জাতীয় পতাকা কেবল নির্দিষ্ট অনুপাতের একখণ্ড রঞ্জিত কাপড় নয়, জাতীয় পতাকা একটি জনপদের সামষ্টিক আকাঙ্ক্ষা, দীর্ঘ লড়াইয়ের নির্যাস এবং আত্মপরিচয়ের এক দৃশ্যমান ইশতেহার। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের বটতলায় প্রথম উত্তোলিত পতাকাটি ছিল এক রাষ্ট্রদ্রোহী বিদ্রোহের প্রকাশ, যা সময়ের পরিক্রমায় স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতীকে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের পতাকার আদি রূপটি তৈরি হয়েছিল এক গভীর রাজনৈতিক গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে, যা ছিল তৎকালীন ছাত্ররাজনীতির এক অনন্য অধ্যায়। ষাটের দশকের শেষভাগ থেকেই বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন যখন মুক্তিযুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছিল, তখন পর্দার অন্তরালে সক্রিয় ছিল ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ বা সংক্ষেপে ‘নিউক্লিয়াস’। এই গোপন সংগঠনটি একটি স্বতন্ত্র জাতীয় পতাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, যা চাঁদ-তারা খচিত পাকিস্তানি পতাকার বিপরীতে বাঙালির নিজস্ব সত্তাকে ধারণ করবে।
১৯৭০ সালের জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের একটি কক্ষে বসে ছাত্রনেতারা এই পতাকার নকশা চূড়ান্ত করেন। সেই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পতাকার জমিনে গাঢ় সবুজের ওপর লাল বৃত্তের ভেতর সোনালি রঙের বাংলাদেশের মানচিত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পতাকার জমিনে মানচিত্রটি ছিল দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত কৃত্রিম পাকিস্তান রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে অস্বীকার করার এক সাহসী পদক্ষেপ। শিবনারায়ণ দাশ যখন নিপুণ হাতে সেই মানচিত্রটি এঁকেছিলেন, তিনি আসলে একটি স্বাধীন দেশের ভবিষ্যৎ সীমানাকেই অঙ্কন করেছিলেন।
১৯৭১ সালের ২ মার্চ ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে এক চরম সন্ধিক্ষণ। ১ মার্চ যখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করে, তখন ছাত্রসমাজ আর নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির তত্ত্বে সীমাবদ্ধ থাকতে পারেনি। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হওয়ার পর ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ মানুষের উপস্থিতিতে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকাটি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করা হয়। এই পতাকা উত্তোলনের তাৎপর্য ছিল গভীর এবং সুদূরপ্রসারী। তৎকালীন ছাত্র নেতৃত্বের হাত ধরে উত্তোলিত সেই পতাকাটি ছিল মূলত পাকিস্তানি সার্বভৌমত্বের প্রতি এক প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ।
সামরিক আইনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পতাকা ওড়ানো ছিল কার্যত সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা।
পতাকার এই বিবর্তন কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার প্রতিটি প্রান্তে। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসকে বাঙালিরা ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করার মধ্য দিয়ে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করে। সেদিন রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত প্রতিটি ঘরে স্বাধীন বাংলার মানচিত্রখচিত পতাকা ওড়ানো হয়।
মানচিত্রখচিত স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা তৈরি করা হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীতপতাকার ইতিহাসে আরেকটি উজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয় ১৮ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে, বিদেশের মাটিতে প্রথম পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে। কলকাতার ৯ সার্কাস এভিনিউতে অবস্থিত পাকিস্তান ডেপুটি হাই কমিশনের বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যখন বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, তখন তারা মিশনের ছাদ থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকাটি সগৌরবে উড়িয়ে দেন। এম হোসেন আলীর নেতৃত্বে এই কূটনৈতিক বিদ্রোহটি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক বিজয়। এর মাধ্যমে বিশ্ব গণমাধ্যম বুঝতে পারে যে, বাঙালির এই লড়াই কোনো অভ্যন্তরীণ দাঙ্গা নয়, বরং এটি একটি রাষ্ট্র গঠনের লড়াই। বিদেশের মাটিতে এই পতাকা উত্তোলনের ঘটনাটি মুক্তিযুদ্ধকে একটি আন্তর্জাতিক মাত্রা প্রদান করেছিল এবং বিশ্বজনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে পতাকার মূল নকশায় কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়। শিল্পী কামরুল হাসানের তত্ত্বাবধানে পতাকাকে একটি পরিমিত জ্যামিতিক রূপ দেওয়া হয় এবং মাঝখানের সোনালি মানচিত্রটি সরিয়ে দেওয়া হয়। পতাকা থেকে মানচিত্রটি সরিয়ে নিলেও পতাকার মূল দর্শনটি অক্ষুণ্ণ রাখা হয়। গাঢ় সবুজ জমিনটি কেবল এদেশের প্রকৃতির প্রতীক নয়, বরং এটি তারুণ্যের প্রাণপ্রাচুর্য এবং একটি সমৃদ্ধ কৃষিনির্ভর দেশের ইঙ্গিতও বহন করে। আর মাঝখানের লাল বৃত্ত, যা উদীয়মান সূর্যের প্রতীক, এই বৃত্ত একইসাথে বহন করছে মুক্তিকামী মানুষের বিসর্জিত রক্তধারা।
আমাদের জাতীয় পতাকার লাল বৃত্তটি কেন সামান্য বাম দিকে সরানো, তার পেছনেও রয়েছে এক গভীর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। পতাকা যখন দণ্ডে উড়ন্ত অবস্থায় থাকে, তখন দূর থেকে দেখলে বৃত্তটি যেন ঠিক মাঝখানে মনে হয়, সেই ভারসাম্য রক্ষা করতেই এই জ্যামিতিক কৌশলটি অবলম্বন করা হয়েছে।
পতাকার মর্যাদা রক্ষা এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ১৯৭২ সালে ‘জাতীয় পতাকা বিধিমালা’ প্রণয়ন করা হয়। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে পতাকার ১০:৬ অনুপাত রক্ষা করা, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পতাকার অবস্থান নিশ্চিত করা এবং জাতীয় শোকের দিনে পতাকাকে অর্ধনমিত রাখার বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা কেবল একটি কাপড়ের বিবর্তন নয়; এটি একটি জাতির দীর্ঘ ২৩ বছরের বঞ্চনা এবং ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মহাকাব্য। ২ মার্চের সেই আদি পতাকাটিতে যে মানচিত্র ছিল, তা আজ আমাদের জাতীয় মানসে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। আজ হয়তো কাপড়ের ওপর সেই ভৌগোলিক রেখাটি নেই, কিন্তু প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে সেই ‘সোনার বাংলা’র মানচিত্রটি এখনো অম্লান।
এই লাল-সবুজ পতাকাটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালির বীরত্বগাথা শুনিয়ে যাবে এবং বিশ্বের মানচিত্রে একটি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রেরণা যোগাবে। পতাকার লাল বৃত্তটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেবে যে, স্বাধীনতার সূর্য কখনো অস্তমিত হয় না যদি একটি জাতি তার সার্বভৌমত্বের প্রতি অনুগত থাকে।