নিলয় দাশ স্মরণে
নিলয় দাশ। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা গিটারিস্ট। আজ ১১ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ছিলেন একাধারে গায়ক, সুরকার, সংগীত পরিচালক ও একজন জনপ্রিয় গিটার-শিক্ষক। গত শতকের আশির দশকে যাঁরা গিটার শিখেছেন এবং পরবর্তীকালে অনেক বিখ্যাত হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই নিলয় দাশের সরাসরি ছাত্র কিংবা তাঁর সঙ্গে বাজিয়ে শিখেছেন এমন। তাঁকে স্মরণ করে নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন সংগীতবিষয়ক লেখক মিলু আমান।
মিলু আমান

১৯৯০ সালের কথা। নিলয় দাশ, আমাদের নিলয়দার প্রথম অ্যালবাম ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’ আরও বছরখানেক আগে বের হয়েছে। সেই অ্যালবামটি অনেকের পছন্দের তালিকায় ছিল। ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’, ‘যখনই নিবিড় করে’ এইসব গান তখন ভক্তদের মুখে মুখে। আর যারা গিটার ভালোবাসে তাঁদের জন্য গানগুলোর গুরুত্ব যেন একটু বেশিই। শোনা যাচ্ছে, নিলয়দার নতুন অ্যালবামের কাজ নাকি শেষ। এখন শুধু বের হবার অপেক্ষায়।
ঢাকায় রক মিউজিক তখন তুঙ্গে। কেউ গিটার বাজাবে কিন্তু নিলয়দার কাছে একবারও আসেনি, এমনটা তখন হয়নি। মিউজিশিয়ানরাও প্রতিনিয়ত নিলয়দার কাছে আসতেন নতুন কিছু শেখার জন্য। আমি কখনও শুনিনি নিলয়দা কাউকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। নিলয়দার বাবা প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ সুধীন দাশ নিজেও একজন নজরুলসংগীত শিক্ষক ছিলেন। তাই শিক্ষকতা ব্যাপারটা নিলয়দাও বেশ উপভোগ করতেন মনে হয়।
কিন্তু এসব নিয়ে ভাবলে এখন আমার চলবে না। অনেক কষ্টে মাকে গিটার রাজি করিয়েছি, আমার গিটার কেনা লাগবে। এখন নিলয়দা কিনে দিতে রাজি হন কি না, সেটাই দেখার বিষয়। বেশি সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না, মা আবার মত পাল্টানোর আগে অতি দ্রুত কাজটা শেষ করতে হবে।
২
স্কুলে অনেকদিন পরে আসলাম। এই কিন্ডারগার্টেনেই আমার স্কুল জীবন শুরু হয়েছিল। তখন স্কুলের নাম ছিল ‘মেরিগোল্ড’। এখন সেটা অন্য জায়গায় চলে গেছে, এটা আলাদা স্কুল। নতুন নাম ‘ব্লু-বার্ড’। পুরোনো স্কুলের দারোয়ান চাচা রয়ে গেছেন ঠিকই। আর ঠিক আগের মতোই গেইটের পাশে ঝোলানো হজমি, আঁচার আর টফির বয়ম। পাঁচ-দশ পয়সা মিলিয়ে আমরা যে টাকাই জমাতে পারতাম, তাই সবাই একসঙ্গে করে টিফিন পিরিয়ডে এসব কিনে খেতাম। বলাবাহুল্য, এসবের জন্য বাসা থেকে কখনও কোনো টাকা দেওয়া হতো না।

দারোয়ান চাচা আমাকে দেখে পরিচিত সুরে বললেন, ‘আরে তুমি? কারও কাছে যাইবা?’
আমি বললাম, ‘জি, নিলয়দা আসছেন না, চাচা?’
চাচা বললেন, ‘হ্যাঁ, ক্লাস নিচ্ছে ১-বি-তে। যাও।’
আমি আবার দারোয়ান চাচাকে বললাম, ‘আচ্ছা চাচা, আমি যাই তাহলে, কোনো অসুবিধা নাই তো?’
চাচা বললেন, ‘আরে না। যাও, আর তোমারে কি আমি চিনি না?’
তারপর চাচাকে বললাম, ‘পরে দেখা হবে, চাচা।’
তবে আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম। প্রায় ১০ বছর পেরিয়ে গেছে কিন্তু স্কুলের সবকিছু অবিকল আগের মতোই আছে। সেটা কী করে সম্ভব? ভেতরেও একই অবস্থা, এমনকি ক্লাস নম্বরগুলিও একই আছে! ১-বি, এটাই আমার শেষ ক্লাস ছিল এই স্কুলে। ক্লাসের দরজার কাছে দাঁড়ালাম। নিলয়দা গিটারে কিছু একটা দেখাচ্ছেন। কিন্তু সেই ছেলেটি কিছুতেই নিজের গিটারে সেটি করে দেখাতে পারছিল না। অন্যরাও সবাই যে যার গিটারে কিছু-না-কিছু বাজিয়ে যাচ্ছে। সবাই লেসন প্র্যাকটিস করছে, আমি তাই দেখছি।
নিলয়দা দরজার দিকে চোখ তুলে তাকালেন, ‘তুমি কে? আমার ক্লাসের?’
আমি বললাম, ‘নিলয়দা আমি এই পাড়ার ছেলে। আমার নাম মিলন। আপনি যেখানে থাকেন, তার কয়েকটা বাসা পরেই আমাদের বাসা, আমান সাহেব, আমার বাবা...’
নিলয় দাশ ‘কী ব্যাপার...’ বলে কিছু একটা চিন্তা করে সঙ্গে সঙ্গে আবার বললেন ‘আচ্ছা তুমি ভেতরে এসে বসো, ক্লাস শেষে কথা বলি। কোনো অসুবিধা নাই তো?’ আমি বললাম, ‘জি না, আমি অপেক্ষা করছি।’
তিনি বলতে লাগলেন, ‘জানো, এই গিটারটা হ্যাপির ছিল। আমার বন্ধু হ্যাপি আখন্দ। সে নেই তাঁর গিটারটা শুধু আছে আমার কাছে, স্মৃতি হিসাবে।’
আমি ক্লাসে ঢুকলাম, এই ক্লাসে আমার সিট ছিল তৃতীয় সারিতে। আমি সেখানেই গিয়ে বসলাম। এমনি নস্টালজিক হয়ে আছি, আবার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে চলছে ১০ গিটারের অর্কেস্ট্রা। কারো সঙ্গে কারো কোনো মিল নেই যদিও, কিন্তু সবাই কিছু-না-কিছু বাজাচ্ছে। দারুণ লাগছে শুনতে।
এবার একে একে সবাই নিলয়দার কাছে লেসন দেখাচ্ছে। নিলয়দা বুঝিয়ে দিচ্ছেন কোথায় কী করতে হবে। গিটারিস্টের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। আমি একটু সামনের দিকে এগিয়ে বসি। মুগ্ধ হয়ে একজনের বাজানো দেখতে থাকি। অদ্ভুত ফ্ল্যামেঙ্কো সুরে গিটার বাজাচ্ছে সে একমনে।
নিলয়দা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, ‘এটা কী বাজাচ্ছে জানো?’
