ad

জন্মদিন

‘সাসপেন্সের ওস্তাদ’ আলফ্রেড হিচকক: আপনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১৮: ২০
আলফ্রেড হিচকক। স্ট্রিম গ্রাফিক

ভাবুন, আপনি বন্ধুর সঙ্গে দোকানে বসে চা খাচ্ছেন। আড্ডা জমে উঠেছে। হঠাৎ পাশেই বোমা ফাটল! আপনি চমকে উঠলেন, ভয় পেলেন। কয়েক মুহূর্ত পর হয়তো সেই ভয় কেটেও গেল।

এবার দৃশ্যটা একটু বদলে দেওয়া যাক।

এবার সিনেমার পর্দায় একই ঘটনা ঘটুক। একদল বন্ধু দোকানে বসে গল্প করছে। সবকিছু স্বাভাবিক। কিন্তু দর্শক হিসেবে আপনি জানেন, টেবিলের নিচে টাইম বোমা রাখা আছে। সেটি ঠিক দুপুর ১টায় বিস্ফোরিত হবে। দেয়ালের ঘড়িতে তখন ১২টা ৪৫ মিনিট।

পর্দার মানুষগুলো কিছুই জানে না। তারা হাসছে, গল্প করছে। আর আপনি জানেন, মাত্র ১৫ মিনিট পর কী হতে যাচ্ছে। ঘড়ির কাঁটা যত এগোয়, আপনার বুকের ধুকপুকানিও তত বাড়ে। মনে মনে চিৎকার করছেন, ‘আরে কথা থামাও! পালাও, নিচে বোমা!’

এই যে ১৫ মিনিটের উৎকণ্ঠা, চোখের পাতা না ফেলে ধুকপুক অপেক্ষা, এর নাম ‘সাসপেন্স’। আর এই মনস্তাত্ত্বিক জাদু যিনি সিনেমার ইতিহাসের ধমনিতে রক্তসঞ্চালনের মতো ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি স্যার আলফ্রেড হিচকক।

১৯৬৭ সালে ফরাসি পরিচালক ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ‘সারপ্রাইজ’ ও ‘সাসপেন্স’-এর পার্থক্য বোঝাতে এই ‘বোম থিওরি’ দিয়েছিলেন হিচকক। সেলুলয়েডে মানুষের অবচেতন মন ও ভয় নিয়ে খেলা করার ক্ষমতার কারণেই আজও বিশ্ব চলচ্চিত্রে হিচকক এক ও অদ্বিতীয়—‘দ্য মাস্টার অব সাসপেন্স’।

লন্ডনে হাতেখড়ি, হলিউডে বাজিমাত

১৮৯৯ সালে লন্ডনে জন্ম নেওয়া আলফ্রেড হিচককের চলচ্চিত্রযাত্রা শুরু হয়েছিল নির্বাক সিনেমার যুগে। চিত্রনাট্যকার ও আর্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ শুরু করলেও পরিচালকের চেয়ারে প্রথম বসেন ১৯২৭ সালের চলচ্চিত্র দ্য লজার: আ স্টোরি অব দ্য লন্ডন ফগ-এ। লন্ডনের কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় জ্যাক দ্য রিপারের ধাঁচে খুনের পটভূমিতে নির্মিত এই সিনেমাকে পরে অনেক ক্রিটিকই প্রথম ‘প্রকৃত হিচককীয়’ সিনেমা হিসেবে অভিহিত করেছেন।

আলফ্রেড হিচকক। সংগৃহীত ছবি
আলফ্রেড হিচকক। সংগৃহীত ছবি

ত্রিশ দশকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ চলচ্চিত্রে হিচকক সবচেয়ে জনপ্রিয় নাম। ১৯৩৫ সালে মুক্তি পায় থ্রিলার ‘দ্য থার্টি নাইন স্টেপস’। ‘ভুল স্থানে ভুল সময়ে উপস্থিত হওয়া নির্দোষ মানুষের পালিয়ে বেড়ানোর’ এই ফরমুলা পরে বহুবার ব্যবহার করেছেন হিচকক।

