জি এইচ হাবীব

শহীদ তাঁর মামার কাছ থেকে কিছু বামপন্থী তথা উদারনৈতিক জনপ্রিয় শব্দ শিখেছিল। যাঁকে সে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক আদর্শ হিসেবে জ্ঞান করত। তিনি সম্ভবত তাঁর এমএ ডিগ্রি অর্জনের শেষ দিকে ছিলেন। শহীদের বাসা ছিল ডাকঘরের পাশেই, আর তাঁর মা ছিলেন নরম মনের ধার্মিক। আমি খুব একটা বাধ্যগত পুত্র ছিলাম না, তবে শহীদ সম্ভবত বাবা-মার ধৈর্যচ্যুতি ঘটাত। অবশ্য কিশোর-কিশোরীর জন্য বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়। তবে আমার বন্ধুটি ছাত্র হিসেবে ভালো ছিল এবং পরে পেশাগত জীবনে যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছিল। যতদূর মনে করতে পারি, শহীদ ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য নামাজ পড়ার কথা বলে আমাকে খোঁচা দেওয়ায় আমার আত্মঅহমিকায় আঘাত লেগেছিল। কিন্তু মনে মনে আমি একটা কথা জানতাম—গণিতে যাতে ভালো করি সেজন্য আমি আসলেই প্রার্থনা করেছিলাম; ওই বিষয়টা্য় আমার যথেষ্ট আত্মবিশাস ছিল না। কিন্তু প্রার্থনা করার পরেও আমি গণিতে তেমন ভালো করিনি; আমার নম্বর ক্লাসের প্রায় নীচের দিকে ছিল।
আমার বাবা তাঁর ধার্মিকতা ও সুফি প্রবণতা সত্বেও, একজন ব্যক্তিগত শিক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি আমাকে গণিতের ব্যাপারে সাহায্য করছিলেন। কাজেই পরীক্ষায় ভালো করার জন্য প্রার্থনা করে লাভ কী? আমি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম, তবে কোনো জবাব পেলাম না। শহীদের ফল আমার চেয়ে ভালো হচ্ছে, অথচ দৃশ্যত সে ধর্মের ব্যাপারে সন্দিহান। তো, দেখা গেল নামাজ পড়ে বা না পড়ে, কোনোভাবেই আমার গণিতটা উৎরালো না। তাছাড়া, আমি আমার বাবার সঙ্গে এক প্রতিবেশীল তুলনা করেও দেখলাম; আমার বাবার চাইতে তাঁর ধন-সম্পদ বেশি ছিল; তিনি নিরীহ নির্দোষ মানুষকে ঠকাতেনও। একজন মন্দ লোক কীভাবে জিতে যায়, আর আধ্যাত্মিকভাবে অনুপ্রাণিত একজন মানুষ পরাজিত হয়? এই দ্বন্দ্বটি আমার মনের মধ্যে অনির্বাণ শিখার মতো জ্বলতে থাকত; কিন্তু তারপরেও আমি সে প্রশ্নের কোনো জবাব খুঁজে পেতাম না—আমার বাবার কাছেও না, রাজু চাচার সুফি চিন্তাধারার মধ্যেও না।
আমি যতই রাজু চাচার কথা ভাবি ততই আমার মনে হয় তিনি ছিলেন এক অবিশ্বাস্য চরিত্র, অথচ তিনি এমন একজন মানুষ যিনি এমনকি উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঠও শেষ করেননি। তিনি ছিলেন গভীর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক মূল্যবোধে পরিপূর্ণ একজন মানুষ, যাঁর সেই অবস্থানের পেছনে লুকানো কোনো উদ্দেশ্য কাজ করত না। তিনি ঠিক পণ্ডিত লোকজনের মতো ছিলেন না। বরং ছিলেন ভ্রাম্যমাণ তপস্বী, দরবেশ বা স্থানীয় সমমনা লোকজনের মতো মরমী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দ্বারা অনুপ্রাণিতদের একজন। আমার বাবা সুফিধারার শিক্ষায় উদ্দীপ্ত মানুষ, তবে তিনি যে কোনো গুপ্ত শক্তির অধিকারী এমন দাবি তিনি কখনো করতেন না। আমার ধারণা, তিনি সাধারণের বোধবুদ্ধির বাইরের গোষ্ঠীর কোনো একজন ছিলেন।