আমি বললাম, ‘জি জানি, ফ্ল্যামেঙ্কো।’
নিলয়দা অবাক হয়ে বললেন, ‘তুমি ফ্ল্যামেঙ্কো শুনসো?’
আমি হাসি দিয়ে বললাম, ‘পাকো দে লুসিয়া’।
উনি একটা হাসি দিয়ে পাশে রাখা নিজের গিটারটা হাতে তুলে নিলেন। শিক্ষক-ছাত্র দুজনে বেশ জ্যামিং করতে শুরু করে দিলো, আমি হতবাক হয়ে দেখছি। যেন চোখের সামনে একটা লাইভ কনসার্ট।
এবার শেষ ছেলেটিও বিদায় নিয়ে চলে গেল। নিলয়দা বললেন, ‘এই ছেলে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসে গিটার শিখতে। কত ডেডিকেশন।’ এরপর আমাকে উদ্দেশ্য করে, একটু ব্যঙ্গ করেই বললেন, ‘তারপর পাড়াতো ভাই, কী মনে করে আসছেন আমার কাছে?’ আমি একটু অপ্রস্তুভাবে বললাম, ‘নিলয়দা একটা গিটার কিনব?’
‘দোকানে যাও! সাইন্স ল্যাব পুলিশবক্সের ওইখানে ভালো গিটারের দোকান আছে।’
বললাম, ‘জি, আমি জানি। কিন্তু আমি তো গিটার চিনি না, কোনটা ভালো...’
নিলয়দা হতাশ হয়ে বললেন, ‘তো আমি তোমার গিটার কিনে দিবো?’
তাকে বললাম ‘প্লিজ যদি দিতেন। আর আম্মা বলছে বড় কাউকে নিয়ে যেতে।’

নিলয়দা অবাক হয়ে আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। কী বলবেন ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। হেসে বললেন, ‘আচ্ছা, বিকেলে টাকা নিয়ে বাসায় চলে আইসো।’ নিলয়দাকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলাম না, যদি আবার মত পাল্টে ফেলেন সেই ভয়ে। সঙ্গে সঙ্গে আমি বলে উঠলাম, ‘থ্যাংক ইউ, নিলয়দা।’ বলেই আমি সোজা রওনা দিলাম। নিলয়দা বলে উঠলেন, ‘এই, তুমি আমার বাসা চিনো?’ আমি অবশ্যই চিনি বলে এক দৌড়ে স্কুল থেকে বের হয়ে চলে আসি।
৩
আহ! আমার একটা নিজের গিটার হতে যাচ্ছে। কী দারুণ ব্যপার! ধুর, কেন যে নিলয়দাকে বাবার নাম বলতে গেলাম, এখন কেমন যেন লজ্জা লাগছে। নিশ্চয় অনেক বোকার মতো লেগেছে শুনতে। আমাকেই চেনেন না, চেনার কোনো কারণ নেই যদিও। রাস্তায় যে কয়েকবার দেখা হয়েছে, আমি দাঁত কেলিয়ে বলেছি, ‘কেমন আছেন, নিলয়দা?’ তিনি ভদ্রতার খাতিরে প্রতিবারই উত্তর দিয়েছেন, হয়ত না চিনেই।
আমি কিন্তু বেশ একটা অসম্ভব কাজ করে আসলাম। নিলয়দা যে এত সহজে রাজি হয়ে যাবেন, তা কিন্তু আমি ভাবিনি, বরং না করে দেয়াটাই তাঁর জন্য স্বাভাবিক ছিল। যাক, মায়ের কথাটা বলাতে কাজ হয়েছে মনে হয়, নিলয়দা কথাটা ফেলতে পারেননি। এখন মা টাকাটা ভালোয় ভালোয় দিলে হয়। আবার বেঁকে না বসেন।
৪
নিলয়দার বাসার সিঁড়ি দিয়ে উঠছি। সেখান থেকেই গিটারের টুংটাং শব্দ শোনা যাচ্ছে। বেশ মেলডিয়াস। কী করে এত অদ্ভুত সুন্দর গিটার বাজায়? আচ্ছা নিলয়দা কি সারাদিনই গিটার বাজায় নাকি? ঘরের দরজা খোলাই ছিল। আরও দুজন ছিল। তাঁরা সবাই নিলয়দার নতুন টিউনটা নিয়েই কথা বলছিল। আমাকে দেখে নিলয়দা বললেন, ‘ও তুমি আসছ? ভেতরে আসো।’
ঘরে ঢুকে অন্য একটা গিটারের দিকে চোখ যায়। গিটারটা একটু আলাদা করে যত্নে রাখা। দারুণ একটা গিটার, বিদেশি কোনো অ্যাকোস্টিক গিটার হবে। গিটারের গায়ে একজন গিটারিস্টের নামের স্টিকার লাগানো। স্টিকারের সেই গিটারিস্টের হাতে একটা পোলকা-ডটেড ফ্লাঙ্গিং ভি-গিটার।
নিলয়দা বললেন, ‘স্টিকারের গিটারিস্টটা কে বলতে পারবা?’
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, ‘র্যান্ডি রোডস।’
নিলয়দা বললেন, ‘আমার খুবই প্রিয় একজন গিটারিস্ট। ব্ল্যাক সাবাথ ছেড়ে ওজি, র্যান্ডিকে নিয়ে ব্যান্ড করে। নিয়োক্ল্যাসিক্যাল মাস্টার ছিল।’
আমি বললাম, ‘প্লেন অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে...আপনিও তো নিয়োক্ল্যাসিক্যাল মাস্টার, তাই না, নিলয়দা?’ আমার কথা যেন নিলয়দা শুনতে পাননি। তিনি বলতে লাগলেন, ‘জানো, এই গিটারটা হ্যাপির ছিল। আমার বন্ধু হ্যাপি আখন্দ। সে নেই তাঁর গিটারটা শুধু আছে আমার কাছে, স্মৃতি হিসাবে।’
কথাগুলো বলতে বলতে নিলয়দা কেমন যেন ইমোশনাল হয়ে গেলেন। এ রকম পরিস্থিতিতে কী বলে সান্ত্বনা দিতে হয়, তা আমার জানা ছিল না। বন্ধু হারানোর মতো এত বড় ঘটনা আমার জীবনে তখনও ঘটেনি। আমি কিছুই বলতে পারলাম না। শুধু নিজের করা প্রশ্নের উত্তর দিলাম, ‘আপনি আসলে মাস্টার অফ অল গিটারিস্ট, নিলয়দা।’ নিলয়দা নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললেন, ‘চলো চলো, তোমার গিটারটা কিনে আনি, আমার আবার কাজ আছে পরে।’
আমি মনে মনে ভাবলাম, গিটার বাজানোও একটা কাজ। কী মজা নিলয়দার। অন্য দুজনও আমাদের সঙ্গে রওনা দেয়। ঠিক হলো, দুইটা রিকশা নিয়ে আমরা সাইন্সল্যাবের সব কয়টা গিটারের দোকানে খুঁজতে যাবো। নিলয়দা তাঁদের দুই জনকে বললেন, ‘তোরা একটায় ওঠ, আমি আর...কী জানি তোমার নাম?’ আমি বললাম, ‘মিলন’।
‘হ্যাঁ, মিলন আর আমি অন্যটায় উঠছি।’
আমার আনন্দে বাকুম-বাকুম অবস্থা। নিলয়দা নিজে গিয়ে গিটার কিনে দেবেন, আবার সে গিটার কিনতে আমরা একসঙ্গে যাচ্ছি। পথে অনেক কথা হলো। গান নিয়েই বেশিরভাগ। তিনি একটু অবাক-ই হলেন আমার সঙ্গে কথা বলে। মনে হলো বেশ মজাও পাচ্ছেন। একসময় দুই হাত সারেন্ডারের মতো করে তুলে হাসতে হাসতে বললেন, ‘বাপ রে! তুমি তো দেখি দুনিয়ার সব কিছু শুইনা ফেলছ। আমি তো ভাবছিলাম রক, হেভি মেটাল শোনো। আমিও তো মনে হয় এত কিছু শুনি নাই। এত টাইম পাও কই? লেখাপড়ার নিশ্চয় খারাপ অবস্থা।’
আমি হাসলাম। তিনিও হাসতে থাকেন। আমাদের রিকশা সাইন্সল্যাব পুলিশবক্সের কাছে একটা গিটারের দোকানের সামনে এসে থামল। নিলয়দাকে নামতে দেখেই দোকানি এগিয়ে এসে বললেন, ‘কিছু দেখবেন, নিলয়দা?’ এসব জায়গায় নিলয়দার যেন আলাদা রকমের কদর। নিলয়দা বললেন, ‘হ্যাঁ, গৌতমদা, গতকাল এসে একটা গিটার বাজালাম না কিছুক্ষণ...’
