জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বিশ্বের প্রাচীনতম ৬ বইয়ের দোকান

একটা বইয়ের দোকান হতে পারে শহরের চিন্তার আড্ডাখানা, তরুণদের বিতর্কের জায়গা, লেখকদের মিলনস্থল কিংবা কোনো বিপ্লবের নীরব সূচনা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এমন কিছু বইয়ের দোকান আছে, যেগুলো শত বছর ধরে টিকে আছে ঝড়, যুদ্ধ, ভূমিকম্প আর সময়ের পরিবর্তনের মাঝেও। চলুন, ঘুরে আসি বিশ্বের পুরোনো ছয়টি বইয়ের দোকান থেকে।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০২৬, ১৫: ০৯
বিশ্বের প্রাচীনতম ৬ বইয়ের দোকান। এআই জেনারেটেড কোলাজ

অমর একুশে বইমেলার আজ পঞ্চম দিন। বইমেলার ধুলোমাখা পথে হাঁটা, নতুন বইয়ের গন্ধ নেওয়ার আনন্দ এখন চারদিকে। বছরজুড়েই বইয়ের দোকানে ঢুকলে একটা আলাদা গন্ধ পাওয়া যায়। মনে হয়, এখানে শুধু বই সাজানো নেই; সাজানো আছে সময়।

একটা বইয়ের দোকান হতে পারে শহরের চিন্তার আড্ডাখানা, তরুণদের বিতর্কের জায়গা, লেখকদের মিলনস্থল কিংবা কোনো বিপ্লবের নীরব সূচনা। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এমন কিছু বইয়ের দোকান আছে, যেগুলো শত বছর ধরে টিকে আছে ঝড়, যুদ্ধ, ভূমিকম্প আর সময়ের পরিবর্তনের মাঝেও। চলুন, ঘুরে আসি বিশ্বের পুরোনো ছয়টি বইয়ের দোকান থেকে।

আরগোসি বুকস

১৯২৫ সাল। লুইস কোহেন নামের এক স্বপ্নবাজ মানুষ নিউইয়র্ক সিটিতে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘আরগোসি বুকস’। দোকানটির নামকরণের পেছনে ছিল তাঁর চতুর ব্যবসায়িক বুদ্ধি। তিনি চেয়েছিলেন টেলিফোন ডিরেক্টরিতে যেন সবার আগে তাঁর দোকানের নাম থাকে, তাই ‘A’ দিয়ে শুরু এই নামটি বেছে নিয়েছিলেন। সেই বুদ্ধি কাজে লেগেছিল বটে! বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন থেকে শুরু করে জ্যাকি কেনেডি, এমনকি বিল ক্লিনটনের মতো ব্যক্তিত্বরা এই দোকানের নিয়মিত খরিদ্দার ছিলেন।

বর্তমানে কোহেন পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম এই দোকানটি পরিচালনা করছে। নিউইয়র্কের আকাশচুম্বী দালানের ভিড়ে ছয় তলা বিশিষ্ট এই দোকান যেন জলজ্যান্ত এক টাইম মেশিন। এখানে পাওয়া যায় বিরল সব পাণ্ডুলিপি, আমেরিকার ইতিহাসের দুষ্প্রাপ্য দলিল আর মেডিকেল সায়েন্সের পুরোনো সব বই।

২০১২ সালে হারিকেন স্যান্ডির আঘাতে পাশের ভবন ধসে পড়লে দোকানটির ছাদ ভেঙে যায়। এতে থমাস জেফারসনের সই করা নথিসহ অনেক অমূল্য সম্পদ নষ্ট হয়ে গেলেও বইপ্রেমীদের ভালোবাসায় মাত্র এক বছরের মধ্যেই আরগোসি আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়।

মোরপুরগো বুকস্টোর

ক্রোয়েশিয়ার স্প্লিট শহরের মানুষের কাছে ‘মোরপুরগো’ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার প্রাণকেন্দ্র। উনিশ শতকে এটাকে ‘পিপলস স্কয়ার’ বলা হতো। ১৮৬০ সালে ভিদ মোরপুরগো এই দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল এমন একটি জায়গা তৈরি করা, যেখানে মানুষ শুধু বই কিনবে না, বরং ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করবে। অর্থাৎ এটি হবে মুক্তচিন্তার একটি জায়গা।

সেই সময় ক্রোয়েশিয়ায় কোনো লাইব্রেরি ছিল না। তাই মোরপুরগোর রিডিং রুমে প্রতিদিন কবি ও সাহিত্যিকরা জড়ো হতেন। এখান থেকেই প্রকাশিত হতো ‘দ্য পিপলস পেপার’।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দোকানটি অনেক ঝড়ের মুখে পড়ে। ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর থেকে তাঁর পরিবার দোকানটি চালায়। তবে দীর্ঘ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে টিকে থাকতে পারেনি। ২০১৭ সালে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় এই ঐতিহাসিক বইয়ের দোকান।

লাইব্রেরি গ্যালিনানি

প্যারিস মানেই শিল্প, সাহিত্য ও ঐতিহ্যের শহর। সেই প্যারিসে লুভর মিউজিয়ামের কাছেই ১৮০১ সাল থেকে দাঁড়িয়ে আছে লাইব্রেরি গ্যালিনানি। এটি ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের অন্যতম পুরোনো ইংরেজি বইয়ের দোকান।

১৮৫৬ সালে রু দ্য রিভোলিতে স্থানান্তরের পর দোকানটির গুরুত্ব আরও বাড়ে। ভেতরের সাজসজ্জা, কাঠের সিঁড়ি আর বড় বড় বইয়ের তাক এখনো পুরোনো দিনের পরিবেশ মনে করিয়ে দেয়।

প্যারিসে বসবাসকারী ইংরেজিভাষী বুদ্ধিজীবীদের কাছে এটি ছিল নিয়মিত আড্ডার জায়গা। আজও দোকানটি তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

হ্যাচার্ডস

লন্ডনের পিকাডিলি রোডে হাঁটলে ১৭৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হ্যাচার্ডস চোখে পড়বে। এটি যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে পুরোনো বইয়ের দোকানগুলোর একটি।

এই দোকানের বড় পরিচয় হলো এর রাজকীয় ঐতিহ্য। হ্যাচার্ডস তিনটি ‘রয়্যাল ওয়ারেন্ট’ পেয়েছে। অর্থাৎ ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্যরা এখান থেকে নিয়মিত বই কেনেন।

দোকানের ভেতরে ঢুকলে মনে হয় যেন ভিক্টোরিয়ান যুগে ফিরে গেছেন। কাঠের সিঁড়ি, পুরোনো ধাঁচের সাজসজ্জা আর শান্ত পরিবেশ এখনো আগের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

বর্তমানে এটি ওয়াটারস্টোনসের অধীনে পরিচালিত হলেও হ্যাচার্ডসের নিজস্ব গাম্ভীর্য ও পরিচিতি বদলায়নি। ২০১৪ সালে সেন্ট প্যানক্রাস স্টেশনে এর নতুন একটি শাখাও খোলা হয়েছে।

মোরাভিয়ান বুকশপ

আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ার বেথলেহেম শহরে মোরাভিয়ান বুকশপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচীনতম বইয়ের দোকানগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত। এর সূচনা হয় ১৭৪৫ সালে, যখন মোরাভিয়ান চার্চ–সম্পর্কিত ধর্মীয় সাহিত্য ও শিক্ষাসামগ্রী বিক্রির জন্য একটি বই বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়।

প্রথমদিকে এটি মূলত চার্চ-সম্পর্কিত ধর্মীয় বই ও উপাসনালয়ভিত্তিক প্রকাশনা বিক্রি করত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সাধারণ বইয়ের দোকানে পরিণত হয় এবং ধর্মীয় বইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য, ইতিহাস, শিশুতোষ বইসহ নানা ধরনের প্রকাশনা বিক্রি শুরু করে।

দোকানটির ভেতরে ঝুলন্ত ২৬ কোণবিশিষ্ট ঐতিহ্যবাহী ‘মোরাভিয়ান স্টার’ বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে পরিচিত, যা বেথলেহেম শহরের জার্মান-মোরাভিয়ান ঐতিহ্যের প্রতীক।

ঐতিহাসিকভাবে এটি দীর্ঘ সময় স্বাধীনভাবে পরিচালিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে দোকানটির ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা রক্ষা নিয়ে আলোচনা থাকলেও, কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে ঐতিহাসিক পরিচয় বজায় রেখেই আধুনিক পরিচালনা কাঠামো চালু রাখা হয়েছে।

বারট্রান্ড বুকস্টোর

পর্তুগালের লিসবনে অবস্থিত বারট্রান্ড বুকস্টোর গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো চালু থাকা বইয়ের দোকান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

১৭৩২ সালে পেদ্রো ফরে এই দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ১৭৫৫ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পে লিসবনের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়, তখন দোকানটিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কিন্তু পেদ্রো ফরের জামাতা পিয়েরে বারট্রান্ড হাল ছাড়েননি। ধ্বংসস্তূপ থেকে আবার নতুন করে দোকানটি গড়ে তোলেন। ১৭৭৩ সালে এটি বর্তমান ঠিকানায় স্থানান্তরিত হয়।

একসময় আলেকজান্ডার হারকুলানোর মতো বিখ্যাত লেখকেরা এখানে নিয়মিত আসতেন। আজও নীল-সাদা টাইলসে সাজানো এই ঐতিহাসিক দোকানটি পর্তুগালের সাহিত্য ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

বিষয়:

বইবইমেলা

সম্পর্কিত