জন্মদিন
লেখা:

১৯০৩ সালের ২৫ জুন ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের বাংলা প্রদেশে জন্মগ্রহণকারী এরিক আর্থার ব্লেয়ার মহাকালে ইংরেজ লেখক জর্জ অরওয়েল নামে বিশ্বখ্যাত। স্বৈরাচার ও একদলীয় মতবাদের বিরুদ্ধে আজীবন সোচ্চার জর্জ অরওয়েলের কাজের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বচ্ছ গদ্য, সামাজিক সমালোচনা, সর্বগ্রাসী সর্বাত্মকবাদ (কর্তৃত্বপরায়ণ সাম্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ উভয়ের বিরোধিতা) এবং গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের সমর্থন।
অরওয়েলের পাণ্ডুলিপি দুবার ফিরিয়ে দেন টি এস এলিয়ট। প্রথমবার এরিক আর্থার ব্লেয়ার থেকে তিনি যখন জর্জ অরওয়েলে রূপান্তরিত হতে চলেছেন, ঠিক তেমন এক সময়ে। আরেকবার অরওয়েলের জীবনের মধ্যগগনে—যখন তিনি অ্যানিমেল ফার্ম উপন্যাস রচনা করে বিশ্ববিখ্যাত হতে চলেছেন। ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন গ্রন্থটির প্রকাশনার ইতিহাস বড়ই অদ্ভূত। অরওয়েল ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন গ্রন্থে বর্ণিত ব্যক্তিদের নাম পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন, কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, তিনি তাদের কিছুটা কাল্পনিক করে তুলেছিলেন। ফরাসি অনুবাদ লা ভাচে এনরাগি (১৯৩৫)-র ভূমিকা থেকে বিষয়টি ইতোমধ্যেই সর্বজনবিদিত। এই স্বীকারোক্তিমূলক লেখা ইঙ্গিত দেয়, এটি কোনো প্রতিবেদন নয়:
“আমার গল্পের সত্যতার কথা বলতে গেলে, আমি বলতে পারি যে, আমি কোনো কিছুই অতিরঞ্জিত করিনি, কেবল ততটুকুই লিখেছি, যতটুকু সব লেখকই বেছে বেছে অতিরঞ্জন করে থাকেন। ঘটনাগুলো ঠিক যে ক্রমে ঘটেছে, সেভাবেই বর্ণনা করতে হবে বলে আমি মনে করিনি। কিন্তু আমি যা কিছু বর্ণনা করেছি, তার সবই কোনো না কোনো সময়ে নিশ্চয়ই ঘটেছিল। একই সাথে, আমি যথাসম্ভব নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির স্বতন্ত্র প্রতিকৃতি আঁকা থেকে বিরত থেকেছি। বইটির উভয় অংশে আমি যে চরিত্রগুলোর বর্ণনা দিয়েছি, তাদের প্রত্যেককে ব্যক্তি হিসেবে না দেখে, বরং তাদের নিজ নিজ শ্রেণির প্যারিসবাসী বা লন্ডনবাসীর প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিরূপ হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে।”
অরওয়েল মূল পাণ্ডুলিপিটি তাঁর ডায়েরি হিসেবে লিখেছিলেন। ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন নামে প্রকাশিত হওয়ার আগে এটি বহুবার পরিমার্জন করা হয়।
জর্জ অরওয়েল তখনও পারিবারিক নাম এরিক আর্থার ব্লেয়ার হিসেবেই পরিচিত। ১৯৩০ সালের শেষের দিকে প্রকাশক জোনাথন কেপের কাছে পঁয়ত্রিশ হাজার শব্দের একটি পাণ্ডুলিপি জমা দেন। প্রকাশকের প্রতিক্রিয়া মোটামুটি ইতিবাচক ছিল, তবে ডায়েরি আকারের বিন্যাসটি খুব খণ্ডিত বলে মনে করা হয়। যদিও প্রকাশক ইতিবাচকভাবেই গ্রন্থটির পুনর্নিমিত দীর্ঘ একটি সংস্করণ প্রকাশের জন্য চেষ্টা করবেন বলে সামান্য আশার আলো দেখান। উৎসাহিত হয়ে অরওয়েল ইংল্যান্ডে তাঁর পদব্রজে ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা যোগ করেন এবং ১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে পুনরায় প্রকাশকের কাছে জমা দেন। তখন এটির শিরোনাম দেন ‘ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন’। প্রকাশক তাঁর অপারগতা প্রকাশ করে পাণ্ডুলিপিটি ফিরিয়ে দেন। মূলত ফেবার অ্যান্ড ফেবার ১৯৩১ সালের ১৪ ডিসেম্বর এরিক আর্থার ব্লেয়ারের ‘আ স্কুলিয়ন’স ডায়েরি’ হাতে পায়। তাদের পান্ডুলিপি-পাঠক ছিলেন কিংবদন্তি কবি, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার টি এস এলিয়ট। ইংরেজি ভাষার আধুনিকতাবাদী কবিতার একজন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব টমাস স্টার্নস এলিয়ট তাঁর ভাষা, লেখার শৈলী ও পদ্য-কাঠামোর ব্যবহারের মাধ্যমে এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। তিনি তাঁর সমালোচনামূলক প্রবন্ধগুলোর জন্যও বিখ্যাত। সেইসব প্রবন্ধে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা সাংস্কৃতিক রীতিসমূহের পুনর্মূল্যায়ন করা হতো। তাঁর সাথে জর্জ অরওয়েল (তখনকার এরিক আর্থার ব্লেয়ার) যোগাযোগ করেন। অরওয়েলের বন্ধু ও বিখ্যাত অ্যাডেলফি সাময়িকীর সম্পাদক রিচার্ড রিসের মাধ্যমে তিনি এলিয়টের সঙ্গে পরিচিত হন। অবশেষে অরওয়েলের প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়। দুঃখের বিষয়, ১৯৩২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ‘আ স্কুলিয়ন’স ডায়েরি’ প্রত্যাখ্যান করা হয়। চিঠিতে টি এস এলিয়ট লেখেন:
প্রিয় মিস্টার ব্লেয়ার,
আপনার পাণ্ডুলিপি রাখার জন্য আমি দুঃখিত। আমরা এটিকে খুব আগ্রহের বিষয় হিসেবে খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু আমাকে দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে যে, লেখাটি প্রকাশ করা আমার কাছে সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। এটি অবশ্যই খুব ছোটো এবং বিশেষ করে এই ধরনের ব্যাপ্তির একটি বইয়ের হিসেবে পুরোটাই খুব ঢিলেঢালাভাবে রচিত বলে মনে হয়েছে আমার কাছে, কারণ ফরাসি ও বিলেতি পর্বদ্বয় আলাদা দুটি ভাগে বিভক্ত এবং উভয়ের সংযোগ খুবই নগণ্য।
তবে আমি অবশ্যই মনে করি যে, শুধু ইংল্যান্ডের নিঃস্ব ভবঘুরে জীবনের ওপর খুব আকর্ষণীয় একটি গ্রন্থ রচনা করার জন্য আপনার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আরও বেশি উপাদান থাকা বাঞ্ছনীয়।
পাণ্ডুলিপিটি আমাকে দেখতে দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
আপনার বিশ্বস্ত,
টি এস এলিয়ট
