মৃত্যুবার্ষিকী
লেখা:

একদিন এক বন্ধু সিনেমা হল থেকে বের হয়ে ফোন করে বললেন, ‘আমি বাংলাদেশে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা দেখেছি।’ আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, ‘কী বলছ?’ বন্ধু বললেন, ‘তরুণ নির্মাতা তারেক মাসুদের কাজ দেখো। পরে কথা হবে।’
বন্ধুর কথা শুনে আমি তারেক মাসুদের সিনেমা দেখলাম। এরপর তারেকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের ‘ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সের’ মাধ্যমে অনেক তরুণ ও প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতা উঠে এসেছেন। তাদের মধ্যে তারেক মাসুদ ছিলেন অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিভা।
‘নরসুন্দর’, ‘মাটির ময়না’, ‘মুক্তির গান’, ‘অন্তর্যাত্রা’ ও ‘রানওয়ে’র মতো অসাধারণ চলচ্চিত্রের নির্মাতা তারেক মাসুদ ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু চলচ্চিত্রপ্রেমী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাইকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
বাংলাদেশের বিকল্প ও শিল্পধর্মী চলচ্চিত্রের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে তারেক মাসুদকে স্মরণ করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারায় নতুন চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন। তাঁর কাজ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। তাই বন্ধুর দেওয়া ‘বাংলাদেশের সত্যজিৎ রায়’ উপমাটিও একেবারে অমূলক ছিল না। অনেকেরই মনে হয়, আরও দীর্ঘ জীবন পেলে বিপুল সম্ভাবনাময় এই নির্মাতা হয়তো আরও অনেক বড় কাজ উপহার দিতে পারতেন।
তারেক মাসুদ শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমাজসচেতন ও মানবিক একজন মানুষ। তাঁর চলচ্চিত্র ও চিন্তার মধ্যে সমাজ, মানুষ ও দেশের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা ফুটে উঠেছে। নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর সেই মানবিক দর্শন ও সৃজনশীল কাজ পৌঁছে দিতে নানা উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। তারেক মাসুদের জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাঁর কাজের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান ও সৃষ্টিশীলতার স্মৃতি তাই সময়ের সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
তারেক মাসুদ ১৯৫৬ সালে ফরিদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা নুরুন নাহার মাসুদ এবং বাবা মশিউর রহমান মাসুদ। তারেক মাসুদের চাচাতো বোন তাহমিনা রব্বানী বলেন, ‘ছোটবেলায় আমরা ফরিদপুরে তারেকদের একই গ্রামে থাকতাম। তাই একসঙ্গেই বড় হয়েছি। তারেকের বাবা আমাদের গ্রামের সবচেয়ে সংস্কৃতিমনা মানুষ ছিলেন। তাঁর কারণেই গ্রামেও আমরা গান গাইতাম ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতাম।’
তারেকের বাবা মশিউর রহমান মাসুদ কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তিনি ছিলেন শিক্ষিত ও উদারমনা মানুষ। তবে তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর হঠাৎ করেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। কয়েক মাস পর তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন। তখন তাঁর পরনে ছিল আলখাল্লা এবং মুখে ছিল লম্বা দাঁড়ি।
তাহমিনা রব্বানী বলেন, ‘একসময় চাচা (তারেকের বাবা) পুরোপুরি বদলে গেলেন। তিনি খুব ধর্মপ্রাণ হয়ে উঠলেন এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত হলেন। এর ফলে বাড়িতে সব ধরনের সাংস্কৃতিক চর্চা পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। তারেককে স্কুলে না দিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয়।’
তারেকের বাবা চেয়েছিলেন, ছেলে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হোক। তাই তারেক মাসুদের শিক্ষাজীবনের একটি পর্যায় কেটেছে মাদ্রাসায়। একেক সময় তাকে পড়তে হয়েছে ফরিদপুর, ঢাকার লালবাগ ও কাকরাইলসহ বিভিন্ন মাদ্রাসায়। এমনকি যশোরের মধুমতী নদীর তীরে বহিরদিয়াতেও পড়াশোনা করেছেন তিনি। বারবার মাদ্রাসা বদলের পেছনে একটি নির্দিষ্ট কারণ ছিল।
তারেকের বাবা ছিলেন তাবলিগের সঙ্গে যুক্ত একজন ধর্মপ্রচারক। তিনি চাইতেন, ছেলে বড় আলেম হোক। তাই তারেককে ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসায় ভর্তি করে বাবা তিন চিল্লায় বিদেশে চলে যেতেন। ফিরে এসে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি মাদ্রাসায় ছেলের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে প্রায়ই জানতে পারতেন, তারেক আর সেখানে নেই।
তাদের বড় পরিবারটি ছিল বেশ সংস্কৃতিমনা। তবে তারেকের বাবা ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি ছিলেন অনেক বেশি অনুরাগী। তারেকের সব চাচা ও চাচাতো ভাই ঢাকায় থাকতেন। বাবা বিদেশে গেলে তারা কয়েক দিনের মধ্যেই এসে তারেককে মাদ্রাসা থেকে নিয়ে যেতেন। বিষয়টি পরে তারেকের বাবা বুঝতে পারেন। এরপর তিনি ছেলেকে তাদের এলাকা থেকে অনেক দূরে, গ্রামের একটি মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দেন। এ কারণেই একের পর এক মাদ্রাসা বদলাতে হয়েছে তারেককে।
তারেকের মন পড়ে থাকত পরিবারের কাছেই। মাদ্রাসায় সুযোগ পেলেই তিনি চলে যেতেন মামার বাড়ি কিংবা নিজের বাড়িতে। মাদ্রাসায় একাকিত্বের কথা তিনি কাউকে বলতেন না। ভাই-বোনদের সঙ্গে খেলাধুলা করে আনন্দে মেতে থাকতেন। একদিন তিনি এক চাচাতো ভাইকে বলেছিলেন, মাদ্রাসার জানালা দিয়ে বাইরে শিশুদের খেলতে ও আনন্দ করতে দেখে তাঁর খুব কষ্ট হতো। তাঁর মনে হতো, বাইরের শিশুরাই যেন স্বাধীন।
তারেক বলেছিল, মাদ্রাসায় পড়ার সময় সেখানে মধ্যবিত্ত পরিবারের কোনো ছেলে ছিল না বললেই চলে। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই ছিল এতিম কিংবা খুব দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তারেকের পরিবার ছিল স্বচ্ছল। তাই মাদ্রাসায় তিনি অনেকটা বাইরের মানুষ হিসেবেই ছিলেন। ষাটের দশকজুড়ে বাবার ইচ্ছায় তাঁকে মাদ্রাসার এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তারেকের জন্যও হয়ে উঠেছিল এক ব্যক্তিগত লড়াই। মুক্তিযুদ্ধের সময় কিশোর তারেক তাঁর মামা দেলোয়ার হোসেন চৌধুরীর অনুপ্রেরণায় যুদ্ধের প্রতি আকৃষ্ট হন। একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় পড়ার আগ্রহও তৈরি হয় তাঁর। একপর্যায়ে তিনি মামার বাড়িতে গিয়ে কাঁধে রাইফেল তুলে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দেন।
