত্র। একসময় সংসদে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য, পরিসংখ্যান ও রাজনৈতিক দর্শন তুলে ধরে বক্তব্য রাখতেন
১২ ঘণ্টা আগে
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামালার শুরু হওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। বর্তমানে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ৯০ থেকে ১২০ মার্কিন ডলারের মধ্যে উঠানামা করছে। ২০২২ সালের পর এটিই তেলের সর্বোচ্চ মূল্যস্তর। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর এই প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম
১৩ ঘণ্টা আগে
আধুনিক যুদ্ধে আকাশপথের আধিপত্য বা ‘এয়ার সুপিরিয়রিটি’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতি সম্প্রতি (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাত এবং এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরের ঘটনাপ্রবাহে এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
১ দিন আগে