২০১৯ সালে প্রকাশিত বিবিসির একটি প্রতিবেদনে চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়, ব্রিটেনে কাজ করার সময় হিচকক শুধু রহস্য বা থ্রিলারের গল্প বলেননি। ক্যামেরার ব্যবহার, দৃশ্য সাজানো ও সম্পাদনার ক্ষেত্রেও নতুন ধরনের ভাষা তৈরি করেছিলেন। এই নতুন ব্যাকরণ ইউরোপীয় চলচ্চিত্রকে আমূল বদলে দেয়।

হলিউড, তোমার গুরু এসেছে

ব্রিটিশ চলচ্চিত্রে নিজের জায়গা শক্ত করে ১৯৩৯ সালে হিচকক পাড়ি জমান হলিউডে। সেখানে তাঁর প্রথম প্রযোজনা ছিল সাহিত্যিক ড্যাফনি দু মারিয়্যার উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ‘রেবেকা’ (১৯৪০)। মৃত নারীর অদৃশ্য ছায়া কীভাবে প্রাসাদ ও জীবিত মানুষের মনকে গ্রাস করতে পারে, তা নিয়েই এই ‘গথিক থ্রিলার’। রেবেকা সেবারের অস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কার পায়। এরপর হলিউডে শুরু হয় হিচককের নতুন অধ্যায়।

চলচ্চিত্রের প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় হিচকক ছিলেন দুঃসাহসী নাবিক। ১৯৪৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘রোপ’ তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। পুরো সিনেমা এমনভাবে শুট ও এডিট করা হয়েছিল যেন পুরো গল্পই একটিমাত্র আনকাট শটে (কন্টিনিউয়াস শট) ঘরের ভেতরেই ঘটে যাচ্ছে। দুই তরুণের ‘নিখুঁত অপরাধ’ করার অহংকারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সিনেমা মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারের নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করেছিল।

সারপ্রাইজ নয়, সাসপেন্স

কেন হিচকককে ‘মাস্টার অব সাসপেন্স’ বলা হয়? উত্তরটা লুকিয়ে আছে তাঁর সিনেমা বানানোর কৌশলে। হিচকক মনে করতেন, দর্শককে অন্ধকারে রেখে চমকে দেওয়া বড় কৃতিত্ব নয়। বরং দর্শককে সব জানিয়ে দিয়ে চরিত্রের পরিণতি কী হবে, তা দেখার জন্য ঝুলিয়ে রাখাই আসল মুন্সিয়ানা।

সাসপেন্স শুধু রক্তপাত বা হঠাৎ কোনো ভয়ংকর শব্দে দর্শককে চমকে দেওয়া নয়। এর আসল জাদু লুকিয়ে আছে মানুষের অবচেতন ভয়, যৌনতা, অপরাধবোধ আর কৌতূহলকে নাড়া দেওয়ার মধ্যে।

১৯৫১ সালের সিনেমা ‘স্ট্র্যাঞ্জার্স অন এ ট্রেইন’-এ দেখা যায় দুই অচেনা ব্যক্তির ট্রেনে দেখা হওয়া। এরপর নিজেদের অপছন্দের মানুষকে অদলবদল করে খুন করার অদ্ভুত চুক্তি। এখানে শুধু খুনের ঘটনাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। হিচকক বরং চরিত্রগুলোর মানসিক টানাপোড়েন এবং অদ্ভুত সব ক্যামেরা অ্যাঙ্গেলের মাধ্যমে গল্পের উত্তেজনা বাড়িয়েছেন।

আর এই মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধানের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ১৯৫৪ সালের ক্লাসিক সিনেমা ‘রিয়ার উইন্ডো’। ভাঙা পা নিয়ে হুইলচেয়ারে বন্দি আলোকচিত্রী জানালার দূরবিন দিয়ে পেছনের বিল্ডিংয়ের প্রতিবেশীদের ওপর নজর রাখেন। হঠাৎ তিনি সন্দেহ করেন, সামনের বাসার প্রতিবেশী হয়তো তার স্ত্রীকে খুন করেছে! হিচকক এখানে পুরো দর্শক সমাজকেই ‘ভোয়্যার’ বা চোরাগোপ্তা দর্শকে পরিণত করেন।

১৯৫৪ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত পর্যালোচনায় সমালোচক বোসলে ক্রাউদার লিখেছিলেন, ‘হিচকক প্রমাণ করেছেন, ঘরের জানালাই আস্ত মানসিক হাসপাতাল ও অপরাধ জগতের চেয়েও বেশি রোমাঞ্চকর হতে পারে।’

সাইকো থেকে বার্ডস: হিচককের স্বর্ণযুগ

ষাটের দশককে হিচককের ক্যারিয়ারের ‘গোল্ডেন এরা’ বা স্বর্ণযুগ বলা চলে। একের পর এক এমন সব চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন, যেগুলো বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাস চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে।

আলফ্রেড হিচককের সিনেমার কোলাজ। সংগৃহীত ছবি
আলফ্রেড হিচককের সিনেমার কোলাজ। সংগৃহীত ছবি

১৯৫৮ সালে মুক্তি পায় মনস্তাত্ত্বিক ও পরাবাস্তব ধাঁচের সিনেমা ‘ভার্টিগো’। উচ্চতাভীতি ও বিভ্রমে ভুগতে থাকা গোয়েন্দার প্রেমে পড়া এবং সত্য-মিথ্যার জালে হারিয়ে যাওয়ার গল্প। এই সিনেমায় উচ্চতাভীতি বোঝাতে হিচকক এবং চিত্রগ্রাহক রবার্ট বার্কস অদ্ভুত ক্যামেরা টেকনিক উদ্ভাবন করেন, যা এখন ‘ডলি জুম’ বা ‘ভার্টিগো ইফেক্ট’ নামে পরিচিত।

১৯৫৯ সালে হিচকক বানান নিখাদ অ্যাকশন-থ্রিলার ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’। ভুল পরিচয়ের শিকার হয়ে সাধারণ বিজ্ঞাপন কর্মকর্তার দেশজুড়ে পালিয়ে বেড়ানো, নির্জন মাঠে হঠাৎ ভুট্টাখেতে বিমানের তাড়া খাওয়া কিংবা মাউন্ট রাশমোরের ওপর প্রাণপণ লড়াই—এই সিনেমার প্রতিটি দৃশ্য আজও থ্রিলার বানানোর পাঠ্যবই হিসেবে গণ্য হয়।

কিন্তু বিশ্ববাসীকে আতঙ্কের কোনো চরম শিখরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, তা হিচকক দেখালেন ১৯৬০ সালে, তাঁর মহাকাব্যিক সৃষ্টি ‘সাইকো’ দিয়ে!

খুব কম বাজেটে, সাদা-কালো ক্যানভাসে তৈরি এই সিনেমা মুক্তির পর বিশ্ব প্রেক্ষাগৃহে যে তোলপাড় হয়েছিল, তা অভূতপূর্ব। নরম্যান বেটস নামের সাইকোপ্যাথ ও তার বাথটাবের শাওয়ারের নিচে ক্যাথরিন চরিত্রে অভিনয় করা জ্যানেট লেইকে ছুরি মারার সেই বিখ্যাত ৪৫ সেকেন্ডের দৃশ্য। কথিত আছে, এই দৃশ্যটি তৈরিতে হিচকক সময় নিয়েছিলেন ৭ দিন ও ৭৮টি ছোট ছোট ক্যামেরা কাট!

১৯৬০ সালে মার্কিন দৈনিক ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এ প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ‘সাইকো’ প্রদর্শনের সময় প্রেক্ষাগৃহের বাইরে দর্শক সামলাতে পুলিশ মোতায়েন করতে হয়েছিল এবং হিচকক কঠোর নিয়ম জারি করেছিলেন—সিনেমা শুরু হওয়ার ১ সেকেন্ড পরেও কাউকে হলে ঢুকতে দেওয়া হবে না!

২০১৯ সালে প্রকাশিত বিবিসির একটি প্রতিবেদনে চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়, ব্রিটেনে কাজ করার সময় হিচকক শুধু রহস্য বা থ্রিলারের গল্প বলেননি। ক্যামেরার ব্যবহার, দৃশ্য সাজানো ও সম্পাদনার ক্ষেত্রেও নতুন ধরনের ভাষা তৈরি করেছিলেন। এই নতুন ব্যাকরণ ইউরোপীয় চলচ্চিত্রকে আমূল বদলে দেয়।

এর ঠিক তিন বছর পর, ১৯৬৩ সালে হিচকক পর্দায় নিয়ে আসেন প্রকৃতি বনাম মানুষের অদ্ভুত সংঘাত। সিনেমার নাম ‘দ্য বার্ডস’। কোনো কারণ ছাড়াই উপকূলীয় শহরের হাজার হাজার পাখি মানুষকে আক্রমণ করতে শুরু করে। বিশেষ কোনো মিউজিক ছাড়াই কেবল পাখির ডানার শব্দ ও কিচিরমিচিরে যে বিভীষিকাময় পরিবেশ তিনি তৈরি করেছিলেন, তা আজও গা শিউরে ওঠার মতো।

মাস্টার ছিলেন, মাস্টার আছেন, মাস্টার থাকবেন

হিচকক কেবল পরিচালক নন, ছিলেন দক্ষ বিপণনকারী। নিজের নামকেই একটি ব্র্যান্ডে পরিণত করেছিলেন। নিজের প্রায় প্রতিটি সিনেমাতেই অল্প সময়ের জন্য হলেও ক্যামিও চরিত্রে বা ফ্রেমের কোণে মুখ দেখানো ছিল হিচককের ট্রেডমার্ক। এ ছাড়া ‘আলফ্রেড হিচকক প্রেজেন্টস’ নাম দিয়ে টিভি সিরিজ দিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন প্রতিটি ঘরে ঘরে।

১৯৮০ সালে এই মহান পরিচালক মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু চলচ্চিত্র জগতে তাঁর রেখে যাওয়া পদচিহ্ন আজও সমান উজ্জ্বল। স্টিভেন স্পিলবার্গ থেকে শুরু করে মার্টিন স্করসেসি, কোয়েন্টিন টারান্টিনো কিংবা ডেভিড ফিনচারের মতো আধুনিককালের বাঘা বাঘা পরিচালকেরা নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন, তাঁদের ভিজ্যুয়াল সেন্স এবং গল্পের নাটকীয়তা তৈরির মূল প্রেরণা আলফ্রেড হিচকক।

সাসপেন্স শুধু রক্তপাত বা হঠাৎ কোনো ভয়ংকর শব্দে দর্শককে চমকে দেওয়া নয়। এর আসল জাদু লুকিয়ে আছে মানুষের অবচেতন ভয়, যৌনতা, অপরাধবোধ আর কৌতূহলকে নাড়া দেওয়ার মধ্যে।

আজ এত বছর পরও যখন অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে কিংবা ড্রয়িংরুমের ডিজিটাল পর্দায় সাইকো-র বাথটাব ড্রেন দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য ভেসে ওঠে, কিংবা রিয়ার উইন্ডো-র মতো কেউ দূরের জানালায় চোখ রাখে, তখন বুকটা ধড়ফড় করে ওঠে। মানুষ আবার নতুন করে বুঝতে পারে, সেলুলয়েডের ফিতায় আলো-ছায়ার খেলা ধরে রাখার ক্ষেত্রে আলফ্রেড হিচককই ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন—‘দ্য মাস্টার অব সাসপেন্স’।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত