জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে ২০২৫ সালটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ওই বছরে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ঢেউ স্পষ্টভাবেই লেগেছিল প্রকাশনা শিল্পে। নানা চড়াই-উতরাই ও অনিশ্চয়তা পেরিয়ে অনুষ্ঠিত ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৫’-এ পাঠক ও প্রকাশকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের মেলায় মোট ৩ হাজার ২৯৯টি নতুন বই প্রকাশিত হয়। মেলায় অংশ নিয়েছিল ৭০৮টি প্রতিষ্ঠান এবং তাদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল ১ হাজার ৮৪ ইউনিটের স্টল।
মেলা শেষে সামগ্রিক প্রকাশনা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও নির্দিষ্ট কিছু বই ও লেখককে ঘিরে পাঠকদের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। বেশ কিছু মৌলিক ও অনুবাদের বই ছিল আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে।
কথাসাহিত্যে আলোচিত বই
২০২৫ সালে উপন্যাসের জগতে বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় লেখক তাঁদের নতুন কাজ নিয়ে হাজির হয়েছেন, যা পাঠকদের মধ্যে সাড়াও ফেলেছে।
থ্রিলার সাহিত্যের পাঠকদের কাছে মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন একটি পরিচিত নাম। ২০২৫ সালে বাতিঘর প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘দ্য ভিঞ্চি ক্লাব’ উপন্যাসটি এই ধারার অন্যতম সংযোজন। বইটি প্রকাশের পর সোশাল মিডিয়ায় পাঠকদের উচ্ছ্বাস ছিল দৃশ্যমান। ব্যতিক্রমী প্লট ও লিখনশৈলীর কারণে এটি ছিল বছরজুড়েই আলোচনায়।
ছবি: সংগৃহীতপ্রচারবিমুখ লেখক হিসেবে পরিচিত ওবায়েদ হক। তিনি নিভৃতে থাকতে পছন্দ করলেও পাঠকেরা তাঁকে নিয়ে সরব থাকেন। ২০২৫ সালে প্রকাশনা সংস্থা ‘৫২ (বায়ান্ন)’ থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর বই ‘উন্মাদ আশ্রম’। লেখককে সচরাচর জনসমক্ষে বা ইভেন্টে দেখা না গেলেও তাঁর এই বইটি নিয়ে পাঠকমহলে হইচই পড়ে যায়। পাঠকেরা নিজেদের উদ্যোগে বইটির প্রচার ও নানা ইভেন্টের আয়োজন করেন, যা বইটিকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
ছবি: সংগৃহীতশিবব্রত বর্মন এমন একজন লেখক, যাঁর লেখা প্রকাশ হওয়া মাত্রই তা আলোচনার জন্ম দেয়। ২০২৫ সালে প্রথমা প্রকাশন থেকে আসে তাঁর উপন্যাস ‘শোধ’। গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সোশাল মিডিয়ার বিভিন্ন গ্রুপে এই বই নিয়ে পাঠকেরা সরব ছিলেন।
ছবি: সংগৃহীতমাহরীন ফেরদৌসের পাঠকেরা সারা বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন তাঁর নতুন বইয়ের জন্য। ২০২৫ সালে কথাপ্রকাশ থেকে বের হয় তাঁর উপন্যাস ‘জলজ লকার’। বইটি বাজারে আসামাত্রই পাঠকেরা লুফে নেন। বইটি নিয়ে যেমন প্রশংসা হয়েছে, তেমনি কিছু সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে। সব মিলিয়ে গত বছরের প্রকাশিত উপন্যাসের মধ্যে এটি ছিল অত্যন্ত চর্চিত একটি নাম।
ছবি: সংগৃহীত‘নিনাদ’ উপন্যাসের মাধ্যমে মুরাদ কিবরিয়া ইতিমধ্যে একটি শক্ত পাঠকশ্রেণি তৈরি করেছেন। ২০২৫ সালে প্রকাশনা সংস্থা আদর্শ থেকে আসে তাঁর নতুন উপন্যাস ‘প্রেম প্রার্থনা মৃত্যু’। বইটির দাম তুলনামূলক বেশি হওয়া সত্ত্বেও মেলা শেষ হওয়ার আগেই এর প্রথম মুদ্রণ শেষ হয়ে যায়। বিশিষ্ট লেখকরাও সোশাল মিডিয়ায় বইটি নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন।
ছবি: সংগৃহীতঅন্যদিকে, পাইওনিয়ার পাবলিকেশনস থেকে প্রকাশিত সালাহ উদ্দীন শুভ্রর ‘গণভবনের ভূত’ বইটি মেলায় বেশ হইচই ফেলে। বিশেষ করে বইটির নাম ও প্রচ্ছদ পাঠকদের মধ্যে প্রবল কৌতূহল ও আলোচনার জন্ম দেয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সম্পর্কিত বই
