আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের লেখা
সংগঠক, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ৮৭তম জন্মদিন আজ। ১৯৩৯ সালের ২৫ জুলাই কলকাতার পার্ক সার্কাসে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
লেখা:

মানুষ যুদ্ধে যায় একসঙ্গে কিন্তু পালায় একা একা। যারা যুদ্ধে যাচ্ছে তাদের অবস্থা আর যারা ফিরে আসছে তাদের অবস্থা এক নয়। যেমন, তরুণদের জন্মদিন আর আমাদের জন্মদিন। ওদের জন্মদিন মানে বয়স বাড়া, আমাদের জন্মদিন মানে বয়স কমা। তবু জীবনে অনেক পথ হাঁটতে গিয়ে বুঝেছি, সব বয়সের মধ্যেই জীবনের সব বয়স আছে। যৌবনের মধ্যে যেমন রয়েছে বার্ধক্য, বার্ধক্যের মধ্যে তেমনি রয়েছে যৌবন। জীবনের পড়ন্ত বেলায় আমরা এখন জীবন নিয়ে যেমন ভাবি, মৃত্যু নিয়েও তেমনি।
অনেক আগে একটা উর্দু শের পড়েছিলাম। তার মর্মার্থ ছিল, ‘সেটা কী বার্ধক্য যার মধ্যে যৌবন নেই, আর সেটা কী যৌবন যার মধ্যে বার্ধক্য নেই?’ মানুষ আসলে এ দুইয়ের সংমিশ্রণ। মানুষ শুধু আশাবাদীও যেমন নয়, তেমনি পুরো নৈরাশ্যবাদীও নয়। অনেকসময় নৈরাশ্যও আশার জন্ম দেয়। আমাদের বড় বড় দুঃখ-বেদনাগুলো অনেকসময় বড় বড় উদ্যমে স্বপ্নে আমাদের উদ্বুদ্ধ করে। সেদিক থেকে জীবনে নৈরাশ্য বলে কিছু নেই। আশা নৈরাশ্য দুটোই দুভাবে আমাদের জীবনকে আশার স্বপ্নে জাগিয়ে তোলে।
মানুষ সাধারণত সামনের দিকেই যায়। কিন্তু সবসময় যায় না। মাঝেমধ্যে তাকে পেছন দিকেও যেতে হয়। এ তাকে যেতে হয় সামনে যাওয়াকে আরও শক্তিশালী করতে। আমরা যখন ঘুষি দিই, তখন হাত দিয়ে কি সোজা সামনের মানুষকে আঘাত করি? করি না, কেননা তাতে ঘুষিতে জোর হয় না। আমরা হাতটা প্রথমে কিছুটা পেছন দিকে নিয়ে আসি, তারপর সামনের দিকে সজোরে ছুড়ে দিই। তখনই তা ঘায়েল করার শক্তি অর্জন করে। সুতরাং জীবন পরস্পরবিরোধী, রহস্যময়। নৈরাশ্যকে আশা বানিয়ে, ব্যর্থতাকে শক্তিতে পরিণত করে আমাদের সামনে তা কেবলই এক উচ্চতর জীবনের দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
আমার জন্মদিনের ছোট অনুষ্ঠানটা আয়োজিত হয়ে চলছে বহু বছর ধরে। অন্তত বছর পঁচিশেক তো হবেই। কে বা কারা এ শুরু করেছিল ঠিক মনে নেই। সেই যে শুরু, তারপর আর থামে নি। বছরের পর বছর ধরে আমাকে বৃদ্ধ থেকে অধিকতর বৃদ্ধে পরিণত করে এ এগিয়ে চলেছে। আমার করুণ অবস্থা দেখে মায়া করেও এ থামে না। এ কারণে প্রত্যেক বছর ঐ একই বিষয়ের ওপর আমাকেও একটি করে বক্তৃতা দিতে হয়। এক বিষয়ে কাঁহাতক আর বলা যায়? সেজন্য আমি ভাবছি, আজ একটা গল্প দিয়ে শুরু করব। গল্পটা খুবই সাধারণ। অনেকের জানাও থাকতে পারে।
এক ভদ্রলোক হেঁটে যাচ্ছেন, একটা খালের ধার ধরে। খালটা হাত তিরিশেক চওড়া। খালের ওপার দিয়ে আরেকজন হেঁটে যাচ্ছে। তার হাতে একটা বাঁশ। বাঁশের দৈর্ঘ্য হাত দশেক। লোকটা সেই বাঁশটা ডানে-বাঁয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাঁটছে।
তাকে এভাবে লাঠি ঘোরাতে দেখে এ পাড়ের লোকটা বলে উঠল, এই যে ভাই, বাঁশটা একটু আস্তে ঘুরাইয়েন, আমার গায়ে লাগতে পারে। ওদিকের লোকটা তো শুনে রেগে কাঁই। সে খেঁকিয়ে উঠল, বলল, আমার বাঁশ লম্বা ১০ হাত আর খাল চওড়া ৩০ হাত, কী করে এটা খাল পার হয়ে আপনার গায়ে লাগবে? বুজরুকির আর জায়গা পান না। যত্তসব! ধমক শুনে এপাশের লোকটা একগাল হেসে বলে উঠল, না, এই একটু গপসপ করি আর কী!