দোকানি বললেন, ‘আছে, এখনও বিক্রি হয় নাই, নিয়া আসছি।’ নিলয়দা আমাকে বললেন, ‘মিলন তোমার ভাগ্য অনেক ভালো, একটা ভালো গিটার পাইলা মনে হয়। গতকালকেই একটা গিটার দেখে গেছিলাম। বেশ মিষ্টি সাউন্ড গিটারটার, সুইট সাউন্ডেড। অনেকদিন পর একটা ভালো জাম্বো গিটার হাতে পড়ল। ইউ আর লাকি।’
আমি খুশি হয়ে, ‘থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ’ বলতে লাগলাম। নিলয়দা খানিকটা বাজালেন আর গিটারটাকে উলটেপালটে কী কী জানি দেখলেন। নিলয়দা দোকানিকে বললেন, ‘গৌতমদা গিটারটা দিয়ে দেন এই ছেলেটাকে।’ গিটারটা আমরা নিয়ে নিলাম। রিকশা করে এবার ফিরছি। আমি তখনও কোনো কথা বলতে পারছিলাম না। তাই দেখে নিলয়দা বললেন, ‘কি পাড়াতো ভাই, গিটার পছন্দ হয়েছে?’ বললাম, ‘থ্যাংক ইউ এগেইন, নিলয়দা।’

নিলয়দা বললেন, ‘গিটারটা কয়েকদিন যদি টানা বাজানো যেত, ফ্রেটবোর্ড পুরা মাখনের মতো স্মুদ, মানে মসৃণ হয়ে যেত।’ আমি নিলয়দাকে বললাম, ‘তাহলে আপনার কাছেই থাক। আপনি বাজান কয়েকদিন, প্লিজ।’
আমাকে বললেন, ‘কী বলো?’ নিলয়দা যেন আকাশ থেকে পড়লেন, ‘মাত্র কিনলা গিটারটা। বাসায় নিয়া যাও। আমার কাছে রেখে যাবা কেন?’
আমি বললাম, ‘অসুবিধা নাই। থাক আপনার কাছে। আর আমি এরমধ্যে গিটারটা ভালোমতো রাখার একটা জায়গাটাও ঠিক করি।’ গিটারটা এতক্ষণ নিলয়দার হাতেই ছিল, তিনি আমার দিকে একটু বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আরে না, নিয়া যাও তো!’ আমি একটু সরে বসে, ‘থাক, নিলয়দা, আপনার কাছেই থাক।’
তিনি একটু বিরক্তি নিয়েই বললেন, ‘তোমার বাসায় কি বলবা...অ্যাই ছেলে, তোমার বাসায় জানে, তুমি গিটার কিনছ?’ আমি চলন্ত রিকশা থেকে এক লাফ দিয়ে নেমে পড়ি। নিলয়দার চোখে অবাক দৃষ্টি, মনে হয় বোঝার চেষ্টা করছেন আমি কোন ধরনের পাগল। আসলে, কথা বলতে বলতে রিকশা প্রায় আমাদের বাসার গেটের কাছে চলে এসেছে। রিকশা পেরিয়ে যাচ্ছে, আমাদের বাসাটা দেখিয়ে একটু উঁচু গলায় বললাম, ‘নিলয়দা, এটাই আমাদের বাসা। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, আর দেরি করলে আব্বা বকবে। আমি কালকে আসছি।’
নিলয়দা উত্তর দিলেন, ‘আজব তো...।’ তারপর তিনিও একটু উঁচু গলায় বললেন, ‘ভালো কিছু শোনার মতো ক্যাসেট নিয়ে আইসো, কালকে আসার সময়।’ তিনি হাসতে লাগলেন, রিকশা একটা বাঁক নিয়ে আড়াল হয়ে গেল। আমিও উচ্চস্বরে ‘আচ্ছা’ বলে বাসায় ঢুকে গেলাম।
৫
নিলয়দার বাসায় জম্পেশ আড্ডা চলছে, আমাকে দেখে নিলয়দা বললেন, ‘তো মিলন সাহেব, কিছু আনলেন আমার শোনার জন্য?’ আমি নিলয়দার হাতে দুইটা ক্যাসেট দিলাম। তিনি বললেন এটা কী? বললাম ‘বার্লিন ওয়াল কনসার্ট।’
‘রজার ওয়াটার্স। বার্লিন ওয়াল ভাঙার পর যে শোটা করলো। কিন্তু এটার তো বেশি দিন হয় নাই।’
এই নাম শুনে নিলয়দা একটা অট্টহাসি দিয়ে বললেন, ‘চরম ড্রিমার’ হলে ভালো হতো না?
তিনি একটু অবাক হলেন। বেশ খুশিও হলেন মনে হলো, ‘খুব ভালো করছ। আমার এখনও শোনা হয় নাই। আরে, অরিজিনাল ক্যাসেট নাকি?’ আমি হেসে বললাম, ‘ইন্ডিয়ান অরিজিনাল। মেজভাই আলীগড়ে পড়ে, সে এনে দেয়। ক্যাসেটগুলো দেখতে ভালো, অ্যালবাম কভার-ব্যাক, লিরিকও থাকে। কিন্তু টেপ কোয়ালিটি বেশি সুবিধার না।’
‘স্নোই হোয়াইট গিটারে, তাই না? গ্রেট হোয়াইট ব্লুজম্যান।’
নিলয়দা রীতিমতো ক্যাসেট দুটো পড়তে শুরু করে দিলেন। তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘ও হ্যাঁ, জেমস গ্যালওয়ে গুডবাই ব্লু স্কাই গানটাতে ফ্লুট বাজাইছে, জনি মিচেলের সঙ্গে। আমি এটা শুনতে চাচ্ছিলাম অনেকদিন ধরে। গ্যালওয়ের বাঁশি, আহা দারুণ। শুনছো আগে?’
