মানুষের মতো মানুষ: কামরুদ্দীন আবসার

লেখা:
লেখা:
আনিস রায়হান

প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৬, ১৫: ১৩
স্ট্রিম গ্রাফিক

গণসংগীতশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার কামরুদ্দীন আবসারের জন্ম ১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর। থাকতেন ঢাকার গোপীবাগের অভয় দাস লেনে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় পিতা আবদুল মুকিতকে হারান। তিনি নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডে চাকরি করতেন। চিন্তাবিদ বদরুদ্দীন উমরের বাবা প্রখ্যাত মুসলিম লীগ নেতা আবুল হাশিম ছিলেন তার বাবার চাচাতো ভাই। পিতার মৃত্যুর পর শিক্ষকতা করেই পরিবারকে রক্ষা করেন তার মা ফাতিমা বেগম। তিনি কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেছিলেন।

কামরুদ্দীন আবসার সংগীতে ডিগ্রি পাস (বি-মিউজিক) করেছিলেন। সেগুনবাগিচায় অবস্থিত মিউজিক কলেজেই কেবল এই ডিগ্রি দেওয়া হতো। ওস্তাদ বারীণ মজুমদার ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা। ওস্তাদ ফুল মোহাম্মদের কাছে ক্লাসিক্যাল এবং জাহেদুর রহিম এর কাছে শিখেছেন রবীন্দ্রসংগীত। ছোটবেলায় গান শিখেছেন বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে (বাফা)। ওস্তাদ ফজলুল হক আর সুধীন দাস ছিলেন সেখানে তার শিক্ষক। অল্প বয়স থেকেই কামরুদ্দীন আবসার প্যারোডি গাইতেন। উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় প্যারোডি গান বেঁধে নারিন্দা স্কুল থেকে বহিষ্কার হতে হয়েছিল তাকে।

পল্টনে এক সমাবেশে সুরসম্রাট আলতাফ মাহমুদকে ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলি রে বাঙালি, তোরা ঢাকার শহর রক্তে ভাসাইলি’ গানটি গাইতে দেখে তিনি মুগ্ধ হন এবং সেই থেকেই গণসঙ্গীতের দিকে ঝুঁকে পড়েন তিনি। পরবর্তীতে আলতাফ মাহমুদের কাছেই গণসঙ্গীতের তালিম নেন তিনি।

সাদেক হোসেন খোকা ও বদরুদ্দীন উমরের সংস্পর্শে রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ হন তিনি। লেখক শিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটিতে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কৃষক ফেডারেশনের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে রাজনৈতিক কাজে সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তীতে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সৃজন’ ও ‘গণসাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ গড়ে উঠলে তাতে তিনি কেন্দ্রীয় দায়িত্ব পালন করেছি। ডাক্তারদা কমরেড সঈফ-উদ-দাহার ও মাস্টারদা কমরেড শাহ আতিউল ইসলাম ছিলেন রাজনীতিতে তার মূল অনুপ্রেরণা।

কামরুদ্দীন আবসারের মতে, “গণসংগীত হচ্ছে সেই গান, যে গানগুলো মার্কসবাদী লাইনে শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি জনগণের সংগ্রামের ও তাদের মুক্তির কথাগুলোকে ধারণ করতে পারে। সে হিসেবে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের কিছু গান দেখা যাবে গণসংগীত না। আবার আমাদের দেশে গণসংগীত হিসেবে পরিচিত, এমন অনেক গানই বাতিল হয়ে যাবে। সেগুলো যে গান নয়, আমি তা বলছি না। কিন্তু এগুলো গণসংগীত হবে না। জীবনমুখীসহ এই ধারার যেসব গান আছে, এগুলো অধিকাংশই মধ্যবিত্তের আশা, আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। আর আছে দেশাত্মবোধক গান, যাতে কিনা দেশপ্রেম ও আক্রমণকারী বিদেশি জাতির প্রতি ঘৃণা থাকে। এগুলোর মধ্যে ভাববাদও থাকে। কিন্তু গণসংগীত হতে হবে ভাববাদমুক্ত।”