বাঙালির আছে শুধু এই গপসপ। গ্রামের হাট থেকে একটা ইলিশ কিনে রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরুন। দেখবেন সে ইলিশ আর ইলিশ নেই। অন্তত পঞ্চাশজন হাত দিয়েছে ওর গায়ে। বেচারার গায়ে প্রত্যেকে একটা করে চাপ দিয়ে জিগ্যেস করছে, কত দিয়ে কিনলেন ভাই? ওটা কেনার যত সাধ তার মনে ছিল আর কিনতে না পারার যত দুঃখ ছিল, সব একখানে করে ঐ চাপটা দিয়ে বলেছে নানা কথা: ‘বেশ জিতেছেন তো! মাছওয়ালাকে একেবারে বসিয়ে দিয়েছেন।’ কেউ আবার বলছে হয়ত কিছুটা অন্য কথা।
এভাবে এক দুই করে অন্তত ৫০ জনের আদর সোহাগ নিয়ে যখন মাছটা বাড়ি পৌছাবে তখন দেখবেন, ও আর যা-ই থাকুক মাছ নেই। থাকলেও খাওয়ার যোগ্য নেই।
যা-হোক, যত গপসপই করি না কেন, আমরা যে বয়সে এসে পৌঁছেছি সে বয়সে এলে জন্মদিন আর জীবনের পক্ষে থাকে না, মৃত্যুর দলে চলে যায়। জন্মদিন এলেই মাথা ফুঁড়ে মৃত্যুর ভাবনা উঠে দাঁড়ায়। এমনিতেও মৃত্যুচিন্তার মতো বিরক্তিকর ইভটিজার আর নেই। সে শিশু থেকে শুরু করে কিশোর যুবক বৃদ্ধ প্রৌঢ় সবাইকে টিজ করে, এমনকি মৃত্যুপথযাত্রীকেও। যেদিন জীবন সম্বন্ধে আমি প্রথম সজাগ হয়েছি, সেদিন থেকেই মৃত্যু উদ্যত বল্লম হাতে আমার পাশে পাশে হাঁটছে। কখন সে আমাকে গেঁথে ফেলবে কেউ তা জানে না।
তাই শুধু আমি নই, সবাই আক্রান্ত। বিশেষ করে আমার বয়সীরা। আমরা যখন আয়নায় তাকাই, হাসন রাজার মতো আমাদেরও মনে হয়: আয়না দিয়া চাইয়া দেখি পাকনা চুল আমার। জল্লাদ খুনি বা পাষণ্ড পৃথিবীতে এমন কে আছে যে মৃত্যুর দুঃখে ব্যথিত হয় নি? কেউ নেই। দেখুন জীবন মৃত্যু নিয়ে কী আক্ষেপ মাইকেলের! ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে, চিরস্থির কবে নীর, হায়রে, জীবন-নদে।’
আর রবীন্দ্রনাথের কবিতা তো প্রায় মৃত্যুর স্তোত্রগানই। বসন্ত নিয়ে তাঁর কবিতা যত, মৃত্যুর কবিতা তিনি লিখেছেন তার চাইতেও বেশি। যেন জীবনের দেনা শোধ করেছেন দুজনকেই। আমি সবসময় ভেবেছি, বাংলা সাহিত্যে বসন্তের কবিতা যদি কারো লেখার কথা থাকে তিনি হবেন নজরুল। এমন যৌবনদীপ্ত, রক্তিম আর বেপরোয়া যেন বসন্তের উড্ডীন পতাকা। বসন্ত থাকলে থাকবে তাঁর কবিতাতে। কিন্তু আশ্চর্য, বসন্তের ব্যাপারে নজরুল আশ্চর্যরকমভাবে নির্বিকার। এ আছে রবীন্দ্রনাথের কবিতায়। তাঁর বিখ্যাত বসন্তের গান: আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে ...। বসন্ত আমার দরজায় জেগে বসে আছে। তো, সেই রবীন্দ্রনাথই আবার আরেক বিস্ময়: যে কবির বসন্ত নিয়ে এমন উজ্জীবন, তাঁরই মৃত্যুর কবিতার সংখ্যা কিন্তু বসন্তের কবিতার চাইতেও বেশি। প্রতি পদে তাঁর মৃত্যুর কথা! তাঁর কবিতা যেন মৃত্যুরই জয়গান।
রবীন্দ্রনাথ শেষ জীবনে একবার লিখেছিলেন আমার মাথার ওপরে এমন নীল একটা আকাশ, কী বিশাল সবুজ একটা মাঠ আমার পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে। কী করে এসব ছেড়ে পৃথিবী ছেড়ে আমি যাই...। এরকম মৃত্যুবেদনার দ্বারা তিনি একেবারে আমুণ্ডুপদনখ আচ্ছন্ন ছিলেন আজীবন। ছিলেন, কেননা এই মৃত্যুবেদনা আসলে জীবন-প্রেমেরই অন্য নাম। হয়ত এজন্যই লিখতে পেরেছিলেন:
শ্যামলা বিপুলা এ ধরার পানে
চেয়ে দেখি আমি মুগ্ধ নয়ানে
সমস্ত প্রাণে কেন যে কে জানে
ভরে আসে আঁখিজল—
বহু মানবের প্রেম দিয়ে ঢাকা,
বহু দিবসের সুখে দুখে আঁকা,
লক্ষ যুগের সংগীতে মাখা সুন্দর ধরাতল।
পৃথিবী নামে তাঁর খুব বিখ্যাত কবিতার শেষ স্তবকে আছে:
হে উদাসীন পৃথিবী
আমাকে সম্পূর্ণ ভোলবার আগে
তোমার নির্মম পদপ্রান্তে
আজ রেখে যাই আমার প্রণতি।
তুমি সবাইকে ভুলছ পৃথিবী, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কিছুকেও। আমাকেও একদিন ভুলে যাবে। আমাকে সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়ার আগে তোমার নিষ্ঠুর পায়ে আমার প্রণতি জানিয়ে গেলাম। মানুষের মধ্যে মৃত্যুর দুঃখ আর জীবন-বাসনা এতই ওতপ্রোত। আর জীবনানন্দ দাশ তো মৃত্যু আর বেদনার মধ্যেই পুরোটা কাল কাটিয়ে দিলেন।
আমরা মৃত্যুর আগে কি বুঝিতে চাই আর? জানি না কি আহা,
সব রাঙা কামনার শিয়রে যে দেয়ালের মতো এসে জাগে
ধূসর মৃত্যুর মুখ-
কিন্তু আমার মনে হয় এভাবে আমাদের ভাবা উচিত না। এ দৃষ্টি তো ইতিবাচক নয়। পৃথিবীর এই যে নদী, এই যে গাছ, এই বাগান, এই আকাশ, এই জীবজন্তু, এই যে সৌরজগৎ, গ্রহ-নক্ষত্র, বিশ্ব-মহাবিশ্ব যা-কিছু এ-যাবৎ জন্মেছে, যা-কিছু পৃথিবীতে আছে, সবই তো ধ্বংস হয়েছে, হবে। সুতরাং আমাদের কি মৃত্যুর দ্বারা ব্যক্তিগতভাবে ব্যথিত হওয়া উচিত? এটা কি আমার ব্যক্তিগত বিষয়? তা তো না। এ তো সর্বজনীন ও সামগ্রিক বিষয়। গোটা মহাবিশ্বের বিষয়। কোটি কোটি মানুষের জীবনে এ ঘটেছে। সুতরাং সেখানে সবার মতো আমাদেরও তো মৃত্যুর এই বিপুল উৎসবে ঝাঁপ দিয়ে বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়। আমাদের তো সেই আনন্দযাপনই কাম্য।
তবে এর পরেও একটা কথা থাকে। তা হচ্ছে আমরা সবাই একদিন হারিয়ে যাব এখান থেকে। আমাদের সামান্যতম চিহ্নও থাকবে না একদিন। সব সত্যি। কিন্তু আমরা যে একদিন পৃথিবীতে জন্মেছিলাম, এখানে বেঁচে ছিলাম, এরকম অবিশ্বাস্য আর অলোকসামান্য একটা পৃথিবীতে জীবন কাটিয়েছিলাম, থৈ থৈ আনন্দের এক সমুদ্রের মধ্যে যে পদ্মের মতো দোল খেয়েছিলাম, সেটা কি কিছুই না? মৃত্যুই শুধু সত্য?