আমি বললাম, ‘না। এইটাতেই প্রথম চিনলাম।’
নিলয়দা হেসে উঠে বললেন, ‘যাক, একটা তো পাওয়া গেল, যেটা তুমি আমার আগে শুনো নাই।’ বলে আরও জোরে হোহো করে হেসে উঠলেন। আমরাও আড্ডাতে যোগ দিলাম। অনেক গল্প হলো, শুধুই মিউজিক নিয়ে। নিলয়দা তাঁর গিটার শেখার প্রথম দিকের ঘটনা বললেন—এক একটা গিটার কর্ড কত কষ্ট করে তিনি চিনেছেন। এক কোরিয়ান ভদ্রলোক নিলয়দাকে কয়েকটি কর্ড দেখিয়ে দিয়েছিলেন, সেগুলিই তিনি রাতদিন প্র্যাকটিস করতেন।
এক ফাঁকে তিনি বললেন, ‘তোমার লেসন নিবা না? তোমার সবচেয়ে আগে আঙুল ফ্রি করতে হবে। গিটারটা আনো ওইখান থেকে...।’ প্রথম লেসনটা আমার ঠিক পছন্দ হইল না। বাঁ হাতের চার আঙুলের এক ধরনের ব্যায়াম বলা যায়! প্রথম আঙুল দিয়ে গিটারের প্রথম ফ্রেট ধরে, দ্বিতীয় আঙুল ক্রমাগত দ্বিতীয় ফ্রেটে ৫০ বার, তৃতীয় আঙুল তৃতীয় ফ্রেটে ৭৫ বার আর সবচেয়ে দুর্বল আঙুল দিয়ে চতুর্থ ফ্রেটে ১০০ বার। এভাবে ক্রমান্নয়ে ছয় তারে করতে হবে। শুধু তাই না, নিলয়দা বললেন, এটা করার সময় অবশ্যই যেন সাউন্ড হয়! যেটা আমি কিছুতেই করতে পারছিলাম না। কোথায় আমি ভাবলাম কয়েকটা কর্ড শিখব। আমার নাকি সেটার এখনও অনেক দেরি আছে।
৬
এরপর থেকে নিয়মিতভাবে ‘অনিয়ম করে’ নিলয়দার বাসায় যাওয়া শুরু করলাম। যেদিন যাওয়ার কথা সেদিন যাই না, এমনকি লেসন ঠিকমতো শেষ করি না। তিনি একবার বেশ রেগে বললেন, ‘এই তুমি স্কুলের ক্লাসে আসো না কেন? এভাবে তো কিছু শিখতে পারবা না। এখন থেকে স্কুলে আসবা, লেসন ঠিক মতো কমপ্লিট করে আসবা।’

আমি বললাম, ‘নিলয়দা, আমি অনেক চিন্তা করে দেখলাম, আসলে আমার আমার আপনার মতো সুপার গিটারিস্ট হওয়ার দরকার নাই। আমি মোটামুটি বাজাতে পারলেই হলো।’ নিলয়দা হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি আঁতকে উঠে বললেন, ‘সুপার গিটারিস্ট’?
এরকম কথা তিনি নিশ্চয়ই আগে কখনও কোনো স্টুডেন্টের কাছে শোনেননি। কী বলবেন ঠিক খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তারপর তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তবে তুমি এই কথাটা ঠিক বলছ, ব্যান্ডে সবার লিড গিটারিস্ট হওয়ার প্রয়োজন নাই। একটা ব্যান্ডে একজন লিড গিটারিস্টই যথেষ্ট।’
আমি বললাম, ‘আমার সব বন্ধুরাই এখন গিটার শিখছে। ওদের মাঝ থেকে কেউ গিটারিস্ট হলে তো আর আমার লিড গিটারিস্ট হতে হচ্ছে না।’ তিনি হেসে বললেন, ‘এই জন্যই তো আমাদের ড্রামারের এত সংকট, সবাই গিটারিস্ট হতে চায়।’ একটা ক্যাসেট তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, ‘এই নেন, এরিক জন্সন শুনতে চাইছিলেন।’ ক্যাসেট হাতে নিয়ে তিনি বললেন, ‘তাহলে এই ব্যান্ডে আপনি কী করবেন?’
আমি একটু মন খারাপ করে বললাম, ‘এখনও ঠিক করি নাই। কয়েকটা গান লিখেছি, কিন্তু বেশি ভালো হয় নাই।’ তিনি আমাকে অভয় দিলে বললেন, ‘আরে ব্যাপার না, হবে। মাত্র তো শুরু করলা।’ তারপর নিলয়দা যেটা বললেন, তা আমি কখনও ভুলবো না। তিনি বললেন, ‘তাছাড়া গিটারের এই ১২ নোটে তেমন কিছু শেখারও নাই। সবার আগে তোমাকে মনের দিক থেকে একজন প্রকৃত মিউজিশিয়ান হতে হবে।’
এই কথা শুনে আমি অবাক হয়ে বলি, এটা তো আপনি একটা লিখে রাখার মতো কথা বলেছেন। নিলয়দা হেসে উঁচু স্বরে বললেন, ‘সাবাস, মিলন সাহেব! তুমি তোমার মতো চালিয়ে যাও। এটাই পারফেক্ট ব্যান্ড অ্যাটিচুড।’ নিলয়দার মুখে এই কথা শুনে আমিও খুশি হয়ে যাই। তিনি আরও বললেন, ‘যেটাই করো মন দিয়া করবা, ফুল ডেডিকেশন দরকার। তুমি লেখালেখি চালিয়ে যাও। গান গাওয়াটাও ট্রাই করে দেখতে পারো, কম্পোজিশন করার জন্য খুব কাজে লাগে।’
আবার বললেন, যখন ইচ্ছা হয় চলে আসতে। তারপর একটু চুপ থেকে বললেন, ‘ও না, তোমার তো রেগুলারই আসতে হবে। না হলে আমার জন্যে ক্যাসেট কে নিয়া আসবে?’ এই বলে তিনি করে হাসতে শুরু করলেন। আমি চলে যাচ্ছিলাম, নিলয়দা হাসতে হাসতেই বললেন, ‘মিলন সাহেব, আপনার এই ফিউচার ব্যান্ডের নাম কী?’ আমি একটু গম্ভীরভাবে উত্তর দিলাম, ‘ক্রোমড্রিমার’। এই নাম শুনে নিলয়দা একটা অট্টহাসি দিয়ে বললেন, ‘চরম ড্রিমার’ হলে ভালো হতো না? আমিও নিলয়দার সঙ্গে হাসিতে যোগ দিলাম।

১৯৯০ সালের কথা। নিলয় দাশ, আমাদের নিলয়দার প্রথম অ্যালবাম ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’ আরও বছরখানেক আগে বের হয়েছে। সেই অ্যালবামটি অনেকের পছন্দের তালিকায় ছিল। ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’, ‘যখনই নিবিড় করে’ এইসব গান তখন ভক্তদের মুখে মুখে। আর যারা গিটার ভালোবাসে তাঁদের জন্য গানগুলোর গুরুত্ব যেন একটু বেশিই। শোনা যাচ্ছে, নিলয়দার নতুন অ্যালবামের কাজ নাকি শেষ। এখন শুধু বের হবার অপেক্ষায়।
