রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন আজ

রবীন্দ্রবিরোধিতার তিন কাল

প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ০৩: ৩৬
রবীন্দ্রবিরোধিতার তিন কাল। স্ট্রিম গ্রাফিক

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের একজন। তাঁর সাহিত্য, গান ও চিন্তা উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। এত বিশাল প্রভাবের কারণেই জীবদ্দশা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক, সমালোচনা ও বিরোধিতা।

কখনো সাহিত্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কখনো রাজনৈতিক মতভেদ, কখনো ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি। আবার কখনো শ্রেণিগত ও সাংস্কৃতিক তর্কের ভেতর দিয়ে রবীন্দ্রবিরোধিতা বারবার নতুন রূপে সামনে এসেছে। ব্রিটিশ আমলে এই বিরোধিতার শুরু হয়েছিল সাহিত্যিক পরিসরে। পরে বঙ্গভঙ্গ, পাকিস্তান আন্দোলন ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রভাবে তা রাজনৈতিক রূপ নেয়।

পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রচর্চা সরাসরি রাষ্ট্রীয় দমননীতির মুখে পড়ে। স্বাধীন বাংলাদেশে এসে রবীন্দ্রবিরোধিতা নতুনভাবে হাজির হয় জাতীয় সংগীত বিতর্ক, জমিদারি প্রশ্ন, পরিচয় রাজনীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার মাধ্যমে।

ব্রিটিশ আমলে বিরোধিতা: ব্যক্তিগত ঈর্ষা থেকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি

রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতার শুরুটা হয়েছিল তাঁর সমসাময়িক কবি ও লেখকদের মাধ্যমেই। ১৯ শতকের শেষভাগে যখন তাঁর প্রতিভা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ তাঁর লিখনশৈলী ও আধুনিকতাকে সহজে মেনে নিতে পারেনি। তবে সাহিত্যিকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিরোধিতা আসে নাট্যকার ও কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কাছ থেকে।

সাহিত্য নিয়ে মতভেদের কারণে দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ‘আনন্দ বিদায়’ প্রহসনে রবীন্দ্রনাথকে বিদ্রুপ করেছিলেন। এ ছাড়া সে সময়কার অনেক সমালোচক রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে ‘অস্পষ্ট’ বা ‘দুর্বোধ্য’ বলে আক্রমণ করতেন। তবে এই পর্যায়ের বিরোধিতা ছিল মূলত সাহিত্যিক মানদণ্ডের।

‘কল্লোল যুগ’-এ রবীন্দ্রবিরোধিতা নতুন মাত্রা পায়। সংগৃহীত ছবি
‘কল্লোল যুগ’-এ রবীন্দ্রবিরোধিতা নতুন মাত্রা পায়। সংগৃহীত ছবি

পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার উত্থানের সময় ‘কল্লোল যুগ’-এ রবীন্দ্রবিরোধিতা নতুন মাত্রা পায়। ১৯২৩ সালে প্রকাশিত কল্লোল পত্রিকাকে ঘিরে একদল তরুণ সাহিত্যিক তৈরি হন। তাঁরা বাংলা সাহিত্যে নতুন ভাষা, নতুন বিষয় এবং নতুন জীবনবোধ আনতে চেয়েছিলেন। এই গোষ্ঠীর সঙ্গে ছিলেন বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখ।

কল্লোল গোষ্ঠীর দৃষ্টিতে বাংলা সাহিত্য তখন অতিমাত্রায় রবীন্দ্র-প্রভাবিত হয়ে পড়েছিল। ফলে তাঁরা সচেতনভাবে রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিকতা ও ভাবালুতার বিপরীতে নগরজীবনের সংকট, বাস্তবতা, হতাশা ও মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনকে সাহিত্যে তুলে ধরেন। এই প্রবণতাকে অনেকে ‘রবীন্দ্রবিরোধিতা’ বললেও প্রকৃতপক্ষে তা ছিল রবীন্দ্র-প্রভাবমুক্ত হয়ে নতুন সাহিত্যধারা নির্মাণের চেষ্টা। কারণ, কল্লোলের অধিকাংশ লেখকই ব্যক্তিগতভাবে রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

রবীন্দ্রবিরোধিতার সাহিত্যিক ধারার আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাম ছিল সাপ্তাহিক ব্যঙ্গপত্র ‘শনিবারের চিঠি’। ১৯২৪ সালে যোগানন্দ দাসের সম্পাদনায় প্রকাশিত এই পত্রিকাটি বাংলা সাহিত্যে ব্যতিক্রমধর্মী ব্যঙ্গ-সাময়িকী হিসেবে পরিচিতি পায়। সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি—সবকিছুকেই তারা ব্যঙ্গ ও বিদ্রুপের উপাদান বানাত। রবীন্দ্রনাথ থেকে কাজী নজরুল ইসলাম, এমনকি সমকালীন বহু খ্যাতিমান লেখকও রেহাই পাননি তাদের তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ থেকে।

পত্রিকাটিও মনে করত, বাংলা সাহিত্য রবীন্দ্রপ্রভাবিত হয়ে পড়েছে। সেখানে ব্যঙ্গকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই ধারার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি নলিনীকান্ত সরকারের লেখা ‘জয়জয়ন্তী’। এটা রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘জন গণ মন’-এর প্যারোডি।

‘ঘন ঘন ধনমপি নায়ক জয় হে জয়ন্তিভাগ্যবিধাতা!

ইংলণ্ড-ফ্রান্স-সুইডেন-ইটালী-আরব-তুর্কী-কঙ্গো-আল্পস-ককেশস-দনিয়ুব-ভলগা-নাইল-মিসিসিপি-হংহো

তব ফরমাসে আসে বাংলা কবিতা চাষে

পূরিল কৃষ্টির খাতা।

ঘন ঘন লাঙল-দায়ক জয় হে, জয়ন্তিভাগ্যবিধাতা!’

রবীন্দ্রবিরোধিতার সাহিত্যিক ধারার আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাম ছিল সাপ্তাহিক ব্যঙ্গপত্র ‘শনিবারের চিঠি’। সংগৃহীত ছবি
রবীন্দ্রবিরোধিতার সাহিত্যিক ধারার আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাম ছিল সাপ্তাহিক ব্যঙ্গপত্র ‘শনিবারের চিঠি’। সংগৃহীত ছবি

রবীন্দ্রবিরোধিতা প্রথম স্পষ্ট রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক রূপ নেয় ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময়। তখন প্রবল সমালোচনার মুখোমুখি হন তিনি। রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন এবং ‘রাখিবন্ধন’ উৎসবের মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর অবস্থানকে চিহ্নিত করা হয়েছিল মুসলমান ও পূর্ববঙ্গের স্বার্থবিরোধী হিসেবে।

এই সময় থেকেই রবীন্দ্রনাথকে ‘হিন্দু জমিদার শ্রেণির প্রতিনিধি’ কিংবা ‘হিন্দু কবি’ হিসেবে দেখানোর রাজনৈতিক প্রচারণা শুরু হয়। ধীরে ধীরে তাঁর সাহিত্য ও রাজনৈতিক অবস্থানকে মুসলিম স্বার্থবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এখান থেকেই জন্ম নেয় একটি বহুল প্রচারিত ঐতিহাসিক মিথ—রবীন্দ্রনাথ নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন।

প্রচার করা হয় যে ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার কার্জন হলের সভায় রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেন। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, সেদিন কার্জন হলে এমন কোনো সভা হয়নি। রবীন্দ্রনাথ তখন কলকাতায়ও ছিলেন না। বরং ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সফরকালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষার পরিবেশের প্রশংসা করেছিলেন। তবুও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তৈরি এই মিথ দীর্ঘদিন ধরে রবীন্দ্রবিরোধী প্রচারণার একটি বড় উপাদান হয়ে থাকে।

ব্রিটিশ ভারতের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তান আন্দোলনের সময় রবীন্দ্র বিরোধিতা আরও তীব্র রাজনৈতিক রূপ পায়। পাকিস্তানপন্থী অনেক বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকের দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কংগ্রেসপন্থী, হিন্দু মধ্যবিত্ত জাতীয়তাবাদের প্রতিনিধি এবং মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিবন্ধক। ফলে পূর্ববঙ্গের একাংশের রাজনৈতিক চেতনায় রবীন্দ্রনাথকে মুসলমান রাজনৈতিক স্বার্থের বিরোধী ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

মোটা দাগে ১৯৪৭ সালের আগে পূর্ববঙ্গের একাংশে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে তিন ধরনের ধারণা তৈরি হয়েছিল। প্রথমত, তিনি অসাধারণ প্রতিভাবান কবি হলেও মুসলমান রাজনৈতিক স্বার্থের বিরোধী; দ্বিতীয়ত, হিন্দু-মুসলমান ঐক্য প্রতিষ্ঠায় তিনি ব্যর্থ; তৃতীয়ত, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান মূলত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ভাবধারার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এই ধারণাগুলোর ভিত্তিতেই ব্রিটিশ ভারতের শেষ যুগে পাকিস্তানবাদী রাজনীতি রবীন্দ্রনাথকে সাংস্কৃতিকভাবে অস্বীকার করার চেষ্টা চালায়।

পাকিস্তান আমল: রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের লড়াই

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যায়। ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পূর্ববাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়েও নতুন টানাপোড়েন শুরু হয়। এই সময় রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বিরোধিতা আর শুধু সাহিত্যিক বা রাজনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটা পরিণত হয় রাষ্ট্রীয় নীতির অংশে।

১৯৬১-৬২ সালে ঢাকায় রবীন্দ্র সঙ্গীত পরিবেশন। সংগৃহীত ছবি
১৯৬১-৬২ সালে ঢাকায় রবীন্দ্র সঙ্গীত পরিবেশন। সংগৃহীত ছবি

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চোখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ‘হিন্দু ভারতের সংস্কৃতির প্রতীক’। তাদের আশঙ্কা ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা যদি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, গান ও চিন্তার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে তারা পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের বদলে নিজেদের বাঙালি পরিচয়ের দিকে বেশি আকৃষ্ট হবে। ফলে ধীরে ধীরে রবীন্দ্রচর্চাকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়।

পূর্ববঙ্গের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবী, ছাত্রসমাজ ও সংস্কৃতিকর্মীদের বড় অংশ রবীন্দ্রনাথকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন। তাঁদের কাছে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন বাঙালি সংস্কৃতি, মানবতাবাদ, উদার চিন্তা ও ভাষাভিত্তিক পরিচয়ের প্রতীক।

এই সময় পূর্ববাংলায় নতুন জাতীয় চেতনা গড়ে উঠতে থাকে। এই চেতনা ধীরে ধীরে পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করে। আর সেই আন্দোলনের সাংস্কৃতিক শক্তির অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথ।

পাকিস্তানি শাসকরা তাই রবীন্দ্রসাহিত্যকে দমানোর চেষ্টা চালায়। বিশেষ করে আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসার পর এই দমননীতি আরও স্পষ্ট হয়। তাঁর শাসনামলে এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান-এর সময় রবীন্দ্রচর্চাকে সীমিত করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী পালনের সময় পাকিস্তান সরকার বাধা সৃষ্টি করে। সরকারি পর্যায়ে বলা হয়, রবীন্দ্রচর্চা পাকিস্তানি আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পূর্ব বাংলার মানুষ ব্যাপকভাবে জন্মশতবার্ষিকী পালন করে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা ও রবীন্দ্রসংগীতের আয়োজন হয়। এতে স্পষ্ট হয়ে যায়, রাষ্ট্রীয় চাপ দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে মানুষের মন থেকে সরানো সম্ভব নয়।

এরপর ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধের ঘোষণা দেন। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রসংগীত আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ নয়।’ এই সিদ্ধান্ত পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ২৪ জুন দেশের ১৯ জন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী এর বিরুদ্ধে যৌথ বিবৃতি দেন। তাঁরা এই সিদ্ধান্তকে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেন।

ব্রিটিশ ভারতের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তান আন্দোলনের সময় রবীন্দ্র বিরোধিতা আরও তীব্র রাজনৈতিক রূপ পায়। পাকিস্তানপন্থী অনেক বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকের দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কংগ্রেসপন্থী, হিন্দু মধ্যবিত্ত জাতীয়তাবাদের প্রতিনিধি এবং মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিবন্ধক।

তবে পূর্ব বাংলার মানুষ শুধু রবীন্দ্রনাথকেই গ্রহণ করেছিল, এমনটা নয়। কাজী নজরুল ইসলাম, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, জীবনানন্দ দাশসহ বহু সাহিত্যিক ও শিল্পীকেও তাঁরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ সবচেয়ে বড় প্রতীকে পরিণত হন।

একই সময় ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে ভিন্ন ধরনের বিরোধিতা দেখা যায়। ষাটের দশকের শেষ ও সত্তরের দশকের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গে নকশাল আন্দোলনে যুক্ত একাংশ তাঁকে বাঙালি মধ্যবিত্ত সংস্কৃতি ও পুরোনো ভদ্রলোক সমাজের প্রতীক হিসেবে দেখত। এই প্রত্যাখ্যানের অংশ হিসেবে রবীন্দ্রনাথসহ বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দের প্রতিকৃতি ভাঙার ঘটনাও ঘটে। তবে এটা পুরো আন্দোলনের সর্বজনীন অবস্থান ছিল না। পুরোনো সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব ভাঙার রাজনৈতিক প্রদর্শন ছিল।

বাংলাদেশ পর্ব: বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণ ও জাতীয় সংগীত বিতর্ক

স্বাধীনতার পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাষ্ট্রীয় মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথ বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ভাষা ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীকে পরিণত হন। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রবিরোধিতাও নতুনভাবে ফিরে আসে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আদর্শিক মহলে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়। একদিকে একটি গোষ্ঠী তাঁকে ‘ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতিনিধি’ হিসেবে আক্রমণ করে। অন্যদিকে, কয়েকজন মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদ তাঁকে শ্রেণিগত দৃষ্টিকোণ থেকে সমালোচনা করেন।

আহমদ শরীফ রবীন্দ্রনাথকে ‘বুর্জোয়া মানবতাবাদের প্রতীক’ হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সংগ্রামের সরাসরি ভাষ্যকার ছিলেন না। আবার আহমদ ছফা প্রশ্ন তুলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ কেন তাঁর মুসলিম প্রজাদের জীবনকে কেন্দ্র করে সাহিত্য রচনা করেননি? এসব সমালোচনা মূলত শ্রেণি, সমাজ ও পরিচয়ভিত্তিক আলোচনার অংশ ছিল।

রবীন্দ্র বিরোধীদের অন্যতম বড় অভিযোগ তাঁর জমিদার পরিচয় নিয়ে। প্রায়ই বলা হয়, তিনি প্রজাদের শোষণ করে শান্তিনিকেতন গড়ে তুলেছিলেন। তবে রবীন্দ্রনাথ তাঁর জমিদারিতে কৃষি সংস্কার, ঋণসুবিধা ও আধুনিক কৃষিব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি পতিসরে কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন এবং নোবেল পুরস্কারের অর্থও কৃষকদের কল্যাণে ব্যবহার করেন।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। তাঁর সাহিত্য, রাজনীতি, শ্রেণি-অবস্থান কিংবা তাঁর সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন তোলা আর ইতিহাস অস্বীকার করা এক বিষয় নয়। রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে সমালোচনা যেমন আছে, তেমনি তাঁকে গ্রহণ করার গভীর ঐতিহাসিক কারণও আছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রবিরোধিতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নতুন রূপ নেয়। তাঁকে ‘এলিট সংস্কৃতির প্রতিনিধি’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা দেখা যায়। একই সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম-এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দ্বন্দ্ব তৈরি করার প্রবণতাও দেখা যায়।

বাংলাদেশে রবীন্দ্রবিরোধিতার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রকাশ দেখা যায় জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের বিতর্কে। স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে আমার সোনার বাংলা বাদ দেওয়ার দাবি উঠেছে। ১৯৭৫ সালে খোন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

জিয়াউর রহমান আমলেও জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের আলোচনা সামনে আসে। ২০০১–২০০৬ সালের সরকারের সময়ও জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের আলোচনা আবার সামনে আসে। তৎকালীন দুই মন্ত্রী জামায়াতের মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদ জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের সুপারিশপত্র জমা দিয়েছিলেন। সেখানে ‘ইসলামি মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’ জাতীয় সংগীতের কথা বলা হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও জাতীয় সংগীত নিয়ে বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলা সংস্কৃতির বহু প্রতিষ্ঠিত উপাদানকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করা শুরু হয়। সেই আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-ও বারবার কেন্দ্রে চলে আসেন।

এ সময় অনেক পোস্ট, ভিডিও ও অনলাইন আলোচনায় রবীন্দ্রনাথকে ‘বাঙালি মুসলিম পরিচয়ের বাইরের কবি’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা দেখা যায়। কেউ কেউ দাবি করেন, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চর্চা দীর্ঘদিন ধরে ‘রবীন্দ্রকেন্দ্রিক’ হয়েছিল। ফলে লোকজ, ইসলামি বা আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক ধারা পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। আবার অনেকে রবীন্দ্রসংগীত ও ছায়ানটকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক চর্চাকে ‘নগর মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির আধিপত্য’ হিসেবেও ব্যাখ্যা করেন।

একই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে বিকৃত তথ্য, পুরোনো অভিযোগ ও আংশিক ঐতিহাসিক বয়ান নতুন করে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। লক্ষণীয়, আগের তুলনায় রবীন্দ্রবিরোধিতা এখন আর শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই। অ্যালগরিদমনির্ভর অনলাইন প্রচারণা, ট্রল সংস্কৃতি এবং পরিচয়ভিত্তিক সাংস্কৃতিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির প্রয়াত গোলাম আজমের সন্তান আবদুল্লাহিল আমান আযমী জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের পক্ষে বক্তব্য দেন। তাঁর দাবি, আমার সোনার বাংলা মূলত বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা। গানটি স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তবতাকে পুরোপুরি ধারণ করে না। পরে এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক তর্ক-বিতর্ক তৈরি হয়। একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা আফম খালিদ হোসেন জানান, সরকার জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের মতো বিতর্কিত কোনো উদ্যোগ নেবে না। সাম্প্রতিক সময়ের এই বিতর্ক আরও উসকে দেয় এনসিপির এমপি হান্নান মাসউদ-এর একটি বক্তব্য। তিনি দাবি করেছেন, রবীন্দ্রনাথ ‘ব্রিটিশদের খুশি করে’ নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।

এদিকে, বর্তমানে রবীন্দ্রবিরোধিতা একটি নতুন সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মোড়ও নিয়েছে। কিছু চিন্তাবিদ রবীন্দ্রনাথকে ‘নাগরিক সংস্কৃতির আধিপত্যকারী’ হিসেবে তুলে ধরে লালন সাঁই-কে তাঁর বিপরীতে ‘সহজ মানুষের প্রতীক’ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। কেউ কেউ দাবি করেন, রবীন্দ্রনাথ লালনের গান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেননি।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। তাঁর সাহিত্য, রাজনীতি, শ্রেণি-অবস্থান কিংবা তাঁর সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন তোলা আর ইতিহাস অস্বীকার করা এক বিষয় নয়। রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে সমালোচনা যেমন আছে, তেমনি তাঁকে গ্রহণ করার গভীর ঐতিহাসিক কারণও আছে।

সম্পর্কিত