অতীতের অন্য যেকোনো সময়ের চাইতে বেশি করে আমার এখন মনে হয় যে রাজু চাচা যখন আমার বাবাকে তাঁর অনীহা সত্ত্বেও, নিজের আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, তখন তিনি আসলে জীবনের আধ্যাত্মিক মানে খুঁড়ে বের করার চেষ্টা করছিলেন। তাঁকে জানার কয়েক দশক পরেও সেসব প্রশ্ন আমার মধ্যে জাগরূক ছিল। কখনো পরিহাসচ্ছলে, তবে আরো অনেকবার বেশ গম্ভীরভাবেই, তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি ভাগ্যবান। তোমার বাবা একজন জাগ্রত মানুষ!’ কথাটার মরমী অর্থ সম্পর্কে সে সময়ে সচেতন না হওয়ায় আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আর, চাচা, আপনি?’ তিনি মৃদু হেসে জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি ঘুমন্ত মানুষ।’ আমার ধারণা, চাচার একটা হীনম্মন্যতার বোধ ছিল; তিনি মনে করতেন তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিকভাবে নিদ্রামগ্ন, কিন্তু আমার বাবা আধ্যাত্মিকভাবে সজাগ। আমি শুনেছিলাম, আমার বাবার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগে রাজু চাচা বাড়ি ছেড়ে মাজারে মাজারে ঘুরতেন এবং তিনি আমার বাবার কাছে একান্তে বলেছিলেন কাজটা তিনি আবারো করতে চান। আমার বাবা অবশ্য তাঁকে এই পরামর্শ দিয়েছিলেন যে তিনি সংসারে বাস করেও আধ্যাত্মিকভাবে উজ্জীবিত জীবন যাপন করতে পারেন।
আমার বাবার বিচিত্র আধ্যাত্মিকতা সত্বেও, ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম তাঁর বিশ্বাসের জগতে প্রবেশ করতে পারেনি। তিনি আমাকে একাধিকবার বলেছেন যে পার্শ্ববর্তী ক্যাথলিক গির্জা থেকে আসা পাদ্রিরা মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে এসে তাঁকে খ্রিষ্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে চাইতেন। আমার বাবা কিছুদিন চার্চ স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন; তবে কখনোই তিনি খ্রিষ্টধর্মে সমর্পিত হতে চাননি। একজন ক্যাথলিক যাজক তাঁকে বাইবেলের একটি কপি উপহার দিয়েছিলেন; সেটা তখনো আমাদের বাড়িতে ছিল।
তাছাড়া, রাজু চাচা আমাকে বলেছিলেন আমার বাবা তাঁকে নিজ পক্ষপুটে আশ্রয় দেওয়ায় তিনি কৃতজ্ঞ; এবং বাবা তাঁকে মহৎ সুফী প্রজ্ঞা ব্যাখ্যা করে যাচ্ছেন। যখন কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা আকস্মিক অসুস্থতার সময় আমরা কারো প্রয়োজন অনুভব করতাম, তখন তিনি শূন্য থেকে উদয় হতেন। বরষার মরশুমে লক্ষ্যায় হঠাৎ করে রাতারাতি বান ডাকত। একবার আমরা সকালে উঠে দেখি আমাদের বাড়ির সামনের উঠোনে হাঁটু পানি! নৌকা ছিল না আমাদের এবং কেউ বুঝতে পারছিলাম না কীভাবে স্কুলে বা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে বাজারে যাবো। হঠাৎ রাজু চাচা একটা ছোট নৌকা নিয়ে হাজির হলেন এবং সঙ্গে আমাদের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
আমার বাবার অতীন্দ্রিয় উপলব্ধি তখনও বিভিন্ন বইপত্র ও তাঁর ধর্মীয় অনুশীলনের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল। সুফি মরমীবাদ তিনি যে শুধু মুসলমানদের মধ্যেই খুঁজে পেতেন তা নয়: হিন্দুধর্ম, ইহুদিধর্ম, বৌদ্ধধর্ম এবং খ্রিষ্টধর্মেও তিনি মরমীবাদের দেখা পেয়েছিলেন; হতেই পারে যে তা ভিন্ন রূপে, ভিন্ন ধরনে। তিনি বিশ্বাস করতেন সুফি মরমীবাদ আসলে ইসলামেরই একটি অংশ; এবং সেটা ইসলামের মূল শিক্ষার ভেতরেই রয়েছে, বাইরে নয়। যদিও সেসবের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ভিন্নতা থাকতেই পারে। তার চাইতে যেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তা হলো, তিনি মনে করতেন আধ্যাত্মিকতা একজন মানুষ কেবল তার নিজের প্রার্থনা, ধ্যান, ধর্মীয় কাজকর্ম ও নিঃস্বার্থ জনসেবার মাধ্যমেই অর্জন করতে পারে। আমার আবছাভাবে মনে পড়ছে যে একবার তিনি রাজু চাচাকে বলেছিলেন, তাঁকে তাঁর আধ্যাত্মিক চেতনা নিজের প্রচেষ্টাতেই অর্জন করতে হয়েছে। এই কথাটা তাঁর খুব প্রিয় ছিল যে ঐশ্বরিক জ্ঞান বা সচেতনতা এমনকি পিতা থেকে পুত্রের মধ্যেও হস্তান্তরযোগ্য নয়। তিনি এই ধরনের গল্প-গাথা একদমই পছন্দ করতেন না যে কোনো প্রবীণ পীর মারা গেলে তাঁর কথিত আধ্যাত্মিক শক্তি তাঁর পুত্র বা তাঁর প্রিয় কোনো মুরিদ তথা শিষ্যকে নতুন করে অর্পণ করা হতো। আমি এমন কাহিনীও শুনেছি যে, কোনো একজন পীর মারা যাওয়ার পর তাঁর পুত্রকে তাঁর স্থানে অধিষ্ঠিত করা হয়েছিল।
আধ্যাত্মিক বই-পত্রের প্রতি আমার বাবার অবিশ্বাস্য রকমের ভালোবাসা ছিল। তাঁর সংগ্রহে এ ধরনের বেশকিছু বই ছিল। আমার বাবা মাঝে মধ্যে যেসব বই পড়তেন তার মধ্যে অন্যতম ছিল সুফি সাহিত্যের ধ্রুপদি গ্রন্থ ফরিদউদ্দিন আত্তারের (আনুমানিক ১১৪৫- আনুমানিক ১২২১) ‘দ্য কনফারেন্স অফ বার্ডস’। তিনি একবার বইটিতে উল্লিখিত ‘পাখি’ শব্দটির গুঢ় অর্থ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। দীর্ঘদিন পর আমি বইটি সম্পর্কে আরো কিছু জানতে পারি—রচনাটি হচ্ছে পৌরাণিক পক্ষীরাজ সিমুর্গের সন্ধান নিয়ে লেখা একটি রূপকধর্মী সুফি কবিতা। আমার বাবা বইটি পাশের শহরের তৎকালীন শিক্ষা কর্মকর্তাকে ধার দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি আবার সেটা অন্য কাউকে পড়তে দিয়েছিলেন। স্পষ্টতই, বইটি হারিয়ে গিয়েছিল। এতে আমার বাবা খুব দুঃখ পেয়েছিলেন; তবে, আমার বিশ্বাস তিনি হারানো বইটির একটি বিকল্প খুঁজে পেয়েছিলেন। একই ফারসি কবির ‘তাজকিরাতুল আউলিয়া’ (‘সাধু-সন্তদের স্মৃতিচারণ’) বইটিও তিনি খুব পছন্দ করতেন, যেখানে ৩৯ জন সুফি সাধকের অলৌকিক ঘটনার কাহিনি বলা হয়েছে। কিন্তু রাজু চাচার ধর্মনিষ্ঠ সচেতনতা ছিল যতটা না অন্যদের কাছ থেকে পাওয়া, তার চাইতে ঢের বেশি সহজাত উপলব্ধি থেকে আসা—আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য তিনি বইয়ের দ্বারস্থ হতেন না; তিনি যেমন, ঠিক তেমনই-ই ছিলেন—কখনো অন্য কিছু হওয়ার ভান করেননি।