হতাশ হয়ে ব্লেয়ার পাণ্ডুলিপিটি মেবেল ফিয়ার্জের কাছে রেখে দিতে বলেন। মেবেল ফিয়ার্জ (১৮৯০–১৯৯০) ছিলেন জর্জ অরওয়েলের সাহিত্যজীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যক্তিত্ব। অরওয়েলের চেয়ে ১৩ বছরের বড়ো, বিবাহিতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী এই লেখিকা ১৯৩০ সালের গ্রীষ্মকালে সাউথওল্ডের একটি সৈকতে তখনকার সংগ্রামরত তরুণ লেখক এরিক আর্থার ব্লেয়ারের বন্ধু হন। ফিয়ার্জ এই তরুণের সহজাত প্রতিভাকে চিনতে পেরে তাঁর লেখা সম্পাদনায় সাহায্য করেন এবং তাঁর লেখার পৃষ্ঠপোষকতাও করেন। অবশেষে তাঁকে সেই সাহিত্য-এজেন্টের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, যিনি তাঁর বই প্রকাশ করেন। ফিয়ার্জ তাঁর বন্ধুর জন্য একজন সাহিত্যিক এজেন্ট খুঁজে দিতে এবং ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন গ্রন্থটি প্রকাশ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। লিওনার্ড মুরকে তাঁর স্বামী ফ্রান্সিস ফিয়ার্জ টেনিস ক্লাব থেকে চিনতেন এবং মিসেস ফিয়ার্জ সেই সংশয়ী এজেন্টকে তিনবার প্রত্যাখ্যাত পাণ্ডুলিপিটি পড়তে রাজি করান। এ এম হিথ লিটারারি এজেন্সির লিওনার্ড মুর ছিলেন অরওয়েলের দীর্ঘদিনের এজেন্ট ও বিশ্বস্ত সহযোগী। অ্যানিমেল ফার্ম প্রকাশ ও অনুবাদ করাতে গিয়ে নিজের হতাশার কথা জানিয়ে অরওয়েল নিয়মিত মুরের সাথে চিঠিপত্র আদান-প্রদান করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এবং তার ঠিক পরেই সোভিয়েত ইউনিয়নকে অসন্তুষ্ট করতে পারে—এমন সব রচনার অনুবাদ ও বিপণন সক্রিয়ভাবে নিরুৎসাহিত করতে শুরু করে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর। এই আমলাতান্ত্রিক বাধা এবং আন্তর্জাতিক স্বত্বাধিকার-সংক্রান্ত আলোচনা সামলাতে অরওয়েল তখন মুরের ওপর নির্ভর করতেন। এ এম হিথ লিটারারি এজেন্সি আজও জর্জ অরওয়েলের উত্তরাধিকারের ব্যবস্থাপনা করে চলেছে। ফিয়ার্জ দম্পতির মাধ্যমে পরিচয়ের আগে এই সবকিছুই অরওয়েলের অজানা ছিল। তিনি পরে জানতে পারেন যে, লিওনার্ড মুর ১৯২৮ সালে প্রকাশনা ব্যবসায় নবাগত ভিক্টর গোলানকজকে পাণ্ডুলিপিটির প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। বামপন্থি এই প্রকাশক পাণ্ডুলিপি পাঠ করার পর এর মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পান।
১৯৩২ সালের আগস্ট মাসে অরওয়েল মেবেল ফিয়ার্জের বাড়িতে বসে ‘ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন’ নামে একটি নতুন খসড়া টাইপ করেন৷ ১৯৩২ সালের অক্টোবর মাসে ‘ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন’ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি প্রকাশক জোনাথন কেপ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়। সেই বছরের ১৪ ডিসেম্বরে অরওয়েল ফেবার অ্যান্ড ফেবার প্রকাশনা সংস্থায় ‘আ স্কুলিয়ন’স ডায়েরি’ শিরোনামে গ্রন্থটির পাণ্ডুলিপি পাঠান। জর্জ অরওয়েল বলেছেন, “‘ডাউন অ্যান্ড আউট’-এ বর্ণিত প্রায় সমস্ত ঘটনাই আদতে বাস্তবে ঘটেছে, কিন্তু সেই ঘটনাসমূহ ঘটেছে বিভিন্ন সময়ে। আমি সেই ঘটনাগুলোকে একত্রিত করেছি, যাতে একটি ধারাবাহিক গল্প তৈরি করা যায়।” ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন সর্বদা প্রকাশকদের প্রচলিত শ্রেণিবিন্যাসকে অস্বীকার করে। ১৯৩০-এর দশকের অরওয়েলের অন্য দুটি গ্রন্থ দ্য রোড টু উইগান পিয়ার (১৯৩৭) ও হোমেজ টু কাতালোনিয়া (১৯৩৮)-এর মতো এটিকে সাধারণত প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচনা করা হলেও আদতে বিষয়টি এতটা সরল ছিল না। পরবর্তীকালে পেঙ্গুইন যখন ১৯৪০ সালের ডিসেম্বর মাসে ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন প্রথম প্রকাশ করে, তখন পরিচিত কমলা ও সাদা পেপারব্যাক কভার ডিজাইনে ‘কল্পকাহিনি’ শব্দটি মুদ্রিত ছিল।
১৯৩২ সালে অরওয়েল ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন গ্রন্থের পাণ্ডুলিপিটি মেবেল ফিয়ের্জের হাতে তুলে দিয়ে ধ্বংস করার নির্দেশনা দেন। এরপর মেবেল ফিয়ার্জ সেটিকে অরওয়েলের সাহিত্য বিষয়ক এজেন্ট লিওনার্ড মুরের কাছে নিয়ে যান। মুর পাণ্ডুলিপিটি ভিক্টর গোলানকজকে জমা দেন। ভিক্টর গোলানকজ ছোটোখাটো পরিবর্তনের পরে এটি প্রকাশ করতে সম্মত হন। অরওয়েলের ২৯ বছর বয়সে প্রকাশিত ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি তিন বছর আগে লেখা হয়। গ্রন্থটিতে আলোচিত ঘটনাসমূহ তারও চার থেকে পাঁচ বছর আগের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়। ডাউন অ্যান্ড আউট সম্পর্কে সঠিক বোঝার জন্য তারিখগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে একটু পেছনে ফিরে তাকানো প্রয়োজন। ১৯২৭ থেকে ১৯৩৩ সাল ছিল ঐতিহাসিকভাবে উত্তাল। ১৯২৯ সালের অক্টোবরের ওয়াল স্ট্রিট ক্র্যাশের মাধ্যমে জ্যাজ যুগের সমাপ্তি ঘটে, বিশ্বব্যাপী বেকারত্ব বেড়েই চলে। অরওয়েলের ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন গ্রন্থটি কুড়ি শতকের যুগান্তরকালের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তকে গভীর গুরুত্বসহ আলোকপাত করে।
১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে অরওয়েল তাৎক্ষণিকভাবে প্যারিস গমনের সিদ্ধান্ত নেন। প্যারিসে ১৮ মাস বসবাসকালের বেশির ভাগ সময় তিনি ল্যাটিন কোয়ার্টারে একটি সস্তা হোটেলে থাকতেন। আচরণে তিনি সিকিভাগ ফরাসি ছিলেন, ভাষাটি সাবলীলভাবে বলতে পারতেন। প্যারিস শহরে নেলি লিমুজিন নামে তাঁর মায়ের এক বোনও বসবাস করতেন। ‘ডাউন অ্যান্ড আউট’ উপন্যাসে ১০ সপ্তাহের ধারাবাহিক বর্ণনা ছাড়াও অরওয়েল তাঁর প্যারিসবাসের সময়ে আর কী করেছেন, তা আমরা কার্যত কিছুই জানি না। তা ছাড়া সময়টিতে তিনি প্রচুর লিখেছেনও। সেইসব লেখার একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ প্রকাশিত হয়ে টিকে আছে, যা আমরা পাঠের মাধ্যমে জানতে পারি। কেন তিনি প্যারিসকে ভ্রমণের জন্য বেছে নিলেন? হয়তো আরও অনেক লেখক, শিল্পী ও সংগীতজ্ঞরা যে স্বাধীনতা চান, সেই একই কারণে। অরওয়েলের সর্বপ্রথম লেখাটি ফরাসি ভাষায় ১৯২৮ সালের অক্টোবরে প্যারিসে প্রকাশিত হয়েছিল ‘লা সেন্সার এন অ্যাঙ্গলেটারে’ শিরোনামে। শিরোনামটির বাংলা অনুবাদ করলে হয় ‘ইংল্যান্ডে সেন্সরশিপ’।
ইংল্যান্ডে সেই সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে সেন্সর ছিল। ১৯২৮ সালে র্যাডক্লিফ হলের লেসবিয়ান (নিষ্পাপ) উপন্যাস দ্য ওয়েল অফ লোনলিনেসকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। গ্রন্থটি পুড়িয়েও ফেলা হয়। ডি এইচ লরেন্সের লেডি চ্যাটারলিজ লাভার ও জেমস জয়েসের ইউলিসিস কাটাছেঁড়া ছাড়া শুধু প্যারিস থেকেই প্রকাশ করা হয়। অবশেষে ব্রিটেনে প্রকাশিত হলে ডাউন অ্যান্ড আউট সেন্সরশিপের কবলে পড়ে। গ্রন্থটি মূলত এর পথ ও ভাষার বাস্তবতার যথার্থতা বিবেচনায় প্রকাশকের জেদের কারণে প্রকাশিত হয়। প্যারিসে লেখালেখির এই স্বাধীনতা কেবল অরওয়েলকেই আকৃষ্ট করেছিল, তা নয়; এটি আমেরিকান লেখকদের ‘লস্ট জেনারেশন’কেও আকৃষ্ট করেছিল। এই দলে ছিলেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, স্কট ফিটজেরাল্ড, হেনরি মিলার, গার্ট্রুড স্টেইন এবং ই ই কামিংস। দুর্বল ফ্রাঙ্ক অর্থাৎ লন্ডন বা নিউ ইয়র্কের উচ্চমূল্যের মুদ্রার (স্টার্লিং বা ডলার) তুলনায় অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। লস্ট জেনারেশন হলো আমেরিকান লেখকদের সেই দল, যাঁরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কালে এসে ১৯২০-এর দশকে নিজেদেরকে সাহিত্যিক খ্যাতির চূড়ায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। পরিভাষাটি আরও সাধারণভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
সাংস্কৃতিকভাবে প্যারিসের ১৯২৮ সালটি ছিল দুটো বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। শহরের প্রাণকেন্দ্রে মার্কিন বংশোদ্ভূত প্রকাশক সিলভিয়া বিচের ‘শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি’ নামে বিখ্যাত একটি বইয়ের দোকান ছিল। সিলভিয়া বিচ জীবনের বেশির ভাগ সময় প্যারিসে কাটিয়েছেন। এখানে তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়টিতে অন্যতম প্রবাসী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, এজরা পাউন্ড, গারট্রুড স্টেইন ও জেমস জয়েসের মতো লেখকরা তাঁর বইয়ের দোকানে নিজেদের অনুকূল অবলম্বন খুঁজে পান। পিকাসো তাঁর পরিণত শৈলী তৈরি করেন। ওদিকে অরওয়েল ডাউন অ্যান্ড আউট-এর প্রামাণিক তথ্য সংগ্রহের ফাঁকে প্যারিসে তাঁর চারপাশে সক্রিয় সৃজনশীল মানুষদের বিষয়ে কিছুটা উদাসীন ছিলেন বলেই মনে করা হয়। নিচুতলার দরিদ্র প্যারিসবাসীরা কীভাবে দিন গুজরান করতো, উপবাসে ভুগতো এবং মারা যেত—সেসব বিষয়ের প্রতি অরওয়েলের একচেটিয়া আগ্রহ ছিল। প্যারিসের নিচুতলার জীবন তাঁর দৃষ্টিকে আকর্ষণ করেছিল।
প্যারিসে যাওয়ার আগে অরওয়েল লন্ডনের উত্তর সীমান্ত-এলাকার নিচুতলার মানবসমাজে প্রাথমিক অনুসন্ধান চালান। শতছিন্ন পোশাক পরে তিনি অসহায়দের ওয়ার্কহাউজের নৈমিত্তিক ওয়ার্ড, সস্তা আবাসন ও ভবঘুরেদের সরাইখানায় রাত কাটান। পরে এক সময় ঘটনাচক্রে তিনি নিজেকে হাজতে বন্দি রাখতেও সক্ষম হন (ক্লিঙ্ক)। প্যারিস-গমনের আগে লন্ডনে বেশ কিছু মাঠপর্যায়ের গবেষণা করেন। তবে প্রকাশিত বইতে লন্ডনকে পরে নিয়ে আসা হয়েছে।
প্যারিসের নিচুতলার সমাজে তাঁর যাত্রা শুরু হয় বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে। তাঁর নিজের জবানিতে—জীর্ণ আবাসিক হোটেলে জনৈক ইতালীয় ভাড়াটিয়ার কবলে পড়ে অরওয়েল ছিনতাইয়ের শিকার হন। পরবর্তী জীবনে তিনি প্রকাশ করেন যে, তিনি আদতে সুজানে নামের এক যৌনকর্মীর খপ্পড়ে পড়েন। শিক্ষকতা পেশা থেকে উপার্জিত তাঁর সামান্য সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দেউলিয়া হয়ে যান। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর প্যারিসবাসী মাসি বা তাঁর পিতামাতার কাছ থেকে সাহায্য চাননি। গ্রন্থেও এমন কোনো উল্লেখ নেই। তাঁর পালানোর পথ ছিল, কিন্তু সরেজমিন গবেষণাই ছিল তাঁর নিগূঢ় উদ্দেশ্য। গরিবকে বুঝতে হলে গরিব হতে হয়। এই সুযোগটি তিনি কাজে লাগিয়েছেন।
১৯২৯ সালের অক্টোবরের ওয়াল স্ট্রিট ক্র্যাশ ও বিশ্বব্যাপী ‘অতিমন্দা’র কালে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। বইটির প্যারিসীয় অর্ধেকটা ছিল দারিদ্র্য-বিষয়ক আর অবশিষ্ট ব্রিটিশ অর্ধেক ছিল বেকারত্ব-বিষয়ক। তিনি সেই বছরের সেরা অংশটিতে একজন ভবঘুরের বেশ ধারণ করেন। প্যারিসেও তাঁর ইংরেজ বন্ধু ও স্বজন ছিল, কিন্তু তিনি লেখার রসদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভবঘুরে জীবনই বেছে নিয়েছিলেন। তিনি অভুক্ত উদরে, অপরিচ্ছন্ন পোশাক পরে ভবঘুরে ও ভিক্ষুকদের প্রতিদিনের পুঞ্জিভূত অপমানকে সশরীরে অনুভব করতে চেয়েছেন। প্রাথমিকভাবে তিনি প্রবন্ধের একটি সিরিজ লিখতে চেয়েছিলেন। জ্যাক লন্ডনের ইনটু দ্য অ্যাবিস এবং ডব্লিউ এইচ ডেভিসের অটোবায়োগ্রাফি অফ আ সুপার ট্রাম্প—এ দুটি সাহিত্যকর্মকে আদর্শ মেনে তিনি এগিয়েছিলেন। কোনো পত্রিকাই তাঁর প্রবন্ধ নিতে চায়নি। তিনি অটল থেকে ফরাসি অংশটিকে একটি ছোটো বইয়ে রূপান্তরিত করেন। তাও খারিজ হয়ে যায়। অবশেষে তিনি ডাউন অ্যান্ড আউটের প্রথম খসড়ার মধ্যে সবকিছু একত্রিত করেন, যাকে বলা হয় ‘ডেইজ ইন লন্ডন অ্যান্ড প্যারিস’। আমরা আগেই জেনেছি যে, ফেবার অ্যান্ড ফেবার প্রকাশনীতে জোনাথন কেপ এবং টি এস এলিয়ট পাণ্ডুলিপিটি ফিরিয়ে দেন। সন্দেহজনকভাবে বইটি লন্ডনের সুশীল সাহিত্যজগতের জন্য অতি উগ্র ছিল। যৌনপল্লির দৃশ্য (যেখানে ‘চার্লি’র বয়ানে একটি ধর্ষণ-দৃশ্য ছিল বিশেষভাবে নৃশংস) ও প্রকৃত নিচুতলার মানুষের কথ্য ভাষার অকপট ব্যবহার সম্ভাব্য প্রকাশকদের স্নায়ুচাপে পীড়িত ও যথাসম্ভব মানহানিকর করে তুলেছিল। অরওয়েল তাঁর জীবনভর ব্রিটিশ প্রকাশকদের একটি ‘নিষ্ঠুর’ দল ভেবেছেন। সেই মুহূর্তে এরিক আর্থার ব্লেয়ার তাঁর পরিবারকে সম্ভাব্য বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে ‘জর্জ অরওয়েল’ ছদ্মনাম ধারণ করেন। তখন অরওয়েল নিছক একজন লেখক নন, একজন সম্ভাবনাময় প্রতিশ্রুতিশীল লেখক হিসেবে বিশ্বখ্যাতির পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। এরপর ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের ৯ জানুয়ারি ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন গ্রন্থটি প্রকাশ করে ভিক্টর গোলানকজ। ৩০ জুন গ্রন্থটির আমেরিকান সংস্করণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের হার্পার কর্তৃক প্রকাশিত হয়। ডাউন অ্যান্ড আউটের শেষে অরওয়েল স্বীকার করেন যে, দরিদ্ররা পরজীবী হিসেবে জেন্ম নেয় না, তারা ভিক্ষা করার জন্যও জন্মায় না, তারা পরিস্থিতির শিকার মাত্র।
টি এস এলিয়ট আরও একবার অরওয়েলের একটি পাণ্ডুলিপি ফেরত দিয়েছেন। আসলে টি এস এলিয়ট ও জর্জ অরওয়েলের মধ্যকার সম্পর্কটি ছিল বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত লেখক-সম্পাদক সম্পর্কগুলোর মধ্যে একটি। অরওয়েলের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি অ্যানিমেল ফার্মকে এলিয়টের বিনয়ী কিন্তু চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমেই এই সম্পর্কটি সংজ্ঞায়িত হয়। এই দুই লেখকের মধ্যকার আলাপচারিতায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল। ফেবার অ্যান্ড ফেবার প্রকাশনাসংস্থার সম্পাদকীয় পরিচালক হিসেবে এলিয়ট ১৯৪৪ সালের ১৩ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যানিমেল ফার্ম প্রত্যাখ্যান করেন। তবুও তিনি এটিকে একটি ‘বিশেষ রচনা’ হিসেবে প্রশংসা করেন এবং জোনাথন সুইফটের রচনার সাথে তুলনা করেন। তবে তিনি বইটির রাজনৈতিক বার্তার সমালোচনা করেন। যেহেতু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেন সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্র ছিল, এলিয়ট যুক্তি দেন যে, বইটির ‘ট্রটস্কিপন্থি’ স্ট্যালিন-বিরোধী অবস্থানটি ছিল অসময়োচিত ও ‘কেবল এক ধরনের নেতিবাচকতা’। পাঠকদের ভুলে গেলে চলবে না যে, জর্জ অরওয়েল এবং টি এস এলিয়ট—এ দুই লেখক সম্পূর্ণ ভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট থেকে এসেছিলেন। এলিয়ট ছিলেন একজন কট্টর রাজনৈতিক রক্ষণশীল, অ্যাংলো-ক্যাথলিক ও একজন আচারপরায়ণতাবাদি কবি। অপরদিকে অরওয়েল ছিলেন একজন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী ও সাংবাদিক, যিনি তাঁর স্পষ্টভাষী নৈতিক স্বচ্ছতার জন্য ছিলেন পরিচিত। প্রত্যাখ্যানের ঘটনা ও আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, এ দুই বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্ব একে অপরের সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন।
জর্জ অরওয়েলকে লেখা টি এস এলিয়টের আরেকটি চিরকুট পাওয়া যায়। তখন অরওয়েল বিবিসি-তে অনুষ্ঠান নির্মাণ করতেন এবং ধারাভাষ্য দিতেন।
২৭ নভেম্বর, ১৯৪২
শামলি উড।
প্রিয় অরওয়েল,
এইমাত্র আমার মনে পড়লো যে, মঙ্গলবারের জন্য বিবিসি-তে প্রবেশের কোনো টিকিট আমি আপনার কাছ থেকে পাইনি: আর আমার কাছে একটি টিকিট পৌঁছে দেওয়ার মতো সময়ও থাকবে না, কারণ আমি স্টেশন থেকে সরাসরি আপনার কাছে আসবো। তাই আপনি কি দ্বাররক্ষী বা অন্য কাউকে আগে থেকে বলে রাখতে পারবেন, যাতে আমাকে প্রবেশদ্বারে বেশিক্ষণ আটকে থাকতে না হয়?
এরপর আমাকে একটি কমিটির মধ্যাহ্নভোজে যেতে হবে, কিন্তু কোনো এক সময় আপনার সাথে মধ্যাহ্নভোজে দেখা করতে পারলে খুব ভালো হতো।
আপনার বিশ্বস্ত,
টি এস এলিয়ট
ইয়ান অ্যাঙ্গাস ব্রিটিশ গ্রন্থাগারিক ও প্রখ্যাত পণ্ডিত, যিনি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল)-এ অরওয়েল আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা ও তত্ত্বাবধান করেছেন। তিনি অরওয়েলের বিধবা স্ত্রী সোনিয়া অরওয়েলের সাথে জর্জ অরওয়েলের কালেক্টেড অ্যাসেইজ, জার্নালিজম অ্যান্ড লেটারস গ্রন্থটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেন। ১৯৫০ অরওয়েলের মৃত্যুর অনেক পরে ১৯৬৩ সালের ২৫ জুলাই ইয়ান অ্যাঙ্গাসকে লেখা একটি চিঠিতে টি এস এলিয়ট উল্লেখ করেন, “তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যাঁর সততাকে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতাম এবং ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে পছন্দ করতাম। আমার মনে আছে, তিনি ও তাঁর স্ত্রী একবার আমার সাথে মধ্যাহ্নভোজ করেছিলেন, কিন্তু দুঃখিত, আমার কাছে এমন কোনো চিঠিপত্র নেই, যা কেবল সাক্ষাতের সময় ঠিক করা ছাড়া আর কিছু হতে পারে এবং আমার মনে নেই, সেই সাক্ষাৎটি কোন সালে হয়েছিল। আমার নিজের কাছেই আমার খুব দুঃখ হয় যে, তাঁর সাথে আড্ডা দেওয়ার মতো যথেষ্ট ঘনিষ্ঠভাবে আমি তাঁকে চিনতাম না।”

১৯০৩ সালের ২৫ জুন ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের বাংলা প্রদেশে জন্মগ্রহণকারী এরিক আর্থার ব্লেয়ার মহাকালে ইংরেজ লেখক জর্জ অরওয়েল নামে বিশ্বখ্যাত। স্বৈরাচার ও একদলীয় মতবাদের বিরুদ্ধে আজীবন সোচ্চার জর্জ অরওয়েলের কাজের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বচ্ছ গদ্য, সামাজিক সমালোচনা, সর্বগ্রাসী সর্বাত্মকবাদ (কর্তৃত্বপরায়ণ সাম্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ উভয়ের বিরোধিতা) এবং গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের সমর্থন।
অরওয়েলের পাণ্ডুলিপি দুবার ফিরিয়ে দেন টি এস এলিয়ট। প্রথমবার এরিক আর্থার ব্লেয়ার থেকে তিনি যখন জর্জ অরওয়েলে রূপান্তরিত হতে চলেছেন, ঠিক তেমন এক সময়ে। আরেকবার অরওয়েলের জীবনের মধ্যগগনে—যখন তিনি অ্যানিমেল ফার্ম উপন্যাস রচনা করে বিশ্ববিখ্যাত হতে চলেছেন। ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন গ্রন্থটির প্রকাশনার ইতিহাস বড়ই অদ্ভূত। অরওয়েল ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন গ্রন্থে বর্ণিত ব্যক্তিদের নাম পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন, কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, তিনি তাদের কিছুটা কাল্পনিক করে তুলেছিলেন। ফরাসি অনুবাদ লা ভাচে এনরাগি (১৯৩৫)-র ভূমিকা থেকে বিষয়টি ইতোমধ্যেই সর্বজনবিদিত। এই স্বীকারোক্তিমূলক লেখা ইঙ্গিত দেয়, এটি কোনো প্রতিবেদন নয়:
“আমার গল্পের সত্যতার কথা বলতে গেলে, আমি বলতে পারি যে, আমি কোনো কিছুই অতিরঞ্জিত করিনি, কেবল ততটুকুই লিখেছি, যতটুকু সব লেখকই বেছে বেছে অতিরঞ্জন করে থাকেন। ঘটনাগুলো ঠিক যে ক্রমে ঘটেছে, সেভাবেই বর্ণনা করতে হবে বলে আমি মনে করিনি। কিন্তু আমি যা কিছু বর্ণনা করেছি, তার সবই কোনো না কোনো সময়ে নিশ্চয়ই ঘটেছিল। একই সাথে, আমি যথাসম্ভব নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির স্বতন্ত্র প্রতিকৃতি আঁকা থেকে বিরত থেকেছি। বইটির উভয় অংশে আমি যে চরিত্রগুলোর বর্ণনা দিয়েছি, তাদের প্রত্যেককে ব্যক্তি হিসেবে না দেখে, বরং তাদের নিজ নিজ শ্রেণির প্যারিসবাসী বা লন্ডনবাসীর প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিরূপ হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে।”
অরওয়েল মূল পাণ্ডুলিপিটি তাঁর ডায়েরি হিসেবে লিখেছিলেন। ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন নামে প্রকাশিত হওয়ার আগে এটি বহুবার পরিমার্জন করা হয়।
জর্জ অরওয়েল তখনও পারিবারিক নাম এরিক আর্থার ব্লেয়ার হিসেবেই পরিচিত। ১৯৩০ সালের শেষের দিকে প্রকাশক জোনাথন কেপের কাছে পঁয়ত্রিশ হাজার শব্দের একটি পাণ্ডুলিপি জমা দেন। প্রকাশকের প্রতিক্রিয়া মোটামুটি ইতিবাচক ছিল, তবে ডায়েরি আকারের বিন্যাসটি খুব খণ্ডিত বলে মনে করা হয়। যদিও প্রকাশক ইতিবাচকভাবেই গ্রন্থটির পুনর্নিমিত দীর্ঘ একটি সংস্করণ প্রকাশের জন্য চেষ্টা করবেন বলে সামান্য আশার আলো দেখান। উৎসাহিত হয়ে অরওয়েল ইংল্যান্ডে তাঁর পদব্রজে ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা যোগ করেন এবং ১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে পুনরায় প্রকাশকের কাছে জমা দেন। তখন এটির শিরোনাম দেন ‘ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন’। প্রকাশক তাঁর অপারগতা প্রকাশ করে পাণ্ডুলিপিটি ফিরিয়ে দেন। মূলত ফেবার অ্যান্ড ফেবার ১৯৩১ সালের ১৪ ডিসেম্বর এরিক আর্থার ব্লেয়ারের ‘আ স্কুলিয়ন’স ডায়েরি’ হাতে পায়। তাদের পান্ডুলিপি-পাঠক ছিলেন কিংবদন্তি কবি, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার টি এস এলিয়ট। ইংরেজি ভাষার আধুনিকতাবাদী কবিতার একজন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব টমাস স্টার্নস এলিয়ট তাঁর ভাষা, লেখার শৈলী ও পদ্য-কাঠামোর ব্যবহারের মাধ্যমে এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। তিনি তাঁর সমালোচনামূলক প্রবন্ধগুলোর জন্যও বিখ্যাত। সেইসব প্রবন্ধে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা সাংস্কৃতিক রীতিসমূহের পুনর্মূল্যায়ন করা হতো। তাঁর সাথে জর্জ অরওয়েল (তখনকার এরিক আর্থার ব্লেয়ার) যোগাযোগ করেন। অরওয়েলের বন্ধু ও বিখ্যাত অ্যাডেলফি সাময়িকীর সম্পাদক রিচার্ড রিসের মাধ্যমে তিনি এলিয়টের সঙ্গে পরিচিত হন। অবশেষে অরওয়েলের প্রথম গ্রন্থ প্রকাশের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়। দুঃখের বিষয়, ১৯৩২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ‘আ স্কুলিয়ন’স ডায়েরি’ প্রত্যাখ্যান করা হয়। চিঠিতে টি এস এলিয়ট লেখেন:
প্রিয় মিস্টার ব্লেয়ার,
আপনার পাণ্ডুলিপি রাখার জন্য আমি দুঃখিত। আমরা এটিকে খুব আগ্রহের বিষয় হিসেবে খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু আমাকে দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে যে, লেখাটি প্রকাশ করা আমার কাছে সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। এটি অবশ্যই খুব ছোটো এবং বিশেষ করে এই ধরনের ব্যাপ্তির একটি বইয়ের হিসেবে পুরোটাই খুব ঢিলেঢালাভাবে রচিত বলে মনে হয়েছে আমার কাছে, কারণ ফরাসি ও বিলেতি পর্বদ্বয় আলাদা দুটি ভাগে বিভক্ত এবং উভয়ের সংযোগ খুবই নগণ্য।
তবে আমি অবশ্যই মনে করি যে, শুধু ইংল্যান্ডের নিঃস্ব ভবঘুরে জীবনের ওপর খুব আকর্ষণীয় একটি গ্রন্থ রচনা করার জন্য আপনার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আরও বেশি উপাদান থাকা বাঞ্ছনীয়।
পাণ্ডুলিপিটি আমাকে দেখতে দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
আপনার বিশ্বস্ত,
টি এস এলিয়ট
হতাশ হয়ে ব্লেয়ার পাণ্ডুলিপিটি মেবেল ফিয়ার্জের কাছে রেখে দিতে বলেন। মেবেল ফিয়ার্জ (১৮৯০–১৯৯০) ছিলেন জর্জ অরওয়েলের সাহিত্যজীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যক্তিত্ব। অরওয়েলের চেয়ে ১৩ বছরের বড়ো, বিবাহিতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী এই লেখিকা ১৯৩০ সালের গ্রীষ্মকালে সাউথওল্ডের একটি সৈকতে তখনকার সংগ্রামরত তরুণ লেখক এরিক আর্থার ব্লেয়ারের বন্ধু হন। ফিয়ার্জ এই তরুণের সহজাত প্রতিভাকে চিনতে পেরে তাঁর লেখা সম্পাদনায় সাহায্য করেন এবং তাঁর লেখার পৃষ্ঠপোষকতাও করেন। অবশেষে তাঁকে সেই সাহিত্য-এজেন্টের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, যিনি তাঁর বই প্রকাশ করেন। ফিয়ার্জ তাঁর বন্ধুর জন্য একজন সাহিত্যিক এজেন্ট খুঁজে দিতে এবং ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন গ্রন্থটি প্রকাশ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। লিওনার্ড মুরকে তাঁর স্বামী ফ্রান্সিস ফিয়ার্জ টেনিস ক্লাব থেকে চিনতেন এবং মিসেস ফিয়ার্জ সেই সংশয়ী এজেন্টকে তিনবার প্রত্যাখ্যাত পাণ্ডুলিপিটি পড়তে রাজি করান। এ এম হিথ লিটারারি এজেন্সির লিওনার্ড মুর ছিলেন অরওয়েলের দীর্ঘদিনের এজেন্ট ও বিশ্বস্ত সহযোগী। অ্যানিমেল ফার্ম প্রকাশ ও অনুবাদ করাতে গিয়ে নিজের হতাশার কথা জানিয়ে অরওয়েল নিয়মিত মুরের সাথে চিঠিপত্র আদান-প্রদান করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এবং তার ঠিক পরেই সোভিয়েত ইউনিয়নকে অসন্তুষ্ট করতে পারে—এমন সব রচনার অনুবাদ ও বিপণন সক্রিয়ভাবে নিরুৎসাহিত করতে শুরু করে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর। এই আমলাতান্ত্রিক বাধা এবং আন্তর্জাতিক স্বত্বাধিকার-সংক্রান্ত আলোচনা সামলাতে অরওয়েল তখন মুরের ওপর নির্ভর করতেন। এ এম হিথ লিটারারি এজেন্সি আজও জর্জ অরওয়েলের উত্তরাধিকারের ব্যবস্থাপনা করে চলেছে। ফিয়ার্জ দম্পতির মাধ্যমে পরিচয়ের আগে এই সবকিছুই অরওয়েলের অজানা ছিল। তিনি পরে জানতে পারেন যে, লিওনার্ড মুর ১৯২৮ সালে প্রকাশনা ব্যবসায় নবাগত ভিক্টর গোলানকজকে পাণ্ডুলিপিটির প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। বামপন্থি এই প্রকাশক পাণ্ডুলিপি পাঠ করার পর এর মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পান।
১৯৩২ সালের আগস্ট মাসে অরওয়েল মেবেল ফিয়ার্জের বাড়িতে বসে ‘ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন’ নামে একটি নতুন খসড়া টাইপ করেন৷ ১৯৩২ সালের অক্টোবর মাসে ‘ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন’ গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি প্রকাশক জোনাথন কেপ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়। সেই বছরের ১৪ ডিসেম্বরে অরওয়েল ফেবার অ্যান্ড ফেবার প্রকাশনা সংস্থায় ‘আ স্কুলিয়ন’স ডায়েরি’ শিরোনামে গ্রন্থটির পাণ্ডুলিপি পাঠান। জর্জ অরওয়েল বলেছেন, “‘ডাউন অ্যান্ড আউট’-এ বর্ণিত প্রায় সমস্ত ঘটনাই আদতে বাস্তবে ঘটেছে, কিন্তু সেই ঘটনাসমূহ ঘটেছে বিভিন্ন সময়ে। আমি সেই ঘটনাগুলোকে একত্রিত করেছি, যাতে একটি ধারাবাহিক গল্প তৈরি করা যায়।” ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন সর্বদা প্রকাশকদের প্রচলিত শ্রেণিবিন্যাসকে অস্বীকার করে। ১৯৩০-এর দশকের অরওয়েলের অন্য দুটি গ্রন্থ দ্য রোড টু উইগান পিয়ার (১৯৩৭) ও হোমেজ টু কাতালোনিয়া (১৯৩৮)-এর মতো এটিকে সাধারণত প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচনা করা হলেও আদতে বিষয়টি এতটা সরল ছিল না। পরবর্তীকালে পেঙ্গুইন যখন ১৯৪০ সালের ডিসেম্বর মাসে ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন প্রথম প্রকাশ করে, তখন পরিচিত কমলা ও সাদা পেপারব্যাক কভার ডিজাইনে ‘কল্পকাহিনি’ শব্দটি মুদ্রিত ছিল।
১৯৩২ সালে অরওয়েল ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন গ্রন্থের পাণ্ডুলিপিটি মেবেল ফিয়ের্জের হাতে তুলে দিয়ে ধ্বংস করার নির্দেশনা দেন। এরপর মেবেল ফিয়ার্জ সেটিকে অরওয়েলের সাহিত্য বিষয়ক এজেন্ট লিওনার্ড মুরের কাছে নিয়ে যান। মুর পাণ্ডুলিপিটি ভিক্টর গোলানকজকে জমা দেন। ভিক্টর গোলানকজ ছোটোখাটো পরিবর্তনের পরে এটি প্রকাশ করতে সম্মত হন। অরওয়েলের ২৯ বছর বয়সে প্রকাশিত ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি তিন বছর আগে লেখা হয়। গ্রন্থটিতে আলোচিত ঘটনাসমূহ তারও চার থেকে পাঁচ বছর আগের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়। ডাউন অ্যান্ড আউট সম্পর্কে সঠিক বোঝার জন্য তারিখগুলো গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে একটু পেছনে ফিরে তাকানো প্রয়োজন। ১৯২৭ থেকে ১৯৩৩ সাল ছিল ঐতিহাসিকভাবে উত্তাল। ১৯২৯ সালের অক্টোবরের ওয়াল স্ট্রিট ক্র্যাশের মাধ্যমে জ্যাজ যুগের সমাপ্তি ঘটে, বিশ্বব্যাপী বেকারত্ব বেড়েই চলে। অরওয়েলের ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন গ্রন্থটি কুড়ি শতকের যুগান্তরকালের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তকে গভীর গুরুত্বসহ আলোকপাত করে।
১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে অরওয়েল তাৎক্ষণিকভাবে প্যারিস গমনের সিদ্ধান্ত নেন। প্যারিসে ১৮ মাস বসবাসকালের বেশির ভাগ সময় তিনি ল্যাটিন কোয়ার্টারে একটি সস্তা হোটেলে থাকতেন। আচরণে তিনি সিকিভাগ ফরাসি ছিলেন, ভাষাটি সাবলীলভাবে বলতে পারতেন। প্যারিস শহরে নেলি লিমুজিন নামে তাঁর মায়ের এক বোনও বসবাস করতেন। ‘ডাউন অ্যান্ড আউট’ উপন্যাসে ১০ সপ্তাহের ধারাবাহিক বর্ণনা ছাড়াও অরওয়েল তাঁর প্যারিসবাসের সময়ে আর কী করেছেন, তা আমরা কার্যত কিছুই জানি না। তা ছাড়া সময়টিতে তিনি প্রচুর লিখেছেনও। সেইসব লেখার একটি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ প্রকাশিত হয়ে টিকে আছে, যা আমরা পাঠের মাধ্যমে জানতে পারি। কেন তিনি প্যারিসকে ভ্রমণের জন্য বেছে নিলেন? হয়তো আরও অনেক লেখক, শিল্পী ও সংগীতজ্ঞরা যে স্বাধীনতা চান, সেই একই কারণে। অরওয়েলের সর্বপ্রথম লেখাটি ফরাসি ভাষায় ১৯২৮ সালের অক্টোবরে প্যারিসে প্রকাশিত হয়েছিল ‘লা সেন্সার এন অ্যাঙ্গলেটারে’ শিরোনামে। শিরোনামটির বাংলা অনুবাদ করলে হয় ‘ইংল্যান্ডে সেন্সরশিপ’।
ইংল্যান্ডে সেই সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে সেন্সর ছিল। ১৯২৮ সালে র্যাডক্লিফ হলের লেসবিয়ান (নিষ্পাপ) উপন্যাস দ্য ওয়েল অফ লোনলিনেসকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। গ্রন্থটি পুড়িয়েও ফেলা হয়। ডি এইচ লরেন্সের লেডি চ্যাটারলিজ লাভার ও জেমস জয়েসের ইউলিসিস কাটাছেঁড়া ছাড়া শুধু প্যারিস থেকেই প্রকাশ করা হয়। অবশেষে ব্রিটেনে প্রকাশিত হলে ডাউন অ্যান্ড আউট সেন্সরশিপের কবলে পড়ে। গ্রন্থটি মূলত এর পথ ও ভাষার বাস্তবতার যথার্থতা বিবেচনায় প্রকাশকের জেদের কারণে প্রকাশিত হয়। প্যারিসে লেখালেখির এই স্বাধীনতা কেবল অরওয়েলকেই আকৃষ্ট করেছিল, তা নয়; এটি আমেরিকান লেখকদের ‘লস্ট জেনারেশন’কেও আকৃষ্ট করেছিল। এই দলে ছিলেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, স্কট ফিটজেরাল্ড, হেনরি মিলার, গার্ট্রুড স্টেইন এবং ই ই কামিংস। দুর্বল ফ্রাঙ্ক অর্থাৎ লন্ডন বা নিউ ইয়র্কের উচ্চমূল্যের মুদ্রার (স্টার্লিং বা ডলার) তুলনায় অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে। লস্ট জেনারেশন হলো আমেরিকান লেখকদের সেই দল, যাঁরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কালে এসে ১৯২০-এর দশকে নিজেদেরকে সাহিত্যিক খ্যাতির চূড়ায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। পরিভাষাটি আরও সাধারণভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
সাংস্কৃতিকভাবে প্যারিসের ১৯২৮ সালটি ছিল দুটো বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। শহরের প্রাণকেন্দ্রে মার্কিন বংশোদ্ভূত প্রকাশক সিলভিয়া বিচের ‘শেক্সপিয়র অ্যান্ড কোম্পানি’ নামে বিখ্যাত একটি বইয়ের দোকান ছিল। সিলভিয়া বিচ জীবনের বেশির ভাগ সময় প্যারিসে কাটিয়েছেন। এখানে তিনি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়টিতে অন্যতম প্রবাসী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, এজরা পাউন্ড, গারট্রুড স্টেইন ও জেমস জয়েসের মতো লেখকরা তাঁর বইয়ের দোকানে নিজেদের অনুকূল অবলম্বন খুঁজে পান। পিকাসো তাঁর পরিণত শৈলী তৈরি করেন। ওদিকে অরওয়েল ডাউন অ্যান্ড আউট-এর প্রামাণিক তথ্য সংগ্রহের ফাঁকে প্যারিসে তাঁর চারপাশে সক্রিয় সৃজনশীল মানুষদের বিষয়ে কিছুটা উদাসীন ছিলেন বলেই মনে করা হয়। নিচুতলার দরিদ্র প্যারিসবাসীরা কীভাবে দিন গুজরান করতো, উপবাসে ভুগতো এবং মারা যেত—সেসব বিষয়ের প্রতি অরওয়েলের একচেটিয়া আগ্রহ ছিল। প্যারিসের নিচুতলার জীবন তাঁর দৃষ্টিকে আকর্ষণ করেছিল।
প্যারিসে যাওয়ার আগে অরওয়েল লন্ডনের উত্তর সীমান্ত-এলাকার নিচুতলার মানবসমাজে প্রাথমিক অনুসন্ধান চালান। শতছিন্ন পোশাক পরে তিনি অসহায়দের ওয়ার্কহাউজের নৈমিত্তিক ওয়ার্ড, সস্তা আবাসন ও ভবঘুরেদের সরাইখানায় রাত কাটান। পরে এক সময় ঘটনাচক্রে তিনি নিজেকে হাজতে বন্দি রাখতেও সক্ষম হন (ক্লিঙ্ক)। প্যারিস-গমনের আগে লন্ডনে বেশ কিছু মাঠপর্যায়ের গবেষণা করেন। তবে প্রকাশিত বইতে লন্ডনকে পরে নিয়ে আসা হয়েছে।
প্যারিসের নিচুতলার সমাজে তাঁর যাত্রা শুরু হয় বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে। তাঁর নিজের জবানিতে—জীর্ণ আবাসিক হোটেলে জনৈক ইতালীয় ভাড়াটিয়ার কবলে পড়ে অরওয়েল ছিনতাইয়ের শিকার হন। পরবর্তী জীবনে তিনি প্রকাশ করেন যে, তিনি আদতে সুজানে নামের এক যৌনকর্মীর খপ্পড়ে পড়েন। শিক্ষকতা পেশা থেকে উপার্জিত তাঁর সামান্য সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দেউলিয়া হয়ে যান। সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর প্যারিসবাসী মাসি বা তাঁর পিতামাতার কাছ থেকে সাহায্য চাননি। গ্রন্থেও এমন কোনো উল্লেখ নেই। তাঁর পালানোর পথ ছিল, কিন্তু সরেজমিন গবেষণাই ছিল তাঁর নিগূঢ় উদ্দেশ্য। গরিবকে বুঝতে হলে গরিব হতে হয়। এই সুযোগটি তিনি কাজে লাগিয়েছেন।
১৯২৯ সালের অক্টোবরের ওয়াল স্ট্রিট ক্র্যাশ ও বিশ্বব্যাপী ‘অতিমন্দা’র কালে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। বইটির প্যারিসীয় অর্ধেকটা ছিল দারিদ্র্য-বিষয়ক আর অবশিষ্ট ব্রিটিশ অর্ধেক ছিল বেকারত্ব-বিষয়ক। তিনি সেই বছরের সেরা অংশটিতে একজন ভবঘুরের বেশ ধারণ করেন। প্যারিসেও তাঁর ইংরেজ বন্ধু ও স্বজন ছিল, কিন্তু তিনি লেখার রসদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভবঘুরে জীবনই বেছে নিয়েছিলেন। তিনি অভুক্ত উদরে, অপরিচ্ছন্ন পোশাক পরে ভবঘুরে ও ভিক্ষুকদের প্রতিদিনের পুঞ্জিভূত অপমানকে সশরীরে অনুভব করতে চেয়েছেন। প্রাথমিকভাবে তিনি প্রবন্ধের একটি সিরিজ লিখতে চেয়েছিলেন। জ্যাক লন্ডনের ইনটু দ্য অ্যাবিস এবং ডব্লিউ এইচ ডেভিসের অটোবায়োগ্রাফি অফ আ সুপার ট্রাম্প—এ দুটি সাহিত্যকর্মকে আদর্শ মেনে তিনি এগিয়েছিলেন। কোনো পত্রিকাই তাঁর প্রবন্ধ নিতে চায়নি। তিনি অটল থেকে ফরাসি অংশটিকে একটি ছোটো বইয়ে রূপান্তরিত করেন। তাও খারিজ হয়ে যায়। অবশেষে তিনি ডাউন অ্যান্ড আউটের প্রথম খসড়ার মধ্যে সবকিছু একত্রিত করেন, যাকে বলা হয় ‘ডেইজ ইন লন্ডন অ্যান্ড প্যারিস’। আমরা আগেই জেনেছি যে, ফেবার অ্যান্ড ফেবার প্রকাশনীতে জোনাথন কেপ এবং টি এস এলিয়ট পাণ্ডুলিপিটি ফিরিয়ে দেন। সন্দেহজনকভাবে বইটি লন্ডনের সুশীল সাহিত্যজগতের জন্য অতি উগ্র ছিল। যৌনপল্লির দৃশ্য (যেখানে ‘চার্লি’র বয়ানে একটি ধর্ষণ-দৃশ্য ছিল বিশেষভাবে নৃশংস) ও প্রকৃত নিচুতলার মানুষের কথ্য ভাষার অকপট ব্যবহার সম্ভাব্য প্রকাশকদের স্নায়ুচাপে পীড়িত ও যথাসম্ভব মানহানিকর করে তুলেছিল। অরওয়েল তাঁর জীবনভর ব্রিটিশ প্রকাশকদের একটি ‘নিষ্ঠুর’ দল ভেবেছেন। সেই মুহূর্তে এরিক আর্থার ব্লেয়ার তাঁর পরিবারকে সম্ভাব্য বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে ‘জর্জ অরওয়েল’ ছদ্মনাম ধারণ করেন। তখন অরওয়েল নিছক একজন লেখক নন, একজন সম্ভাবনাময় প্রতিশ্রুতিশীল লেখক হিসেবে বিশ্বখ্যাতির পথে এগিয়ে যাচ্ছেন। এরপর ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের ৯ জানুয়ারি ডাউন অ্যান্ড আউট ইন প্যারিস অ্যান্ড লন্ডন গ্রন্থটি প্রকাশ করে ভিক্টর গোলানকজ। ৩০ জুন গ্রন্থটির আমেরিকান সংস্করণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের হার্পার কর্তৃক প্রকাশিত হয়। ডাউন অ্যান্ড আউটের শেষে অরওয়েল স্বীকার করেন যে, দরিদ্ররা পরজীবী হিসেবে জেন্ম নেয় না, তারা ভিক্ষা করার জন্যও জন্মায় না, তারা পরিস্থিতির শিকার মাত্র।
টি এস এলিয়ট আরও একবার অরওয়েলের একটি পাণ্ডুলিপি ফেরত দিয়েছেন। আসলে টি এস এলিয়ট ও জর্জ অরওয়েলের মধ্যকার সম্পর্কটি ছিল বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত লেখক-সম্পাদক সম্পর্কগুলোর মধ্যে একটি। অরওয়েলের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি অ্যানিমেল ফার্মকে এলিয়টের বিনয়ী কিন্তু চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমেই এই সম্পর্কটি সংজ্ঞায়িত হয়। এই দুই লেখকের মধ্যকার আলাপচারিতায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মুহূর্ত ছিল। ফেবার অ্যান্ড ফেবার প্রকাশনাসংস্থার সম্পাদকীয় পরিচালক হিসেবে এলিয়ট ১৯৪৪ সালের ১৩ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যানিমেল ফার্ম প্রত্যাখ্যান করেন। তবুও তিনি এটিকে একটি ‘বিশেষ রচনা’ হিসেবে প্রশংসা করেন এবং জোনাথন সুইফটের রচনার সাথে তুলনা করেন। তবে তিনি বইটির রাজনৈতিক বার্তার সমালোচনা করেন। যেহেতু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেন সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্র ছিল, এলিয়ট যুক্তি দেন যে, বইটির ‘ট্রটস্কিপন্থি’ স্ট্যালিন-বিরোধী অবস্থানটি ছিল অসময়োচিত ও ‘কেবল এক ধরনের নেতিবাচকতা’। পাঠকদের ভুলে গেলে চলবে না যে, জর্জ অরওয়েল এবং টি এস এলিয়ট—এ দুই লেখক সম্পূর্ণ ভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপট থেকে এসেছিলেন। এলিয়ট ছিলেন একজন কট্টর রাজনৈতিক রক্ষণশীল, অ্যাংলো-ক্যাথলিক ও একজন আচারপরায়ণতাবাদি কবি। অপরদিকে অরওয়েল ছিলেন একজন গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী ও সাংবাদিক, যিনি তাঁর স্পষ্টভাষী নৈতিক স্বচ্ছতার জন্য ছিলেন পরিচিত। প্রত্যাখ্যানের ঘটনা ও আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, এ দুই বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্ব একে অপরের সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন।
জর্জ অরওয়েলকে লেখা টি এস এলিয়টের আরেকটি চিরকুট পাওয়া যায়। তখন অরওয়েল বিবিসি-তে অনুষ্ঠান নির্মাণ করতেন এবং ধারাভাষ্য দিতেন।
২৭ নভেম্বর, ১৯৪২
শামলি উড।
প্রিয় অরওয়েল,
এইমাত্র আমার মনে পড়লো যে, মঙ্গলবারের জন্য বিবিসি-তে প্রবেশের কোনো টিকিট আমি আপনার কাছ থেকে পাইনি: আর আমার কাছে একটি টিকিট পৌঁছে দেওয়ার মতো সময়ও থাকবে না, কারণ আমি স্টেশন থেকে সরাসরি আপনার কাছে আসবো। তাই আপনি কি দ্বাররক্ষী বা অন্য কাউকে আগে থেকে বলে রাখতে পারবেন, যাতে আমাকে প্রবেশদ্বারে বেশিক্ষণ আটকে থাকতে না হয়?
এরপর আমাকে একটি কমিটির মধ্যাহ্নভোজে যেতে হবে, কিন্তু কোনো এক সময় আপনার সাথে মধ্যাহ্নভোজে দেখা করতে পারলে খুব ভালো হতো।
আপনার বিশ্বস্ত,
টি এস এলিয়ট
ইয়ান অ্যাঙ্গাস ব্রিটিশ গ্রন্থাগারিক ও প্রখ্যাত পণ্ডিত, যিনি ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল)-এ অরওয়েল আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা ও তত্ত্বাবধান করেছেন। তিনি অরওয়েলের বিধবা স্ত্রী সোনিয়া অরওয়েলের সাথে জর্জ অরওয়েলের কালেক্টেড অ্যাসেইজ, জার্নালিজম অ্যান্ড লেটারস গ্রন্থটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেন। ১৯৫০ অরওয়েলের মৃত্যুর অনেক পরে ১৯৬৩ সালের ২৫ জুলাই ইয়ান অ্যাঙ্গাসকে লেখা একটি চিঠিতে টি এস এলিয়ট উল্লেখ করেন, “তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যাঁর সততাকে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতাম এবং ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে পছন্দ করতাম। আমার মনে আছে, তিনি ও তাঁর স্ত্রী একবার আমার সাথে মধ্যাহ্নভোজ করেছিলেন, কিন্তু দুঃখিত, আমার কাছে এমন কোনো চিঠিপত্র নেই, যা কেবল সাক্ষাতের সময় ঠিক করা ছাড়া আর কিছু হতে পারে এবং আমার মনে নেই, সেই সাক্ষাৎটি কোন সালে হয়েছিল। আমার নিজের কাছেই আমার খুব দুঃখ হয় যে, তাঁর সাথে আড্ডা দেওয়ার মতো যথেষ্ট ঘনিষ্ঠভাবে আমি তাঁকে চিনতাম না।”
.png)

১৯৮৮ সালের জুন মাস। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহর তখন এক অকল্পনীয় উন্মাদনায় কাঁপছে। কারণ, সেখানে এসেছেন পপ কিংবদন্তি মাইকেল জ্যাকসন। তাঁর ‘ব্যাড’ অ্যালবামের প্রচারের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল বিশাল কনসার্টের। স্টেডিয়ামে তিল ধারণের জায়গা নেই। হাজার হাজার চোখ মঞ্চের দিকে। হঠাৎ আলো নিভে গিয়ে চারপাশ ধোঁয়ায় ঢেকে গেল
১ ঘণ্টা আগে
ব্যান্ডের কার্যক্রম সচল রাখতে এবং ভক্তদের প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে ‘ট্যুরিং ভোকাল’ হিসেবে ব্যান্ডে যুক্ত হয়েছেন বখতিয়ার হোসাইন। সম্প্রতি ব্যান্ডের সব সদস্য ফেসবুক লাইভে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরিবর্তনের কথা জানান।
১ দিন আগে
সম্প্রতি একটি ভিডিও ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোচনা শুরু হয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাদেশের সংগীতশিল্পী হাবিব ওয়াহিদের গাওয়া ‘মহা জাদু’ গানটি। ভিডিওটি ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক
১ দিন আগে
এই ষোল বছরে মেসির বয়স বেড়েছে, চুলের স্টাইল পরিবর্তন হয়েছে, ইনজুরি, প্রণয়, বিয়ে—সবই হয়েছে। তবে একই আছে তাঁর পায়ের জাদু। আর্থিক অসচ্ছলতা, হরমোনের কারণে বেড়ে উঠতে না পারা—কিছুই আটকাতে পারেনি সর্বকালের সেরা এই খেলোয়াড়কে। তাই সতের হাজার কিলোমিটারের দূরত্ব অতিক্রম করে ঢাকা থেকে রোজারিও—মেসিকে জন্মদিনের শু
১ দিন আগে