leadT1ad

সেলিম আল দীনের চাকা ও মোরশেদুল ইসলাম গাড়োয়ান

আজ ১৪ জানুয়ারি নাট্যকার সেলিম আল দীনের মৃত্যুদিন। নাট্যরচনা ও নাট্যগবেষণা উভয়ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষত্বের জন্য রবীন্দ্র-উত্তরকালের শ্রেষ্ঠ বাংলা নাট্যকার হিসেবে নির্দ্বিধায় তাঁকে মেনে নেওয়া যায়। আবহমান বাংলার জীবন ও সংস্কৃতির রেপ্রিজেন্টেশন সেলিম আল দীনের নাটকের মূল প্রসঙ্গ। তাঁর চাকা (১৯৯০) নাটকও এর বাইরে নয়। চাকা নাটককে মোরশেদুল ইসলাম চলচ্চিত্র হিসেবে নির্মাণ করে নতুন কী দেখালেন?

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪: ৪৫
সেলিম আল দীনের চাকা ও মোরশেদুল গাড়োয়ান। ছবি: স্ট্রিম গ্রাফিক
‘...শস্যের চেয়ে কি লাশের মূল্য কম’

চাকা—সেলিম আল দীন

বাংলা নাট্যজগতের এক প্রবাদ পুরুষের নাম সেলিম আল দীন। নাট্যরচনা ও নাট্যগবেষণা উভয়ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষত্বের জন্য রবীন্দ্র-উত্তরকালের শ্রেষ্ঠ বাংলা নাট্যকার হিসেবে নির্দ্বিধায় তাঁকে মেনে নেওয়া যায়। ইউরোপীয় নাট্যরীতির বাইরে গিয়ে বিষয়বস্তু ও আঙ্গিক সংক্রান্ত যে নিরীক্ষা তিনি করেছেন, সেটাই তাঁর বিশেষত্ব। বাংলা নাটকের শেকড়-সন্ধানী গবেষণা এক্ষেত্রে তাঁর নাটকের ভাব, আঙ্গিক ও ভাষাকে শানিত করেছে। আবহমান বাংলার জীবন ও সংস্কৃতির রেপ্রিজেন্টেশন সেলিম আল দীনের নাটকের মূল প্রসঙ্গ। তাঁর চাকা (১৯৯০) নাটকও এর বাইরে নয়।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষিভিত্তিক জনপদে অপঘাতে মৃত নামহীন ঠিকানাহীন একটি লাশ, একটি গরুর গাড়ি আর দুজন গাড়োয়ান মিলে খুঁজতে থাকে মৃতের গ্রাম। এই কাজে যে বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি তারা হয়, এই ঘটনাই চাকা নাটকের মূল কাহিনি।

এই কাহিনিকে সেলুলয়েডে ধারণ করেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম। চাকা নির্মাণের ঘটনা সম্পর্কে জানা যায়, আশির দশকের শেষপ্রান্তে নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম ঔপন্যাসিক মাহমুদুল হকের খেলাঘর উপন্যাস থেকে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ঢাকা থিয়েটারের অভিনয়শিল্পী আফজাল হোসেন ও সুবর্ণা মুস্তাফাকে প্রধান দুই চরিত্রে মনোনীত করেন। এ বিষয়ে আফজাল হোসেনের সঙ্গে কথা বলার জন্য তিনি প্রায়ই থিয়েটারে যাতায়াত শুরু করেন। একদিন মহিলা সমিতি মঞ্চে উপভোগ করেন ঢাকা থিয়েটার পরিবেশিত সেলিম আল দীনের নাটক চাকা।

সেলিম আল দীনের 'চাকা'। ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবি
সেলিম আল দীনের 'চাকা'। ফেসবুক থেকে নেওয়া ছবি

আফজাল হোসেন এ সময় তাঁর মাথায় গেঁথে দেন, এই নাটক থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব। এই ঘটনার পরবর্তী দৃশ্য হলো ১৯৯৩ সালে চলচ্চিত্র হিসেবে চাকার মুক্তি। এখন প্রশ্ন হলো সেলিম আল দীনের চাকা নাটককে মোরশেদুল ইসলাম চলচ্চিত্র হিসেবে নির্মাণ করে নতুন কী দেখালেন? কিংবা যা মঞ্চে দর্শকের সামনে প্রদর্শন করা হয় সেটার চলচ্চিত্রায়ন কি খুব জরুরি ছিল? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তবে কেন? এসব প্রশ্নের জবাবে সেলিম আল দীনের চাকা থেকে মোরশেদুল ইসলামের চাকার খোঁজ শুরু করা যাক।

যদি একবাক্যে উত্তর চাওয়া হয়, চাকা নাটক/চলচ্চিত্রের মূল বিষয়বস্তু আসলে কী? সেক্ষেত্রে জবাব— আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান। একজন জীবিত ব্যক্তি (গাড়োয়ান) ও একটি লাশ উভয়কে কেন্দ্রে রেখে একটি বৃত্তাকার পরিভ্রমণের সঙ্গী করা হয়েছে দর্শককে। চলচ্চিত্রের শুরুতে যে লাশকে নিতে গাড়োয়ান অস্বীকৃতি জানায় শেষপর্যায়ে সেই লাশের প্রতি তার মমত্ববোধ উত্থিত হয়। অপঘাতে মৃত অপরিচিত লাশটির জন্য গাড়োয়ানের এমন রূপান্তর ব্যক্তিক নাকি সামষ্টিক? চলচ্চিত্রজুড়ে এই প্রশ্নটিকেই বারবার দৃশ্যের পর দৃশ্যে হাজির করা হয়েছে। একটি গ্রাম্য চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে যে লাশটিকে সরকারি লাশ হিসেবে গাড়োয়ানের গরুর গাড়িতে তুলে দেওয়া হয় তাতে তার পূর্বনির্ধারিত ধান বহন করা কাজের ব্যাঘাত ঘটে। তারা বেপারির বায়না নেওয়া ধান আনার উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছিল। চলচ্চিত্রের শুরুতে একটি ভাওয়াইয়া গানের ভেতর দিয়ে বিষয়টি তুলে ধরেছেন নির্মাতা।

গাড়োয়ান লাশটি নিতে অস্বীকৃতি জানালে হাসপাতালের কর্তাব্যক্তির ধমকের সুরে বলা, ‘এটা সরকারি লাশ, না নিয়ে গেলে কিন্তু বিপদে পড়বি!’—কথাটি বিশেষভাবে খেয়াল করা দরকার। যে ব্যক্তিটি জীবিতকালে তার শেষকথা হিসেবে শুধু গ্রামের নাম ছাড়া আর কিছুই বলতে পারেনি, মৃত্যুর পর তার একধরনের আইডেনটিটি তৈরি হয়েছে—‘সরকারি লাশ’। লাশটির এই আইডেনটিটি নিয়ে দুজন গাড়োয়ান কাটা-ধানের খেতের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা মাটির পথ ধরে গ্রামের পর গ্রাম ঘুরতে থাকে। গাড়ির গতি কখনো শ্লথ আবার কখনো দ্রুত এই তালের সঙ্গে উৎপন্ন হতে থাকে চাকার কর্কশধ্বনি।

গাড়োয়ান এই বেওয়ারিশ লাশটির ঠিকানা বের করার ক্ষেত্রে ডোমেইনের কাজটি করতে চেয়েছিল। কিন্তু যখন সে তা করতে পারেনি তখন তার মধ্যে যে ব্যক্তিক ক্ষরণ সেটারই বহিঃপ্রকাশ এই কান্না। যদি এই কান্না নির্বাক হতো তাহলে তা একান্তই তার ব্যক্তিগত হয়ে থাকতো কিন্তু যখন কান্নায় শব্দ যুক্ত করা হয়েছে তখন তা সামষ্টিক হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এই আহাজারি সংক্রমিত করতেই সেলিম আল দীনের চাকার গাড়োয়ানের ভূমিকা নেন মোরশেদুল ইসলাম।