২০২৫ সালের প্রকাশনা জগতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রভাব ছিল অত্যন্ত প্রবল। এ সংক্রান্ত বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে কিছু বই তুমুল তর্ক-বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত এবং সমালোচিত বইটি হলো আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার লেখা ‘জুলাই: মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’। প্রথমা প্রকাশন থেকে বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই অভ্যুত্থানের অনেক অংশীজন বইটির বিষয়বস্তু নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ ছাড়া প্রথমা প্রকাশন থেকে কেন এই বই প্রকাশিত হলো, তা নিয়েও সমালোচনার ঝড় ওঠে। আন্দোলনরত অনেক ছাত্র-জনতা লেখার মাধ্যমে এই বইয়ের বিরোধিতা করেন। সব মিলিয়ে এটি ছিল এ বছরের অন্যতম আলোচিত প্রকাশনা।
ছবি: সংগৃহীতবাংলা একাডেমি থেকে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কবিতা’ নামে একটি সংকলন প্রকাশের খবর সোশাল মিডিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি করে। অভিযোগ ওঠে, এই সংকলনে এমন কবিদের স্থান দেওয়া হয়েছে, যাঁরা জুলাই হত্যাকাণ্ডের পক্ষে বয়ান তৈরি করেছিলেন। বইটি এখনো বাজারে না এলেও তুমুল সমালোচিত হয়েছে। তবে একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গল্প’ ও ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রবন্ধ’ বই দুটি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে এবং পাঠকদের মধ্যে আলোচিত হয়েছে।
ছবি: সংগৃহীতপ্রথমা থেকে আলতাফ পারভেজের গবেষণাধর্মী বই ‘লাল জুলাই: চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পথপরিক্রমা’ বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। এ ছাড়া সারোয়ার তুষারের ‘অন্তর্বর্তী ভাবনা’, মিনহাজুল ইসলামের ‘পনেরো সমন্বয়কের সাক্ষাৎকার’ এবং আহম্মদ ফয়েজের ‘সংবাদপত্রে জুলাই অভ্যুত্থান: ২৫টি শীর্ষ দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠা’ বইগুলো জুলাইয়ের ঘটনাবলিকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছে।
অনুবাদ সাহিত্য
২০২৫ সালের বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম বড় ঘটনা ছিল ৯ সেপ্টেম্বর ড্যান ব্রাউনের নতুন বই ‘দ্য সিক্রেটস অব সিক্রেট’ প্রকাশ। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে এই বইটিকে ঘিরে এক অভূতপূর্ব প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায়।
বেশ কয়েকটি প্রকাশনী ঘোষণা দিয়েছিল যে বিশ্বব্যাপী ইংরেজি সংস্করণ বের হওয়ার দিনই তারা বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করবে। যদিও সেই দাবি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, তবুও বইটির প্রতি পাঠকদের আগ্রহ ছিল আকাশচুম্বী। জ্ঞানকোষ প্রকাশনী, বাতিঘর প্রকাশনী, অন্যধারা, দি স্কাই পাবলিশার্স এবং অনুজ প্রকাশনসহ (প্রি-অর্ডার চলছে)—একাধিক প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশিত হয় বা হওয়ার প্রক্রিয়ায় আছে।
ছবি: সংগৃহীতবইটি নিয়ে সোশাল মিডিয়া থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডা—সর্বত্রই ছিল আলোচনার ঝড়। অনেক দিন পর বইয়ের বাজার এতটা চাঙা হতে দেখা যায়। তবে জ্ঞানকোষ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত সংস্করণটিতে কিছু কারিগরি ত্রুটি থাকায় শুরুতে সমালোচনার মুখে পড়ে। পরে তারা সেটি সংশোধন করে পুনরায় বাজারে ছাড়ে। সব মিলিয়ে ড্যান ব্রাউনের এই বই এবং এর বাংলা অনুবাদ ২০২৫ সালের সাহিত্যাঙ্গনে এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে এনেছিল।