নয় মাসের যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই যেন নতুন এক তারেক মাসুদেরও জন্ম হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারেকের বাবা উপলব্ধি করেন, ধর্মীয় ভ্রাতৃত্বের চেয়ে একই সাংস্কৃতিক ও জাতিগত পরিচয়ে গড়ে ওঠা মানুষের পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতাই বাস্তব সত্য। পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ দেখার পরই তাঁর চিন্তায় এই পরিবর্তন আসে। নির্যাতন-নিপীড়নের পরও স্বাধীনতাকামী মানুষ লড়াই থেকে সরে যায়নি। ফলে যে বিপরীত স্রোতে একসময় তিনি তারেককে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, সেখান থেকে তারেককে ফিরিয়ে আনেন তাঁর বাবা। তিনি বুঝতে পারেন, তারেককে তার স্বাভাবিক সত্তার বাইরে ঠেলে দিয়ে কোনো ভালো ফল পাওয়া যাবে না। পাকিস্তানিরাও যেমন এ দেশের মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে জোর করে দমিয়ে রাখতে পারেনি, তেমনি তারেকের স্বাভাবিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত করে রাখা সম্ভব নয়।
তারেক বুঝতে পেরেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনকে অনেক কিছু দিয়েছে। তাঁর মা আবার স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছেন। তাঁর বাবার মধ্যেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছিল। ইসলাম রক্ষার নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং নতুন এক চেতনায় জেগে উঠেছিলেন। নিজের চোখে নদীতে লাশ ভাসতে দেখার পর তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তাঁর বাবার চিন্তাভাবনায় আরও একটি মৌলিক পরিবর্তন আসে। তাঁর উদ্যোগেই ১৯৭৩ সালে তারেক ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাস করেন। পরে তিনি তারেককে আর মাদ্রাসায় যেতে দেননি।
ম্যাট্রিক পাস করার পর তারেকের কলেজজীবন ছিল একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতার। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ ছিল সহশিক্ষার কলেজ, যেখানে প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীই ছিল নারী। মাদ্রাসায় দরিদ্র ও এতিম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থাকা তাঁর জন্য যতটা সহজ ছিল, সহশিক্ষার কলেজের পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া তাঁর জন্য শুরুর দিকে তার চেয়ে বেশি কঠিন ছিল। এটাই তাঁর জন্য বড় ধরনের সাংস্কৃতিক ধাক্কা হয়ে এসেছিল। তবে আবাসিক হলে থাকার সময় ধীরে ধীরে তিনি এই প্রতিকূল শহুরে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মানসিক শক্তি অর্জন করেন। আবাসিক জীবনে নানা ভাষা, অভ্যাস, রুচি, এমনকি মানুষের বসা ও হাঁটার ভিন্নতাকেও গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি হয়। তারেকের মধ্যেও সেই মানসিকতা গড়ে উঠেছিল।
তারেক সুন্দর কবিতা লিখতেন। মাদ্রাসায় পড়া একটি ছেলে এত সুন্দর বাংলা লিখতে পারে এটি দেখে অনেকেই অবাক হতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বন্ধুবৎসল। আর এ কারণেই তাঁর বন্ধুরাও তাঁকে খুব আপন করে নিয়েছিলেন। তারেক আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে নটর ডেম কলেজ থেকে স্নাতক হন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেন। কলেজে পড়ার সময় থেকেই ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর যাতায়াত শুরু হয়। একপর্যায়ে তিনি বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গেও যুক্ত হন।
সত্তরের দশকের শুরুর দিকে সাহিত্যমনস্ক অন্য অনেক তরুণের মতো তারেকও চলচ্চিত্রকে খুব একটা গুরুত্ব দিতেন না। এর একটি কারণ ছিল তাঁর মাদ্রাসাশিক্ষা ও রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবেশ। শৈশব থেকেই দেশি-বিদেশি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে তাঁর তেমন পরিচয় ছিল না। তবে সংগীত, চিত্রকলা, স্থাপত্য, নৃতত্ত্ব ও মনোবিজ্ঞানের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদে চলচ্চিত্রবিষয়ক বিভিন্ন বই পড়তে গিয়ে তারেকের ধারণা বদলাতে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হয়ে ওঠেন। চলচ্চিত্রকে গভীরভাবে বোঝার প্রবল আগ্রহ জন্ম নেয় তাঁর মধ্যে। সংসদে নিয়মিত চলচ্চিত্র দেখা শুরু করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে তাঁর সামনে হঠাৎ খুলে যায় বিশ্ব চলচ্চিত্রের বিশাল জগৎ। মনে হচ্ছিল, তাঁর জীবন যেন দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।
অনেকে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ দেখার আগে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসটি পড়েছেন। কিন্তু তারেকের ক্ষেত্রে ঘটেছিল উল্টোটা। তিনি আগে সিনেমাটি দেখেন। ছোটবেলা থেকে তিনি শুনে এসেছিলেন, সিনেমা খারাপ জিনিস। কিন্তু ‘পথের পাঁচালী’ দেখার পর তাঁর সেই ধারণা পুরোপুরি বদলে যায়। তিনি উপলব্ধি করেন, এটি শুধু বাস্তব জীবনের গল্প নয়; বরং মানুষের সত্যিকারের জীবনকেই তুলে ধরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়টিও তারেকের জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হলেও তাঁর বেশির ভাগ সময় কাটত চারুকলা বিভাগে। ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক মুনতাসীর মামুন তাঁকে পড়াতেন। বিভাগীয় পড়াশোনায় তারেক খুব ভালো না করলেও মুনতাসীর মামুন সবসময় তাঁকে উৎসাহ ও সমর্থন দিতেন। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামও ছিলেন তাঁর শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের শিক্ষাবিদ আহমদ শরীফের সঙ্গেও তাঁর ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তাঁদের প্রত্যেকের প্রতিই তারেকের ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতা।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তারেক মাসুদ আরেকজন মানুষকে খুব পছন্দ করতেন তিনি ছিলেন আহমদ ছফা। ছাত্রজীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি ছিল ছফার সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। লাইব্রেরি চত্বরে বসে তাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন। ছফার সঙ্গে কথা বলার আনন্দই ছিল আলাদা। নানা বিষয়ে তিনি তর্কে জড়াতেন। তারেক জানতেন, ছফা সবসময়ই যুক্তি-তর্ক করতে পছন্দ করতেন, তবে সেই তর্ক কখনো উত্তপ্ত হয়ে উঠত না। আর কোনো বিষয় নিয়েই ছফা কখনো বিরক্ত হতেন না।
অবসর সময়ে তারেক মাসুদ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। সত্তরের দশক ছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উজ্জীবিত একটি সময়। তাঁর মনেও ছিল স্বাধীনতার চেতনা ও সাংস্কৃতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তিনি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মতো জায়গায় গিয়ে নানা ধরনের বই পড়তেন, কবিতা আন্দোলনে অংশ নিতেন এবং পথনাটকে যুক্ত হতেন। সেই সময়ের বিপ্লবী চেতনা তাঁকে সাংস্কৃতিক মুক্তির আন্দোলনের দিকে টেনে নেয়। লেখক শিবিরসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
একসময় তিনি একটি নাট্যদলও গড়ে তোলেন। দলটি নিয়ে দেশের দূর-দূরান্তের বিভিন্ন এলাকায় নাটক মঞ্চস্থ করতে যেতেন। যাত্রাপথে লঞ্চ বা নৌকাতেও চলত নাটকের মহড়া। কৃষকদের জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যেও তাঁরা সাংস্কৃতিক কর্মসূচি চালাতেন। ‘ওরে ওঠ রে চাষি, জগতবাসী’ এমন গান গেয়ে তাঁরা মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করার চেষ্টা করতেন। সমাজে কিছু করার তাগিদ থেকেই এসব কর্মকাণ্ডে তিনি যুক্ত হন। তবে চরম বামপন্থী রাজনীতির মতাদর্শগত কঠোরতা তারেকের ভালো লাগত না। বিশেষ করে স্ট্যালিনের সমালোচনা করাকে ঘিরে বামপন্থী রাজনীতিকদের যে কঠোর অবস্থান ছিল, সেটিও তিনি পছন্দ করতেন না। তারেকের কাছে রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে সাংস্কৃতিক মুক্তিই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বিশ্বাস ছিল, মানুষের চিন্তা ও সংস্কৃতির স্বাধীনতাই সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান পথ।
অন্যদিকে, লেখক শিবিরের পাশাপাশি চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনও চলচ্চিত্র সংগঠন ক্যাটওয়ার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লেখক শিবির ও চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন পরস্পরের সঙ্গে সমন্বিতভাবে এগিয়ে চলছিল। এ সময় কয়েকজন বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরও তাঁদের প্রতি সমর্থন ছিল। তখন তারেকের চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ ছিল প্রবল। এই আগ্রহ তৈরির পেছনে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো প্রেরণা কাজ করেছিল। একজন মানুষ যখন জীবনের কোনো লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যান, তখন তাঁর পথচলায় কিছু বিষয় একে অন্যের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যুক্ত হতে থাকে। তারেকের ক্ষেত্রেও তেমনটাই দেখা যায়। চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর আকর্ষণ, দিনের পর দিন আর্ট কলেজে সময় কাটানো এসবের সঙ্গে তাঁর চিত্রকলার প্রতি গভীর আগ্রহের সম্পর্ক ছিল।

শৈশবে মাদ্রাসায় পড়ার সময় প্রজাপতির ছবি আঁকার জন্যও তাঁকে বকুনি খেতে হয়েছিল। কারণ, শিক্ষকদের চোখে ছবি আঁকা ছিল সৃষ্টিকর্তার কাজ অনুকরণ করার মতো বিষয়। সেই মাদ্রাসাজীবন থেকেই হয়তো চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর আগ্রহের বীজ তৈরি হয়েছিল, যদিও তখন তিনি নিজেও তা স্পষ্টভাবে বলতে পারতেন না। তবে কৌতূহলটা তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছিল এবং ধীরে ধীরে তা আরও গভীর হয়। একসময় তাঁর চিত্রকলার প্রতি আগ্রহ, গ্রামবাংলার পথে পথে ঘুরে বেড়ানো এবং সমাজ ও মানুষের জীবনকে কাছ থেকে জানার চেষ্টা সবকিছু যেন এক জায়গায় এসে মিলিত হয়। তারেকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা চলচ্চিত্র বিষয়ে ছিল না। কিন্তু চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে তাঁর বিকাশে বিশেষভাবে কার্যকর হয়েছিল দুটি বিষয়— একটি ছিল বিশ্বের প্রায় সব চলচ্চিত্র নির্মাতাই সৃষ্টিশীল কাজের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যান। তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রচর্চার মূল শিক্ষাকেন্দ্র ছিল চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন। ফিল্ম আর্কাইভে যে প্রশিক্ষণ কোর্স চালু হয়েছিল, সেটিও মূলত ফিল্ম সংসদ আন্দোলনেরই ফল। পরবর্তী সময়ে ফিল্ম সংসদকর্মীদের উদ্যোগেই গড়ে ওঠে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম।
অন্যটি ছিল, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ও ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৮ সালে। শুরুতে সেখানে চলচ্চিত্রবিষয়ক অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স চালু করা হয়। এই কোর্স থেকেই পরবর্তীতে বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতা উঠে আসেন। ১৯৮২ সালে নতুন নির্মাতাদের মধ্যে তারেক মাসুদ ছিলেন অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিভা। তারেকের চলচ্চিত্র বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। তাই ১৯৮২ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ শেখার জন্য তিনি ভারতের পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার আবেদন করেন এবং বৃত্তিও পান। কিন্তু ২৪ মার্চ জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর ভারতবিরোধী অবস্থানের কারণে ভারতীয় বৃত্তিগুলো বাতিল করে দেওয়া হয়।
তারেক অবশ্য এতে দমে যাননি। বৃত্তি ফিরে পাওয়ার জন্য তিনি নানা জায়গায় যোগাযোগ ও তদবির শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি বৃত্তিটি ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হন। এরপর পুনে গিয়ে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের পরিচালক কৃষ্ণমূর্তির কাছ থেকে অনাপত্তিপত্রও (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) সংগ্রহ করেন। এরই মধ্যে সময় গড়িয়ে যায়, পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ক্লাসও শুরু হয়ে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারেক আর সেখানে যাননি। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি পরিবারের কাছে টাকা চান এবং চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করতে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।
১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে ঢাকায় ফেরেন তারেক। মূলত তিনিই ছিলেন এই উৎসবের প্রধান সংগঠকদের একজন। বিভিন্ন দেশ থেকে স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্তধারার চলচ্চিত্র সংগ্রহ করে তিনি উৎসবটি আয়োজন করেন। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এই উৎসব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। পরবর্তী সময়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলন ‘বিকল্প চলচ্চিত্র আন্দোলন’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ফোরাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এরই মধ্যে ১৯৮৯ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন চলচ্চিত্র পরিচালক ক্যাথরিনকে বিয়ে করেন তারেক। ১৯৯০ সালে ক্যাথরিনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার আগে তারা দুজন মিলে ‘আদম সুরত’, ‘আহ আমেরিকা’ ও ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ এই তিনটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
৫০ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র ‘আদম সুরত’ নির্মিত হয় বাংলাদেশের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জীবন, শিল্পভাবনা ও মানবিক দর্শনকে কেন্দ্র করে। তাঁর আঁকা ছবিতে শ্রমিক ও কৃষকদের শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রকৃতিও সেখানে মানুষের ভালোবাসাময় জীবনধারণের অবলম্বন হিসেবে উপস্থিত। তরুণ তারেক সুলতানের শিল্প ও মানবিক দর্শন থেকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। বাংলার লোকসংস্কৃতির জগতেও এই মানবতাবাদী দর্শনের শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। পরবর্তী সময়ে তারেকের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোতেও মানবতাবাদী চিন্তার এই প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
‘আদম সুরত’ নির্মাণের সময়ই তারেক ‘সোনার বেড়ি’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ভাবনা পান। নারীর ওপর বিভিন্ন ধরনের নিপীড়ন ও শোষণকে কেন্দ্র করে এই চলচ্চিত্রের পরিকল্পনা করা হয়। ‘সোনার বেড়ি’ নামটির মধ্যেই রয়েছে এর মূল বক্তব্য নারীকে অলংকারের প্রতি আকৃষ্ট করে কীভাবে সেই অলংকারকেই তার শৃঙ্খলে পরিণত করা হয়। কোমর, হাত ও পায়ে সোনার অলংকার পরিয়ে নারীর ওপর তৈরি করা সামাজিক বন্ধনকে এখানে প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
তারেকের আরেকটি গভীর বিশ্বাস ছিল নিজের মাটি, দেশ ও সংস্কৃতির চেয়ে বড় কিছু নেই। এই দর্শনকে সামনে রেখেই তিনি ‘আহ আমেরিকা’ নির্মাণ করেন। অন্যদিকে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ ছিল একটি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
তারেক মাসুদের স্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্যচিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘মুক্তির গান’ ও ‘মুক্তির কথা’। নিজের অর্থায়নে নির্মিত ‘মুক্তির গান’ মূলত মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গান ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের গল্প তুলে ধরে। এসব লোকগান ও গণসংগীতের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদের শক্তি ছিল। একদিকে সাংস্কৃতিক কর্মীরা গানের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, অন্যদিকে এসব গান মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
তারেক মাসুদের নিজের জীবন ও অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া গল্পের ভিত্তিতে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’। ছবিটি নানা প্রশ্নের মুখোমুখি করে দর্শককে। এখানে ভালো-মন্দ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস এবং মানবিকতার নানা দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে। তবে ছবির উপস্থাপনভঙ্গির মধ্যেই এসব প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তরও খুঁজে পাওয়া যায়। ২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মাটির ময়না’ তারেক মাসুদকে একজন ব্যতিক্রমী চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পী হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে।
ছবিটির শুরু হয় একটি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকের দৈনন্দিন জীবন দিয়ে। গল্প এগিয়ে যায় মাদ্রাসার কিশোর ছাত্র আনুকে কেন্দ্র করে। একই সঙ্গে বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিও উঠে আসে আনুর মা আয়েশার শীতের পিঠা তৈরির দৃশ্যে। গ্রামীণ পরিবারে বেড়ে উঠলেও আনুর বাবা তাকে মাদ্রাসায় পড়তে পাঠান। সেখানে আনুর একমাত্র বন্ধু ছিল আরেক কিশোর রোকন।
‘মাটির ময়না’র গল্পের পটভূমিতে রয়েছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম ও পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা। ভৌগোলিকভাবে এক হাজার মাইলেরও বেশি দূরত্বে থাকা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে এক রাষ্ট্রের অধীনে রাখা হলেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা পূর্ব পাকিস্তানকে প্রায় উপনিবেশের মতোই শাসন করত। ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ধর্ম ও রাজনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে বৈষম্য ছিল। একই সঙ্গে পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে।
এরই প্রতিবাদে শুরু হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন। পরে সেই আন্দোলন ধীরে ধীরে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার বৃহত্তর সংগ্রামে রূপ নেয়। ভাষা, সংস্কৃতি ও নিজস্ব ঐতিহ্যের ভিত্তিতে একটি ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা জোরালো হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে পাকিস্তানকে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে টিকিয়ে রাখতে একদল ধর্মান্ধ মানুষও সক্রিয় হয়। ‘মাটির ময়না’য় আনুর বাবাও শুরুতে পাকিস্তানপন্থীদের সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো নির্মম হত্যাযজ্ঞ ও মানুষের ওপর নির্যাতন নিজের চোখে দেখে তার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আয়েশা ছেলে আনুকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এভাবেই ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক টানাপোড়েন, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে এক সুতোয় গেঁথে তারেক মাসুদ নির্মাণ করেছেন ‘মাটির ময়না’।
(দ্য কানাডা টাইমস থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

একদিন এক বন্ধু সিনেমা হল থেকে বের হয়ে ফোন করে বললেন, ‘আমি বাংলাদেশে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা দেখেছি।’ আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, ‘কী বলছ?’ বন্ধু বললেন, ‘তরুণ নির্মাতা তারেক মাসুদের কাজ দেখো। পরে কথা হবে।’
বন্ধুর কথা শুনে আমি তারেক মাসুদের সিনেমা দেখলাম। এরপর তারেকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের ‘ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সের’ মাধ্যমে অনেক তরুণ ও প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতা উঠে এসেছেন। তাদের মধ্যে তারেক মাসুদ ছিলেন অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিভা।