সম্ভবত, আমি তখন দশম শ্রেণিতে পড়ি। একদিন বাবা কী একটা কাজে বাইরে গেছেন, এমন সময় রাজু চাচা এলেন। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতে পছন্দ করতেন। আমি যে কলেজে যাওয়ার কথা ভাবছি, তাতে তিনি খুশি হয়েছিলেন এবং আমাকে অর্জনযোগ্য সর্বোচ্চ ডিগ্রিলাভের জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। ঐশী সাধকদের ব্যাপারে আমি কিছুটা সন্দেহবাদী ছিলাম, তাই আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম: ‘চাচা, আপনার কি মনে হয় মানুষ আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে পারে?’ তারপর আরো বললাম,
‘আল্লাহ তো অনেক দূরের, ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তাছাড়া, আমার তো মাঝে মাঝে তাঁর কাছে প্রার্থনা করতেও ভয় লাগে,’ বাবাকে এমন ধারা প্রশ্ন করলে, যা বোধকরি অবিশ্বাসের কাছাকাছি, তিনি আমাকে চড়ই মেরে বসতেন। তার অর্থ, আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে আমার চাচা নিজের সাধ্য অনুযায়ী আধ্যাত্মিক প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার ব্যাপারে বেশি যত্নশীল ছিলেন।
আমার বাবা নিজের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস সম্পর্কে আমার মাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করাতে বা বোঝাতে পারেননি। মানুষ কীভাবে সুফি হয়, সেকথা বোঝার ধারে কাছেও আমি ছিলাম না তখন। কিন্তু আমি প্রশ্নগুলো করেছিলাম বলে রাজু চাচা আমাকে সন্দেহবাদী বলে মনে করেননি। ‘আল্লাহ তোমার কাছ থেকে দূরে নন, কিন্তু তোমার প্রার্থনা, ধ্যান, অন্যের জন্য ভালো কাজ, তাঁর প্রতি ভালোবাসা, আর বিশ্বাসের মাধ্যমে তোমাকে তাঁর খোঁজ করতে হবে।’ কিন্তু আমি কথাগুলো ঠিক পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কারণ আমি আমার নিজের মধ্যে আল্লাহর কোনো চিহ্নই দেখতে পাচ্ছিলাম না; রেজু চাচার কথাগুলো আমি ঠিক মন দিয়ে শুনছিলাম না। আমি ভাবছিলাম, আল্লাহ কীভাবে এমন একজনের মধ্যে থাকবেন যে নিয়মিত প্রার্থনা করে না, যার অভ্যাস তার বাবা-মায়ের কথা না শোনা, যে মাঝে মাঝে মিথ্যা কথা বলে। আর তার মা পরিবারের সবার জন্য যে মিষ্টি বানান তা চুরি করে! আল্লাহ কি এত সস্তা! তাই, আমি তাঁকে বললাম, ‘চাচা, আমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছি না।’ ইতিমধ্যে, আমার বাবা সেখানে এসে পৌঁছালেন, এবং চাচা এই বলে আলাপটি শেষ করলেন: ‘তিনি আছেন তো বটেই, কিন্তু তোমাকে তাঁর খোঁজ করতে হবে!’ এরপর আমি সেখান থেকে চলে গেলাম, কিন্তু আমার সংশয়ের কোনো শেষ ছিল না।

শহীদ তাঁর মামার কাছ থেকে কিছু বামপন্থী তথা উদারনৈতিক জনপ্রিয় শব্দ শিখেছিল। যাঁকে সে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক আদর্শ হিসেবে জ্ঞান করত। তিনি সম্ভবত তাঁর এমএ ডিগ্রি অর্জনের শেষ দিকে ছিলেন। শহীদের বাসা ছিল ডাকঘরের পাশেই, আর তাঁর মা ছিলেন নরম মনের ধার্মিক। আমি খুব একটা বাধ্যগত পুত্র ছিলাম না, তবে শহীদ সম্ভবত বাবা-মার ধৈর্যচ্যুতি ঘটাত। অবশ্য কিশোর-কিশোরীর জন্য বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়। তবে আমার বন্ধুটি ছাত্র হিসেবে ভালো ছিল এবং পরে পেশাগত জীবনে যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছিল। যতদূর মনে করতে পারি, শহীদ ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য নামাজ পড়ার কথা বলে আমাকে খোঁচা দেওয়ায় আমার আত্মঅহমিকায় আঘাত লেগেছিল। কিন্তু মনে মনে আমি একটা কথা জানতাম—গণিতে যাতে ভালো করি সেজন্য আমি আসলেই প্রার্থনা করেছিলাম; ওই বিষয়টা্য় আমার যথেষ্ট আত্মবিশাস ছিল না। কিন্তু প্রার্থনা করার পরেও আমি গণিতে তেমন ভালো করিনি; আমার নম্বর ক্লাসের প্রায় নীচের দিকে ছিল।
আমার বাবা তাঁর ধার্মিকতা ও সুফি প্রবণতা সত্বেও, একজন ব্যক্তিগত শিক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি আমাকে গণিতের ব্যাপারে সাহায্য করছিলেন। কাজেই পরীক্ষায় ভালো করার জন্য প্রার্থনা করে লাভ কী? আমি নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম, তবে কোনো জবাব পেলাম না। শহীদের ফল আমার চেয়ে ভালো হচ্ছে, অথচ দৃশ্যত সে ধর্মের ব্যাপারে সন্দিহান। তো, দেখা গেল নামাজ পড়ে বা না পড়ে, কোনোভাবেই আমার গণিতটা উৎরালো না। তাছাড়া, আমি আমার বাবার সঙ্গে এক প্রতিবেশীল তুলনা করেও দেখলাম; আমার বাবার চাইতে তাঁর ধন-সম্পদ বেশি ছিল; তিনি নিরীহ নির্দোষ মানুষকে ঠকাতেনও। একজন মন্দ লোক কীভাবে জিতে যায়, আর আধ্যাত্মিকভাবে অনুপ্রাণিত একজন মানুষ পরাজিত হয়? এই দ্বন্দ্বটি আমার মনের মধ্যে অনির্বাণ শিখার মতো জ্বলতে থাকত; কিন্তু তারপরেও আমি সে প্রশ্নের কোনো জবাব খুঁজে পেতাম না—আমার বাবার কাছেও না, রাজু চাচার সুফি চিন্তাধারার মধ্যেও না।
আমি যতই রাজু চাচার কথা ভাবি ততই আমার মনে হয় তিনি ছিলেন এক অবিশ্বাস্য চরিত্র, অথচ তিনি এমন একজন মানুষ যিনি এমনকি উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঠও শেষ করেননি। তিনি ছিলেন গভীর আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক মূল্যবোধে পরিপূর্ণ একজন মানুষ, যাঁর সেই অবস্থানের পেছনে লুকানো কোনো উদ্দেশ্য কাজ করত না। তিনি ঠিক পণ্ডিত লোকজনের মতো ছিলেন না। বরং ছিলেন ভ্রাম্যমাণ তপস্বী, দরবেশ বা স্থানীয় সমমনা লোকজনের মতো মরমী ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দ্বারা অনুপ্রাণিতদের একজন। আমার বাবা সুফিধারার শিক্ষায় উদ্দীপ্ত মানুষ, তবে তিনি যে কোনো গুপ্ত শক্তির অধিকারী এমন দাবি তিনি কখনো করতেন না। আমার ধারণা, তিনি সাধারণের বোধবুদ্ধির বাইরের গোষ্ঠীর কোনো একজন ছিলেন।
অতীতের অন্য যেকোনো সময়ের চাইতে বেশি করে আমার এখন মনে হয় যে রাজু চাচা যখন আমার বাবাকে তাঁর অনীহা সত্ত্বেও, নিজের আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, তখন তিনি আসলে জীবনের আধ্যাত্মিক মানে খুঁড়ে বের করার চেষ্টা করছিলেন। তাঁকে জানার কয়েক দশক পরেও সেসব প্রশ্ন আমার মধ্যে জাগরূক ছিল। কখনো পরিহাসচ্ছলে, তবে আরো অনেকবার বেশ গম্ভীরভাবেই, তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি ভাগ্যবান। তোমার বাবা একজন জাগ্রত মানুষ!’ কথাটার মরমী অর্থ সম্পর্কে সে সময়ে সচেতন না হওয়ায় আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আর, চাচা, আপনি?’ তিনি মৃদু হেসে জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি ঘুমন্ত মানুষ।’ আমার ধারণা, চাচার একটা হীনম্মন্যতার বোধ ছিল; তিনি মনে করতেন তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিকভাবে নিদ্রামগ্ন, কিন্তু আমার বাবা আধ্যাত্মিকভাবে সজাগ। আমি শুনেছিলাম, আমার বাবার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগে রাজু চাচা বাড়ি ছেড়ে মাজারে মাজারে ঘুরতেন এবং তিনি আমার বাবার কাছে একান্তে বলেছিলেন কাজটা তিনি আবারো করতে চান। আমার বাবা অবশ্য তাঁকে এই পরামর্শ দিয়েছিলেন যে তিনি সংসারে বাস করেও আধ্যাত্মিকভাবে উজ্জীবিত জীবন যাপন করতে পারেন।
আমার বাবার বিচিত্র আধ্যাত্মিকতা সত্বেও, ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম তাঁর বিশ্বাসের জগতে প্রবেশ করতে পারেনি। তিনি আমাকে একাধিকবার বলেছেন যে পার্শ্ববর্তী ক্যাথলিক গির্জা থেকে আসা পাদ্রিরা মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে এসে তাঁকে খ্রিষ্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে চাইতেন। আমার বাবা কিছুদিন চার্চ স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন; তবে কখনোই তিনি খ্রিষ্টধর্মে সমর্পিত হতে চাননি। একজন ক্যাথলিক যাজক তাঁকে বাইবেলের একটি কপি উপহার দিয়েছিলেন; সেটা তখনো আমাদের বাড়িতে ছিল।
তাছাড়া, রাজু চাচা আমাকে বলেছিলেন আমার বাবা তাঁকে নিজ পক্ষপুটে আশ্রয় দেওয়ায় তিনি কৃতজ্ঞ; এবং বাবা তাঁকে মহৎ সুফী প্রজ্ঞা ব্যাখ্যা করে যাচ্ছেন। যখন কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা আকস্মিক অসুস্থতার সময় আমরা কারো প্রয়োজন অনুভব করতাম, তখন তিনি শূন্য থেকে উদয় হতেন। বরষার মরশুমে লক্ষ্যায় হঠাৎ করে রাতারাতি বান ডাকত। একবার আমরা সকালে উঠে দেখি আমাদের বাড়ির সামনের উঠোনে হাঁটু পানি! নৌকা ছিল না আমাদের এবং কেউ বুঝতে পারছিলাম না কীভাবে স্কুলে বা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে বাজারে যাবো। হঠাৎ রাজু চাচা একটা ছোট নৌকা নিয়ে হাজির হলেন এবং সঙ্গে আমাদের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
আমার বাবার অতীন্দ্রিয় উপলব্ধি তখনও বিভিন্ন বইপত্র ও তাঁর ধর্মীয় অনুশীলনের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল। সুফি মরমীবাদ তিনি যে শুধু মুসলমানদের মধ্যেই খুঁজে পেতেন তা নয়: হিন্দুধর্ম, ইহুদিধর্ম, বৌদ্ধধর্ম এবং খ্রিষ্টধর্মেও তিনি মরমীবাদের দেখা পেয়েছিলেন; হতেই পারে যে তা ভিন্ন রূপে, ভিন্ন ধরনে। তিনি বিশ্বাস করতেন সুফি মরমীবাদ আসলে ইসলামেরই একটি অংশ; এবং সেটা ইসলামের মূল শিক্ষার ভেতরেই রয়েছে, বাইরে নয়। যদিও সেসবের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে ভিন্নতা থাকতেই পারে। তার চাইতে যেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তা হলো, তিনি মনে করতেন আধ্যাত্মিকতা একজন মানুষ কেবল তার নিজের প্রার্থনা, ধ্যান, ধর্মীয় কাজকর্ম ও নিঃস্বার্থ জনসেবার মাধ্যমেই অর্জন করতে পারে। আমার আবছাভাবে মনে পড়ছে যে একবার তিনি রাজু চাচাকে বলেছিলেন, তাঁকে তাঁর