একথা মনে হয় বলেই দুটো ব্যাপারই আমার মধ্যে হয়। আমার মৃত্যুবেদনাও হয়। আবার মৃত্যুকে ঝেটিয়ে তাড়ানোর একটা অদম্য ইচ্ছাও মনকে দখল করে। সেজন্য কখনও কখনও গলায় একটু দুঃখের সুর বেজে ওঠে। এটা আসলে দুঃখ নয়। এটা সেই ঘুষির মতো, হাতটা একবার পেছনে টেনে এনে শক্তি সঞ্চয় করে মুষ্ঠির জোর বাড়িয়ে সামনে ছুড়ে দেয়া।
মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্যে একটা খুব সুন্দর কথা আছে। রাবণের বীর সন্তান বীরবাহু যুদ্ধে নিহত হয়েছে। একজন ভগ্নদূত এসে খবরটা তাঁকে দিয়েছে। তিনি কাঁদছেন। তাঁর ঝরঝর ঝরে অবিরল অশ্রুধারা। রাবণ ধৈর্যশীল মানুষ, পরাক্রান্ত রাজা, তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল তাঁর মন্ত্রী-সারণ। সে ব্যাপারটা ধরিয়ে দিল, বলল, রাজা আপনি মহান, এই বিশাল রাজ্যের ধারক। পুত্রশোকে অশ্রুবিসর্জন কি আপনার সাজে? বজ্রাঘাতে যদি পর্বতের শৃঙ্গ উড়েও যায়, তাতে কি পৃথিবী অস্থির হয়? পর্বতের শৃঙ্গরূপ আপনার বীরপুত্র নিহত। কিন্তু তাতে আপনার কি বিচলিত হওয়া সাজে! শুনে রাবণ বললেন, সবই বুঝি। যা কহিলে সত্য হে সারণ, তবু জেনেশুনে প্রাণ কাঁদে অবোধ। সব অর্থহীন জানি, কিন্তু জেনেশুনেও মন যে কাঁদে, সেজন্যই তো আমরা মানুষ। হয়ত আমার গলায় বেদনার সুর ঐ কারণেই। আমি মানুষ বলেই।
একটা ছোট্ট গল্প বলি। গল্পটা এক রোমান কাহিনীকাব্যের। কবি ওভিদের লেখা। গল্পটা এরকম: এক মেয়ে ছিল, অপূর্ব সুন্দরী। নাম সিবিল্লা। অনুপম সুন্দরী সে। তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গ্রীক দেবতা অ্যাপোলো তার কাছে প্রেম নিবেদন করলেন। সিবিল্লা বলল, তোমার প্রেম আমি গ্রহণ করতে পারি কিন্তু এক শর্তে। আমাকে একটা বর দিতে হবে। বরটা হল, এই যে সামনে বালুর বিশাল ঢিবিটা আছে, এই ঢিবিতে যত বালু আছে, আমি যেন তত বছর বাঁচি। এখন কী করেন বেচারা অ্যাপোলো? প্রেমে পড়েছেন যে! কথায় আছে-কিনতে পাগল বেঁচতে ছাগল। তেমনি প্রেমে পাগল অ্যাপোলো বললেন, ঠিক আছে এ বরই তোমাকে দিলাম। বর পেয়েই সিবিল্লার মনে হল, সে একটা বিরাট ভুল করে ফেলেছে।
চির জীবনের বর সে চেয়েছে কিন্তু চির যৌবনের বর তো চায় নি। কাজেই সে মরল না। আগের মতোই তার বয়স বাড়তে লাগল। সে যুবতী থেকে একসময় প্রৌঢ়া হল। প্রৌঢ়া থেকে বৃদ্ধা। দেখতে দেখতে একশ বছর পার হল। একসময় দেড়শ বছর, দুইশ বছর পার হল। সে একটা কদর্য কাদার পিণ্ডে পরিণত হল। তখনও সেই কদাকার পিণ্ড থেকে মানুষ সিবিল্লার জীর্ণ কণ্ঠে তার যৌবনদিনের অহংকারী কণ্ঠ শুনতে পেত। তারা শুনত সে বলছে একদিন আমি এমন সুন্দরী ছিলাম যে, অ্যাপোলো আমার কাছে প্রেম নিবেদন করেছিলেন।

সুতরাং যৌবন ভালো। কিন্তু জীবন যেন ওই বালুর ঢিবির সমান না হয়। যেন হাজার বছর আমরা না বাঁচি। জীবন ততদিনই জীবন যতদিন তাতে যৌবন আছে। তারপরে জীবনের কী অর্থ?
আজকেই কার কাছে যেন শুনলাম এক লেখক রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন বেঁচে ছিলেন।’ শুনে অবাক হলাম, এ আবার কী কথা? মানুষ তো সারা জীবনই বাঁচে, এর চেয়ে কম বাঁচে নাকি? আসলে বক্তব্যটার সারকথা হল, তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন পুরোপুরিই বেঁচে ছিলেন। অর্থাৎ যৌবনদীপ্ত আর কর্মমুখর ছিলেন। আমরা সাধারণত মৃত্যুর বহু আগেই মারা যাই। রবীন্দ্রনাথ সেভাবে মারা যান নি। রবীন্দ্রনাথকে কিন্তু অল্প বয়সের ছবির চাইতে বেশি বয়সের ছবিতে সুন্দর লাগে। তার কারণও এটি। তাঁর বয়স বেড়েছে কিন্তু যৌবন তাঁর মধ্যে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। যৌবন আর বার্ধক্য যদি একসঙ্গে হয়, তার চাইতে শক্তিশালী জিনিস পৃথিবীতে খুব কমই আছে।
আর একটা কথা বলি। সুকুমার রায় মাত্র ৩৬ বছরে মারা গিয়েছিলেন। এই রকম প্রতিভাবান মানুষের মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যাওয়া সত্যি দুঃখের! কিন্তু আশ্চর্য, সুকুমার রায়ের কবিতায় আমি কোথাও বেদনার কথা পাই নি। হয়ত তাঁর কবিতার হাসির হুল্লোড়ের মধ্যে মৃত্যুর জায়গা হয় নি। একইভাবে পাই নি নজরুলের কবিতায়। থাকতে পারে, হয়ত আমার চোখে পড়ে নি। কিন্তু একটা জায়গায় সুকুমার রায় মৃত্যুর কথা বলেছেন। তাঁর একেবারে শেষের দিকের একটা কবিতায়। তাঁর মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে। উনি লিখছেন, আদিম রাতের চন্দ্রালোকিত শীতলতা আমাকে ধীরে ধীরে অধিকার করছে। দেখলাম জীবনটা হল একটা তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম ছাড়া কিছু নয়। তারপর বলছেন, ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর, গানের পালা সাঙ্গ মোর। জীবনটা কি তাহলে তাঁর কাছে? তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম। এখানেও কিন্তু ব্যঙ্গ করতে তিনি ছাড়ছেন না।
আমি কিন্তু একথার সঙ্গে একমত নই। জীবনে ‘জীবন’ একদিন থাকে না বলে একে আমি ঘোড়ার ডিম বলব? কিন্তু মৃত্যু আছে বলেই না জীবনকে আমরা এইভাবে ভালোবাসি। মৃত্যু আছে বলেই না আমরা কবিতা লিখি। গান গাই। ছবি আঁকি। তাজমহল তৈরি করি। মৃত্যু যদি না থাকত অর্থাৎ ঐ ঘোড়ার ডিমটা যদি না থাকত, তাহলে আমরা তো অন্য যে-কোনো জীবের মতো আরেকটা জীব হয়ে যেতাম। তাই আমি মনে করি, জীবনকে সত্যিকার অর্থ দেওয়ার জন্য ‘জীবন’ যে-রকম দরকার, ‘মৃত্যু’ও সে-রকমই দরকার।
সবশেষে একটা ছোট্ট গল্প বলে শেষ করব। জাপানে এক রকমের সুস্বাদু খাবার আছে। নাম সুশি। তাতে প্রথমে কিছু মাছের বাচ্চা কাঁচা অবস্থায় ফালি ফালি করে কাটা হয়। তারপরে একটা সস্ দিয়ে সেগুলো খাওয়া হয়। এটা একটা পৃথিবী বিখ্যাত খাবার। কিন্তু যেসব মাছ দিয়ে সুশি তৈরি হয়, সে মাছ সমুদ্র থেকে ধরে পাত্রে করে নিয়ে আসতে যে সময় লাগে, তার মধ্যে ওই মাছের বাচ্চাগুলোর একটা বড় অংশ মরে যায়। আর মরে গেলে সুশির স্বাদও যায় কমে। এখন এদের বাঁচিয়ে রাখার উপায় কী?
এই নিয়ে শুরু হল গবেষণা। বিস্তর চিন্তাভাবনার পর একটা বুদ্ধি বের হল: যেসব পানিভর্তি বিশাল বিশাল পাত্রে করে ঐ মাছের বাচ্চাগুলোকে আনা হচ্ছে, ওগুলোতে কিছু কিছু হাঙরের বাচ্চা ছেড়ে দাও। এতে দেখা গেল, হাঙরের বাচ্চাগুলো ওদের খাওয়ার জন্য সারা পাত্রজুড়ে যেমন দৌড়াচ্ছে, তেমনি সুশি মাছগুলোও নিজেদের বাঁচানোর জন্য প্রাণভয়ে দৌড়ে চলেছে। দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় ভুলেই যাচ্ছে যে, ওদের আসলে মারা যাওয়ার কথা ছিল!
আমার জীবনের ভেতরে আমিও ওরকম এক দঙ্গল হাঙরের বাচ্চা ছেড়ে দিয়েছি। সেই হাঙরের বাচ্চাগুলোর নাম হল কাজ। আমি কাজ বাড়িয়ে দিয়েছি। এমনভাবে বাড়িয়েছি যাতে ও ছাড়া অন্য কোনো চিন্তা আমাকে দখল করতে না পারে।
আমি সবসময় ছাত্রদের একটা কথা বলি-লেখাপড়া করে যেই, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সেই। বলি, কথাটা সবাই জানে। কিন্তু ভালো ছাত্রেরা জানে কবে? বছরের প্রথম দিনটিতেই। তাই সারা বছর প্রাণপণে পড়াশোনা করে পরীক্ষায় ভালো ফল হাতিয়ে নেয়। খারাপ ছাত্রেরাও কথাটা জানে। কবে? যেদিন পরীক্ষাটা শেষ হয় সেদিন। তাই সেদিন কপাল চাপড়ে বলতে থাকে, প্রথমদিন যদি বুঝতাম তবে পরীক্ষার ফল হয়ত এভাবে খারাপ হত না।
তাই সময় থাকতে থাকতে সবাইকে বলি, দেরি করো না। জীবনের মধ্যে ওই হাঙরের বাচ্চাগুলোকে ছেড়ে দাও। শত শত কাজ তোমাকে অনুক্ষণ তাড়া করুক। দেখবে মৃত্যুর কথা ভুলে গেছ। দেখবে তুমি দাঁড়িয়ে আছ যৌবনে, শক্তিতে, রক্তিম প্রাচুর্যের ভেতর। অর্থাৎ ইতিবাচকতায়। ঐশ্বর্যের জগতে।
কী, খুশি তো? না, আমি অন্যদের জিগ্যেস করছি না। ওই যে যারা বসে আছেন, ওদের জিগ্যেস করছি। ইতিবাচকতা বলাতে খুশি তো? খুশি? বেশ!
ধন্যবাদ।
(আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ৭৭তম জন্মবার্ষিকীতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত একটি অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তব্য, ২৫ জুলাই ২০১৬। বক্তব্যটি ‘ভাঙো দুর্দশার চক্র’ বই থেকে নেওয়া হয়েছে।)

মানুষ যুদ্ধে যায় একসঙ্গে কিন্তু পালায় একা একা। যারা যুদ্ধে যাচ্ছে তাদের অবস্থা আর যারা ফিরে আসছে তাদের অবস্থা এক নয়। যেমন, তরুণদের জন্মদিন আর আমাদের জন্মদিন। ওদের জন্মদিন মানে বয়স বাড়া, আমাদের জন্মদিন মানে বয়স কমা। তবু জীবনে অনেক পথ হাঁটতে গিয়ে বুঝেছি, সব বয়সের মধ্যেই জীবনের সব বয়স আছে। যৌবনের মধ্যে যেমন রয়েছে বার্ধক্য, বার্ধক্যের মধ্যে তেমনি রয়েছে যৌবন। জীবনের পড়ন্ত বেলায় আমরা এখন জীবন নিয়ে যেমন ভাবি, মৃত্যু নিয়েও তেমনি।
অনেক আগে একটা উর্দু শের পড়েছিলাম। তার মর্মার্থ ছিল, ‘সেটা কী বার্ধক্য যার মধ্যে যৌবন নেই, আর সেটা কী যৌবন যার মধ্যে বার্ধক্য নেই?’ মানুষ আসলে এ দুইয়ের সংমিশ্রণ। মানুষ শুধু আশাবাদীও যেমন নয়, তেমনি পুরো নৈরাশ্যবাদীও নয়। অনেকসময় নৈরাশ্যও আশার জন্ম দেয়। আমাদের বড় বড় দুঃখ-বেদনাগুলো অনেকসময় বড় বড় উদ্যমে স্বপ্নে আমাদের উদ্বুদ্ধ করে। সেদিক থেকে জীবনে নৈরাশ্য বলে কিছু নেই। আশা নৈরাশ্য দুটোই দুভাবে আমাদের জীবনকে আশার স্বপ্নে জাগিয়ে তোলে।
মানুষ সাধারণত সামনের দিকেই যায়। কিন্তু সবসময় যায় না। মাঝেমধ্যে তাকে পেছন দিকেও যেতে হয়। এ তাকে যেতে হয় সামনে যাওয়াকে আরও শক্তিশালী করতে। আমরা যখন ঘুষি দিই, তখন হাত দিয়ে কি সোজা সামনের মানুষকে আঘাত করি? করি না, কেননা তাতে ঘুষিতে জোর হয় না। আমরা হাতটা প্রথমে কিছুটা পেছন দিকে নিয়ে আসি, তারপর সামনের দিকে সজোরে ছুড়ে দিই। তখনই তা ঘায়েল করার শক্তি অর্জন করে। সুতরাং জীবন পরস্পরবিরোধী, রহস্যময়। নৈরাশ্যকে আশা বানিয়ে, ব্যর্থতাকে শক্তিতে পরিণত করে আমাদের সামনে তা কেবলই এক উচ্চতর জীবনের দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
আমার জন্মদিনের ছোট অনুষ্ঠানটা আয়োজিত হয়ে চলছে বহু বছর ধরে। অন্তত বছর পঁচিশেক তো হবেই। কে বা কারা এ শুরু করেছিল ঠিক মনে নেই। সেই যে শুরু, তারপর আর থামে নি। বছরের পর বছর ধরে আমাকে বৃদ্ধ থেকে অধিকতর বৃদ্ধে পরিণত করে এ এগিয়ে চলেছে। আমার করুণ অবস্থা দেখে মায়া করেও এ থামে না। এ কারণে প্রত্যেক বছর ঐ একই বিষয়ের ওপর আমাকেও একটি করে বক্তৃতা দিতে হয়। এক বিষয়ে কাঁহাতক আর বলা যায়? সেজন্য আমি ভাবছি, আজ একটা গল্প দিয়ে শুরু করব। গল্পটা খুবই সাধারণ। অনেকের জানাও থাকতে পারে।
এক ভদ্রলোক হেঁটে যাচ্ছেন, একটা খালের ধার ধরে। খালটা হাত তিরিশেক চওড়া। খালের ওপার দিয়ে আরেকজন হেঁটে যাচ্ছে। তার হাতে একটা বাঁশ। বাঁশের দৈর্ঘ্য হাত দশেক। লোকটা সেই বাঁশটা ডানে-বাঁয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাঁটছে।
তাকে এভাবে লাঠি ঘোরাতে দেখে এ পাড়ের লোকটা বলে উঠল, এই যে ভাই, বাঁশটা একটু আস্তে ঘুরাইয়েন, আমার গায়ে লাগতে পারে। ওদিকের লোকটা তো শুনে রেগে কাঁই। সে খেঁকিয়ে উঠল, বলল, আমার বাঁশ লম্বা ১০ হাত আর খাল চওড়া ৩০ হাত, কী করে এটা খাল পার হয়ে আপনার গায়ে লাগবে? বুজরুকির আর জায়গা পান না। যত্তসব! ধমক শুনে এপাশের লোকটা একগাল হেসে বলে উঠল, না, এই একটু গপসপ করি আর কী!
বাঙালির আছে শুধু এই গপসপ। গ্রামের হাট থেকে একটা ইলিশ কিনে রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরুন। দেখবেন সে ইলিশ আর ইলিশ নেই। অন্তত পঞ্চাশজন হাত দিয়েছে ওর গায়ে। বেচারার গায়ে প্রত্যেকে একটা করে চাপ দিয়ে জিগ্যেস করছে, কত দিয়ে কিনলেন ভাই? ওটা কেনার যত সাধ তার মনে ছিল আর কিনতে না পারার যত দুঃখ ছিল, সব একখানে করে ঐ চাপটা দিয়ে বলেছে নানা কথা: ‘বেশ জিতেছেন তো! মাছওয়ালাকে একেবারে বসিয়ে দিয়েছেন।’ কেউ আবার বলছে হয়ত কিছুটা অন্য কথা।
এভাবে এক দুই করে অন্তত ৫০ জনের আদর সোহাগ নিয়ে যখন মাছটা বাড়ি পৌছাবে তখন দেখবেন, ও আর যা-ই থাকুক মাছ নেই। থাকলেও খাওয়ার যোগ্য নেই।
যা-হোক, যত গপসপই করি না কেন, আমরা যে বয়সে এসে পৌঁছেছি সে বয়সে এলে জন্মদিন আর জীবনের পক্ষে থাকে না, মৃত্যুর দলে চলে যায়। জন্মদিন এলেই মাথা ফুঁড়ে মৃত্যুর ভাবনা উঠে দাঁড়ায়। এমনিতেও মৃত্যুচিন্তার মতো বিরক্তিকর ইভটিজার আর নেই। সে শিশু থেকে শুরু করে কিশোর যুবক বৃদ্ধ প্রৌঢ় সবাইকে টিজ করে, এমনকি মৃত্যুপথযাত্রীকেও। যেদিন জীবন সম্বন্ধে আমি প্রথম সজাগ হয়েছি, সেদিন থেকেই মৃত্যু উদ্যত বল্লম হাতে আমার পাশে পাশে হাঁটছে। কখন সে আমাকে গেঁথে ফেলবে কেউ তা জানে না।
তাই শুধু আমি নই, সবাই আক্রান্ত। বিশেষ করে আমার বয়সীরা। আমরা যখন আয়নায় তাকাই, হাসন রাজার মতো আমাদেরও মনে হয়: আয়না দিয়া চাইয়া দেখি পাকনা চুল আমার। জল্লাদ খুনি বা পাষণ্ড পৃথিবীতে এমন কে আছে যে মৃত্যুর দুঃখে ব্যথিত হয় নি? কেউ নেই। দেখুন জীবন মৃত্যু নিয়ে কী আক্ষেপ মাইকেলের! ‘জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে, চিরস্থির কবে নীর, হায়রে, জীবন-নদে।’
আর রবীন্দ্রনাথের কবিতা তো প্রায় মৃত্যুর স্তোত্রগানই। বসন্ত নিয়ে তাঁর কবিতা যত, মৃত্যুর কবিতা তিনি লিখেছেন তার চাইতেও বেশি। যেন জীবনের দেনা শোধ করেছেন দুজনকেই। আমি সবসময় ভেবেছি, বাংলা সাহিত্যে বসন্তের কবিতা যদি কারো লেখার কথা থাকে তিনি হবেন নজরুল। এমন যৌবনদীপ্ত, রক্তিম আর বেপরোয়া যেন বসন্তের উড্ডীন পতাকা। বসন্ত থাকলে থাকবে তাঁর কবিতাতে। কিন্তু আশ্চর্য, বসন্তের ব্যাপারে নজরুল আশ্চর্যরকমভাবে নির্বিকার। এ আছে রবীন্দ্রনাথের কবিতায়। তাঁর বিখ্যাত বসন্তের গান: আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে ...। বসন্ত আমার দরজায় জেগে বসে আছে। তো, সেই রবীন্দ্রনাথই আবার আরেক বিস্ময়: যে কবির বসন্ত নিয়ে এমন উজ্জীবন, তাঁরই মৃত্যুর কবিতার সংখ্যা কিন্তু বসন্তের কবিতার চাইতেও বেশি। প্রতি পদে তাঁর মৃত্যুর কথা! তাঁর কবিতা যেন মৃত্যুরই জয়গান।
রবীন্দ্রনাথ শেষ জীবনে একবার লিখেছিলেন আমার মাথার ওপরে এমন নীল একটা আকাশ, কী বিশাল সবুজ একটা মাঠ আমার পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে। কী করে এসব ছেড়ে পৃথিবী ছেড়ে আমি যাই...। এরকম মৃত্যুবেদনার দ্বারা তিনি একেবারে আমুণ্ডুপদনখ আচ্ছন্ন ছিলেন আজীবন। ছিলেন, কেননা এই মৃত্যুবেদনা আসলে জীবন-প্রেমেরই অন্য নাম। হয়ত এজন্যই লিখতে পেরেছিলেন:
শ্যামলা বিপুলা এ ধরার পানে
চেয়ে দেখি আমি মুগ্ধ নয়ানে
সমস্ত প্রাণে কেন যে কে জানে
ভরে আসে আঁখিজল—
বহু মানবের প্রেম দিয়ে ঢাকা,
বহু দিবসের সুখে দুখে আঁকা,
লক্ষ যুগের সংগীতে মাখা সুন্দর ধরাতল।
পৃথিবী নামে তাঁর খুব বিখ্যাত কবিতার শেষ স্তবকে আছে:
হে উদাসীন পৃথিবী
আমাকে সম্পূর্ণ ভোলবার আগে
তোমার নির্মম পদপ্রান্তে
আজ রেখে যাই আমার প্রণতি।
তুমি সবাইকে ভুলছ পৃথিবী, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কিছুকেও। আমাকেও একদিন ভুলে যাবে। আমাকে সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়ার আগে তোমার নিষ্ঠুর পায়ে আমার প্রণতি জানিয়ে গেলাম। মানুষের মধ্যে মৃত্যুর দুঃখ আর জীবন-বাসনা এতই ওতপ্রোত। আর জীবনানন্দ দাশ তো মৃত্যু আর বেদনার মধ্যেই পুরোটা কাল কাটিয়ে দিলেন।
আমরা মৃত্যুর আগে কি বুঝিতে চাই আর? জানি না কি আহা,
সব রাঙা কামনার শিয়রে যে দেয়ালের মতো এসে জাগে
ধূসর মৃত্যুর মুখ-
কিন্তু আমার মনে হয় এভাবে আমাদের ভাবা উচিত না। এ দৃষ্টি তো ইতিবাচক নয়। পৃথিবীর এই যে নদী, এই যে গাছ, এই বাগান, এই আকাশ, এই জীবজন্তু, এই যে সৌরজগৎ, গ্রহ-নক্ষত্র, বিশ্ব-মহাবিশ্ব যা-কিছু এ-যাবৎ জন্মেছে, যা-কিছু পৃথিবীতে আছে, সবই তো ধ্বংস হয়েছে, হবে। সুতরাং আমাদের কি মৃত্যুর দ্বারা ব্যক্তিগতভাবে ব্যথিত হওয়া উচিত? এটা কি আমার ব্যক্তিগত বিষয়? তা তো না। এ তো সর্বজনীন ও সামগ্রিক বিষয়। গোটা মহাবিশ্বের বিষয়। কোটি কোটি মানুষের জীবনে এ ঘটেছে। সুতরাং সেখানে সবার মতো আমাদেরও তো মৃত্যুর এই বিপুল উৎসবে ঝাঁপ দিয়ে বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়। আমাদের তো সেই আনন্দযাপনই কাম্য।
তবে এর পরেও একটা কথা থাকে। তা হচ্ছে আমরা সবাই একদিন হারিয়ে যাব এখান থেকে। আমাদের সামান্যতম চিহ্নও থাকবে না একদিন। সব সত্যি। কিন্তু আমরা যে একদিন পৃথিবীতে জন্মেছিলাম, এখানে বেঁচে ছিলাম, এরকম অবিশ্বাস্য আর অলোকসামান্য একটা পৃথিবীতে জীবন কাটিয়েছিলাম, থৈ থৈ আনন্দের এক সমুদ্রের মধ্যে যে পদ্মের মতো দোল খেয়েছিলাম, সেটা কি কিছুই না? মৃত্যুই শুধু সত্য?
একথা মনে হয় বলেই দুটো ব্যাপারই আমার মধ্যে হয়। আমার মৃত্যুবেদনাও হয়। আবার মৃত্যুকে ঝেটিয়ে তাড়ানোর একটা অদম্য ইচ্ছাও মনকে দখল করে। সেজন্য কখনও কখনও গলায় একটু দুঃখের সুর বেজে ওঠে। এটা আসলে দুঃখ নয়। এটা সেই ঘুষির মতো, হাতটা একবার পেছনে টেনে এনে শক্তি সঞ্চয় করে মুষ্ঠির জোর বাড়িয়ে সামনে ছুড়ে দেয়া।
মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্যে একটা খুব সুন্দর কথা আছে। রাবণের বীর সন্তান বীরবাহু যুদ্ধে নিহত হয়েছে। একজন ভগ্নদূত এসে খবরটা তাঁকে দিয়েছে। তিনি কাঁদছেন। তাঁর ঝরঝর ঝরে অবিরল অশ্রুধারা। রাবণ ধৈর্যশীল মানুষ, পরাক্রান্ত রাজা, তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিল তাঁর মন্ত্রী-সারণ। সে ব্যাপারটা ধরিয়ে দিল, বলল, রাজা আপনি মহান, এই বিশাল রাজ্যের ধারক। পুত্রশোকে অশ্রুবিসর্জন কি আপনার সাজে? বজ্রাঘাতে যদি পর্বতের শৃঙ্গ উড়েও যায়, তাতে কি পৃথিবী অস্থির হয়? পর্বতের শৃঙ্গরূপ আপনার বীরপুত্র নিহত। কিন্তু তাতে আপনার কি বিচলিত হওয়া সাজে! শুনে রাবণ বললেন, সবই বুঝি। যা কহিলে সত্য হে সারণ, তবু জেনেশুনে প্রাণ কাঁদে অবোধ। সব অর্থহীন জানি, কিন্তু জেনেশুনেও মন যে কাঁদে, সেজন্যই তো আমরা মানুষ। হয়ত আমার গলায় বেদনার সুর ঐ কারণেই। আমি মানুষ বলেই।
একটা ছোট্ট গল্প বলি। গল্পটা এক রোমান কাহিনীকাব্যের। কবি ওভিদের লেখা। গল্পটা এরকম: এক মেয়ে ছিল, অপূর্ব সুন্দরী। নাম সিবিল্লা। অনুপম সুন্দরী সে। তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গ্রীক দেবতা অ্যাপোলো তার কাছে প্রেম নিবেদন করলেন। সিবিল্লা বলল, তোমার প্রেম আমি গ্রহণ করতে পারি কিন্তু এক শর্তে। আমাকে একটা বর দিতে হবে। বরটা হল, এই যে সামনে বালুর বিশাল ঢিবিটা আছে, এই ঢিবিতে যত বালু আছে, আমি যেন তত বছর বাঁচি। এখন কী করেন বেচারা অ্যাপোলো? প্রেমে পড়েছেন যে! কথায় আছে-কিনতে পাগল বেঁচতে ছাগল। তেমনি প্রেমে পাগল অ্যাপোলো বললেন, ঠিক আছে এ বরই তোমাকে দিলাম। বর পেয়েই সিবিল্লার মনে হল, সে একটা বিরাট ভুল করে ফেলেছে।
চির জীবনের বর সে চেয়েছে কিন্তু চির যৌবনের বর তো চায় নি। কাজেই সে মরল না। আগের মতোই তার বয়স বাড়তে লাগল। সে যুবতী থেকে একসময় প্রৌঢ়া হল। প্রৌঢ়া থেকে বৃদ্ধা। দেখতে দেখতে একশ বছর পার হল। একসময় দেড়শ বছর, দুইশ বছর পার হল। সে একটা কদর্য কাদার পিণ্ডে পরিণত হল। তখনও সেই কদাকার পিণ্ড থেকে মানুষ সিবিল্লার জীর্ণ কণ্ঠে তার যৌবনদিনের অহংকারী কণ্ঠ শুনতে পেত। তারা শুনত সে বলছে একদিন আমি এমন সুন্দরী ছিলাম যে, অ্যাপোলো আমার কাছে প্রেম নিবেদন করেছিলেন।

সুতরাং যৌবন ভালো। কিন্তু জীবন যেন ওই বালুর ঢিবির সমান না হয়। যেন হাজার বছর আমরা না বাঁচি। জীবন ততদিনই জীবন যতদিন তাতে যৌবন আছে। তারপরে জীবনের কী অর্থ?
আজকেই কার কাছে যেন শুনলাম এক লেখক রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন বেঁচে ছিলেন।’ শুনে অবাক হলাম, এ আবার কী কথা? মানুষ তো সারা জীবনই বাঁচে, এর চেয়ে কম বাঁচে নাকি? আসলে বক্তব্যটার সারকথা হল, তিনি যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন পুরোপুরিই বেঁচে ছিলেন। অর্থাৎ যৌবনদীপ্ত আর কর্মমুখর ছিলেন। আমরা সাধারণত মৃত্যুর বহু আগেই মারা যাই। রবীন্দ্রনাথ সেভাবে মারা যান নি। রবীন্দ্রনাথকে কিন্তু অল্প বয়সের ছবির চাইতে বেশি বয়সের ছবিতে সুন্দর লাগে। তার কারণও এটি। তাঁর বয়স বেড়েছে কিন্তু যৌবন তাঁর মধ্যে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। যৌবন আর বার্ধক্য যদি একসঙ্গে হয়, তার চাইতে শক্তিশালী জিনিস পৃথিবীতে খুব কমই আছে।
আর একটা কথা বলি। সুকুমার রায় মাত্র ৩৬ বছরে মারা গিয়েছিলেন। এই রকম প্রতিভাবান মানুষের মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যাওয়া সত্যি দুঃখের! কিন্তু আশ্চর্য, সুকুমার রায়ের কবিতায় আমি কোথাও বেদনার কথা পাই নি। হয়ত তাঁর কবিতার হাসির হুল্লোড়ের মধ্যে মৃত্যুর জায়গা হয় নি। একইভাবে পাই নি নজরুলের কবিতায়। থাকতে পারে, হয়ত আমার চোখে পড়ে নি। কিন্তু একটা জায়গায় সুকুমার রায় মৃত্যুর কথা বলেছেন। তাঁর একেবারে শেষের দিকের একটা কবিতায়। তাঁর মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে। উনি লিখছেন, আদিম রাতের চন্দ্রালোকিত শীতলতা আমাকে ধীরে ধীরে অধিকার করছে। দেখলাম জীবনটা হল একটা তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম ছাড়া কিছু নয়। তারপর বলছেন, ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর, গানের পালা সাঙ্গ মোর। জীবনটা কি তাহলে তাঁর কাছে? তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম। এখানেও কিন্তু ব্যঙ্গ করতে তিনি ছাড়ছেন না।
আমি কিন্তু একথার সঙ্গে একমত নই। জীবনে ‘জীবন’ একদিন থাকে না বলে একে আমি ঘোড়ার ডিম বলব? কিন্তু মৃত্যু আছে বলেই না জীবনকে আমরা এইভাবে ভালোবাসি। মৃত্যু আছে বলেই না আমরা কবিতা লিখি। গান গাই। ছবি আঁকি। তাজমহল তৈরি করি। মৃত্যু যদি না থাকত অর্থাৎ ঐ ঘোড়ার ডিমটা যদি না থাকত, তাহলে আমরা তো অন্য যে-কোনো জীবের মতো আরেকটা জীব হয়ে যেতাম। তাই আমি মনে করি, জীবনকে সত্যিকার অর্থ দেওয়ার জন্য ‘জীবন’ যে-রকম দরকার, ‘মৃত্যু’ও সে-রকমই দরকার।
সবশেষে একটা ছোট্ট গল্প বলে শেষ করব। জাপানে এক রকমের সুস্বাদু খাবার আছে। নাম সুশি। তাতে প্রথমে কিছু মাছের বাচ্চা কাঁচা অবস্থায় ফালি ফালি করে কাটা হয়। তারপরে একটা সস্ দিয়ে সেগুলো খাওয়া হয়। এটা একটা পৃথিবী বিখ্যাত খাবার। কিন্তু যেসব মাছ দিয়ে সুশি তৈরি হয়, সে মাছ সমুদ্র থেকে ধরে পাত্রে করে নিয়ে আসতে যে সময় লাগে, তার মধ্যে ওই মাছের বাচ্চাগুলোর একটা বড় অংশ মরে যায়। আর মরে গেলে সুশির স্বাদও যায় কমে। এখন এদের বাঁচিয়ে রাখার উপায় কী?
এই নিয়ে শুরু হল গবেষণা। বিস্তর চিন্তাভাবনার পর একটা বুদ্ধি বের হল: যেসব পানিভর্তি বিশাল বিশাল পাত্রে করে ঐ মাছের বাচ্চাগুলোকে আনা হচ্ছে, ওগুলোতে কিছু কিছু হাঙরের বাচ্চা ছেড়ে দাও। এতে দেখা গেল, হাঙরের বাচ্চাগুলো ওদের খাওয়ার জন্য সারা পাত্রজুড়ে যেমন দৌড়াচ্ছে, তেমনি সুশি মাছগুলোও নিজেদের বাঁচানোর জন্য প্রাণভয়ে দৌড়ে চলেছে। দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় ভুলেই যাচ্ছে যে, ওদের আসলে মারা যাওয়ার কথা ছিল!
আমার জীবনের ভেতরে আমিও ওরকম এক দঙ্গল হাঙরের বাচ্চা ছেড়ে দিয়েছি। সেই হাঙরের বাচ্চাগুলোর নাম হল কাজ। আমি কাজ বাড়িয়ে দিয়েছি। এমনভাবে বাড়িয়েছি যাতে ও ছাড়া অন্য কোনো চিন্তা আমাকে দখল করতে না পারে।
আমি সবসময় ছাত্রদের একটা কথা বলি-লেখাপড়া করে যেই, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সেই। বলি, কথাটা সবাই জানে। কিন্তু ভালো ছাত্রেরা জানে কবে? বছরের প্রথম দিনটিতেই। তাই সারা বছর প্রাণপণে পড়াশোনা করে পরীক্ষায় ভালো ফল হাতিয়ে নেয়। খারাপ ছাত্রেরাও কথাটা জানে। কবে? যেদিন পরীক্ষাটা শেষ হয় সেদিন। তাই সেদিন কপাল চাপড়ে বলতে থাকে, প্রথমদিন যদি বুঝতাম তবে পরীক্ষার ফল হয়ত এভাবে খারাপ হত না।
তাই সময় থাকতে থাকতে সবাইকে বলি, দেরি করো না। জীবনের মধ্যে ওই হাঙরের বাচ্চাগুলোকে ছেড়ে দাও। শত শত কাজ তোমাকে অনুক্ষণ তাড়া করুক। দেখবে মৃত্যুর কথা ভুলে গেছ। দেখবে তুমি দাঁড়িয়ে আছ যৌবনে, শক্তিতে, রক্তিম প্রাচুর্যের ভেতর। অর্থাৎ ইতিবাচকতায়। ঐশ্বর্যের জগতে।
কী, খুশি তো? না, আমি অন্যদের জিগ্যেস করছি না। ওই যে যারা বসে আছেন, ওদের জিগ্যেস করছি। ইতিবাচকতা বলাতে খুশি তো? খুশি? বেশ!
ধন্যবাদ।
(আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ৭৭তম জন্মবার্ষিকীতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত একটি অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তব্য, ২৫ জুলাই ২০১৬। বক্তব্যটি ‘ভাঙো দুর্দশার চক্র’ বই থেকে নেওয়া হয়েছে।)
.png)

ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বয়ান অনেক সময়ই ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে আসে না; আসে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ ও অভিজ্ঞতার গল্প থেকে। চব্বিশের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সেই জনতার গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র ‘জুলাই ডায়েরিজ’।
১ ঘণ্টা আগে
ঢাকা কলেজের পেছনের ছোট্ট এক মিলনায়তন কক্ষ থেকে শুরু হওয়া স্বপ্ন আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক-শিক্ষামূলক আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। তার নাম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।
৩ ঘণ্টা আগে
১৯৫১ সালে পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় ব্যঙ্গপত্র অচলপত্র একটি কার্টুন প্রকাশ করেছিল। নাম ‘বেঙ্গলের হিরো’। সেখানে হাঁটতে থাকা একটি শিশুর মুখে বসানো হয়েছিল এক নবাগত অভিনেতার চেহারা। প্রেমিকার গলায় ঝুলে সে বলছে, ‘ডার্লিং, তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?’ সেই মুখটি ছিল উত্তম কুমার চট্টোপাধ্যায়ের। যাকে আমরা চিনি ‘উত্তম
১৬ ঘণ্টা আগে
মোহাম্মদ রশিদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসিত গ্রন্থের লেখক। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এই নিবন্ধটি ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘আইডেন্টিটি অব আ মুসলিম ফ্যা
১৮ ঘণ্টা আগে