ঢাকায় রক মিউজিক তখন তুঙ্গে। কেউ গিটার বাজাবে কিন্তু নিলয়দার কাছে একবারও আসেনি, এমনটা তখন হয়নি। মিউজিশিয়ানরাও প্রতিনিয়ত নিলয়দার কাছে আসতেন নতুন কিছু শেখার জন্য। আমি কখনও শুনিনি নিলয়দা কাউকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। নিলয়দার বাবা প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ সুধীন দাশ নিজেও একজন নজরুলসংগীত শিক্ষক ছিলেন। তাই শিক্ষকতা ব্যাপারটা নিলয়দাও বেশ উপভোগ করতেন মনে হয়।
কিন্তু এসব নিয়ে ভাবলে এখন আমার চলবে না। অনেক কষ্টে মাকে গিটার রাজি করিয়েছি, আমার গিটার কেনা লাগবে। এখন নিলয়দা কিনে দিতে রাজি হন কি না, সেটাই দেখার বিষয়। বেশি সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না, মা আবার মত পাল্টানোর আগে অতি দ্রুত কাজটা শেষ করতে হবে।
২
স্কুলে অনেকদিন পরে আসলাম। এই কিন্ডারগার্টেনেই আমার স্কুল জীবন শুরু হয়েছিল। তখন স্কুলের নাম ছিল ‘মেরিগোল্ড’। এখন সেটা অন্য জায়গায় চলে গেছে, এটা আলাদা স্কুল। নতুন নাম ‘ব্লু-বার্ড’। পুরোনো স্কুলের দারোয়ান চাচা রয়ে গেছেন ঠিকই। আর ঠিক আগের মতোই গেইটের পাশে ঝোলানো হজমি, আঁচার আর টফির বয়ম। পাঁচ-দশ পয়সা মিলিয়ে আমরা যে টাকাই জমাতে পারতাম, তাই সবাই একসঙ্গে করে টিফিন পিরিয়ডে এসব কিনে খেতাম। বলাবাহুল্য, এসবের জন্য বাসা থেকে কখনও কোনো টাকা দেওয়া হতো না।

দারোয়ান চাচা আমাকে দেখে পরিচিত সুরে বললেন, ‘আরে তুমি? কারও কাছে যাইবা?’
আমি বললাম, ‘জি, নিলয়দা আসছেন না, চাচা?’
চাচা বললেন, ‘হ্যাঁ, ক্লাস নিচ্ছে ১-বি-তে। যাও।’
আমি আবার দারোয়ান চাচাকে বললাম, ‘আচ্ছা চাচা, আমি যাই তাহলে, কোনো অসুবিধা নাই তো?’
চাচা বললেন, ‘আরে না। যাও, আর তোমারে কি আমি চিনি না?’
তারপর চাচাকে বললাম, ‘পরে দেখা হবে, চাচা।’
তবে আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম। প্রায় ১০ বছর পেরিয়ে গেছে কিন্তু স্কুলের সবকিছু অবিকল আগের মতোই আছে। সেটা কী করে সম্ভব? ভেতরেও একই অবস্থা, এমনকি ক্লাস নম্বরগুলিও একই আছে! ১-বি, এটাই আমার শেষ ক্লাস ছিল এই স্কুলে। ক্লাসের দরজার কাছে দাঁড়ালাম। নিলয়দা গিটারে কিছু একটা দেখাচ্ছেন। কিন্তু সেই ছেলেটি কিছুতেই নিজের গিটারে সেটি করে দেখাতে পারছিল না। অন্যরাও সবাই যে যার গিটারে কিছু-না-কিছু বাজিয়ে যাচ্ছে। সবাই লেসন প্র্যাকটিস করছে, আমি তাই দেখছি।
নিলয়দা দরজার দিকে চোখ তুলে তাকালেন, ‘তুমি কে? আমার ক্লাসের?’
আমি বললাম, ‘নিলয়দা আমি এই পাড়ার ছেলে। আমার নাম মিলন। আপনি যেখানে থাকেন, তার কয়েকটা বাসা পরেই আমাদের বাসা, আমান সাহেব, আমার বাবা...’
নিলয় দাশ ‘কী ব্যাপার...’ বলে কিছু একটা চিন্তা করে সঙ্গে সঙ্গে আবার বললেন ‘আচ্ছা তুমি ভেতরে এসে বসো, ক্লাস শেষে কথা বলি। কোনো অসুবিধা নাই তো?’ আমি বললাম, ‘জি না, আমি অপেক্ষা করছি।’
তিনি বলতে লাগলেন, ‘জানো, এই গিটারটা হ্যাপির ছিল। আমার বন্ধু হ্যাপি আখন্দ। সে নেই তাঁর গিটারটা শুধু আছে আমার কাছে, স্মৃতি হিসাবে।’
আমি ক্লাসে ঢুকলাম, এই ক্লাসে আমার সিট ছিল তৃতীয় সারিতে। আমি সেখানেই গিয়ে বসলাম। এমনি নস্টালজিক হয়ে আছি, আবার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে চলছে ১০ গিটারের অর্কেস্ট্রা। কারো সঙ্গে কারো কোনো মিল নেই যদিও, কিন্তু সবাই কিছু-না-কিছু বাজাচ্ছে। দারুণ লাগছে শুনতে।
এবার একে একে সবাই নিলয়দার কাছে লেসন দেখাচ্ছে। নিলয়দা বুঝিয়ে দিচ্ছেন কোথায় কী করতে হবে। গিটারিস্টের সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। আমি একটু সামনের দিকে এগিয়ে বসি। মুগ্ধ হয়ে একজনের বাজানো দেখতে থাকি। অদ্ভুত ফ্ল্যামেঙ্কো সুরে গিটার বাজাচ্ছে সে একমনে।
নিলয়দা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, ‘এটা কী বাজাচ্ছে জানো?’
আমি বললাম, ‘জি জানি, ফ্ল্যামেঙ্কো।’
নিলয়দা অবাক হয়ে বললেন, ‘তুমি ফ্ল্যামেঙ্কো শুনসো?’
আমি হাসি দিয়ে বললাম, ‘পাকো দে লুসিয়া’।
উনি একটা হাসি দিয়ে পাশে রাখা নিজের গিটারটা হাতে তুলে নিলেন। শিক্ষক-ছাত্র দুজনে বেশ জ্যামিং করতে শুরু করে দিলো, আমি হতবাক হয়ে দেখছি। যেন চোখের সামনে একটা লাইভ কনসার্ট।
এবার শেষ ছেলেটিও বিদায় নিয়ে চলে গেল। নিলয়দা বললেন, ‘এই ছেলে নারায়ণগঞ্জ থেকে আসে গিটার শিখতে। কত ডেডিকেশন।’ এরপর আমাকে উদ্দেশ্য করে, একটু ব্যঙ্গ করেই বললেন, ‘তারপর পাড়াতো ভাই, কী মনে করে আসছেন আমার কাছে?’ আমি একটু অপ্রস্তুভাবে বললাম, ‘নিলয়দা একটা গিটার কিনব?’
‘দোকানে যাও! সাইন্স ল্যাব পুলিশবক্সের ওইখানে ভালো গিটারের দোকান আছে।’
বললাম, ‘জি, আমি জানি। কিন্তু আমি তো গিটার চিনি না, কোনটা ভালো...’
নিলয়দা হতাশ হয়ে বললেন, ‘তো আমি তোমার গিটার কিনে দিবো?’
তাকে বললাম ‘প্লিজ যদি দিতেন। আর আম্মা বলছে বড় কাউকে নিয়ে যেতে।’

নিলয়দা অবাক হয়ে আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। কী বলবেন ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। হেসে বললেন, ‘আচ্ছা, বিকেলে টাকা নিয়ে বাসায় চলে আইসো।’ নিলয়দাকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলাম না, যদি আবার মত পাল্টে ফেলেন সেই ভয়ে। সঙ্গে সঙ্গে আমি বলে উঠলাম, ‘থ্যাংক ইউ, নিলয়দা।’ বলেই আমি সোজা রওনা দিলাম। নিলয়দা বলে উঠলেন, ‘এই, তুমি আমার বাসা চিনো?’ আমি অবশ্যই চিনি বলে এক দৌড়ে স্কুল থেকে বের হয়ে চলে আসি।
৩
আহ! আমার একটা নিজের গিটার হতে যাচ্ছে। কী দারুণ ব্যপার! ধুর, কেন যে নিলয়দাকে বাবার নাম বলতে গেলাম, এখন কেমন যেন লজ্জা লাগছে। নিশ্চয় অনেক বোকার মতো লেগেছে শুনতে। আমাকেই চেনেন না, চেনার কোনো কারণ নেই যদিও। রাস্তায় যে কয়েকবার দেখা হয়েছে, আমি দাঁত কেলিয়ে বলেছি, ‘কেমন আছেন, নিলয়দা?’ তিনি ভদ্রতার খাতিরে প্রতিবারই উত্তর দিয়েছেন, হয়ত না চিনেই।
আমি কিন্তু বেশ একটা অসম্ভব কাজ করে আসলাম। নিলয়দা যে এত সহজে রাজি হয়ে যাবেন, তা কিন্তু আমি ভাবিনি, বরং না করে দেয়াটাই তাঁর জন্য স্বাভাবিক ছিল। যাক, মায়ের কথাটা বলাতে কাজ হয়েছে মনে হয়, নিলয়দা কথাটা ফেলতে পারেননি। এখন মা টাকাটা ভালোয় ভালোয় দিলে হয়। আবার বেঁকে না বসেন।
৪
নিলয়দার বাসার সিঁড়ি দিয়ে উঠছি। সেখান থেকেই গিটারের টুংটাং শব্দ শোনা যাচ্ছে। বেশ মেলডিয়াস। কী করে এত অদ্ভুত সুন্দর গিটার বাজায়? আচ্ছা নিলয়দা কি সারাদিনই গিটার বাজায় নাকি? ঘরের দরজা খোলাই ছিল। আরও দুজন ছিল। তাঁরা সবাই নিলয়দার নতুন টিউনটা নিয়েই কথা বলছিল। আমাকে দেখে নিলয়দা বললেন, ‘ও তুমি আসছ? ভেতরে আসো।’
ঘরে ঢুকে অন্য একটা গিটারের দিকে চোখ যায়। গিটারটা একটু আলাদা করে যত্নে রাখা। দারুণ একটা গিটার, বিদেশি কোনো অ্যাকোস্টিক গিটার হবে। গিটারের গায়ে একজন গিটারিস্টের নামের স্টিকার লাগানো। স্টিকারের সেই গিটারিস্টের হাতে একটা পোলকা-ডটেড ফ্লাঙ্গিং ভি-গিটার।
নিলয়দা বললেন, ‘স্টিকারের গিটারিস্টটা কে বলতে পারবা?’
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, ‘র্যান্ডি রোডস।’
নিলয়দা বললেন, ‘আমার খুবই প্রিয় একজন গিটারিস্ট। ব্ল্যাক সাবাথ ছেড়ে ওজি, র্যান্ডিকে নিয়ে ব্যান্ড করে। নিয়োক্ল্যাসিক্যাল মাস্টার ছিল।’
আমি বললাম, ‘প্লেন অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে...আপনিও তো নিয়োক্ল্যাসিক্যাল মাস্টার, তাই না, নিলয়দা?’ আমার কথা যেন নিলয়দা শুনতে পাননি। তিনি বলতে লাগলেন, ‘জানো, এই গিটারটা হ্যাপির ছিল। আমার বন্ধু হ্যাপি আখন্দ। সে নেই তাঁর গিটারটা শুধু আছে আমার কাছে, স্মৃতি হিসাবে।’
কথাগুলো বলতে বলতে নিলয়দা কেমন যেন ইমোশনাল হয়ে গেলেন। এ রকম পরিস্থিতিতে কী বলে সান্ত্বনা দিতে হয়, তা আমার জানা ছিল না। বন্ধু হারানোর মতো এত বড় ঘটনা আমার জীবনে তখনও ঘটেনি। আমি কিছুই বলতে পারলাম না। শুধু নিজের করা প্রশ্নের উত্তর দিলাম, ‘আপনি আসলে মাস্টার অফ অল গিটারিস্ট, নিলয়দা।’ নিলয়দা নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললেন, ‘চলো চলো, তোমার গিটারটা কিনে আনি, আমার আবার কাজ আছে পরে।’
আমি মনে মনে ভাবলাম, গিটার বাজানোও একটা কাজ। কী মজা নিলয়দার। অন্য দুজনও আমাদের সঙ্গে রওনা দেয়। ঠিক হলো, দুইটা রিকশা নিয়ে আমরা সাইন্সল্যাবের সব কয়টা গিটারের দোকানে খুঁজতে যাবো। নিলয়দা তাঁদের দুই জনকে বললেন, ‘তোরা একটায় ওঠ, আমি আর...কী জানি তোমার নাম?’ আমি বললাম, ‘মিলন’।
‘হ্যাঁ, মিলন আর আমি অন্যটায় উঠছি।’
আমার আনন্দে বাকুম-বাকুম অবস্থা। নিলয়দা নিজে গিয়ে গিটার কিনে দেবেন, আবার সে গিটার কিনতে আমরা একসঙ্গে যাচ্ছি। পথে অনেক কথা হলো। গান নিয়েই বেশিরভাগ। তিনি একটু অবাক-ই হলেন আমার সঙ্গে কথা বলে। মনে হলো বেশ মজাও পাচ্ছেন। একসময় দুই হাত সারেন্ডারের মতো করে তুলে হাসতে হাসতে বললেন, ‘বাপ রে! তুমি তো দেখি দুনিয়ার সব কিছু শুইনা ফেলছ। আমি তো ভাবছিলাম রক, হেভি মেটাল শোনো। আমিও তো মনে হয় এত কিছু শুনি নাই। এত টাইম পাও কই? লেখাপড়ার নিশ্চয় খারাপ অবস্থা।’
আমি হাসলাম। তিনিও হাসতে থাকেন। আমাদের রিকশা সাইন্সল্যাব পুলিশবক্সের কাছে একটা গিটারের দোকানের সামনে এসে থামল। নিলয়দাকে নামতে দেখেই দোকানি এগিয়ে এসে বললেন, ‘কিছু দেখবেন, নিলয়দা?’ এসব জায়গায় নিলয়দার যেন আলাদা রকমের কদর। নিলয়দা বললেন, ‘হ্যাঁ, গৌতমদা, গতকাল এসে একটা গিটার বাজালাম না কিছুক্ষণ...’
দোকানি বললেন, ‘আছে, এখনও বিক্রি হয় নাই, নিয়া আসছি।’ নিলয়দা আমাকে বললেন, ‘মিলন তোমার ভাগ্য অনেক ভালো, একটা ভালো গিটার পাইলা মনে হয়। গতকালকেই একটা গিটার দেখে গেছিলাম। বেশ মিষ্টি সাউন্ড গিটারটার, সুইট সাউন্ডেড। অনেকদিন পর একটা ভালো জাম্বো গিটার হাতে পড়ল। ইউ আর লাকি।’
আমি খুশি হয়ে, ‘থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ’ বলতে লাগলাম। নিলয়দা খানিকটা বাজালেন আর গিটারটাকে উলটেপালটে কী কী জানি দেখলেন। নিলয়দা দোকানিকে বললেন, ‘গৌতমদা গিটারটা দিয়ে দেন এই ছেলেটাকে।’ গিটারটা আমরা নিয়ে নিলাম। রিকশা করে এবার ফিরছি। আমি তখনও কোনো কথা বলতে পারছিলাম না। তাই দেখে নিলয়দা বললেন, ‘কি পাড়াতো ভাই, গিটার পছন্দ হয়েছে?’ বললাম, ‘থ্যাংক ইউ এগেইন, নিলয়দা।’

নিলয়দা বললেন, ‘গিটারটা কয়েকদিন যদি টানা বাজানো যেত, ফ্রেটবোর্ড পুরা মাখনের মতো স্মুদ, মানে মসৃণ হয়ে যেত।’ আমি নিলয়দাকে বললাম, ‘তাহলে আপনার কাছেই থাক। আপনি বাজান কয়েকদিন, প্লিজ।’
আমাকে বললেন, ‘কী বলো?’ নিলয়দা যেন আকাশ থেকে পড়লেন, ‘মাত্র কিনলা গিটারটা। বাসায় নিয়া যাও। আমার কাছে রেখে যাবা কেন?’
আমি বললাম, ‘অসুবিধা নাই। থাক আপনার কাছে। আর আমি এরমধ্যে গিটারটা ভালোমতো রাখার একটা জায়গাটাও ঠিক করি।’ গিটারটা এতক্ষণ নিলয়দার হাতেই ছিল, তিনি আমার দিকে একটু বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আরে না, নিয়া যাও তো!’ আমি একটু সরে বসে, ‘থাক, নিলয়দা, আপনার কাছেই থাক।’
তিনি একটু বিরক্তি নিয়েই বললেন, ‘তোমার বাসায় কি বলবা...অ্যাই ছেলে, তোমার বাসায় জানে, তুমি গিটার কিনছ?’ আমি চলন্ত রিকশা থেকে এক লাফ দিয়ে নেমে পড়ি। নিলয়দার চোখে অবাক দৃষ্টি, মনে হয় বোঝার চেষ্টা করছেন আমি কোন ধরনের পাগল। আসলে, কথা বলতে বলতে রিকশা প্রায় আমাদের বাসার গেটের কাছে চলে এসেছে। রিকশা পেরিয়ে যাচ্ছে, আমাদের বাসাটা দেখিয়ে একটু উঁচু গলায় বললাম, ‘নিলয়দা, এটাই আমাদের বাসা। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, আর দেরি করলে আব্বা বকবে। আমি কালকে আসছি।’
নিলয়দা উত্তর দিলেন, ‘আজব তো...।’ তারপর তিনিও একটু উঁচু গলায় বললেন, ‘ভালো কিছু শোনার মতো ক্যাসেট নিয়ে আইসো, কালকে আসার সময়।’ তিনি হাসতে লাগলেন, রিকশা একটা বাঁক নিয়ে আড়াল হয়ে গেল। আমিও উচ্চস্বরে ‘আচ্ছা’ বলে বাসায় ঢুকে গেলাম।
৫
নিলয়দার বাসায় জম্পেশ আড্ডা চলছে, আমাকে দেখে নিলয়দা বললেন, ‘তো মিলন সাহেব, কিছু আনলেন আমার শোনার জন্য?’ আমি নিলয়দার হাতে দুইটা ক্যাসেট দিলাম। তিনি বললেন এটা কী? বললাম ‘বার্লিন ওয়াল কনসার্ট।’
‘রজার ওয়াটার্স। বার্লিন ওয়াল ভাঙার পর যে শোটা করলো। কিন্তু এটার তো বেশি দিন হয় নাই।’
এই নাম শুনে নিলয়দা একটা অট্টহাসি দিয়ে বললেন, ‘চরম ড্রিমার’ হলে ভালো হতো না?
তিনি একটু অবাক হলেন। বেশ খুশিও হলেন মনে হলো, ‘খুব ভালো করছ। আমার এখনও শোনা হয় নাই। আরে, অরিজিনাল ক্যাসেট নাকি?’ আমি হেসে বললাম, ‘ইন্ডিয়ান অরিজিনাল। মেজভাই আলীগড়ে পড়ে, সে এনে দেয়। ক্যাসেটগুলো দেখতে ভালো, অ্যালবাম কভার-ব্যাক, লিরিকও থাকে। কিন্তু টেপ কোয়ালিটি বেশি সুবিধার না।’
‘স্নোই হোয়াইট গিটারে, তাই না? গ্রেট হোয়াইট ব্লুজম্যান।’
নিলয়দা রীতিমতো ক্যাসেট দুটো পড়তে শুরু করে দিলেন। তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘ও হ্যাঁ, জেমস গ্যালওয়ে গুডবাই ব্লু স্কাই গানটাতে ফ্লুট বাজাইছে, জনি মিচেলের সঙ্গে। আমি এটা শুনতে চাচ্ছিলাম অনেকদিন ধরে। গ্যালওয়ের বাঁশি, আহা দারুণ। শুনছো আগে?’
আমি বললাম, ‘না। এইটাতেই প্রথম চিনলাম।’
নিলয়দা হেসে উঠে বললেন, ‘যাক, একটা তো পাওয়া গেল, যেটা তুমি আমার আগে শুনো নাই।’ বলে আরও জোরে হোহো করে হেসে উঠলেন। আমরাও আড্ডাতে যোগ দিলাম। অনেক গল্প হলো, শুধুই মিউজিক নিয়ে। নিলয়দা তাঁর গিটার শেখার প্রথম দিকের ঘটনা বললেন—এক একটা গিটার কর্ড কত কষ্ট করে তিনি চিনেছেন। এক কোরিয়ান ভদ্রলোক নিলয়দাকে কয়েকটি কর্ড দেখিয়ে দিয়েছিলেন, সেগুলিই তিনি রাতদিন প্র্যাকটিস করতেন।
এক ফাঁকে তিনি বললেন, ‘তোমার লেসন নিবা না? তোমার সবচেয়ে আগে আঙুল ফ্রি করতে হবে। গিটারটা আনো ওইখান থেকে...।’ প্রথম লেসনটা আমার ঠিক পছন্দ হইল না। বাঁ হাতের চার আঙুলের এক ধরনের ব্যায়াম বলা যায়! প্রথম আঙুল দিয়ে গিটারের প্রথম ফ্রেট ধরে, দ্বিতীয় আঙুল ক্রমাগত দ্বিতীয় ফ্রেটে ৫০ বার, তৃতীয় আঙুল তৃতীয় ফ্রেটে ৭৫ বার আর সবচেয়ে দুর্বল আঙুল দিয়ে চতুর্থ ফ্রেটে ১০০ বার। এভাবে ক্রমান্নয়ে ছয় তারে করতে হবে। শুধু তাই না, নিলয়দা বললেন, এটা করার সময় অবশ্যই যেন সাউন্ড হয়! যেটা আমি কিছুতেই করতে পারছিলাম না। কোথায় আমি ভাবলাম কয়েকটা কর্ড শিখব। আমার নাকি সেটার এখনও অনেক দেরি আছে।
৬
এরপর থেকে নিয়মিতভাবে ‘অনিয়ম করে’ নিলয়দার বাসায় যাওয়া শুরু করলাম। যেদিন যাওয়ার কথা সেদিন যাই না, এমনকি লেসন ঠিকমতো শেষ করি না। তিনি একবার বেশ রেগে বললেন, ‘এই তুমি স্কুলের ক্লাসে আসো না কেন? এভাবে তো কিছু শিখতে পারবা না। এখন থেকে স্কুলে আসবা, লেসন ঠিক মতো কমপ্লিট করে আসবা।’

আমি বললাম, ‘নিলয়দা, আমি অনেক চিন্তা করে দেখলাম, আসলে আমার আমার আপনার মতো সুপার গিটারিস্ট হওয়ার দরকার নাই। আমি মোটামুটি বাজাতে পারলেই হলো।’ নিলয়দা হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি আঁতকে উঠে বললেন, ‘সুপার গিটারিস্ট’?
এরকম কথা তিনি নিশ্চয়ই আগে কখনও কোনো স্টুডেন্টের কাছে শোনেননি। কী বলবেন ঠিক খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তারপর তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তবে তুমি এই কথাটা ঠিক বলছ, ব্যান্ডে সবার লিড গিটারিস্ট হওয়ার প্রয়োজন নাই। একটা ব্যান্ডে একজন লিড গিটারিস্টই যথেষ্ট।’
আমি বললাম, ‘আমার সব বন্ধুরাই এখন গিটার শিখছে। ওদের মাঝ থেকে কেউ গিটারিস্ট হলে তো আর আমার লিড গিটারিস্ট হতে হচ্ছে না।’ তিনি হেসে বললেন, ‘এই জন্যই তো আমাদের ড্রামারের এত সংকট, সবাই গিটারিস্ট হতে চায়।’ একটা ক্যাসেট তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, ‘এই নেন, এরিক জন্সন শুনতে চাইছিলেন।’ ক্যাসেট হাতে নিয়ে তিনি বললেন, ‘তাহলে এই ব্যান্ডে আপনি কী করবেন?’
আমি একটু মন খারাপ করে বললাম, ‘এখনও ঠিক করি নাই। কয়েকটা গান লিখেছি, কিন্তু বেশি ভালো হয় নাই।’ তিনি আমাকে অভয় দিলে বললেন, ‘আরে ব্যাপার না, হবে। মাত্র তো শুরু করলা।’ তারপর নিলয়দা যেটা বললেন, তা আমি কখনও ভুলবো না। তিনি বললেন, ‘তাছাড়া গিটারের এই ১২ নোটে তেমন কিছু শেখারও নাই। সবার আগে তোমাকে মনের দিক থেকে একজন প্রকৃত মিউজিশিয়ান হতে হবে।’
এই কথা শুনে আমি অবাক হয়ে বলি, এটা তো আপনি একটা লিখে রাখার মতো কথা বলেছেন। নিলয়দা হেসে উঁচু স্বরে বললেন, ‘সাবাস, মিলন সাহেব! তুমি তোমার মতো চালিয়ে যাও। এটাই পারফেক্ট ব্যান্ড অ্যাটিচুড।’ নিলয়দার মুখে এই কথা শুনে আমিও খুশি হয়ে যাই। তিনি আরও বললেন, ‘যেটাই করো মন দিয়া করবা, ফুল ডেডিকেশন দরকার। তুমি লেখালেখি চালিয়ে যাও। গান গাওয়াটাও ট্রাই করে দেখতে পারো, কম্পোজিশন করার জন্য খুব কাজে লাগে।’
আবার বললেন, যখন ইচ্ছা হয় চলে আসতে। তারপর একটু চুপ থেকে বললেন, ‘ও না, তোমার তো রেগুলারই আসতে হবে। না হলে আমার জন্যে ক্যাসেট কে নিয়া আসবে?’ এই বলে তিনি করে হাসতে শুরু করলেন। আমি চলে যাচ্ছিলাম, নিলয়দা হাসতে হাসতেই বললেন, ‘মিলন সাহেব, আপনার এই ফিউচার ব্যান্ডের নাম কী?’ আমি একটু গম্ভীরভাবে উত্তর দিলাম, ‘ক্রোমড্রিমার’। এই নাম শুনে নিলয়দা একটা অট্টহাসি দিয়ে বললেন, ‘চরম ড্রিমার’ হলে ভালো হতো না? আমিও নিলয়দার সঙ্গে হাসিতে যোগ দিলাম।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেদিন ভেনেজুয়েলা আক্রমণ করে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক তুলে নিয়ে এলেন এবং ভেনেজুয়েলার তেল ব্যবস্থাপনা ‘আমেরিকা চালাবে’ বলে ঘোষণা দিলেন, তার দুদিন বাদে আমার হাতে একটি বই এল।
১০ ঘণ্টা আগে
আজ ১১ জানুয়ারি। ১৯২২ সালের এই দিনে প্রথমবারের মতো মানুষের শরীরে ইনসুলিন প্রয়োগ করা হয়েছিল। যে ডায়াবেটিস একসময় নিশ্চিত মৃত্যুর সমার্থক ছিল, সেই রোগের চিকিৎসায় সেদিন খুলে যায় নতুন দিগন্ত। শুরু হয় আধুনিক চিকিৎসার এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এর পেছনে ছিল কয়েক বছরের গবেষণা আর কুকুরের ওপর চালানো বহু ব্যর্থ–সফ
১২ ঘণ্টা আগে
বিশ্বজুড়ে চায়ের একমাত্র জোগানদাতা ছিল চীন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে চীন থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে চা কিনতে হতো। পরবর্তী সময়ে তারা এর বিনিময়ে আফিম বিক্রি শুরু করলেও চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সবসময়ই নড়বড়ে ছিল।
১ দিন আগে
শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ত্বক তার স্বাভাবিক আর্দ্রতা হারিয়ে রুক্ষ ও খসখসে হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত শীতে ত্বকের যত্নে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চললে ত্বক নিয়ে আর দুশ্চিন্তায় পড়তে হবে না।
১ দিন আগে