‘নরসুন্দর’, ‘মাটির ময়না’, ‘মুক্তির গান’, ‘অন্তর্যাত্রা’ ও ‘রানওয়ে’র মতো অসাধারণ চলচ্চিত্রের নির্মাতা তারেক মাসুদ ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। তাঁর আকস্মিক মৃত্যু চলচ্চিত্রপ্রেমী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাইকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
বাংলাদেশের বিকল্প ও শিল্পধর্মী চলচ্চিত্রের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে তারেক মাসুদকে স্মরণ করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারায় নতুন চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আসেন। তাঁর কাজ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। তাই বন্ধুর দেওয়া ‘বাংলাদেশের সত্যজিৎ রায়’ উপমাটিও একেবারে অমূলক ছিল না। অনেকেরই মনে হয়, আরও দীর্ঘ জীবন পেলে বিপুল সম্ভাবনাময় এই নির্মাতা হয়তো আরও অনেক বড় কাজ উপহার দিতে পারতেন।
তারেক মাসুদ শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমাজসচেতন ও মানবিক একজন মানুষ। তাঁর চলচ্চিত্র ও চিন্তার মধ্যে সমাজ, মানুষ ও দেশের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা ফুটে উঠেছে। নতুন প্রজন্মের চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর সেই মানবিক দর্শন ও সৃজনশীল কাজ পৌঁছে দিতে নানা উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। তারেক মাসুদের জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাঁর কাজের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান ও সৃষ্টিশীলতার স্মৃতি তাই সময়ের সঙ্গে আরও উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
তারেক মাসুদ ১৯৫৬ সালে ফরিদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা নুরুন নাহার মাসুদ এবং বাবা মশিউর রহমান মাসুদ। তারেক মাসুদের চাচাতো বোন তাহমিনা রব্বানী বলেন, ‘ছোটবেলায় আমরা ফরিদপুরে তারেকদের একই গ্রামে থাকতাম। তাই একসঙ্গেই বড় হয়েছি। তারেকের বাবা আমাদের গ্রামের সবচেয়ে সংস্কৃতিমনা মানুষ ছিলেন। তাঁর কারণেই গ্রামেও আমরা গান গাইতাম ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতাম।’
তারেকের বাবা মশিউর রহমান মাসুদ কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তিনি ছিলেন শিক্ষিত ও উদারমনা মানুষ। তবে তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর হঠাৎ করেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। কয়েক মাস পর তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন। তখন তাঁর পরনে ছিল আলখাল্লা এবং মুখে ছিল লম্বা দাঁড়ি।
তাহমিনা রব্বানী বলেন, ‘একসময় চাচা (তারেকের বাবা) পুরোপুরি বদলে গেলেন। তিনি খুব ধর্মপ্রাণ হয়ে উঠলেন এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত হলেন। এর ফলে বাড়িতে সব ধরনের সাংস্কৃতিক চর্চা পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। তারেককে স্কুলে না দিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয়।’
তারেকের বাবা চেয়েছিলেন, ছেলে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হোক। তাই তারেক মাসুদের শিক্ষাজীবনের একটি পর্যায় কেটেছে মাদ্রাসায়। একেক সময় তাকে পড়তে হয়েছে ফরিদপুর, ঢাকার লালবাগ ও কাকরাইলসহ বিভিন্ন মাদ্রাসায়। এমনকি যশোরের মধুমতী নদীর তীরে বহিরদিয়াতেও পড়াশোনা করেছেন তিনি। বারবার মাদ্রাসা বদলের পেছনে একটি নির্দিষ্ট কারণ ছিল।
তারেকের বাবা ছিলেন তাবলিগের সঙ্গে যুক্ত একজন ধর্মপ্রচারক। তিনি চাইতেন, ছেলে বড় আলেম হোক। তাই তারেককে ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসায় ভর্তি করে বাবা তিন চিল্লায় বিদেশে চলে যেতেন। ফিরে এসে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি মাদ্রাসায় ছেলের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে প্রায়ই জানতে পারতেন, তারেক আর সেখানে নেই।
তাদের বড় পরিবারটি ছিল বেশ সংস্কৃতিমনা। তবে তারেকের বাবা ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি ছিলেন অনেক বেশি অনুরাগী। তারেকের সব চাচা ও চাচাতো ভাই ঢাকায় থাকতেন। বাবা বিদেশে গেলে তারা কয়েক দিনের মধ্যেই এসে তারেককে মাদ্রাসা থেকে নিয়ে যেতেন। বিষয়টি পরে তারেকের বাবা বুঝতে পারেন। এরপর তিনি ছেলেকে তাদের এলাকা থেকে অনেক দূরে, গ্রামের একটি মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দেন। এ কারণেই একের পর এক মাদ্রাসা বদলাতে হয়েছে তারেককে।
তারেকের মন পড়ে থাকত পরিবারের কাছেই। মাদ্রাসায় সুযোগ পেলেই তিনি চলে যেতেন মামার বাড়ি কিংবা নিজের বাড়িতে। মাদ্রাসায় একাকিত্বের কথা তিনি কাউকে বলতেন না। ভাই-বোনদের সঙ্গে খেলাধুলা করে আনন্দে মেতে থাকতেন। একদিন তিনি এক চাচাতো ভাইকে বলেছিলেন, মাদ্রাসার জানালা দিয়ে বাইরে শিশুদের খেলতে ও আনন্দ করতে দেখে তাঁর খুব কষ্ট হতো। তাঁর মনে হতো, বাইরের শিশুরাই যেন স্বাধীন।
তারেক বলেছিল, মাদ্রাসায় পড়ার সময় সেখানে মধ্যবিত্ত পরিবারের কোনো ছেলে ছিল না বললেই চলে। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই ছিল এতিম কিংবা খুব দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তারেকের পরিবার ছিল স্বচ্ছল। তাই মাদ্রাসায় তিনি অনেকটা বাইরের মানুষ হিসেবেই ছিলেন। ষাটের দশকজুড়ে বাবার ইচ্ছায় তাঁকে মাদ্রাসার এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তারেকের জন্যও হয়ে উঠেছিল এক ব্যক্তিগত লড়াই। মুক্তিযুদ্ধের সময় কিশোর তারেক তাঁর মামা দেলোয়ার হোসেন চৌধুরীর অনুপ্রেরণায় যুদ্ধের প্রতি আকৃষ্ট হন। একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় পড়ার আগ্রহও তৈরি হয় তাঁর। একপর্যায়ে তিনি মামার বাড়িতে গিয়ে কাঁধে রাইফেল তুলে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দেন।
নয় মাসের যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই যেন নতুন এক তারেক মাসুদেরও জন্ম হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তারেকের বাবা উপলব্ধি করেন, ধর্মীয় ভ্রাতৃত্বের চেয়ে একই সাংস্কৃতিক ও জাতিগত পরিচয়ে গড়ে ওঠা মানুষের পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতাই বাস্তব সত্য। পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ দেখার পরই তাঁর চিন্তায় এই পরিবর্তন আসে। নির্যাতন-নিপীড়নের পরও স্বাধীনতাকামী মানুষ লড়াই থেকে সরে যায়নি। ফলে যে বিপরীত স্রোতে একসময় তিনি তারেককে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, সেখান থেকে তারেককে ফিরিয়ে আনেন তাঁর বাবা। তিনি বুঝতে পারেন, তারেককে তার স্বাভাবিক সত্তার বাইরে ঠেলে দিয়ে কোনো ভালো ফল পাওয়া যাবে না। পাকিস্তানিরাও যেমন এ দেশের মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে জোর করে দমিয়ে রাখতে পারেনি, তেমনি তারেকের স্বাভাবিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত করে রাখা সম্ভব নয়।