আধ্যাত্মিক চেতনা নিজের প্রচেষ্টাতেই অর্জন করতে হয়েছে। এই কথাটা তাঁর খুব প্রিয় ছিল যে ঐশ্বরিক জ্ঞান বা সচেতনতা এমনকি পিতা থেকে পুত্রের মধ্যেও হস্তান্তরযোগ্য নয়। তিনি এই ধরনের গল্প-গাথা একদমই পছন্দ করতেন না যে কোনো প্রবীণ পীর মারা গেলে তাঁর কথিত আধ্যাত্মিক শক্তি তাঁর পুত্র বা তাঁর প্রিয় কোনো মুরিদ তথা শিষ্যকে নতুন করে অর্পণ করা হতো। আমি এমন কাহিনীও শুনেছি যে, কোনো একজন পীর মারা যাওয়ার পর তাঁর পুত্রকে তাঁর স্থানে অধিষ্ঠিত করা হয়েছিল।
আধ্যাত্মিক বই-পত্রের প্রতি আমার বাবার অবিশ্বাস্য রকমের ভালোবাসা ছিল। তাঁর সংগ্রহে এ ধরনের বেশকিছু বই ছিল। আমার বাবা মাঝে মধ্যে যেসব বই পড়তেন তার মধ্যে অন্যতম ছিল সুফি সাহিত্যের ধ্রুপদি গ্রন্থ ফরিদউদ্দিন আত্তারের (আনুমানিক ১১৪৫- আনুমানিক ১২২১) ‘দ্য কনফারেন্স অফ বার্ডস’। তিনি একবার বইটিতে উল্লিখিত ‘পাখি’ শব্দটির গুঢ় অর্থ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। দীর্ঘদিন পর আমি বইটি সম্পর্কে আরো কিছু জানতে পারি—রচনাটি হচ্ছে পৌরাণিক পক্ষীরাজ সিমুর্গের সন্ধান নিয়ে লেখা একটি রূপকধর্মী সুফি কবিতা। আমার বাবা বইটি পাশের শহরের তৎকালীন শিক্ষা কর্মকর্তাকে ধার দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি আবার সেটা অন্য কাউকে পড়তে দিয়েছিলেন। স্পষ্টতই, বইটি হারিয়ে গিয়েছিল। এতে আমার বাবা খুব দুঃখ পেয়েছিলেন; তবে, আমার বিশ্বাস তিনি হারানো বইটির একটি বিকল্প খুঁজে পেয়েছিলেন। একই ফারসি কবির ‘তাজকিরাতুল আউলিয়া’ (‘সাধু-সন্তদের স্মৃতিচারণ’) বইটিও তিনি খুব পছন্দ করতেন, যেখানে ৩৯ জন সুফি সাধকের অলৌকিক ঘটনার কাহিনি বলা হয়েছে। কিন্তু রাজু চাচার ধর্মনিষ্ঠ সচেতনতা ছিল যতটা না অন্যদের কাছ থেকে পাওয়া, তার চাইতে ঢের বেশি সহজাত উপলব্ধি থেকে আসা—আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য তিনি বইয়ের দ্বারস্থ হতেন না; তিনি যেমন, ঠিক তেমনই-ই ছিলেন—কখনো অন্য কিছু হওয়ার ভান করেননি।
সম্ভবত, আমি তখন দশম শ্রেণিতে পড়ি। একদিন বাবা কী একটা কাজে বাইরে গেছেন, এমন সময় রাজু চাচা এলেন। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলতে পছন্দ করতেন। আমি যে কলেজে যাওয়ার কথা ভাবছি, তাতে তিনি খুশি হয়েছিলেন এবং আমাকে অর্জনযোগ্য সর্বোচ্চ ডিগ্রিলাভের জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। ঐশী সাধকদের ব্যাপারে আমি কিছুটা সন্দেহবাদী ছিলাম, তাই আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম: ‘চাচা, আপনার কি মনে হয় মানুষ আল্লাহর কাছে পৌঁছাতে পারে?’ তারপর আরো বললাম,
‘আল্লাহ তো অনেক দূরের, ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তাছাড়া, আমার তো মাঝে মাঝে তাঁর কাছে প্রার্থনা করতেও ভয় লাগে,’ বাবাকে এমন ধারা প্রশ্ন করলে, যা বোধকরি অবিশ্বাসের কাছাকাছি, তিনি আমাকে চড়ই মেরে বসতেন। তার অর্থ, আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে আমার চাচা নিজের সাধ্য অনুযায়ী আধ্যাত্মিক প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার ব্যাপারে বেশি যত্নশীল ছিলেন।
আমার বাবা নিজের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস সম্পর্কে আমার মাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করাতে বা বোঝাতে পারেননি। মানুষ কীভাবে সুফি হয়, সেকথা বোঝার ধারে কাছেও আমি ছিলাম না তখন। কিন্তু আমি প্রশ্নগুলো করেছিলাম বলে রাজু চাচা আমাকে সন্দেহবাদী বলে মনে করেননি। ‘আল্লাহ তোমার কাছ থেকে দূরে নন, কিন্তু তোমার প্রার্থনা, ধ্যান, অন্যের জন্য ভালো কাজ, তাঁর প্রতি ভালোবাসা, আর বিশ্বাসের মাধ্যমে তোমাকে তাঁর খোঁজ করতে হবে।’ কিন্তু আমি কথাগুলো ঠিক পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কারণ আমি আমার নিজের মধ্যে আল্লাহর কোনো চিহ্নই দেখতে পাচ্ছিলাম না; রেজু চাচার কথাগুলো আমি ঠিক মন দিয়ে শুনছিলাম না। আমি ভাবছিলাম, আল্লাহ কীভাবে এমন একজনের মধ্যে থাকবেন যে নিয়মিত প্রার্থনা করে না, যার অভ্যাস তার বাবা-মায়ের কথা না শোনা, যে মাঝে মাঝে মিথ্যা কথা বলে। আর তার মা পরিবারের সবার জন্য যে মিষ্টি বানান তা চুরি করে! আল্লাহ কি এত সস্তা! তাই, আমি তাঁকে বললাম, ‘চাচা, আমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছি না।’ ইতিমধ্যে, আমার বাবা সেখানে এসে পৌঁছালেন, এবং চাচা এই বলে আলাপটি শেষ করলেন: ‘তিনি আছেন তো বটেই, কিন্তু তোমাকে তাঁর খোঁজ করতে হবে!’ এরপর আমি সেখান থেকে চলে গেলাম, কিন্তু আমার সংশয়ের কোনো শেষ ছিল না।
.png)

রেলে ‘হরতাল’ ‘হরতাল’ একটা রব উঠেছে! সে খবর ইঞ্জিন, লাইন, ঘণ্টা, সিগন্যাল এদের কাছেও পৌঁছে গেছে। তাই এরা একটা সভা ডাকল। মস্ত সভা। পূর্ণিমার দিন রাত দুটোয় অস্পষ্ট মেঘে ঢাকা চাঁদের আলোর নীচে সবাই জড়ো হল। হাঁপাতে হাঁপাতে বিশালবপু সভাপতি ইঞ্জিন মশাই এলেন। তাঁর লেট হয়ে গেছে।
১১ ঘণ্টা আগে
বন্ধুমহলে নাম শুনেছিলুম আগেই; চোখে দেখলুম লেক-লগ্ন একটি ক্লাবের বাইশে শ্রাবণের অনুষ্ঠানে। উজ্জ্বল আলোয়, সুবেশ, চিক্কণ এবং সাধারণত কাব্য সম্বন্ধে উদাসীন মেয়ে পুরুষের ভিড়ের মধ্যে কালো একটি ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে, বেশ চেঁচিয়ে, বেশ স্পষ্ট ক’রে রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে নিজের লেখা একটি কবিতা পড়লো।
১৩ ঘণ্টা আগে
কম করে হলেও এক হাজার বছর ধরে কবিতা লিখছে বাংলাভাষী মানুষ; এ অঞ্চলে জন্মেছেন অগণিত ভাবমূর্তিসম্পন্ন কবি। উপাধিপ্রবণ বাঙালি কবিসমাজ তৈরি করে নিয়েছে নানা ধরনের উপাধি—‘কবিকঙ্কন’, ‘বিশ্বকবি’, ‘বিদ্রোহী কবি’, ‘পল্লীকবি’, ‘রূপসী বাংলার কবি’। তবে ‘কিশোর-কবি’ অভিধা পেয়েছেন মূলত একজনই—সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬
১৩ ঘণ্টা আগে
কাব্য-সাহিত্যের অনুর্বরতাও এই জন্য যে কবিতা লেখার মজুরীতে কবি বাঁচে না। নতুন যুগের অলঙ্ঘ নির্দেশে তাকে আজ দেহমনে চব্বিশ ঘণ্টার সাহচার্য বরণ করে নিতে হয় তার যে উলঙ্গ ছেলেরা আজ বুলেট খেয়ে মরছে তাদের, কাব্যচর্চা আর জীবিকাচর্চার শোষণে সে ক্ষয় হয়ে যায়।
১৪ ঘণ্টা আগে