বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, বুক ক্যাফে ও আধুনিক ‘হ্যাংআউট’

প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৬, ১৬: ০১
বিশ্বসাহিত্য-কেন্দ্র। ছবি: সংগৃহীত

একসময় বইয়ের দোকানে মানুষ যেত বই কিনতে। এখন অনেকেই যান বই কিনতে, পড়তে, আড্ডা দিতে, কিংবা শুধু বইয়ের গন্ধে কিছুটা সময় কাটাতে। ঢাকার বাতিঘর, বুকওয়ার্ম, পাঠক সমাবেশ কিংবা বিভিন্ন রিডিং ক্যাফেতে ঢুকলে দেখা যায়, কেউ এক কোণে বসে নিজের মতো বই পড়ছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে বই নিয়ে তর্ক করছেন, আবার কোথাও চলছে লেখক-পাঠকের আড্ডা।

বর্তমানে এটি আমাদের খুবই পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বইকে ঘিরে এমন একটি সামাজিক সংস্কৃতি তৈরি হলো কীভাবে? বই পড়া একসময় ছিল নিভৃত, ব্যক্তিগত একটি অভ্যাস। সেই অভ্যাস কীভাবে মানুষের মিলনস্থল, আলোচনার বিষয় বা ‘হ্যাংআউটে’ পরিণত হলো?

বাংলাদেশের এই পাঠসংস্কৃতির বিবর্তনে আজকের বুক ক্যাফে বা আধুনিক বইয়ের দোকান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এর পেছনে রয়েছে এক পাঠচক্রের ইতিহাস। আছেন একজন শিক্ষক এবং তাঁর—‘আলোকিত মানুষ’ গড়ার স্বপ্ন।

যখন বই পড়া ছিল ব্যক্তিগত ব্যাপার

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বই প্রকাশনা ধীরে ধীরে বাড়লেও বই পড়াকে ঘিরে সংগঠিত কোনো আন্দোলন ছিল না। বইমেলা ছিল, লাইব্রেরি ছিল, বইয়ের দোকানও ছিল। কিন্তু বই পড়া অধিকাংশ মানুষের কাছেই ছিল পরীক্ষার প্রস্তুতি, অথবা ব্যক্তিগত শখ।

স্কুল-কলেজের বাইরের বই পড়াকে উৎসাহ দেওয়ার মতো বড় পরিসরের উদ্যোগ খুব কম ছিল। পাঠক তৈরি করার চেয়ে বই প্রকাশের দিকেই জোর ছিল বেশি। এমন সময়েই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একটি ভিন্ন প্রশ্ন তুললেন—শুধু বই প্রকাশ করলেই হবে, নাকি পাঠকও তৈরি করতে হবে?

একটি ছোট পাঠচক্র থেকে যাত্রা

১৯৭৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর কয়েকজন তরুণকে নিয়ে যাত্রা শুরু করে ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। শুরুটা ছিল একটি ছোট পাঠচক্র। উদ্দেশ্য ছিল সহজ—মানুষকে ভালো বই পড়তে উৎসাহিত করা, বই নিয়ে আলোচনা করা, আর বইয়ের মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তোলা। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই এটি আর শুধু একটি সাহিত্য সংগঠন রইল না। ধীরে ধীরে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাঠাভ্যাস আন্দোলনে পরিণত হয়।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দর্শনও ছিল আলাদা। এখানে বই পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জ্ঞান অর্জন নয়, বরং একজন মানুষকে আরও মানবিক, যুক্তিবাদী ও সংস্কৃতিমনস্ক করে তোলা। কেন্দ্রের বহুল পরিচিত স্লোগান—‘আলোকিত মানুষ চাই’ আসলে সেই দর্শনেরই প্রকাশ।

বই বিক্রি নয়, পাঠক তৈরির চেষ্টা

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সবচেয়ে বড় অবদান হলো, তারা কখনো নিজেদের বইয়ের দোকান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়নি। বরং চেষ্টা করেছে এমন মানুষ তৈরি করতে, যারা নিজেরাই বই খুঁজে নেবে।

স্কুলভিত্তিক বইপাঠ কর্মসূচি, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, পাঠচক্র, সাহিত্য আলোচনা, লেখক-আড্ডা—এসব উদ্যোগের মাধ্যমে কয়েক দশকে লাখো শিক্ষার্থী বই পড়ার সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। অনেকের জন্য প্রথম উপন্যাস, প্রথম অনুবাদ সাহিত্য বা প্রথম বিশ্বসাহিত্য পড়ার সুযোগ এসেছে এই কর্মসূচির মাধ্যমে।

আজ বাংলাদেশের অনেক লেখক, শিক্ষক, সাংবাদিক কিংবা গবেষক তাঁদের পাঠজীবনের শুরুতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রভাবের কথা স্মরণ করেন।

রিডিং ক্যাফে: বই পড়ার নতুন ঠিকানা

নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প যেমন বড় হয়েছে, তেমনি বদলেছে পাঠকদের চাহিদাও।

এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যায় নতুন প্রজন্মের স্বাধীন বইয়ের দোকানগুলোতে। বাতিঘর, বুকওয়ার্ম কিংবা অন্যান্য আধুনিক বইয়ের দোকান শুধু বই বিক্রি করে না, তারা বইকে ঘিরে একটি অভিজ্ঞতা তৈরি করে, মানুষের সংস্কৃতি বিকাশের জায়গা করে দেয়।

এই রিডিং ক্যাফেগুলোতে বইয়ের তাকের পাশে বসে পড়া যায়, কফি খেতে খেতে বই উল্টানো যায়, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়, লেখকদের সঙ্গে পাঠকদের কথা হয়, বুক ক্লাবের বৈঠক বসে। বইয়ের দোকান ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক মিলনস্থলেও পরিণত হয়েছে।

অর্থাৎ বই এখন শুধু একটি পণ্য নয়, এটি সামাজিক যোগাযোগেরও একটি মাধ্যম। এই পরিবর্তনের পেছনে অবশ্যই ডিজিটাল যুগের প্রভাব রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বই নিয়ে আলোচনা, বুক ক্লাব, বুকস্টাগ্রাম কিংবা বুকটিউব—সব মিলিয়ে বইকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন এক পাঠকসমাজ। তবে, ঠিক এই চর্চাটাই শুরু করেছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এখনো বাংলামোটরে তাদের ভবনে গেলে এই চর্চাটিই পুরোনো আমলের মোড়কে দেখা যায়।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভূমিকা কি শেষ

একেবারেই নয়। আজকের এই নতুন পাঠসংস্কৃতিকে বিশ্লেষণ করলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে আরও গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। কারণ আধুনিক বইয়ের দোকান বা রিডিং ক্যাফে মূলত সেই মানুষদেরই একটি অংশকে ঘিরে তৈরি হয়েছে, যাঁদের বই পড়ার অভ্যাস আগে থেকেই ছিল। আর কয়েক দশক ধরে সেই পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যে ভূমিকা রেখেছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

এটি এমন নয় যে এখনকার রিডিং ক্যাফেগুলো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের উত্তরসূরি। আবার এটাও নয় যে তারা একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী। বরং, তারা বাংলাদেশের পাঠসংস্কৃতির দুটি ভিন্ন অধ্যায়।

মাধ্যম বদলেছে, লক্ষ্য একই

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বইকে মানুষের কাছে নিয়ে গেছে পাঠাভ্যাস আন্দোলনের মাধ্যমে। আজকের স্বাধীন বইয়ের দোকান ও রিডিং ক্যাফেগুলো নতুন উপায়ে বইকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের অংশ করে তুলছে।

ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, স্কুলভিত্তিক পাঠচক্র, বইপাঠ কর্মসূচির গণ্ডি পার হয়ে বুক ক্লাব, লেখক-পাঠক আড্ডা, ক্যাফে সংস্কৃতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বই নিয়ে আলোচনা— এই পদ্ধতিগুলো আলাদা, কিন্তু লক্ষ্য এক। তা হলো মানুষকে বইয়ের আরও কাছে নিয়ে যাওয়া।

বাংলাদেশে বই পড়ার সংস্কৃতি রাতারাতি তৈরি হয়নি। এটি বহু মানুষের দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফল। সেই ইতিহাসে যেমন আধুনিক বইয়ের দোকান ও রিডিং ক্যাফের নাম থাকবে, তেমনি শুরুতেই থাকবে আলোকিত মানুষ তৈরির লক্ষ্যে শুরু হওয়া একটি ছোট পাঠচক্র।

Ad 300x250

সম্পর্কিত