তারেক বুঝতে পেরেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনকে অনেক কিছু দিয়েছে। তাঁর মা আবার স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছেন। তাঁর বাবার মধ্যেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছিল। ইসলাম রক্ষার নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন এবং নতুন এক চেতনায় জেগে উঠেছিলেন। নিজের চোখে নদীতে লাশ ভাসতে দেখার পর তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তাঁর বাবার চিন্তাভাবনায় আরও একটি মৌলিক পরিবর্তন আসে। তাঁর উদ্যোগেই ১৯৭৩ সালে তারেক ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাস করেন। পরে তিনি তারেককে আর মাদ্রাসায় যেতে দেননি।
ম্যাট্রিক পাস করার পর তারেকের কলেজজীবন ছিল একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতার। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ ছিল সহশিক্ষার কলেজ, যেখানে প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীই ছিল নারী। মাদ্রাসায় দরিদ্র ও এতিম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে থাকা তাঁর জন্য যতটা সহজ ছিল, সহশিক্ষার কলেজের পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া তাঁর জন্য শুরুর দিকে তার চেয়ে বেশি কঠিন ছিল। এটাই তাঁর জন্য বড় ধরনের সাংস্কৃতিক ধাক্কা হয়ে এসেছিল। তবে আবাসিক হলে থাকার সময় ধীরে ধীরে তিনি এই প্রতিকূল শহুরে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মানসিক শক্তি অর্জন করেন। আবাসিক জীবনে নানা ভাষা, অভ্যাস, রুচি, এমনকি মানুষের বসা ও হাঁটার ভিন্নতাকেও গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি হয়। তারেকের মধ্যেও সেই মানসিকতা গড়ে উঠেছিল।
তারেক সুন্দর কবিতা লিখতেন। মাদ্রাসায় পড়া একটি ছেলে এত সুন্দর বাংলা লিখতে পারে এটি দেখে অনেকেই অবাক হতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বন্ধুবৎসল। আর এ কারণেই তাঁর বন্ধুরাও তাঁকে খুব আপন করে নিয়েছিলেন। তারেক আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে নটর ডেম কলেজ থেকে স্নাতক হন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেন। কলেজে পড়ার সময় থেকেই ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর যাতায়াত শুরু হয়। একপর্যায়ে তিনি বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গেও যুক্ত হন।
সত্তরের দশকের শুরুর দিকে সাহিত্যমনস্ক অন্য অনেক তরুণের মতো তারেকও চলচ্চিত্রকে খুব একটা গুরুত্ব দিতেন না। এর একটি কারণ ছিল তাঁর মাদ্রাসাশিক্ষা ও রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবেশ। শৈশব থেকেই দেশি-বিদেশি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে তাঁর তেমন পরিচয় ছিল না। তবে সংগীত, চিত্রকলা, স্থাপত্য, নৃতত্ত্ব ও মনোবিজ্ঞানের প্রতি তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদে চলচ্চিত্রবিষয়ক বিভিন্ন বই পড়তে গিয়ে তারেকের ধারণা বদলাতে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হয়ে ওঠেন। চলচ্চিত্রকে গভীরভাবে বোঝার প্রবল আগ্রহ জন্ম নেয় তাঁর মধ্যে। সংসদে নিয়মিত চলচ্চিত্র দেখা শুরু করেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে তাঁর সামনে হঠাৎ খুলে যায় বিশ্ব চলচ্চিত্রের বিশাল জগৎ। মনে হচ্ছিল, তাঁর জীবন যেন দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।
অনেকে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ দেখার আগে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসটি পড়েছেন। কিন্তু তারেকের ক্ষেত্রে ঘটেছিল উল্টোটা। তিনি আগে সিনেমাটি দেখেন। ছোটবেলা থেকে তিনি শুনে এসেছিলেন, সিনেমা খারাপ জিনিস। কিন্তু ‘পথের পাঁচালী’ দেখার পর তাঁর সেই ধারণা পুরোপুরি বদলে যায়। তিনি উপলব্ধি করেন, এটি শুধু বাস্তব জীবনের গল্প নয়; বরং মানুষের সত্যিকারের জীবনকেই তুলে ধরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়টিও তারেকের জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিনি ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হলেও তাঁর বেশির ভাগ সময় কাটত চারুকলা বিভাগে। ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক মুনতাসীর মামুন তাঁকে পড়াতেন। বিভাগীয় পড়াশোনায় তারেক খুব ভালো না করলেও মুনতাসীর মামুন সবসময় তাঁকে উৎসাহ ও সমর্থন দিতেন। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামও ছিলেন তাঁর শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের শিক্ষাবিদ আহমদ শরীফের সঙ্গেও তাঁর ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তাঁদের প্রত্যেকের প্রতিই তারেকের ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও মুগ্ধতা।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তারেক মাসুদ আরেকজন মানুষকে খুব পছন্দ করতেন তিনি ছিলেন আহমদ ছফা। ছাত্রজীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি ছিল ছফার সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। লাইব্রেরি চত্বরে বসে তাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন। ছফার সঙ্গে কথা বলার আনন্দই ছিল আলাদা। নানা বিষয়ে তিনি তর্কে জড়াতেন। তারেক জানতেন, ছফা সবসময়ই যুক্তি-তর্ক করতে পছন্দ করতেন, তবে সেই তর্ক কখনো উত্তপ্ত হয়ে উঠত না। আর কোনো বিষয় নিয়েই ছফা কখনো বিরক্ত হতেন না।
অবসর সময়ে তারেক মাসুদ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। সত্তরের দশক ছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উজ্জীবিত একটি সময়। তাঁর মনেও ছিল স্বাধীনতার চেতনা ও সাংস্কৃতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তিনি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মতো জায়গায় গিয়ে নানা ধরনের বই পড়তেন, কবিতা আন্দোলনে অংশ নিতেন এবং পথনাটকে যুক্ত হতেন। সেই সময়ের বিপ্লবী চেতনা তাঁকে সাংস্কৃতিক মুক্তির আন্দোলনের দিকে টেনে নেয়। লেখক শিবিরসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
একসময় তিনি একটি নাট্যদলও গড়ে তোলেন। দলটি নিয়ে দেশের দূর-দূরান্তের বিভিন্ন এলাকায় নাটক মঞ্চস্থ করতে যেতেন। যাত্রাপথে লঞ্চ বা নৌকাতেও চলত নাটকের মহড়া। কৃষকদের জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যেও তাঁরা সাংস্কৃতিক কর্মসূচি চালাতেন। ‘ওরে ওঠ রে চাষি, জগতবাসী’ এমন গান গেয়ে তাঁরা মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করার চেষ্টা করতেন। সমাজে কিছু করার তাগিদ থেকেই এসব কর্মকাণ্ডে তিনি যুক্ত হন। তবে চরম বামপন্থী রাজনীতির মতাদর্শগত কঠোরতা তারেকের ভালো লাগত না। বিশেষ করে স্ট্যালিনের সমালোচনা করাকে ঘিরে বামপন্থী রাজনীতিকদের যে কঠোর অবস্থান ছিল, সেটিও তিনি পছন্দ করতেন না। তারেকের কাছে রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে সাংস্কৃতিক মুক্তিই ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বিশ্বাস ছিল, মানুষের চিন্তা ও সংস্কৃতির স্বাধীনতাই সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান পথ।
অন্যদিকে, লেখক শিবিরের পাশাপাশি চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনও চলচ্চিত্র সংগঠন ক্যাটওয়ার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। লেখক শিবির ও চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন পরস্পরের সঙ্গে সমন্বিতভাবে এগিয়ে চলছিল। এ সময় কয়েকজন বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরও তাঁদের প্রতি সমর্থন ছিল। তখন তারেকের চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহ ছিল প্রবল। এই আগ্রহ তৈরির পেছনে নিশ্চয়ই কোনো না কোনো প্রেরণা কাজ করেছিল। একজন মানুষ যখন জীবনের কোনো লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যান, তখন তাঁর পথচলায় কিছু বিষয় একে অন্যের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যুক্ত হতে থাকে। তারেকের ক্ষেত্রেও তেমনটাই দেখা যায়। চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর আকর্ষণ, দিনের পর দিন আর্ট কলেজে সময় কাটানো এসবের সঙ্গে তাঁর চিত্রকলার প্রতি গভীর আগ্রহের সম্পর্ক ছিল।

শৈশবে মাদ্রাসায় পড়ার সময় প্রজাপতির ছবি আঁকার জন্যও তাঁকে বকুনি খেতে হয়েছিল। কারণ, শিক্ষকদের চোখে ছবি আঁকা ছিল সৃষ্টিকর্তার কাজ অনুকরণ করার মতো বিষয়। সেই মাদ্রাসাজীবন থেকেই হয়তো চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর আগ্রহের বীজ তৈরি হয়েছিল, যদিও তখন তিনি নিজেও তা স্পষ্টভাবে বলতে পারতেন না। তবে কৌতূহলটা তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছিল এবং ধীরে ধীরে তা আরও গভীর হয়। একসময় তাঁর চিত্রকলার প্রতি আগ্রহ, গ্রামবাংলার পথে পথে ঘুরে বেড়ানো এবং সমাজ ও মানুষের জীবনকে কাছ থেকে জানার চেষ্টা সবকিছু যেন এক জায়গায় এসে মিলিত হয়। তারেকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা চলচ্চিত্র বিষয়ে ছিল না। কিন্তু চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে তাঁর বিকাশে বিশেষভাবে কার্যকর হয়েছিল দুটি বিষয়— একটি ছিল বিশ্বের প্রায় সব চলচ্চিত্র নির্মাতাই সৃষ্টিশীল কাজের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যান। তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রচর্চার মূল শিক্ষাকেন্দ্র ছিল চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন। ফিল্ম আর্কাইভে যে প্রশিক্ষণ কোর্স চালু হয়েছিল, সেটিও মূলত ফিল্ম সংসদ আন্দোলনেরই ফল। পরবর্তী সময়ে ফিল্ম সংসদকর্মীদের উদ্যোগেই গড়ে ওঠে বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম।
অন্যটি ছিল, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ও ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৮ সালে। শুরুতে সেখানে চলচ্চিত্রবিষয়ক অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স চালু করা হয়। এই কোর্স থেকেই পরবর্তীতে বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতা উঠে আসেন। ১৯৮২ সালে নতুন নির্মাতাদের মধ্যে তারেক মাসুদ ছিলেন অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিভা। তারেকের চলচ্চিত্র বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। তাই ১৯৮২ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ শেখার জন্য তিনি ভারতের পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ভর্তি হওয়ার আবেদন করেন এবং বৃত্তিও পান। কিন্তু ২৪ মার্চ জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর ভারতবিরোধী অবস্থানের কারণে ভারতীয় বৃত্তিগুলো বাতিল করে দেওয়া হয়।
তারেক অবশ্য এতে দমে যাননি। বৃত্তি ফিরে পাওয়ার জন্য তিনি নানা জায়গায় যোগাযোগ ও তদবির শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি বৃত্তিটি ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হন। এরপর পুনে গিয়ে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের পরিচালক কৃষ্ণমূর্তির কাছ থেকে অনাপত্তিপত্রও (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট) সংগ্রহ করেন। এরই মধ্যে সময় গড়িয়ে যায়, পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে ক্লাসও শুরু হয়ে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারেক আর সেখানে যাননি। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি পরিবারের কাছে টাকা চান এবং চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করতে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।
১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে ঢাকায় ফেরেন তারেক। মূলত তিনিই ছিলেন এই উৎসবের প্রধান সংগঠকদের একজন। বিভিন্ন দেশ থেকে স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্তধারার চলচ্চিত্র সংগ্রহ করে তিনি উৎসবটি আয়োজন করেন। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এই উৎসব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। পরবর্তী সময়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলন ‘বিকল্প চলচ্চিত্র আন্দোলন’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ফোরাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এরই মধ্যে ১৯৮৯ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন চলচ্চিত্র পরিচালক ক্যাথরিনকে বিয়ে করেন তারেক। ১৯৯০ সালে ক্যাথরিনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার আগে তারা দুজন মিলে ‘আদম সুরত’, ‘আহ আমেরিকা’ ও ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ এই তিনটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
৫০ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্র ‘আদম সুরত’ নির্মিত হয় বাংলাদেশের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জীবন, শিল্পভাবনা ও মানবিক দর্শনকে কেন্দ্র করে। তাঁর আঁকা ছবিতে শ্রমিক ও কৃষকদের শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণভাবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রকৃতিও সেখানে মানুষের ভালোবাসাময় জীবনধারণের অবলম্বন হিসেবে উপস্থিত। তরুণ তারেক সুলতানের শিল্প ও মানবিক দর্শন থেকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। বাংলার লোকসংস্কৃতির জগতেও এই মানবতাবাদী দর্শনের শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। পরবর্তী সময়ে তারেকের নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোতেও মানবতাবাদী চিন্তার এই প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
‘আদম সুরত’ নির্মাণের সময়ই তারেক ‘সোনার বেড়ি’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ভাবনা পান। নারীর ওপর বিভিন্ন ধরনের নিপীড়ন ও শোষণকে কেন্দ্র করে এই চলচ্চিত্রের পরিকল্পনা করা হয়। ‘সোনার বেড়ি’ নামটির মধ্যেই রয়েছে এর মূল বক্তব্য নারীকে অলংকারের প্রতি আকৃষ্ট করে কীভাবে সেই অলংকারকেই তার শৃঙ্খলে পরিণত করা হয়। কোমর, হাত ও পায়ে সোনার অলংকার পরিয়ে নারীর ওপর তৈরি করা সামাজিক বন্ধনকে এখানে প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
তারেকের আরেকটি গভীর বিশ্বাস ছিল নিজের মাটি, দেশ ও সংস্কৃতির চেয়ে বড় কিছু নেই। এই দর্শনকে সামনে রেখেই তিনি ‘আহ আমেরিকা’ নির্মাণ করেন। অন্যদিকে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ ছিল একটি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি তৎকালীন স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।
তারেক মাসুদের স্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্যচিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘মুক্তির গান’ ও ‘মুক্তির কথা’। নিজের অর্থায়নে নির্মিত ‘মুক্তির গান’ মূলত মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গান ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের গল্প তুলে ধরে। এসব লোকগান ও গণসংগীতের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদের শক্তি ছিল। একদিকে সাংস্কৃতিক কর্মীরা গানের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, অন্যদিকে এসব গান মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
তারেক মাসুদের নিজের জীবন ও অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া গল্পের ভিত্তিতে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’। ছবিটি নানা প্রশ্নের মুখোমুখি করে দর্শককে। এখানে ভালো-মন্দ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস এবং মানবিকতার নানা দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে। তবে ছবির উপস্থাপনভঙ্গির মধ্যেই এসব প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তরও খুঁজে পাওয়া যায়। ২০০২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মাটির ময়না’ তারেক মাসুদকে একজন ব্যতিক্রমী চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পী হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে।
ছবিটির শুরু হয় একটি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকের দৈনন্দিন জীবন দিয়ে। গল্প এগিয়ে যায় মাদ্রাসার কিশোর ছাত্র আনুকে কেন্দ্র করে। একই সঙ্গে বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিও উঠে আসে আনুর মা আয়েশার শীতের পিঠা তৈরির দৃশ্যে। গ্রামীণ পরিবারে বেড়ে উঠলেও আনুর বাবা তাকে মাদ্রাসায় পড়তে পাঠান। সেখানে আনুর একমাত্র বন্ধু ছিল আরেক কিশোর রোকন।
‘মাটির ময়না’র গল্পের পটভূমিতে রয়েছে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম ও পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা। ভৌগোলিকভাবে এক হাজার মাইলেরও বেশি দূরত্বে থাকা পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে এক রাষ্ট্রের অধীনে রাখা হলেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকেরা পূর্ব পাকিস্তানকে প্রায় উপনিবেশের মতোই শাসন করত। ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ধর্ম ও রাজনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে বৈষম্য ছিল। একই সঙ্গে পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা ও সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে।
এরই প্রতিবাদে শুরু হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন। পরে সেই আন্দোলন ধীরে ধীরে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার বৃহত্তর সংগ্রামে রূপ নেয়। ভাষা, সংস্কৃতি ও নিজস্ব ঐতিহ্যের ভিত্তিতে একটি ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা জোরালো হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে পাকিস্তানকে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে টিকিয়ে রাখতে একদল ধর্মান্ধ মানুষও সক্রিয় হয়। ‘মাটির ময়না’য় আনুর বাবাও শুরুতে পাকিস্তানপন্থীদের সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো নির্মম হত্যাযজ্ঞ ও মানুষের ওপর নির্যাতন নিজের চোখে দেখে তার দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আয়েশা ছেলে আনুকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এভাবেই ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক টানাপোড়েন, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে এক সুতোয় গেঁথে তারেক মাসুদ নির্মাণ করেছেন ‘মাটির ময়না’।
(দ্য কানাডা টাইমস থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)
.png)

ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; তা মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের অন্যতম প্রধান সূত্রও। ভাষাপ্রয়োগের মধ্যে ব্যক্তিমানুষের চিন্তা, সংস্কৃতি, সামাজিক অবস্থান ও পরিচয় নিহিত থাকে। ব্যক্তির কথাবলার ভঙ্গি, শব্দব্যবহারের প্রকৃতি, ধ্বনি-উচ্চারণের প্রবণতা, বাক্যনির্মাণের স্বতন্ত্রতা, ব্যক্তিত
২ ঘণ্টা আগে
কাস্ত্রো নামটি শুনলেই মনে পড়ে এক কিউবান রাজনৈতিক ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীর কথা। যুক্তরাষ্ট্রের একেবারে নাকের ডগায় একটি কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে তা টিকিয়ে রাখার সাহসী কাজের জন্য তিনি ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। আজকের দিনেই এই বিপ্লবীর জন্মশতবার্ষিকী পূর্ণ হলো।
২ ঘণ্টা আগে
২০১৯ সালে প্রকাশিত বিবিসির একটি প্রতিবেদনে চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়, ব্রিটেনে কাজ করার সময় হিচকক শুধু রহস্য বা থ্রিলারের গল্প বলেননি। ক্যামেরার ব্যবহার, দৃশ্য সাজানো ও সম্পাদনার ক্ষেত্রেও নতুন ধরনের ভাষা তৈরি করেছিলেন। এই নতুন ব্যাকরণ ইউরোপীয় চলচ্চিত্রকে আমূল বদলে দেয়।
৫ ঘণ্টা আগে
বিড়ালকে পরিবারের সদস্যের মতো করে যাঁরা বড় করেন, তাঁদের অনেকেই নিজেদের ‘ক্যাট মম’ বলতে পছন্দ করেন। কারও জীবনে এই সম্পর্কের শুরু অসুস্থ বিড়ালকে বাঁচানো থেকে, কারও আবার হঠাৎ পাওয়া বিড়ালছানাকে ঘিরে।
৭ ঘণ্টা আগে