গণসঙ্গীতের জন্য কামরুদ্দীন আবসারকে গ্রেপ্তার, কারাবরণ, দৈহিক নির্যাতনের শিকার, সবই সইতে হয়েছে। ১৯৭৪ সালে প্রথম ১৭ মার্চ শেখ মুজিবের জন্মদিন উদযাপনের সময় ‘ঘরে ঘরে অনাহারে, মানুষ মরে অনাদরে, কেউ তো দেখে না, হ্যাপি বার্থডে বঙ্গবন্ধু! হ্যাপি বার্থডে বঙ্গবন্ধু!’ শীর্ষক প্যারোডি গান গেয়ে পুলিশের হাতে ধৃত হন। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ‘আজব দেশের আজব লীলা’ গানে এরশাদকে তাচ্ছিল্য করে ‘মেশিনগানে কাব্য লেখে তোমরা কি ভাই হুনছনি’ গেয়ে টিএসসির মঞ্চ থেকে নামামাত্রই গ্রেপ্তারের শিকার হন।

নিজের গাওয়া গানের মধ্যে তার সবচেয়ে প্রিয় হলো, ‘কারা বলছো সামনের পথ অন্ধকার?/ পৃথিবীর বুকে সূর্যটাকে টান টান করে বেঁধে, আমরা পথ হাঁটি/ তোমরা যদি বলো, মাথা নিচু করে বাঁচা যায়/ আমি মানবো না/ আমি মানবো না’। এছাড়া ‘আমি কোনো ভালোবাসার গল্প বলিনি, যেটুকু বলেছি সবটুকু যুদ্ধের, দিনরাত্রি জীবনভর, মানুষের সাথে মানুষের, যেটুকু বলেছি সবটুকু যুদ্ধের’, গানটিও তার সবচেয়ে পছন্দের।

কামরুদ্দিন আবসার ছিলেন একজন মানুষের মতো মানুষ, পরিপূর্ণ মানুষ। তার জীবনে সেই অর্থে সফলতা বা উন্নতি হয়নি, তেমন উন্নতি তিনি চাননি। কোনো লোভ, আত্মপ্রতিষ্ঠার বাসনা তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। তাই কামরুদ্দিন আবসার দু’একজন নয়, লাখো মানুষের কাছে অনন্য এক মানুষ, যারাই তার সংস্পর্শে এসেছেন, তারাই স্বীকার করেছেন।

মানুষের মতো মানুষ হতে গিয়ে গণমানুষের জন্য তিনি সবই করেছেন। চলচ্চিত্রে নির্দেশনা, অভিনয়, বই প্রকাশনা, বইয়ের দোকান, এমন অনেক কিছুই করেছেন। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় হাতিয়ারটি ছিল গণসংগীত। এদেশের বিখ্যাত সব সঙ্গীত সাধকের কাছে গান শিখেছেন, কিন্তু ওটা তার উপরে ওঠার সিঁড়ি হয়নি- তিনি গেয়েছেন মানুষের মুক্তির জন্য। শিল্পী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেননি কখনো। বলেন, “আমি রাজনৈতিক কর্মী, গণমানুষের মুক্তির সৈনিক, গান আমার একটা হাতিয়ার মাত্র।” তাই মিডিয়াও তার খবর রাখেনি, সুধীসমাজ তাকে চেনেনি। কিন্তু ঠিকই তাকে চেনে শ্রমজীবী সেই রিকশাওয়ালারা, যাদের মেসে গিয়ে তিনি দিন কাটাতেন, আবার তাদের গানও শেখাতেন। সেই কৃষকেরা তাকে চেনে, যাদের বঞ্চনা তার কণ্ঠে অগ্নি হয়ে ঝরত। তাকে চেনে বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষেরা, যাদের জন্য তিনি শুধু গানই করেননি, উৎসর্গ করে দিয়েছেন নিজেকেই।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ব্রেন স্ট্রোকের শিকার হন। মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে এসেছেন অনেকের বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরে, কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। শরীরের একাংশ কেড়ে নিয়েছে পক্ষাঘাত। একা আর চলতে পারেন না, ঘরেই থাকেন। তবে কামরুদ্দিন আবসার উদ্যম হারাননি। মাঝেমধ্যে কোনো কোনো প্রতিবাদী কর্মসূচিতে হাজির হতে দেখা যেত তাকে। ২০২৬ সালের ৩০ মে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সূত্র: ‘মানুষের মতো মানুষ: কামরুদ্দীন আবসার’ শীর্ষক দীর্ঘ আত্মজৈবনিক সাক্ষাৎকার থেকে তথ্যাদি গৃহীত।

সম্পর্কিত