চলচ্চিত্রে গাড়ির ‘ক্যারকের’ আওয়াজ কি বারবার চাকার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত? তাইতো মনে হয়। কিংবা এই আওয়াজ একধরনের সংলাপ। বিস্তীর্ণ খেত, কখনো কর্মরত কখনো বিশ্রামরত কিষাণ আর লোকালয় পেরিয়ে ধুলা ওড়াতে ওড়াতে কখনো লং শটে, আবার কখনো মিড-লং শর্টে গরুর গাড়ি চলার দৃশ্য হলো এই চলচ্চিত্রের দৃশ্যকাব্য। আর লং শটে মূলত নির্জনতা অধিকতর প্রগাঢ় হয়েছে। যা এই চলচ্চিত্রের জন্য যুৎসই। কারণ, মৃতব্যক্তি যেহেতু নির্বাক তাই নীরব-নির্জন প্রকৃতিই এখানে ভাষা হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে পাখির ডাক আর চাকার ক্যারকের শব্দ ভেদ করে কোনো গ্রামে যখনই গাড়ি পৌঁছেছে তখন ‘লাশ’ ‘লাশ’ শব্দটি ব্যঞ্জনাধর্মী হয়ে ওঠে। লাশটিকে ঘিরে একে একে দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে কলেজ পড়ুয়া ছেলের জন্য মায়ের আশঙ্কা, অপেক্ষরাত প্রেমিকের জন্য প্রেমিকার উৎকণ্ঠা কিংবা আরো কোনো চরিত্রেরা। কিন্তু শেষপর্যন্ত কোনো গ্রামেই পরিচয় মেলে না মৃতদেহটির।

দিনের শেষে রাত্রি নেমে এলে তারা নবগ্রাম থেকে নবীগ্রামে পৌঁছে। এখানে এক ক্ষীণদৃষ্টির বৃদ্ধা লাশটিকে তার নাতি মনে করে কান্নার আহাজারি তোলে কিন্তু এখানেও লাশের পরিচয় মেলে না। সেই রাতে গাড়োয়ান লাশটিকে নিয়ে নবীগ্রামে খোলা আকাশের গাছতলায় আগুন জ্বালিয়ে বসে থাকে। শীতের রাতে জ্বলতে থাকা খড়ের আগুনের সামনে বসে ঝিমুতে ঝিমুতে গাড়োয়ান স্বপ্ন দেখে লাশটি তার কাছে বিড়ি চায় আর বলে, ‘দুনিয়াটা বড়ো সুন্দর জায়গা। এত্ত বড়ো দুনিয়ায় তোমরা মোর ঠিকানা কুন্ঠি খুঁজি পাবা?’

ঠিকানা সম্পর্কিত এই ডায়লগটি আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। যার উত্তর খোঁজার জন্য শীতের সকালে ক্যারকের আওয়াজ তুলে চাকা আবার ঘুরতে থাকে। কর্তিত ফসলের খেত, চরে বেড়ানো গবাদিপশু, পাখপাখালির ডাক পেরিয়ে একটি নবজাতক মানব শিশুর কান্নার চিৎকার নজর কাড়ে। কেন এই শিশু কান্না? সে প্রসঙ্গে একটু পরে আসা যাক। চাকা ঘুরতে ঘুরতে এবার পৌঁছে শিবগঞ্জ গ্রামের একটি বিয়েবাড়ির সম্মুখে। বিয়েবাড়ির মেয়েলিগীত থেমে যায় আর ‘লাশ লাশ’—ধ্বনি গমগম করতে থাকে।

চাকা সিনেমার পোস্টার। আইএমডিবি থেকে নেওয়া ছবি
চাকা সিনেমার পোস্টার। আইএমডিবি থেকে নেওয়া ছবি

এখানেও লাশের ঠিকানা মেলে না। বরং বিয়েবাড়ির লোকজনের কাছে একধরনের প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ে গাড়োয়ান। আর তখন সে বলে, ‘খবরদার লাশে কেউ হাত দিবা না’। এই ডায়লগ লাশটির নতুন পরিচয় সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য। যে লাশটির স্বজন খোঁজার জন্য দুইদিন ধরে গাড়োয়ান বয়ে নিয়ে চলছিল গ্রামের পর গ্রাম, সে এবার সিদ্ধান্ত নেয় লাশটিকে কবর দেয়ার। এটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কারণ তখন পর্যন্ত সে সমষ্টির মত পায়নি। তাই আবার সে চেষ্টা করে।

ক্যারকের আওয়াজে চাকা ঘুরতে থাকে আর তার সঙ্গে সমান তালে দূর থেকে মাইকে ভেসে আসে একটি মৃতের ঘোষণা—এতে নাম, পরিচয় ও ঠিকানা বর্ণিত হয়। এই দৃশ্যে ক্লোজ শটে গাড়োয়ানের মুখাবয়ব ও আকাশের দিকে দৃষ্টি যেন কৈফিয়ত চায়। তারপর গাড়ি একটি গ্রামে পৌঁছে। সেখানে আলাপরত তিনজন বৃদ্ধের কাছে গাড়োয়ান লাশটি দাফনের জন্য সহযোগিতা চাইলে তারা বেওয়ারিশ লাশ অজুহাতে ওই গ্রামে কবর দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে এখানেও সে সমষ্টিগত মতের কাছে নিরুপায় হয়ে থাকে।

আবার গ্রামের মাটির পথ ধরে চাকা ঘুরতে থাকে। এই সিকুয়েন্সে লাশের পায়ে মাছি পড়া ও ফুলে ওঠার দৃশ্য লক্ষ করা যায়। এতে বোঝা যায়, লাশে পচন ধরেছে। মাছিগুলো কীভাবে চরিত্রটির পায়ে বসে আছে—এই প্রশ্নে দৃশ্যটি সম্পর্কে নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম জানান, চরিত্রটির পায়ে মধু লেপে দেওয়া হয়েছিল যাতে মাছি আকৃষ্ট হয়। এরপর গাড়োয়ান একটি সবুজ শ্যামল গ্রামে প্রবেশ করে। সেখানে তার সঙ্গে মসজিদের ইমামের দেখা হয়। তাকে সে অনুনয় করে বলে:

গাড়োয়ান: হুজুর, ...আমারা একটা লাশ লিয়াইছি, বেওয়ারিশ লাশ, এ্যানা মাটি দেওয়া লাগে।

ইমাম: কই, নাম কী মানুষটার?

গাড়োয়ানকে নিরুত্তর দেখে ইমাম বলে: নাম জানো না, মুসলমানের লাশ তো?

শুরুতে যে লাশকে নিতে গাড়োয়ান অস্বীকৃতি জানায় শেষপর্যায়ে সেই লাশের প্রতি তার মমত্ববোধ উত্থিত হয়। অপঘাতে মৃত অপরিচিত লাশটির জন্য গাড়োয়ানের এমন রূপান্তর ব্যক্তিক নাকি সামষ্টিক?

এই প্রশ্নের জবাবে ক্লোজ শটে নির্বাক গাড়োয়ানের মুখচ্ছবিতে যে অসহায়ত্ব লক্ষ করা যায়, তাতে ওই লাশের পাশাপাশি সে নিজেও আত্মপরিচয়ের সংকটে পড়ে। ইমাম লাশের ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে সন্দিহান হওয়ার কারণে লাশটি দাফনে অস্বীকৃতি জানায়। এক্ষেত্রে সে পাপবিদ্ধ হওয়ার শঙ্কাবোধ করে। পূর্বে লাশটির ব্যক্তিক ও সামাজিক পরিচয়ের যে খোঁজ চলছিল এই পর্যায়ে তার ধর্মীয় পরিচয় খোঁজার সংকটের সম্মুখীন হতে হয় গাড়োয়ানকে।

তখন প্রশ্ন জাগে, লাশটির ধর্মীয় পরিচয় বের করার জন্য তার শারীরিক অঙ্গের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারত। কিন্তু নির্মাতা কেন তা করলেন না? এখানেই এই চলচ্চিত্রের মূল বিষয়টি বিদ্যমান। লাশটি যে শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের সংকটের কারণে দাফনে অস্বীকৃত হয়েছে ব্যাপারটি তেমন নয়। এখানে রাষ্ট্র শুরুতেই একটি লাশকে বেওয়ারিশ ঘোষণা করে একজন অপরিচিত গাড়োয়ানের হাতে তুলে দিয়েছে, সেই গাড়োয়ান লাশটিকে নিয়ে পর্যায়ক্রমে ব্যক্তিক সংকট, সামাজিক সংকট ও সর্বশেষে ধর্মীয় পরিচয়ের সংকটে পড়েছে। ফলে ব্যাপারটি অত সহজ নয় যে, শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের সংকট সমাধান হলেই লাশটির দাফন সম্পন্ন হতো।

ব্যক্তি জীবিতকালে আত্মপরিচয়জনিত যে ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয় অপঘাতে মৃত্যুর পর বিবিধ কারণে তার আত্মপরিচয়ের সংকট আরও বেড়েছে—যা এই চলচ্চিত্রে ঘুরেফিরে এসেছে। এই সংকটের সমাধান খোঁজার চেয়ে বরং সেই প্রশ্ন উত্থাপন করাটাই নির্মাতার এই চলচ্চিত্রের বার্তা। কিংবা এই সংকটের সমাধান হয়তোবা তিনি নিয়তি-নির্দিষ্ট ভেবেছেন ফলে চলচ্চিত্রে জন্ম, মৃত্যু ও বিয়েকে সিম্বলিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। একটি নবজাতক শিশুর কান্নার, বিয়েবাড়ির দৃশ্য আর অপঘাতে মরা লাশ তিনটিকেই তিনি নিয়তিতাড়িত কারবার হিসেবেই রাখতে চেয়েছেন হয়তো-বা।

সেলিম আল দীন। ছবি: সংগৃহীত
সেলিম আল দীন। ছবি: সংগৃহীত

এবার সেলিম আল দীনের চাকা প্রসঙ্গে একটু ফেরা যাক। সেক্ষেত্রে বাহের গাড়োয়ানের মনের ভাবান্তরটাই সবচেয়ে টার্নিং পয়েন্ট। মৃত্যু সম্পর্কে যে নান্দনিক দৃশ্যের আকাঙ্ক্ষা তার মনে জাগে সেটা ছিল এমন:

...পাকা ধানের আঁটি বোঝাই ভেজাভেজা গন্ধ ছড়ানো দুই সফল গাড়ি এদের অতিক্রম করে চলে যায়* হঠাৎ আত্মতৃপ্ত বাহের ঘাড় ঘুরিয়ে সে দিকে তাকায়* ভাবে শস্যের চেয়ে কি লাশের মূল্য কম\

না শস্যের চেয়ে লাশ বহনকারীদের অহঙ্কারও কম নয়* কারণ নয়ানপুরের যে গৃহে আজ শোকধ্বনি উঠবে উত্তীর্ণ প্রদোষে সে শস্য সহজে ফলে না* এ যদি সোনার ধান তবে তার রং রুপার* তার জন্ম লবণাক্ত সাগরে\ এই গাড়িতে এমন এক কষ্ট বহন করে নিয়ে যাচ্ছে সে যে তাতে বরং ভরা ধানের সোনার আড়ত ভূষি উড়ে যাবে* এই মৃতকে ঘিরে যে আহাজারি উঠবে পৃথিবীর কোন কোন শস্য তাকে রুখতে পারে না\

চলচ্চিত্রে গাড়োয়ানের যে মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটে নাটকের উপর্যুক্ত উদ্ধৃতি তার কারণ হিসেবে ধরা যায়। গাড়োয়ানের এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। কারণ লাশটির নামধাম-ঠিকানা-পরিজন কোনোকিছুই খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই না-পাওয়ার বেদনা গভীর হয়েছে চলচ্চিত্রের শেষের দৃশ্যে, পড়ন্ত বেলায় লাশটি দাফন করার পর যখন বাহের গাড়োয়ান একটি গাছে হেলান দিয়ে হু হু করে কেঁদে ওঠে। তার এই কান্নার কারণ কী? এ প্রসঙ্গে মার্টিন হাইডেগারের বরাতে বলা যায়—‘ব্যক্তিগত আচরণ ও জনসাধারণের মৃত্যুর বিচিত্রতার মধ্যে একধরনের টেনশন বা উত্তেজনা ক্রিয়া করে। এই উত্তেজনা শুধু মৃত্যুর আলোচনার মধ্যে আসে ব্যাপরটা সেরকম নয়। তা একই সঙ্গে আমাদের সামাজিক অস্তিত্বকেও পরিবর্তিত করে। মৃত্যু একই সঙ্গে ব্যক্তি ও জনসাধারণের মধ্যে সম্পর্ক তৈরিতে একটি ডোমেইনের মতো কাজ করে। ফলে মৃত্যু ব্যক্তিক ও সামষ্টিক উভয় অবস্থার বৈচিত্র্য নির্দেশক হয়ে ওঠে।’

গাড়োয়ান এই বেওয়ারিশ লাশটির ঠিকানা বের করার ক্ষেত্রে ডোমেইনের কাজটি করতে চেয়েছিল। কিন্তু যখন সে তা করতে পারেনি তখন তার মধ্যে যে ব্যক্তিক ক্ষরণ সেটারই বহিঃপ্রকাশ এই কান্না। যদি এই কান্না নির্বাক হতো তাহলে তা একান্তই তার ব্যক্তিগত হয়ে থাকতো কিন্তু যখন কান্নায় শব্দ যুক্ত করা হয়েছে তখন তা সামষ্টিক হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এই আহাজারি সংক্রমিত করতেই সেলিম আল দীনের চাকার গাড়োয়ানের ভূমিকা নেন মোরশেদুল ইসলাম।

Ad 300x250

সম্পর্কিত