ad

চার নারীর ‘ক্যাট মম’ হয়ে ওঠার গল্প

বিড়ালকে পরিবারের সদস্যের মতো করে যাঁরা বড় করেন, তাঁদের অনেকেই নিজেদের ‘ক্যাট মম’ বলতে পছন্দ করেন। কারও জীবনে এই সম্পর্কের শুরু অসুস্থ বিড়ালকে বাঁচানো থেকে, কারও আবার হঠাৎ পাওয়া বিড়ালছানাকে ঘিরে।

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ৩০
চার নারীর ‘ক্যাট মম’ হয়ে ওঠার গল্প। স্ট্রিম গ্রাফিক

দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই কেউ ছুটে আসে। কেউ পা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আদর চায়। কেউ আবার দূর থেকে অভিমানী চোখে তাকিয়ে থাকে। সারাদিনের ব্যস্ততার পর এই ছোট্ট সঙ্গীদের কাছে ফিরলেই যেন ঘরের পরিবেশ বদলে যায়। কারও কাছে তারা নিঃসঙ্গতার সঙ্গী, কারও কাছে প্রিয় ‘দায়িত্ব’, আবার কারও কাছে সন্তানের সমতুল্য।

যারা ভালোবেসে ঘরে বিড়াল পোষেন, তাঁদের গল্পগুলোও আলাদা। কেউ পরিকল্পনা করে বিড়াল ঘরে আনেন। কেউ হঠাৎ পাওয়া একটি প্রাণীকে আর ছেড়ে দিতে পারেন না। কিন্তু একবার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেলে সেই বিড়াল আর শুধু ‘পোষা প্রাণী’ থাকে না। হয়ে ওঠে পরিবারেরই একজন। বিড়ালের প্রতি পরম মমতা আর যত্নে তাঁরা হয়ে ওঠেন ‘ক্যাট মম’, বাংলায় বললে ‘বিড়াল মাতা’।

আহত-অসুস্থ ছয়টি বিড়াল শাওনের পোষ্য

প্রথমেই বিড়ালপ্রেমী ফারজানা শাওনের গল্পে যাওয়া যাক। পথের অসুস্থ ও আহত প্রাণীদের সুস্থ করে তুলতে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নানা জায়গায় ছুটে বেড়িয়েছেন। কখনো দলবল নিয়ে, কখনো একাই। জনসচেতনতা তৈরিতেও সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব থেকেছেন। এতে কখনও কাজ হয়েছে, বেশিরভাগ সময়ই হয়নি। কিন্তু থেমে যাননি।

ফারজানা শাওন একজন মা, শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি নিজের ছোট একটি স্টার্টআপও করেছেন। এখানেই শেষ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সংগঠন ‘পথের প্রাণ’-এর সভাপতি তিনি। সংগঠনটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আহত ও অসহায় কুকুর-বিড়ালদের উদ্ধারে কাজ করে।

তবে এই কাজের শুরুটা হয়েছিল হঠাৎ করে, কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই। প্রাণীদের ‘রেসকিউ’ করার কাজ যখন শুরু করেন, তখন এর মানেটাও ঠিকমতো জানতেন না শাওন। তখন তিনি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। একদিন তাঁর বোন দুটি বিড়াল নিয়ে বাসায় আসেন। পরে একটি বিড়াল মারা যায়। অন্যটি ছিল তাঁদের কোয়ার্টারের আশপাশে থাকা একটি পথের বিড়াল। একসময় সেই বিড়ালটি কয়েকটি বাচ্চা জন্ম দেয়। ছোট বাচ্চাগুলোকে কেউ রাখতে চাইল না। একপর্যায়ে সেগুলো ফেলে দেওয়া হয়। তখন শাওন তাদের উদ্ধার করে বাসায় নিয়ে আসেন।

সেই থেকেই শুরু।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় নিজের পোষা বিড়ালটিকেও সঙ্গে নিয়ে যান শাওন। কিন্তু প্রথম বছরেই বিড়ালটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি বিড়ালের চিকিৎসার দায়িত্বও নিতে হয় তাঁকে। তাই ক্লাসের পাশাপাশি টিউশনি শুরু করেন। টিউশনের টাকা দিয়ে নিজের খরচের পাশাপাশি বিড়ালের খাবার ও চিকিৎসার খরচও চালাতেন।

তবে অনেক চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত বিড়ালটিকে বাঁচাতে পারেননি। প্রিয় প্রাণীটির মৃত্যু শাওনকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। এরপর রাস্তায় কোনো অসুস্থ কুকুর বা বিড়াল দেখলেই তাঁর মনে হতো, অন্তত একবার চেষ্টা করে দেখা উচিত।

শাওনের বাসায় একসময় ১০টি বিড়াল ছিল। এখন আছে ছয়টি। মুমূর্ষু অবস্থায় কোনো বিড়ালকে দেখলে তিনি বাসায় নিয়ে আসেন। তাঁর মতে, একবার কোনো বিড়াল ঘরের পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে গেলে বাইরে বেঁচে থাকা কঠিন। তাই অসুস্থ প্রাণীগুলোকে সুস্থ করে অন্য পরিবারে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু অনেক সময় দত্তক দেওয়া বিড়ালও আবার ফিরে আসে। তখন মায়ার কারণে তাদের আর ছেড়ে দিতে পারেন না।

এই ছোট্ট সঙ্গীদের কাছে ফিরলেই যেন ঘরের পরিবেশ বদলে যায়।
এই ছোট্ট সঙ্গীদের কাছে ফিরলেই যেন ঘরের পরিবেশ বদলে যায়।

তার বাসায় থাকা ছয়টি বিড়ালের প্রায় প্রতিটিই কোনো না কোনো শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। কেউ অন্ধ, কেউ আবার পুরোনো অসুস্থতা নিয়ে বেঁচে আছে। সবাই যেখানে ‘পিকচার পারফেক্ট’ বিড়াল বেছে নিতে চায়, সেখানে শাওন বেছে নিয়েছেন উদ্ধার করা বিড়ালদের।

তাঁর মতে, একটি সুস্থ ও সুন্দর বিড়াল হয়তো সহজেই পরিবার পেয়ে যায়। কিন্তু অসুস্থ বিড়ালকে কেউ নিতে চায় না। শাওনের কাছে রেসকিউ করার মূল কারণ এটাই। যতদিন বেঁচে আছে, অন্তত ভালো থাকুক।

হোস্টেল ছেড়েছেন তবু প্রিয় বিড়াল ‘সিম্বাকে’ ছাড়েননি

মালিহা চৈতির গল্পটাও শুরু হয়েছিল অনেকটা হঠাৎ করে। তাঁর এক বন্ধুর চারটি বিড়ালছানার মধ্যে একটি ছিল খুব দুর্বল। মা তাকে দুধ খেতে দিত না। এমনকি ভাইবোনেরাও তাকে কামড়াত। তাই বন্ধুটি বিড়ালছানাকে অন্য কারও কাছে দত্তক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

মালিহা প্রথমে ভেবেছিলেন, কিছুদিনের জন্য বিড়ালছানাটিকে নিজের কাছে রাখবেন। কিন্তু কাছে পাওয়ার পর আর ছেড়ে দিতে পারেননি। সেই ছোট্ট বিড়ালছানাই এখন পাঁচ বছরের সিম্বা। হয়ে উঠেছে তাঁর পরিবারেরই একজন।

শারীরিকভাবেও খুব একটা সুস্থ নয় সিম্বা। জন্মগতভাবে তার হৃদ্‌যন্ত্রে সমস্যা আছে। আবার অ্যাজমাও আছে। তাই প্রতিদিন তাকে নেবুলাইজ করতে হয়। মালিহা অফিসে থাকলেও চিন্তা থাকে, সিম্বা ঠিকমতো ওষুধ পেয়েছে কি না। সিম্বার হার্ট সার্জারির সময় তাঁকে এক সপ্তাহ অফিস থেকেও ছুটি নিতে হয়েছিল।

চারজনের গল্প আলাদা। কারও শুরু ভয় থেকে, কারও হঠাৎ পাওয়া একটি বিড়ালছানা থেকে, কারও আবার একটি প্রাণীকে বাঁচানোর চেষ্টা থেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গল্পগুলো এসে মেলে একই জায়গায়।

হোস্টেলে থাকার সময়ও সিম্বাকে ছাড়েননি মালিহা। পোষা প্রাণী রাখার অনুমতি না থাকায় তাকে লুকিয়ে রাখতে হতো। শেষ পর্যন্ত হোস্টেল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানতে পারলে সিম্বা কিংবা হোস্টেলের মধ্যে একটি বেছে নিতে বলা হয়। মালিহা হোস্টেল ছেড়ে দেন। কারণ অসুস্থ ছোট্ট সিম্বাকে রাস্তায় ফেলে দেওয়ার কথা তিনি ভাবতেই পারেননি।

একসময় বিড়াল ভয় পেতেন, তিনিই এখন ‘ক্যাট মম’

বিড়াল পালনের সিদ্ধান্তটা ফাহরিন হোসেনেরও পরিকল্পনা করে নেওয়া ছিল না। কর্মজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও এর আগে তিনি খরগোশ, কবুতর ও লাভবার্ড পুষেছেন। তবে দুটি খরগোশ মারা যাওয়ার পর প্রায় তিন বছর আর কোনো প্রাণী পোষেননি। বরং তখন বিড়ালকে তিনি কিছুটা ভয়ই পেতেন।

সেই ভয় কাটে পরিচিত একজনের বাসায় ‘বাবলসকে’ দেখার পর। শান্ত স্বভাবের এই বিড়ালটি ধীরে ধীরে ফাহরিনের ভয় দূর করে দেয়। একদিন জানতে পারেন, বাবলসকে অন্য কারও কাছে দেওয়া হতে পারে। তখন নিজেই তাকে নেওয়ার আগ্রহ দেখান।

কমলা রঙের পার্সিয়ান বিড়াল বাবলস। তার তুলতুলে নরম লোম আর ছোট ছোট চোখ দেখে মায়ায় পড়ে যেতে পারে যে কেউ। বয়স এখন প্রায় ছয় বছর। বাবলসকে নিজের কাছে পাওয়ার পর বিড়াল নিয়ে ফাহরিনের ভয় পুরোপুরি কেটে যায়। এখন বাসার আশপাশে থাকা দুই-তিনটি পথবিড়ালকেও নিয়মিত খাবার দেন তিনি।

তবে চাকরির ব্যস্ততার কারণে বাবলসকে যতটা সময় দিতে চান, সবসময় তা সম্ভব হয় না। অফিসে যাওয়ার আগে কিছুটা সময় তার সঙ্গে কাটান। ছুটির দিনেও চেষ্টা থাকে বেশি সময় দেওয়ার।

বাবলসেরও আছে নিজের রুটিন। প্রতিদিন সূর্য ওঠার পরপরই সে ফাহরিনকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে। অফিসে থাকলে বাবলসকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি চিন্তা হয়। বিশেষ করে বাসার মূল গেট খোলা থাকলে সে বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করে। তখন সারাক্ষণ মনে হয়, ‘ও ঠিকঠাক আছে তো?’

দিনশেষে বাবলসই যেন ফাহরিনের ক্লান্তির সবচেয়ে সহজ ওষুধ। অফিসে বের হওয়ার সময় সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। আবার ফাহরিন বাসায় ফিরলেও একইভাবে দরজায় অপেক্ষা করে। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে ফিরে এমন অপেক্ষা দেখতে কার না ভালো লাগে!

জেদের বশে শুরু, এখন বিড়ালই সবচেয়ে কাছের সঙ্গী

ঢাকার একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষিকা লুলু মারজান দ্বীনা। কর্মব্যস্ত দিন শেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলে ঘরে থাকা চার বিড়াল—হালুম, কাজু, মিতু ও গোলু—হয়ে ওঠে তাঁর মন ভালো করার ওষুধ। তবে এই চার বিড়ালকে ঘিরে গল্পের শুরুটা হয়েছিল করোনার লকডাউনের সময়।

বিড়ালকে পরিবারের সদস্যের মতো করে যাঁরা বড় করেন, তাঁদের অনেকেই নিজেদের ‘ক্যাট মম’ বলতে পছন্দ করেন।
বিড়ালকে পরিবারের সদস্যের মতো করে যাঁরা বড় করেন, তাঁদের অনেকেই নিজেদের ‘ক্যাট মম’ বলতে পছন্দ করেন।

এর আগে দ্বীনা বিড়াল-কুকুরসহ প্রাণীদের ভয় পেতেন। সেই ভয় কাটানোর জেদ থেকেই ধীরে ধীরে বিড়ালের সঙ্গে অভ্যস্ত হতে শুরু করেন। কিছুদিন পর পোষা প্রাণীই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অন্যতম প্রিয় অংশ।

দ্বীনার পরিবারের প্রথম বিড়াল ছিল মৃন্ময়ী। ২০২৩ সালে অসুস্থ হয়ে প্রিয় বিড়ালটি মারা গেলেও তার সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্ক থেকে যায়। মৃন্ময়ীর স্মৃতি থেকেই একে একে তাঁদের ঘরে আশ্রয় পেতে থাকে আহত বিড়াল। আবার অতীতের আঘাতে অনেক বিড়াল এতটাই ভীত বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে যে তাদের নতুন পরিবার খুঁজে দেওয়া সম্ভব হয় না। তখন তারাই থেকে যায় দ্বীনার কাছে।

এই পরিবারের বিড়ালদের যত্নও কারও একার দায়িত্ব নয়। যেমন মিতু নামের বিড়ালটিকেও একসময় উদ্ধার করেছিলেন দ্বীনার মা। অথচ শুরুতে তিনিই বিড়াল পালায় সবচেয়ে বিরক্ত ছিলেন। এখন বিড়ালের জন্য মাছ কিনে আনেন, খাবার রান্না করেন। পরিবারের সবাই মিলে ভাগ করে নেয় দায়িত্ব। লুলুর ভাইবোনদের কেউ খাবার দেয়, কেউ গোসল করায়, কেউ চিকিৎসা করায়। আর বাবা বাইরে খেলতে যাওয়া বিড়ালগুলোর দেখভাল করেন যাতে কেউ বিড়ালদের ওপর আঘাত না করে।

পরিবারের কারও মন খারাপ হলে বিড়ালগুলোও যেন তা বুঝতে পারে। কাছে এসে গা ঘেঁষে থাকে, আদর করে।

চারজনের গল্প আলাদা। কারও শুরু ভয় থেকে, কারও হঠাৎ পাওয়া একটি বিড়ালছানা থেকে, কারও আবার একটি প্রাণীকে বাঁচানোর চেষ্টা থেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গল্পগুলো এসে মেলে একই জায়গায়।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত