ad

তৃতীয় পর্ব/একাডেমিক লেখা, জ্ঞান, সত্য-উৎপাদন ও নির্মাণ

আজকের পর্বে ফুকোর তিনটি কেন্দ্রীয় ধারণা—ডিসকোর্স, এপিস্টিম ও জিনিওলোজি—দিয়ে বোঝার চেষ্টা করব, সত্য কীভাবে ‘উৎপাদিত’ হয়, আর এই বোঝাপড়া একাডেমিক লেখকের জন্যে কী অর্থ বহন করে।

একাডেমিক লেখা, জ্ঞান, সত্য-উৎপাদন ও নির্মাণ। স্ট্রিম গ্রাফিক
একাডেমিক লেখা, জ্ঞান, সত্য-উৎপাদন ও নির্মাণ। স্ট্রিম গ্রাফিক

দ্বিতীয় পর্বে আমরা কথা বলেছিলাম ক্রিটিকের ধারণা নিয়ে, অর্থাৎ একাডেমিক লেখা কীভাবে যুক্তি-তর্ক-বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে আগায়, কোনো দাবিকে নাকচ করে বা নতুন দাবি হাজির করে, হায়ারার্কি উন্মোচন করে, সারনির্যাসবাদ উদঘাটন করে, নিহিত অনুমান খুঁড়ে বের করে, ইত্যাদি। আজকের পর্বে আমরা আলোচনা করব, এই যে ‘জ্ঞান’ নিয়ে আমরা এত কথা বলছি, এই জ্ঞান জিনিসটা আসলে কী? সত্য বলে যা আমরা মেনে নেই, সেটা কোত্থেকে আসে?

একটা মতে, সত্য একটা বাইরে থাকা বস্তু, লেখার মধ্য দিয়ে আমরা সেটাকে ধরতে চাই মাত্র। ভাষা এখানে একটা স্বচ্ছ মাধ্যম, জগৎ আর মনের মাঝখানকার সেতু এই ভাষা। দার্শনিক পরিভাষায় একে বলে correspondence theory of truth। এখানে সত্য মানে বক্তব্য আর বাস্তবতার মিল। এই মতে লেখক অনেকটা আবিষ্কারকের মতো, বাইরে যা আছে তা যত নিখুঁতভাবে সম্ভব ধরে ফেলাই তার কাজ।

আরেকটা মত হচ্ছে, সত্য একটা সলিড, স্থির বস্তু না; সত্য উৎপাদিত হয়। এটা কোথাও ‘আছে হয়ে’ বসে নাই যে গিয়ে খুঁজে বের করব; বরং একটা নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, নির্দিষ্ট ক্ষমতা-সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়। এই দ্বিতীয় ধারার সবচেয়ে প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর মিশেল ফুকো।

আজকের পর্বে ফুকোর তিনটা কেন্দ্রীয় ধারণা—ডিসকোর্স, এপিস্টিম ও জিনিওলোজি—দিয়ে বোঝার চেষ্টা করব, সত্য কীভাবে ‘উৎপাদিত’ হয়, আর এই বোঝাপড়া একাডেমিক লেখকের জন্যে কী অর্থ বহন করে।

জ্ঞান ও স্বার্থ

জ্ঞানসৃষ্টি ও ‘সত্য’ অনুসন্ধানকে আমরা উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য বলে জানি। বিশ্ববিদ্যালয় মানেই এক অর্থে সত্যান্বেষণের জমিন, জ্ঞানোৎপাদন এটির কেন্দ্র। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই ‘জ্ঞান’ ধারণাটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, কারণ জ্ঞানের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য-বিস্তারের অভীপ্সার একটা গভীর সম্পর্ক নিরূপণ করা গেছে।

এখানে ইয়ুর্গেন হেবারমাসের (Jürgen Habermas) একটা পুরোনো কিন্তু এখনো বেশ প্রাসঙ্গিক ভাগ মনে করা যেতে পারে। এই ভাগটি তিনি করেছিলেন Knowledge and Human interests বইয়ে, যা ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে, আর মূল জার্মান সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৮ সালে। হেবারমাসের মতে জ্ঞান কখনোই স্বার্থ-নিরপেক্ষ হয় না, বরং প্রতিটা জ্ঞান-প্রক্রিয়ার পেছনে একটা নির্দিষ্ট cognitive interest কাজ করে। তিনি একে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। একটাকে বলে টেকনিক্যাল-ইন্সট্রুমেন্টাল নলেজ, যার মূল আগ্রহ কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণে। যেমন, প্রকৃতি বা সমাজকে বোঝা ও তাকে ম্যানুপুলেইট করার জ্ঞান, যেমন পদার্থবিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যবস্থাপনাবিদ্যা ইত্যাদি। এই জ্ঞানে ‘কেন’র প্রশ্নের চেয়ে প্রাধান্য পায় ‘কীভাবে করব’ প্রশ্নটি।

আরেকটি হচ্ছে, হারমেনিউটিক্যাল নলেজ, যার আগ্রহ অর্থ বোঝা, ব্যাখ্যা করা। সাহিত্য, ইতিহাস, নৃবিজ্ঞানের মতো ডিসিপ্লিন এই ধরনের জ্ঞান তৈরি করে। মানুষ কীভাবে নিজেদের ও পৃথিবীকে বোঝে, সেটা বোঝার চেষ্টা করে এই জ্ঞানশাস্ত্র। ইমানসিপেশান বা মুক্তিতে আগ্রহী জ্ঞানকে বলা হয় ক্রিটিকাল নলেজ। এই জ্ঞান জিজ্ঞেস করে কোন কাঠামো মানুষকে অবদমিত রাখছে, আর কীভাবে সেই কাঠামো ভাঙা যায়। মার্ক্সবাদী, ফেমিনিস্ট বা পোস্ট-কলোনিয়াল স্কলারশিপ অনেকটা এই আগ্রহ থেকেই কাজ করে।

এই ‘জ্ঞান’ শব্দটাকেই আরও একটু ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন দার্শনিক নাকিব আল-আত্তাস। তাঁর মত, বাস্তবতার একটা শ্রেণীবদ্ধ কাঠামো আছে, আর তাতে প্রতিটা বস্তুর একটা উপযুক্ত অবস্থান বা ‘মাকাম’ আছে; তাঁর কাছে জ্ঞান মানে বাস্তবতায় নিজের ও প্রতিটা বস্তুর যথাযথ অবস্থান বোঝা। প্রতিটা জিনিসের এই যথাস্থানের জ্ঞানকেই তিনি বলেন ‘আদাব’। এখানে আদাব বলতে শুধু নৈতিকতা বা আখলাক না, বরং বস্তুজগতের প্রতিটা জিনিসের নির্ধারিত কাজ, অবস্থান ও সম্পর্কের জ্ঞানকে বোঝানো হচ্ছে।

যাহোক, হেবারমাসের এই ভাগ থেকে বোঝা যায়, ‘জ্ঞান’ একরৈখিক ও নিরপেক্ষ কোনো জিনিস না। এর পেছনে সবসময় একটা ‘কেন’-র প্রশ্ন লুকিয়ে থাকে। ফুকো দেখান সত্য ক্ষমতা-সম্পর্কের ভেতর দিয়ে উৎপাদিত হয়। হেবারমাস দেখান জ্ঞান নিজেই একটা স্বার্থ-চালিত বা ইন্টরেস্ট-ড্রিভেন প্রক্রিয়া।

দুজনেই মানেন যে, ‘নিরপেক্ষ জ্ঞান’ বলে প্রচারিত ধারণাকে প্রশ্ন করলেই জ্ঞানের ভিন্ন এক বা একাধিক তল বেরিয়ে আসে। গবেষণা-প্রবন্ধে যে রিসার্চ কোয়েশ্চেন থাকে বা কোনো দাবিকে প্রশ্ন আকারে ভাবতে বা ডীল করতে হয়, তার পেছনে জ্ঞানের এই নুয়ান্সগুলোর সম্পর্ক আছে।

পোস্ট-ট্রুথ জমানায় বস্তুনিষ্ঠ সত্যের প্রশ্ন বেশ হুমকির মুখে আছে। জনমত গঠনে ফ্যাক্টের চেয়ে যখন অনুভূতি বেশি প্রভাববিস্তারী হয়ে ওঠে, তখন লি ম্যাকিন্টায়ার (Lee McIntyre) সেই পরিস্থিতিকে বলেন ‘পোস্ট-ট্রুথ’। এই ভাব-উৎপাদনে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি, মিডিয়া ইকোসিস্টেম, বিবিধ পলিটিকাল অ্যাক্টর, নানা কর্পোরেশনের ভূমিকা আছে। হ্যারি ফ্রাংকফুর্ট তাঁর On Bullshit নামের ছোট্ট বইটাতে বলেন, লোকজন যখন কোনোরকম বিশেষজ্ঞতা ছাড়াই, ভালোভাবে না জেনেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলে, সেই পরিবেশেই ‘বুলশিট’ বিকশিত হয়। লায়ার ও বুলশিটার-এর মধ্যে একটা পার্থক্য করেন ফ্রাংকফুর্ট। লায়ার হলো সে, যে সত্য জেনেও লুকায়; আর বুলশিটার হলো সে যে সত্যের কোনো তোয়াক্কাই করে না, বরং ফলাফল, প্রভাবিত করা ও নিজেকে উপস্থাপন করা নিয়েই ভাবিত থাকে।

এখন একটা প্রশ্ন খুব স্বাভাবিকভাবেই উঠবে যে, যদি সত্য সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ না হয়, জ্ঞান যদি সবসময় কোনো না কোনো স্বার্থ বা ক্ষমতা-সম্পর্কের ভেতর দিয়ে উৎপাদিত হয়, তাহলে কি একাডেমিক লেখা শেষমেশ আপেক্ষিকতায় গিয়ে ঠেকে? এই ক্ষেত্রেও ফুকো সহায়ক হতে পারেন। তিনি সত্যকে সম্পূর্ণ বাতিল করেননি।

মাইকেল হ্যাননের পোস্ট-ট্রুথ ও গণতন্ত্র নিয়ে লেখা কাজে তিনি যুক্তি দেন, সত্যের মৃত্যু ঘটেনি, বরং সত্যকে পরোয়া করার প্রবণতারই ক্ষয় ঘটছে — যেটা গণতন্ত্রের জন্যে ভালো না। সত্য হয়ে উঠছে ক্ষমতার একটা হাতিয়ার—ফুকো যেমন বলেছিলেন, সত্য হচ্ছে ‘ইফেক্ট অব পাওয়ার’। অনেক সময়ই সত্যকে অস্ত্র বানিয়ে ভিন্ন চিন্তাকে অগ্রাহ্য করা হয়, আর এভাবে ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা জারি ও শক্তিশালী রাখা হয়। কোনো কোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে সেখানে একক সত্য পাওয়া কঠিন, এমনকি ঐকমত্যে পৌঁছানোও প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। তাই পোস্ট-ট্রুথ পদটাকে একেবারে নেতিবাচক না ভেবে, ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে এনগেজ হওয়ার একটা সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে, রালফ কিজ তাঁর The Post-Truth Era: Dishonesty and Deception in Contemporary Life বইয়ে দেখান, নানারকম ইউফেমিজম ব্যবহার করে অসততাকে লুকানো হয়, মিথ্যাকে সহনীয় করে তোলা হয়। মিথ্যা যদি ‘কাজ করে’, তাহলে সেটাকেই জাস্টিফাই করা হয়—কার্যকারিতার প্রশ্ন নীতিনৈতিকতারও স্থলাভিষিক্ত হয়ে যায়। মিডিয়া, টিভি শো, ফেইক নিউজ, নানামুখী বিনোদন, রাজনীতিবিদদের মিথ্যাচার—এসব মিলে মিথ্যাকে ক্রমশ স্বাভাবিক করে তোলে।

বেলজিয়ামের দার্শনিক সাইমন ট্রুয়ান্ট সত্যের চার রকম রূপের কথা বলেন—ফ্যাকচুয়াল ট্রুথ, আইডিওলজিক্যাল ট্রুথ, প্র্যাগমাটিক ট্রুথ ও এক্সিস্টেনশিয়াল ট্রুথ। ‘ওভারথিংক’ পডকাস্টে পোস্ট-ট্রুথ নিয়ে আলোচনায় তাঁর ‘ট্রুথ হ্যাজ ফোর ফেইসেস’ নামক একটা বইয়ের কথা বলা হয়েছিল, যেটির ইংরেজি অনুবাদ হয় নি। যাহোক, আইডিওলজিক্যাল ট্রুথ বলতে নিজের বিশ্বাস-ব্যবস্থা ও বিশ্ববীক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত করে বোঝাকে নির্দেশ করে। প্র্যাগমাটিক ট্রুথ নির্ধারিত হয় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দিয়ে। এক্সিস্টেনশিয়াল ট্রুথ যুক্ত থাকে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যাপিত জীবন ও অস্তিত্বের সঙ্গে। ট্রুয়ান্ট মনে করেন, সত্যের এই বিভিন্ন রূপ স্বীকার করে ও বুঝে নিয়েই আমরা পাবলিক ডিবেটের বহু-পথকে খুলে দিতে পারি।

যেটাকে সত্য বললে নিজের রাজনীতির জন্যে সুবিধা, সেটাকে সত্য বলে চালানোর চেষ্টা, আর প্রতিদ্বন্দ্বী যেকোনো সত্য-দাবিকে কোণঠাসা করার চেষ্টা—এটাই সত্যোত্তর যুগের রাজনীতি। এই রাজনীতিতে ফ্যাকচুয়াল ট্রুথের চেয়ে আইডিওলজিক্যাল, প্র্যাগমাটিক ও অস্তিত্বগত প্রশ্ন অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মিডিয়া মেকানিজম, প্রযুক্তির ব্যবহার, জনবল দিয়ে কোনো কিছুকে সত্য বলে প্রতিভাত করা গেলে তা প্রায়শই সত্যের মর্যাদা পেয়ে যায়—এখানে ফ্যাকচুয়াল ট্রুথ আসলে গৌণ হয়ে পড়ে। জঁ-ফ্রঁসোয়া লিওতার বলেছেন, গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ ছাড়া সমাজ হয়ে ওঠে বিবাদমান নানা সত্যদাবির একটা ‘প্যাচওয়ার্ক’।

এখানেই একাডেমিক লেখকের দায়িত্বটা জটিল হয়ে ওঠে। সত্যের নির্মিতি স্বীকার করেও, সব বয়ানকে সে জ্ঞানগতভাবে সমান বৈধ বলে মেনে নিতে পারে না এবং সত্য-ব্যাখ্যা, ঠিক ভাষ্য ইত্যাদির বাসনা তাঁর মরে না।

সত্যের বিবিধ তত্ত্ব

এই প্রসঙ্গে দর্শনে যে তত্ত্বাদি আছে তা নিয়ে আলোচনা করা যাক। করেসপন্ডেন্স তত্ত্বে সত্য বলতে বিবৃতি আর বাস্তবতার মিলকে বোঝায়। বাইরে যা আছে, তার সঙ্গে মিলে গেলেই তা সত্য। কোহেরেন্স তত্ত্বে সত্য মানে একটা বয়ান অন্যান্য গৃহীত বয়ানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা। এখানে বাইরের বাস্তবতার সঙ্গে মিল না, বরং একটা বিশ্বাস-ব্যবস্থার ভেতরে সামঞ্জস্যই মাপকাঠি।

তবে ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে এভাবে বলা হয় যে, শুধু নিজের চিন্তাকাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতি থাকলেই কোনো বিশ্বাস জ্ঞান হয়ে ওঠে না, তার প্রয়োজন হয় বহিবাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি মিলেরও। সত্যের একটা ক্লাসিক আরবি সংজ্ঞা এভাবে দেওয়া হয়: আল-হাক্কু হুয়াল হুকমুল মুতাবিকু লিল-ওয়াকি—সত্য হলো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রায় বা সিদ্ধান্ত। ড. ইয়াসির নাদিমের ‘ইসলাম ও আধুনিক জ্ঞানতত্ত্ব’ বইয়ে এ আলোচনা পাওয়া যাবে। আবার, হাসান স্পাইকার-এর ‘থিংস এজ দেই আর’ বইতেও ‘অবজেক্টিভ ট্রুথ’ ধারণার অধিবিদ্যিক ভিত্তি নিয়ে বিস্তারিত জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনা আছে।

প্র্যাগমাটিক থিয়োরিতে সত্য মানে যা কার্যকর, যা প্র্যাকটিক্যালি ‘কাজ করে’। উইলিয়াম জেমস বা পিয়ার্সের দর্শনে এই ধারা পাওয়া যায়। কোনো বিশ্বাস বাস্তব জীবনে ঠক কাজে লাগলে সেটাই তার সত্যতার প্রমাণ। আবার, সত্য মানে যা নিয়ে একটা কমিউনিটি যুক্তিসঙ্গত আলোচনার মধ্য দিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছায়। এটাকে বলে কনসেন্সাস তত্ত্ব। হেবারমাসের একটা অবদান যোগাযোগমূলক যুক্তি বা communicative rationality-এর ধারণা তৈরিতে, যেখানে সত্য তৈরি হয় আইডীয়াল স্পীচ সিচুয়েশনে বাধাহীন ও সমতাভিত্তিক আলোচনার মধ্য দিয়ে।

আর্গুমেন্ট তত্ত্ব সত্যের কনসেন্সাস তত্ত্বের কাছাকাছি। কিন্তু এটা জোর দেয় যুক্তির গুণগত মান ও প্রক্রিয়ার উপর। সত্য কোনো স্থির বিন্দু নয়, বরং যুক্তি-তর্কের একটা চলমান প্রক্রিয়ার ফসল, যা সবসময় রিভিশন-এর জন্যে খোলা।

পোস্ট-ট্রুথ-এর প্রসঙ্গে আসা যায়। কিন্তু এটা আরেকটা দার্শনিক তত্ত্ব না। বরঞ্চ এটা একটা রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির নাম, যেখানে বস্তুনিষ্ঠ সত্যের চেয়ে আবেগ ও ব্যক্তিগত বিশ্বাস জনমত গঠনে বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। মজার ব্যাপার হলো, পোস্ট-ট্রুথ প্রপঞ্চটা অনেকাংশে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক সেই একই অন্তর্দৃষ্টির উপর যা ফুকো বা পোস্টমডার্ন চিন্তকরা দিয়েছিলেন, অর্থাৎ এই ধারণায় যে ‘সত্য নির্মিত’। কিন্তু সেই অন্তর্দৃষ্টিকে ব্যবহার করা হয় প্রায়শই সম্পূর্ণ উল্টা উদ্দেশ্যে। জ্ঞান-অনুসন্ধানকে গভীর করার জন্যে না, বরং যেকোনো অস্বস্তিকর তথ্যকে প্রতিষ্ঠা বা খারিজ করবার জন্যে। আমাদের জনপরিসরে ট্রুথ বনাম ন্যারেটিভ নিয়ে যে বিতন্ডা হাজির আছে, তা এই পোস্ট-ট্রুথ জমানার সিম্পটম।

আবার, হাইডেগার সত্যকে ভিন্নভাবে বোঝান। তাঁর কাছে সত্য হলো অ্যালিথিয়া (aletheia)। গ্রিক aletheia শব্দটির আক্ষরিক অর্থ unconcealment বা অবগুণ্ঠন-উন্মোচন। অর্থাৎ যা আড়ালে বা গোপনে ছিল, তার প্রকাশিত হয়ে ওঠা। ফলে সত্য তাঁর কাছে কেবল কোনো বক্তব্যের সঠিকতা বা বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল না অর্থাৎ করসপন্ডেন্স থিয়োরি থেকে তার বক্তব্য ভিন্ন; সত্য হলো কোনো কিছুর ‘অ-গোপন’ হয়ে ওঠার ঘটনা। তবে এই প্রকাশ কখনোই সম্পূর্ণ হয় না। কারণ যা কিছু প্রকাশিত হয়, তার প্রকাশের মধ্যেই অন্য কিছু আড়ালে থেকে যায়। অর্থাৎ প্রকাশের মধ্যেই প্রচ্ছন্নতা বা অপ্রকাশ নিহিত থাকে। সত্য তাই হাইডেগারের কাছে একটি স্থির অবস্থা না, বরং অবগুণ্ঠন ও অবগুণ্ঠন-উন্মোচনের একটা চলমান ঘটনা।

এইসব তত্ত্বালোচনার পর আমরা এখন ফুকোর প্রকল্পে ঢুকতে পারি, অর্থাৎ তিনি ঠিক কীভাবে দেখান যে, সত্য ক্ষমতার সঙ্গে জড়িয়ে ‘উৎপাদিত’ হয়।

ডিসকোর্স: বয়ান কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়

কোন বয়ান বা ডিসকোর্স সমাজের ভেতরে কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় তাঁর বিশ্লেষণ আছে মিশেল ফুকোর বিখ্যাত প্রবন্ধ The Order of Discourse-এ। বৃহত্তর অর্থে, পলিটিকাল পাওয়ার নিয়মিতভাবেই কোনো না কোনো ডিসকোর্সকে সাপ্রেস বা ডিলিমিট করে। মিনিং মেকিং প্রসেসে ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে অনুমোদিত (politically sanctioned) বা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিশেষ কিছু বয়ানকেই শুধু আবির্ভূত হতে দেওয়া হয়।

তো, বাহ্যিকভাবে তিনটা ফ্যাক্টর কোনো একটা ডিসকোর্সের বিচলনকে নিয়ন্ত্রণ করে, বা সীমায়িত করে। একটা হলো ট্যাবু, দ্বিতীয়টা হলো স্যানিটি-ইনস্যানিটি বা যৌক্তিক-অযৌক্তিকতার প্রসঙ্গ এবং তিন নম্বর হচ্ছে উইল টু ট্রুথ বা সত্য-ইচ্ছা (will to truth)।

আর্কিওলজি ও জিনিওলজিকাল পদ্ধতি বুঝতে অনেকেরই অসুবিধা হয়। এটা বোঝার জন্যে একটা উদাহরণ বেশ মশহুর, সরলীকরণের ঝুঁকি কিছুটা থাকলেও। ঘরের উদাহরণ। আর্কিওলজি হলো একটা ঘরের গড়ন বোঝা, আর জিনিওলোজি হলো সেই ঘরের নানামাত্রিক মালিকানার ইতিহাস অন্বেষণ!

কোনো বিশেষ সমাজে ও নির্দিষ্ট সময়খণ্ডে কিছু কিছু বিষয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ বা কিছু আলোচনাকে থামিয়ে দেওয়া হবে সমাজের কিছু বিধিনিষেধের প্রসঙ্গ তুলে। নারীর রঞ্চনা বা অধিকারের কথা বলে ইসলামি ঘরানায় ফেমিনিষ্ট ট্যাগ খাওয়ার ভয়কেও এটার মধ্যে ফেলতে পারি। বা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে প্রচলিত প্রবল বয়ানের বাইরে কেউ যদি ভিন্ন অর্থ দেয় তাহলেও এটা নিষেধাজ্ঞার শিকার হবে। এই ট্যাবু বা প্রহিবিটেড টপিক সমাজে সমাজে আলাদা হয়, একেক সমাজের ট্যাবু একেক জিনিস। ট্যাবুমুক্ত কোনো সমাজ নাই।

আবার, সুস্থতা-অসুস্থতা বা যৌক্তিকতা-অযৌক্তিকতার প্রসঙ্গ এনেও কোনো কোনো বক্তব্য বা বিশ্বাসকে বিস্তৃত হতে দেওয়া হয়না। কাউকে পাগল, অস্পৃশ্য হিসেবে প্রমাণ করা গেলে তার ডিসকোর্স আর গ্রহণযোগ্য হবে না। কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জঙ্গি বলে একবার ট্যাগ দিয়ে আলাদা করে ফেলা গেলে, তার আর কোনো বক্তব্য শোনার দরকার নাই, কারণ তখন ধরেই নেওয়া হবে সে কোনো মিনিংফুল ডিসকোর্স-এর উপযোগী নয়। এই ম্যাডনেস বা ইররেশনালিটি বা এই আদারিং বা অপরায়ন বিশেষ বিশেষ সমাজে বা সময়ে বিশেষ বিশেষভাবে করা হয়। ওয়ার অন টেররের যুগে ‘মিলিটেন্ট’ ট্যাগটি অনেকটা এমনি। এই স্যানিটি-ইনস্যানিটি, স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক, যৌক্তিক-অযৌক্তিক বাইনারি দিয়ে কোনো ডিসকোর্সকে থামিয়ে দেওয়াতেও ক্ষমতা-সম্পর্ক ক্রিয়াশীল। কে জঙ্গি, কে পাগল—এই সংজ্ঞায়নে আধিপত্য থাকে প্রবলেরই হাতে। সে ‘প্রবল’ হতে পারে ক্ষমতার সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা মিডিয়া, বা ডিসিপ্লিনারি ফোর্স। ভিকটিমের নিয়তি যেন সংজ্ঞায়িত হওয়া, সংজ্ঞা দেওয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা অর্জিত হওয়ার আগে সে সংজ্ঞায়িতই হবে।

তৃতীয়টি হলো, will to truth অর্থাৎ, সত্য ও মিথ্যার মধ্যে একটা সীমারেখা টানার এবং সেই সীমারেখাকে বলবৎ রাখার একটা প্রাতিষ্ঠানিক তাগিদ। অর্থাৎ এইটাকে ইন্সটিটিউশনাল র্যাটিফিকেশনের প্রসঙ্গ আকারে বিবেচনা করতে পারি। এই will to truth বাস্তবায়িত হয় নানা প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে, যেগুলো ডিসকোর্স তৈরি করে, অপর ডিসকোর্সকে নিয়ন্ত্রণ করে বা ন্যায্যতা দেয—যেমন, মিডিয়া বা নিউজ এজেন্সি, পাব্লিশিং ইন্ডাস্ট্রি, প্রেসনোট, পুলিশি ভাষ্য, সরকারি প্রজ্ঞাপন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ সংস্থা ইত্যাদি। এরা মিনিং প্রোডাকশন, সার্কুলেশন ও কনজাম্পশনকে নিয়ন্ত্রণ করে। বলতে পারি, এটা দুইভাবে ঘটে: একটা ইন্ট্রিন্সিকালি বা ফ্যাকচুয়ালি, আর আরেকটা মোটিভেটেড বা প্ররোচিত হয়ে। যেমন, আজ যদি কেউ বলে সূর্য পৃথিবীর চারপাশে ঘুরে, এইটা প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায্যতা পাবে না—বিজ্ঞানীদের সংস্থা এটাকে খারিজ করে দেবে। আবার, ধরা যাক, পুলিশি ভাষ্য—অনেকে এটাতেই আস্থা রেখে অন্য কোনো বয়ান ‘সত্য’ হলেও সেটাকে আস্থায় নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করবে না। হুজুর বলেন চমৎকার, তো হুজুরের মতে অমতকার! কোনো বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করার জন্যে যে শ্রম দেবার প্রয়োজন বা অনুসন্ধান দরকার বা ইন্টেলেকচুয়াল রিগার দরকার সেটা অনেকেরই না থাকার কারণে প্রতিষ্ঠিত বয়ানেই তারা নতশির থাকে, নতুন বয়ানের প্রলিফারেশন বা বিস্তৃতিতে সায় দেয় না বা বিরোধিতা করে।

এই তিনটা প্রক্রিয়া—ট্যাবু, স্যানিটি-ইনস্যানিটি বাইনারি, ও উইল টু ট্রুথ—একসঙ্গে দেখিয়ে দেয়, ‘সত্য’ বলে যা আমরা মেনে নিই তা কোনো নিরপেক্ষ, সবসময় বিদ্যমান কিছু নয়; বরং প্রতিটা সমাজ ও সময় তার নিজস্ব নিয়মে ঠিক করে দেয় কোন কথা বলার অধিকার কার আছে, আর কোনটা নিঃশব্দ থেকে যাবে, কোনটা ন্যায্য জ্ঞান, কোনটা তা নয় ইত্যাদি। এইটুকু ছিল ডিসকোর্স কীভাবে বাহ্যিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় তার আলোচনা। এবার প্রশ্ন হলো—এই যে বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ-কাঠামো একেক সময়ে একেক রকম, এর পেছনে কি কোনো গভীরতর প্যাটার্ন আছে? এখানেই আসে ফুকোর আরেকটা কেন্দ্রীয় ধারণা: এপিস্টিম।

এপিস্টিম: কোনো যুগের জ্ঞান-কাঠামো

এপিস্টিম মানে হলো, একটা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক যুগে জ্ঞান গঠনের অন্তর্নিহিত নিয়মকানুন বা কাঠামো। কোন বিবৃতি ‘জ্ঞান’ হিসেবে গণ্য হবে, কোনটা হবে না, কোন পদ্ধতিতে কিছু জানা যাবে বলে ধরে নেওয়া হবে—এই সবকিছু একটা অদৃশ্য কাঠামোর মধ্যে বাঁধা থাকে, যেটা সেই যুগের মানুষের কাছে এতটাই ‘স্বাভাবিক’ মনে হয় যে তারা নিজেরাই সেটা ধরতে পারে না।

ফুকো দেখান, রেনেসাঁ যুগের এপিস্টিম, ক্লাসিক্যাল যুগের এপিস্টিম আর আধুনিক যুগের এপিস্টিম — এই তিনটা একেবারে ভিন্ন ভিন্ন নিয়মে চলে। যেমন, রেনেসাঁ যুগে জ্ঞান গঠিত হতো সাদৃশ্য (resemblance) দিয়ে। জগতের একটা জিনিস আরেকটার সঙ্গে কীভাবে মিল রাখে সেটার বোঝাপড়া। ক্লাসিক্যাল যুগে এসে জ্ঞান হয়ে ওঠে শ্রেণীবিন্যাস ও তুলনা-নির্ভর। আর আধুনিক যুগে জ্ঞান কেন্দ্রীভূত হয় মানুষ নামক এক নতুন বিষয়/বিষয়ীকে (subject) ঘিরে। মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞানের মতো ‘মানব-বিজ্ঞান’ তখনই জন্ম নেয়, যেখানে মানুষ একইসঙ্গে জ্ঞানকর্তা ও জ্ঞানের বিষয় বা এভাবে বলা যায়, একই সঙ্গে সে বিষয় ও বিষয়ী। এ প্রসঙ্গে আমাদের মনে পড়বে ফুকোর The Order of Things বইয়েরই একেবারে শেষ দিককার এই কথা যে, মানুষ এক আধুনিক আবিষ্কার। এই মানুষ সমুদ্রের তীরে বালিতে আঁকা মুখের মতো মুছে যাবে। মানুষ-এর বর্তমান ধারণা গড়ে উঠেছিল অষ্টাদশ শতকে, এই জ্ঞান-কাঠামো বা এপিস্টিম পরিবর্তন হলে মানুষ সম্পর্কে বর্তমান ধারণাও মুছে যাবে, সমুদ্র পাড়ে বালিতে আঁকা মুখের মতোই!

লক্ষণীয় বিষয় হলো, একটা এপিস্টিম থেকে আরেকটায় স্থানান্তর কোনো ক্রমোন্নতি না, বরং এটা একধরনের রাপচার বা বিচ্ছিন্ন আকস্মিকতা, ধারাবাহিক বা সরলরৈখিক কোনো ব্যাপার নয়। আজকের বিজ্ঞান গতকালের বিজ্ঞানের চেয়ে ‘বেশি সত্য’ এই সরল প্রগতিশীলতার গল্প ফুকোর নয়৷ তিনি ডিসকন্টিনিউটি, রাপচার ইত্যাদি প্রসঙ্গকে গুরুত্ব দেন। প্রতিটা এপিস্টিমের নিজস্ব যুক্তি আছে, আর একটা এপিস্টিমের মানদণ্ড দিয়ে আরেকটাকে বিচার করাটা ভুল।

এই ধারণাটা টমাস কুনের বিখ্যাত ‘প্যারাডাইম’ ধারণার সঙ্গে অনেকটা সমান্তরাল, যা আমরা প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে কিছুটা আলোচনা করে এসেছি। কুন বিজ্ঞানের ইতিহাসে দেখান, কোনো একটা সময়ে বিজ্ঞানীসমাজ একটা নির্দিষ্ট প্যারাডাইমের ভেতরে কাজ করে (যাকে normal science বলে), আর সেই প্যারাডাইম যখন আর সংকট সামলাতে পারে না, তখন একটা paradigm shift বা বৈজ্ঞানিক বিপ্লব। যেমন, নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞান থেকে আইনস্টাইনীয় পদার্থবিজ্ঞানে শিফট। কুন আর ফুকোর পদ্ধতি ভিন্ন; কুন মূলত বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন, আর ফুকো জ্ঞানের ইতিহাস (মানববিজ্ঞান, মেডিসিন, শাস্তি-ব্যবস্থা ইত্যাদি) নিয়ে, কিন্তু দুজনেই এইটা দেখান যে: ‘বস্তুনিষ্ঠতা’ নিজেই একটা ইতিহাস-সাপেক্ষ ধারণা।

তবে ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে এভাবে বলা হয় যে, শুধু নিজের চিন্তাকাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতি থাকলেই কোনো বিশ্বাস জ্ঞান হয়ে ওঠে না, তার প্রয়োজন হয় বহিবাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি মিলেরও। সত্যের একটা ক্লাসিক আরবি সংজ্ঞা এভাবে দেওয়া হয়: আল-হাক্কু হুয়াল হুকমুল মুতাবিকু লিল-ওয়াকি—সত্য হলো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রায় বা সিদ্ধান্ত।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শাস্ত্রেও এই একই প্যাটার্নের একটা নাম পেয়েছি তুর্কি বংশোদ্ভূত অধ্যাপিকা আইসি জারাকল, যিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পড়ান, -এর ‘বিফোর দ্য ওয়েস্ট’ বইটাতে। কোনো এক বিশেষ বাস্তবতায় আমাদের মনে গড়ে ওঠা গভীর বিশ্বাস বা অবিশ্বাসকে তিনি গ্রীক শব্দে নাম দিয়েছেন ‘একুমিনি’ (Ecumene)। জাতিরাষ্ট্রই যেন চূড়ান্ত, এটা আছে ও থাকবে—এই যে দৃঢ় কাণ্ডজ্ঞান হয়ে ওঠা বোধ, এটা এখন যেন আমাদের ‘একুমিনি’র অংশ; অথচ ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে কেউ জাতিরাষ্ট্র-ভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে ভাবতেই পারত না।

এপিস্টিম, প্যারাডাইম ও একুমিনি এই তিনটাই মূলত একই অন্তর্দৃষ্টির তিনটা ভিন্ন-শাস্ত্রীয় নাম: প্রতিটা যুগেরই এমন কিছু গভীর, প্রশ্নহীন বিশ্বাস-কাঠামো থাকে যা তার নিজের সময়ে ‘বাস্তবতা’ বলে মনে হয়, অথচ ইতিহাসের অন্য কোনো বিন্দু থেকে দেখলে সেটাকে স্বতঃসিদ্ধ কিছু বলে মনে হবে না।

আর্কিওলজি ও জিনিওলোজি: ভেতরের নিয়ম খোঁড়া, কুলুজি সন্ধান

এই এপিস্টিম বা জ্ঞান-কাঠামো কীভাবে গবেষণা বা অনুসন্ধান করা যায়? ফুকো এর জন্যে দুটো পদ্ধতিগত টুল তৈরি করেছেন। একটাকে বলে আর্কিওলজি ও অন্যটি জিনিওলোজি।

The Archaeology of Knowledge গ্রন্থে ফুকো এই পদ্ধতির রূপরেখা দেন। এটা অনেকটা ভূতাত্ত্বিক খননের মতো। কোনো একটা যুগের জ্ঞান-স্তরে নেমে গিয়ে দেখা, কোন বিবৃতি বা কথা সেই সময়ে বলার অধিকার কার ছিল, কোন প্রাতিষ্ঠানিক শর্তে একটা বক্তব্য ‘গ্রহণযোগ্য জ্ঞান’ হিসেবে টিকে থাকত। আর্কিওলজি প্রশ্ন করে না ‘এই ধারণাটা সত্য কিনা’, বরং প্রশ্ন করে, এই ধারণাটা কীভাবে বলার-যোগ্য (sayable) হয়ে উঠল, কোন discursive formation-এর ভেতরে।

জিনিওলোজি পদ্ধতিটা ফুকো ধার নেন নিটশে থেকে। নিটশের বইয়ের নাম ‘On the Genealogy of Morality’। নিটশে বলেন: ‘Only something which has no history is capable of being defined’। অর্থাৎ, যেটির কোনো ইতিহাস নেই সেটিই শুধু সংজ্ঞায়িত হবার যোগ্য। মানে, যেটির ইতিহাস আছে সেটির একক সংজ্ঞা নাই, একক উৎস নাই, সেটিকে ইতিহাসে নানাভাবে বোঝা হয়, সময়পরম্পরার নানা স্বার্থ ও ক্ষমতার বিবিধ প্রেক্ষিতে।

আর্কিওলজি যেখানে একটা যুগের জ্ঞান-কাঠামোর চিত্র আঁকে, জিনিওলোজি সেখানে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটা দেখে, ক্ষমতার সঙ্গে লগ্নতাকে দেখে। কোনো ধারণা, প্রতিষ্ঠান বা অনুশীলন কীভাবে ধাপে ধাপে, প্রায়ই বিচ্ছিন্ন ও অনিয়মিত পথে, কোনো একরৈখিক ‘প্রগতি’ ছাড়াই বর্তমান রূপে পৌঁছাল, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, কার স্বার্থে। ফুকোর Discipline and Punish বা History of Sexuality বইগুলো জিনিওলজিক্যাল বিশ্লেষণের ক্লাসিক উদাহরণ।

একাডেমিক লেখালেখিতে এই দুটো পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় ও প্রয়োগ করা যায়। একটা ‘প্রতিষ্ঠিত সত্য’ বা মানদণ্ড ধরে তার জিনিওলোজি খোঁড়া যায়, দেখানো যায় এইটা কবে থেকে, কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে ‘স্ট্যান্ডার্ড’ হয়ে উঠল, কে লাভবান হলো এই মানদণ্ডে। আর আর্কিওলজিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি লেখককে সচেতন করে যে তার নিজের ডিসিপ্লিনের ‘স্বাভাবিক’ মনে হওয়া নিয়মও আসলে একটা নির্দিষ্ট এপিস্টিমের ভেতরে ঐতিহাসিকভাবে নির্মিত। যেমন - কোন প্রশ্ন করা বৈধ, কোন ভাষা ‘স্কলারলি’ মনে হয়, কোন উৎস উদ্ধৃতিযোগ্য ইত্যাদি।

আর্কিওলজি ও জিনিওলজিকাল পদ্ধতি বুঝতে অনেকেরই অসুবিধা হয়। এটা বোঝার জন্যে একটা উদাহরণ বেশ মশহুর, সরলীকরণের ঝুঁকি কিছুটা থাকলেও। ঘরের উদাহরণ। আর্কিওলজি হলো একটা ঘরের গড়ন বোঝা, আর জিনিওলোজি হলো সেই ঘরের নানামাত্রিক মালিকানার ইতিহাস অন্বেষণ! আর্কিওলজিকাল মেথড দেখবে ঘরটা কীভাবে তৈরি ও এর ভেতরের অংশগুলো পরস্পরের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত, কোন অলিখিত নিয়ম ঘরের আর্কিটেকচারে লক্ষ্য করা যাচ্ছে বা যুগের কোন বৈশিষ্ট্য এতে দৃশ্যমান। জিনিওলজিকাল পদ্ধতি দেখবে কে এই ঘর বানাইতে আদেশ দিয়েছিল, কে এই ঘর জোর করে দখলে নিয়েছিল, কোন বিপ্লবী এসে এর দরজা ভেঙেছিল, অর্থাৎ ক্ষমতা-সম্পর্ক দেখা, লড়াই, দখল বা রূপান্তরের ইতিহাস ও তার ফাটল দেখা।

একাডেমিক লেখায় সত্য ও পদ্ধতির প্রশ্ন

এখন একটা প্রশ্ন খুব স্বাভাবিকভাবেই উঠবে যে, যদি সত্য সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ না হয়, জ্ঞান যদি সবসময় কোনো না কোনো স্বার্থ বা ক্ষমতা-সম্পর্কের ভেতর দিয়ে উৎপাদিত হয়, তাহলে কি একাডেমিক লেখা শেষমেশ আপেক্ষিকতায় (relativism) গিয়ে ঠেকে? এই ক্ষেত্রেও ফুকো সহায়ক হতে পারেন। তিনি সত্যকে সম্পূর্ণ বাতিল করেননি। তিনি আসলে সত্যের শর্ত-শরায়েত ও কার্যকারিতা ও উৎপাদনকে বুঝতে ও বোঝাতে চেয়েছেন এবং প্রশ্ন করেছেন। অর্থাৎ, ‘এটা সত্য না মিথ্যা’ প্রশ্নের বদলে, ‘এই সত্য কীভাবে সম্ভব হলো, কার স্বার্থে এটা কাজ করছে’ এই প্রশ্নে ফোকাস করেছেন।

এটা একাডেমিক লেখককে একটা প্রায়োগিক কৌশল দেয়। পোস্ট-ফুকোডিয়ান জগতে, সত্যের করেসপন্ডেন্স থিয়োরি অর্থাৎ আমি বাস্তবতাকে হুবহু ধরে ফেলেছি—এই কথাকে টেকসই মনে করা হয় না। কিন্তু তার মানে এই না যে যেকোনো বয়ান-বিবৃতিই সমান বৈধ ও সঠিক। লেখককে হতে হয় কোহেরেন্স ও আর্গুমেন্টেশনের প্রতি সৎ, অর্থাৎ নিজের দাবিকে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ, যুক্তির সঙ্গতি ও কমিউনিটির যাচাইয়ের মুখোমুখি রাখা। এখানেই আসে একাডেমিক লেখার পিয়ার রিভিউ-এর প্রসঙ্গ যা উইল-ট্যু-ট্রুথ এর একটা রূপ। যাকে আমরা ইন্সটিটিউশনাল রেটিফিকেশনও বলেছি উপরে।

একইসঙ্গে নিজের অবস্থানের সীমাবদ্ধতা ও স্বার্থ খোলাখুলি স্বীকার করা অর্থাৎ কোন ইন্টারেস্ট থেকে লিখছি, এবং এই স্বার্থ কি টেকনিকাল, হার্মেনিউটিকাল নাকি ক্রিটিকাল, নিজের ডিসিপ্লিনের ডিস্কার্সিভ নর্মস ও নিজের যুগের এপিস্টিমিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকা, এটাই বোধহয় পোস্ট-ট্রুথ যুগে একাডেমিক লেখালেখির দাবি ও কৌশল। সত্য যে নির্মিত হয় এইটা মেনে নিয়েও, এই নির্মাণ-প্রক্রিয়াটাকে বিশ্লেষণ করা এবং এটাকে স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য রাখা একাডেমিক লেখার কাজ, সম্ভবত।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত